রবিবার, ৭ জুলাই, ২০২৪

কোটা সংস্কার আন্দোলন, বাস্তবায়ন এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

রাষ্ট্রকে একটি ট্রেনের সঙ্গে তুলনা করলে, সেই ট্রেনের চালক হচ্ছে রাজনীতিবিদরা, যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন হচ্ছে দেশের আমলারা এবং সমস্ত বগীতে বসা যাত্রীরা হচ্ছেন দেশের জনগণ।বগীতে বসা যাত্রীদের ঝুঁকিমুক্ত নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন দক্ষ ও কর্তব্যপরায়ণ চালক এবং উন্নত যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ইঞ্জিন। এর বিপরীত হলে বগিতে বসে থাকা  শতশত যাত্রীর জীবন হবে নিশ্চিত ঝুঁকির সম্মুখীন ।আমাদের রাষ্ট্র নামক রেলগাড়ির চালকগন কেমন দক্ষ ও কর্তব্যপরায়ণ তা আমরা সুবিধাভোগী চতুর জ্ঞানী ব্যক্তিরা ব্যতীত একজন সৎ নিরপেক্ষ  নিরক্ষর ব্যক্তিরও জানা।এমন চালকদের গাড়ির ইঞ্জিনও যদি তৈরি করা হয় জিঞ্জিরার যন্ত্রাংশ দিয়ে তাহলে গাড়ির  পরিণতি অনুধাবন করে আমাদের যাত্রীদেরই নিজেদের জানমাল রক্ষার্থে সচেতন হওয়া অত্যাবশ্যক।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকুরীতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, মহান মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পোষ্যদের জন্য কোটা সংরক্ষণের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে,  তবে আমাদের দেশ ও জনগণের স্বার্থে সেই কোটা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা যৌক্তিক ভাবে ভেবে দেখা উচিত।


বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন এর মাধ্যমে  দেশের প্রশাসনের বিভিন্ন শাখায় যে সকল নিয়োগ হয় সেই পদগুলো মূলত রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী পদ। এই চেয়ারগুলো যারা অলংকৃত করেন তাদের হাতেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের  ভিত্তি  নির্ধারণ হয়। স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে আমরা ৫৪ বছর পার করেছি, আমাদের হাতে হাতে প্রযুক্তি, ছোনের ঘরের পরিবর্তে ইট পাথরের ঘরে ঘুমাই,তিন বেলা খেয়ে পড়ে বাঁচার ব্যবস্থা হয়েছে , আসমানে আমাদের স্যাটেলাইট প্রদক্ষিণ করে,এক সময় ছেঁড়া বসনে আমাদের দিন কাটলে এখন কম বেশী সবাই রঙিন হরেক রকম পোশাক পরি।আজ এই  অবস্থায় আসতে কৃষকের হাড় ভাঙা শ্রম, গার্মেন্টসে কর্মরত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের বিরামহীন পরিশ্রম, বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের শ্রম এবং প্রবাসে অবস্থানরত এক কোটি মানুষের ত্যাগ ও তিতিক্ষা রয়েছে।দেশের  জনগোষ্ঠীর  বৃহৎ অংশ  উৎপাদন ও অর্থনীতির সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট, এই জনগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের উপর মূলত রাষ্ট্রের গতি সচল থাকে। এই জনগোষ্ঠীকে সঠিক ভাবে ও সঠিক পথে পরিচালনার জন্য  নীতি নির্ধারণ,নানা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন,তাদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান ও নানাবিধ সেবা প্রদানের জন্য জনগণের  করের টাকায় রাষ্ট্র প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে মেধাবী, সৎ, সুশিক্ষিত,  উদ্যমী শিক্ষার্থীদের নিয়োগ প্রদান করবেন,  এটাই রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষের কাম্য।কিন্তু জনগণ সেবার জন্য যাদের বেতন দিয়ে সংসার চালায়, তাদের কাছ থেকে পরিপূর্ণ সেবা কি তারা পায়? এর উত্তর,  সেবা পায় তবে তার জন্য আবার জনগণকে প্রায়শ বাড়তি টাকা গুনতে হয়, অর্থাৎ ঘুষ দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অর্জনকারী একজন  মানুষ ঘুষ খায় এটা শুনতে বেমানান হলেও, কথিত শিক্ষিত সমাজ আজ দুর্নীতিগ্রস্ত এটাই বাস্তব সত্য। বছরের পর বছর পার হলেও এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ হচ্ছেনা, এবং উত্তরণের পথও আমরা খুঁজছিনা।  


প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত বেশভূষায় ভদ্রলোকেরা কেন দুর্নীতিগ্রস্ত? এর কারণ খুঁজতে প্রথমত যে বিষয়টি উঠে আসে তাহলো এদের নিয়োগ প্রক্রিয়া।দেশের সরকারি চাকুরীর নিয়োগের প্রতিটি ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করে বাকি ৪৪ শতাংশ পদ সর্বসাধারণের মধ্য থেকে যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগের প্রথা চালু থাকলে এই ৪৪ শতাংশ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবী নিয়োগের পরিবর্তে মন্ত্রী এম পি’দের তদবিরের ভিত্তিতে লক্ষ লক্ষ টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের মেলা বসানো হয়।এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সরকারী চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পর্যন্ত বিদ্যমান।আমাদের দেশে সরকারী  চাকুরী মানেই শুধু বেতনের টাকায় নিজেকে স্বনির্ভর করা এবং একটি নিরাপদ জীবন যাপনকে বোঝায়।কিন্তু চাকুরী মানে নিয়োগকর্তার সেবা করা এই ধারণাই আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত।প্রশ্ন সরকারী চাকুরীর নিয়োগ কর্তা কে? উত্তর সরকার।কিন্তু সরকার পরিচালনার দায়িত্বশীলদের দায়িত্বভার অর্পণকর্তা কারা? উত্তর- জনগণ।সরকার পরিচালনার অর্থের যোগানদার কে ?উত্তর- জনগণ। জনগণ কেন তার কষ্টার্জিত অর্থ সরকারকে দেয়? উত্তরঃ তার অর্থে জীবিকা নির্বাহ করা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মচারীগন জনগণকে সেবা প্রদান করবে। যেখানে জনগণের কাছে তাদের নিয়োগ করা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার কথা সেখানে উল্টো জনগণকেই তার কর্মচারীদের দ্বারা শোষিত হতে হয় এবং তাদের সেবা অর্থের (ঘুষের) বিনিময়ে কিনতে হয়।  প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত বেশভূষায় ভদ্রলোকেরা কেন দুর্নীতিগ্রস্ত এর কারণ খুঁজতে প্রথমত যে বিষয়টি উঠে আসে তাহলো এদের নিয়োগ প্রক্রিয়া।দেশের সরকারি চাকুরীর নিয়োগের প্রতিটি ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করে বাকি ৪৪ শতাংশ পদ সর্বসাধারণের মধ্য থেকে যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগের প্রথা চালু থাকলে এই ৪৪ শতাংশ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবী নিয়োগের পরিবর্তে মন্ত্রী এম পি’দের তদবিরের ভিত্তিতে লক্ষ লক্ষ টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের মেলা বসানো হয়।এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সরকারী চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পর্যন্ত বিদ্যমান।আমাদের দেশে সরকারী  চাকুরী মানেই শুধু বেতনের টাকায় নিজেকে স্বনির্ভর করা এবং একটি নিরাপদ জীবন যাপনকে বোঝায়।কিন্তু চাকুরী মানে নিয়োগকর্তার সেবা করা এই ধারণাই আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত।প্রশ্ন সরকারী চাকুরীর নিয়োগ কর্তা কে? উত্তর সরকার।কিন্তু সরকার পরিচালনার দায়িত্বশীলদের দায়িত্বভার অর্পণকর্তা কারা? উত্তর- জনগণ।সরকার পরিচালনার অর্থের যোগানদার কে ?উত্তর- জনগণ। জনগণ কেন তার কষ্টার্জিত অর্থ সরকারকে দেয়? উত্তর তার অর্থে জীবিকা নির্বাহ করা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মচারী জনগণকে সেবা করবে। যেখানে জনগণের কাছে তাদের নিয়োগ করা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার কথা সেখানে উল্টো জনগণকেই তার কর্মচারীদের দ্বারা শোষিত হতে হয় এবং তাদের সেবা অর্থের (ঘুষের) বিনিময়ে কিনতে হয়।


জ্ঞান মানুষকে মহৎ করে এবং সুশিক্ষিত মানুষ হয় আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ।একজন মানুষ যখন জ্ঞান অর্জনের ভেতর দিয়ে নিজেকে তৈরি করার পর তার মেধা প্রমাণের সিঁড়িগুলো অতিক্রম করে করে কোন দায়িত্বে আসীন হন তখন তিনি বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে দক্ষতা, সেবার মানসিকতা এবং সততার সমন্বয় ঘটিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এমন মানুষেরাই মূলত একটি জাতির দিক নির্দেশনা দেয় এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। অপরদিকে কোন মানুষ যখন ঘাম না ঝরিয়ে মেধা প্রমাণের সিঁড়ি অতিক্রম ছাড়াই কোন দায়িত্বের আসন লাভ করে তখন তার মধ্যে প্রথমত প্রাপ্ত দায়িত্বভারের বিশেষ গুরুত্ববোধ উপলব্ধি হয়না।এছাড়া একজন অযোগ্য লোকের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, যেহেতু তার যোগ্যতা  দিয়ে নিজেকেই  রক্ষা করতে অক্ষম তাই তার কাছ থেকে বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার আশা করা অনর্থক। এমন মানুষের কাছ থেকে দেশ ও জাতির  সেবার পরিবর্তে বরং ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভানাই বেশি।নিজেকে রক্ষার চিন্তায় নিমগ্ন এমন মানুষেরাই অসৎ পথে আত্মনির্ভর হয়ে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত থাকে। যার প্রমাণ রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রের বর্তমান বিরাজমান অরাজকতা এবং আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র।রাজনীতি থেকে শুরু করে করে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্র আজ অযোগ্য মানুষদেই আধিক্যে।  


 মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন আমাদের আঠারো কোটি মানুষের মাথার মুকুট।বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন তাদের ঋণ রক্ত দিয়েও শোধ করার নয়।মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার জীবন। সেই জীবনকেই তুচ্ছ জ্ঞান করে অস্ত্র হাতে হানাদার মুক্ত করে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে একটি মানচিত্র ও পতাকা উপহার দিয়েছেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা।স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে দেশের সেবায় অবদান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিকভাবে সহায়তার জন্য ত্রিশ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ ছিল একটি সময় উপযোগী প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত।দেশ আজ তার চুয়ান্ন  বছরের সময়কাল পারি দিয়েছে।সময়ের প্রয়োজনে মেধা, প্রযুক্তি নির্ভর ও সুসভ্য জাতি বিনির্মাণে দেশকে নতুন করে পুনর্গঠন আজ প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনুভূত।মুক্তি যোদ্ধার সন্তান ও তার উত্তরসূরিদের রক্তে দেশপ্রেমের ধারা বহমান।দেশের স্বার্থে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মিছিলে প্রথম পদচারণা হবে তাদের, আমরা সেটাই কামনা করি।সরকারী প্রতিটি চাকুরীর ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও তাদের পোষ্যদের জন্য ত্রিশ শতাংশ চাকুরী ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা বলবদ থাকার কারণে অনেক অসৎ মানুষ রাজনৈতিক সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধার সনদের অধিকারী হয়ে রাষ্ট্রের এই উদারতাকে অপব্যবহার করে চলছে।আমার দেখা তীব্র আত্মমর্যাদা সম্পন্ন অনেক মুক্তিযোদ্ধা জীবনে কখনোই সরকারের নিকট সনদের জন্য দ্বারস্থ হননি এবং তাদের সন্তানদের যোগ্য মানুষ হওয়ার মন্ত্রে দীক্ষিত করে বড় করেছেন।তাদের অনেকেই  যোগ্যতার মূল্যায়নে দেশ বিদেশে  সম্মানজনক পদে আসীন।প্রতিটি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরি বা পোষ্যদের উচিত যোগ্য মানুষ হয়ে রাষ্ট্রের সেবায় অংশগ্রহণ করা। কোন অনুগ্রহ বা অনুকম্পায় শুধু বেতন পাওয়ার আশায় একটি চাকুরীর জন্য রাস্তায় দাঁড়ানো তার পূর্ব পুরুষের বীরত্বকেই খাটো করার হয় । আমার দেখা ছাত্র জীবনের প্রতি স্তরে মেধার সাক্ষর রাখা অনেক বন্ধু ও বড় ভাইকে দেখেছি সরকারের নিয়োগ প্রক্রিয়ার নীতির কারণে সরকারী চাকুরীতে সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হয়েই কোন বেসরকারী মাদ্রাসায় চাকুরী করছে অথবা শুধু জীবীকার প্রয়োজনে বিদেশের মাটিতে শ্রমিকের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।অথচ তার মেধা দেশকে এগিয়ে নেবার স্বার্থেই সরকারের কাজে ব্যবহার হওয়া উচিত ছিল।অথচ, মুক্তিযোদ্ধা সনদধারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান শিক্ষা জীবনের সকল স্তরে টেনেটুনে পাশ করে প্রথম দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকুরীর পদ দখল করে বসে আছে।আমার মতে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরই প্রথম দায়িত্ব।আমরা যদি মেধা ও সততার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড় করাতে পারি তাহলে হয়তো আজ যে চাকুরীকে কর্মসংস্থান ও জীবিকা অর্জনের ভিত্তি ভেবে যে দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়েছি সেই ধারণাই হয়তো সবার বদলে যেতে পারে। মানুষ হয়তো সরকারী চাকুরী না খুঁজে আরও ভালো কিছু উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিজেই করে সম্মানের সহিত মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখবে।   


আমাদের বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষ সামাজিক ভাবে অবহেলার স্বীকার। সমাজের এই শ্রেণীর মানুষের পাশে থাকা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।সেই লক্ষ্যে তাদের  রাষ্ট্রের সেবায় অংশগ্রহণ ও সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকুরীতে কোটা সংরক্ষণ অত্যাবশ্যক।তবে অপমানের দৃষ্টি ভঙ্গীতে না দেখে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরীতে শুধু মাত্র অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে অন্যান্য কোটা একটা নির্দিষ্ট সময়কাল নাগাদ বলবদ রাখার প্রয়োজন অনুভব করি।  


বিগত সময় স্রোতের বিপরীতে লড়াই করার দৃঢ় মানসিক শক্তিতে বলীয়ান ছাত্র সমাজের তীব্র আন্দোলনের  মুখে বাধ্য হয়েই সরকার কোটা সংস্কারের এই ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে দেশের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকুরীর নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল প্রকার কোটা বাতিলের  সিদ্ধান্ত নেয়।যা ভাবা হয়েছিল, অরাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র সমাজের  অধিকার প্রতিষ্ঠার এটি একটি ঐতিহাসিক বিজয় এবং সরকারের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সমালোচনার মাঝে এটি একটি সময় উপযোগী বিচক্ষণ এবং প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত।

কিন্তু, ক্ষমতাসীনদের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোন রূপরেখা আজও পর্যন্ত দৃশ্যমান না হওয়ায় হতাশ ছাত্রসমাজ আবারো রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে।


যদিও এই আন্দোলনকে ভণ্ডুল করার কৌশল হিসেবে কোটার সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নানা অপবাদ ও অপপ্রচার ছড়ানোর চেষ্টা করলেও বৃহত্তর সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে এবং সচেতন সাধারণ মানুষের সমর্থনে তা নস্যাৎ হয়ে গণ-মানুষের অধিকার আদায়ের দাবিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।  


অদূর ভবিষ্যতে কোটা প্রথা বাতিল হয়ে গেলেই যে সরকারী চাকুরীতে মেধাবীদের মেলা বসে যাবে এমন ভাবাও অর্থহীন।নিয়োগ বাণিজ্যের আড়তদাররা এখনো আমাদের মাথার উপর সক্রিয় হয়ে বসে আছে, সেই সাথে চাকুরীর প্রশ্নপত্র ফাঁস,দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ ইত্যাদি সমস্যা সংক্রামক ব্যাধির মত  বিরাজমান।একটি সুখী সমৃদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে দেশের সর্বস্তরের জনগণের নিজ স্বার্থে এই সংক্রামক ব্যাধিকে সমূলে নির্মূলের ব্যাপারে সোচ্চার  হওয়া অত্যাবশ্যক। 


ছবি ইন্টারনেট থেকে নেয়া ......

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০২৪

মানব জীবনের বৃত্ত

আমাদের জীবনটা হলো যোগ বিয়োগের খেলা। দুঃখ জরা, হতাশা,বিচ্ছেদ,বিরহ বাধা, বিপত্তি,সংগ্রাম, মৃত্যু ,জন্ম, প্রাপ্তি,আনন্দ, উচ্ছ্বাস ইত্যাদি দিয়ে আমাদের প্রত্যেকটা মানুষের জীবন সাজানো । এই নিয়মের বৃত্তের বাইরে পৃথিবীর একটি মানুষও নেই ।রাস্তার ফকির থেকে সিংহাসনের উপবিষ্ট রাজা বাদশা পর্যন্ত এই বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে মানব সৃষ্টির পর থেকে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে পৃথিবীর শেষ অবধি। আমরা জন্মের  আনন্দ উপভোগ করতে ভালবাসি, যাবতীয় প্রাপ্তিতে গর্বিত হই ।আমাদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে শুধু পাওয়ার প্রত্যাশা, হারানোটাও যে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করিনা বা ভাবনায় রাখিনা।তাই হঠাৎ কোন দুর্ঘটনা বা বিয়োগের  কবলে পরলে আমরা প্রথমেই ভেঙ্গে পরি, হতাশ হই।আমরা হারানো নিয়ে না ভাবলেও  আমাদের প্রত্যেকের নিয়তিতে হারানোর বেদনা অবধারিত ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জরিয়ে রয়েছে। এর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ সবাইকেই করতে হয়।এছাড়া  জীবন চলার পথে কোন প্রাপ্তির আনন্দকে ধরাও  সহজ নয়, এটা  উপভোগ করতে হলে বহু প্রতিবন্ধকতার পথ পারি দিয়ে সুখের গন্তব্যে পৌঁছেতে হয়। রাস্তার ফকিরের জীবনের সব চেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ক্ষুধা নিবারণের অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা মাথায় রেখেই প্রতিদিন সে রাস্তায় নামে ক্ষুধা নিবারণের আনন্দ উপভোগ এবং জীবন রক্ষার তাগিদে ।ক্ষুধাকে জয় করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়তই তাকে যেমন হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়  অপর দিয়ে রাষ্ট্রের মসনদে বসা রাষ্ট্রপতির ক্ষুধা নিবারণের চিন্তা না থকেলেও ক্ষমতা ও অবস্থান ধরে রাখার জন্য তাকেও রাজনীতির নানা প্রতিবন্ধকতা পথ পারি দিতে গিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুরাশা দ্বারা  গ্রাসিত হতে হয় প্রায়  প্রতিনিয়ত ।একজনের ক্ষুধা নিবারণের অন্যজনের অবস্থান ধরে রাখার হতাশা দুরাশার জীবন । সমাজের এই উঁচু নিচু দুটি মানুষের দেহের আবরণের পোশাকের বৈচিত্র্যতার তারতম্য থাকলেও দেহের আকৃতি সমান এবং সেই দেহের মধ্যে  অবস্থিত মস্তিষ্ক  জীবন ভেদে যার যার অবস্থানে টিকে থাকার অনিশ্চয়তা ও  দুশ্চিন্তামুক্ত নয়।আমরা রাষ্ট্রপতির জীবন যাপনের  বহিরাবরণ দেখে সুখী মানুষ হিসেবে  ভাবলেও ক্ষমতা হারানোর অনিশ্চয়তায় বিনিদ্র রাত্রি যাপনের সংখ্যা আমরা জানি না , আবার ফকিরের পোশাক দেখে দুঃখী মানুষ ভাবলেও শুধু রাতে উদরপূর্তির আনন্দে কত অসংখ্য রাত তার সুখনিদ্রায় পার হয় তাও আমাদের উপলব্ধিতে ধরা পড়েনা । 


সুতরাং,জীবন ভেদে অবস্থান যেখানেই হোক, সুখ দুঃখ, বিরহ বেদনা,প্রাপ্তি এবং হারানোর নিয়মের উপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।।তাই এই বিষয়গুলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভেবে প্রতিটি বিষয়কে আলিঙ্গন করার মানসিক পরিপক্বতা যে মানুষ অর্জন করতে পারে তার কাছে জীবন সহজ হয়ে ধরা দেয়।যে কোন প্রতিবন্ধকতার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা মানে দুমড়ে মুচড়ে স্থবির হয়ে যাওয়া। 

এ ক্ষেত্রে মাদার তেরেসা’র «  জীবন »  কবিতার  প্রতিটি লাইন খুব তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনুপ্রেরণার:  

                  

                     Life 


Life is an opportunity, benefit from it.

Life is beauty, admire it.

Life is bliss, taste it.

Life is a dream, realize it.

Life is a challenge, meet it.

Life is a duty, complete it.

Life is a game, play it.

Life is a promise, fulfill it.

Life is sorrow, overcome it.

Life is a song, sing it.

Life is a struggle, accept it.

Life is a tragedy, confront it.

Life is an adventure, dare it.

Life is luck, make it.

Life is too precious, do not destroy it.

Life is life, fight for it.


জীবনে সুস্থতার পাশে থাকে অসুস্থতা,

অর্জনের পাশাপাশি ব্যর্থতার আনাগোনা, 

মিলন থাকলে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা 

পৃথিবীর একদিকে শান্তিতো অন্যদিকে যুদ্ধ

আবার দীর্ঘ দিনের শান্তির বসতি হারিয়ে মুহূর্তেই হতে হয় বাস্তুহারা । 


অবধারিত মৃত্যুরকে ঘাড়ের উপর রেখে যে জীবন চলে  

সেই জীবনের  শেষ নিশ্বাসের পূর্ব পর্যন্ত থাকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকার স্বপ্ন সংগ্রাম। 

এটাই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ।  


সর্বশেষ কথা হচ্ছে, মানব দেহের মধ্যে ধারণ করা জীবনটাই হচ্ছে আমাদের  সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের প্রাপ্তি ।জীবনকে সহজ করতে জীবন চক্রের অবধারিত বিষয়গুলোকে জীবনে ধারণ এবং গ্রহণ করার শক্ত মানসিকতা তৈরি করা  অন্যতম বড় দায়িত্ব ।যে মানুষ এই যোগ্যতা অর্জন করতে পারে একমাত্র সেই মানুষের কাছেই পৃথিবীর স্বল্প সময় কালের জীবনে স্বর্গের অনুভূতি নেমে আসে।   


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ

প্যারিস, ফ্রান্স ।

বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৪

পরবাসে পরিযায়ী

পরবাসে পরিযায়ী মূলত আমার একটি ভ্রমণ কাহিনী উপজীব্য বই।আমার কাছে এই পৃথিবীটা একটি বৃহৎ পর্যটন স্থান। একটি নশ্বর শরীরকে অবলম্বন করে  আমাদের অস্তিত্ব বা আত্মার এই ভবে কিছু সময়ের জন্য আগমন। প্রকৃতির ধ্রুব কঠিন বাস্তব নিয়মের মধ্যে প্রাণীজগতের আমরা সবাই আবর্তিত।এই দেহ ছেড়ে আত্মার প্রস্থান কার কখন তা কেউ জানেনা। দেহে আত্মার অবস্থানকালে পৃথিবীকে ঘিরে থাকে আমাদের  নানা রঙ্গিন স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। কিন্তু, প্রকৃতির ডাক আসলে সবকিছু ফেলে হুট করেই প্রিয় দেহটিকে ছেড়ে আমাদের  মূল গন্তব্যের দিকে যাত্রা করতে হয়। এই পৃথিবীতে অবস্থানের সময় কার কতটুক তা আমরা কেউ জানিনা। তাই, স্বল্প সময়ের অনিশ্চিত সময় সীমার মধ্যে  প্রতিনিয়ত  প্রাণ প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবেনর সুখ সন্ধান করা আমার অন্যতম নেশা। নতুন স্থান, সেখানকার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি,মানুষের জীবনযাপেনর বৈচিত্রতা ,সংস্কৃতি  সব সময় আমাকে  দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।

সেই আকর্ষণে প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝে সুযোগ হলেই  ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি ।সঙ্গে থাকে  মুহূর্ত ধরে  রাখার আমার  প্রিয় ক্যামেরা।ঘুরে বেড়ানোর বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা লিখে বর্ণনা করা আমার  প্রিয় সখগুলোর মধ্যে একটি।পরবাসে পরিযায়ী মূলত আমার সেই অভিজ্ঞতার এক ডায়েরী। 


ভ্রমণ সম্পর্কে আমার নিজস্ব একটি মূল্যায়ন আমার বইয়ের পাতা থেকে তুলে ধরছি ,


«  আমরা পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ এই বিশ্বের কোন এক প্রান্তে জন্মগ্রহণ করে ঐ প্রান্ত থেকেই বিদায় নেই।কিন্তু,  আমাদের এই ধরিত্রী যে কত বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যে ভরপুর তার কিঞ্চিত অংশও দুচোখ মেলে দেখার সৌভাগ্য হয়না।পৃথিবীর কোথাও সমভূমিতে ফসলী মাঠের বাতাসে নেচে চলা,কোথাও আকাশমুখী পাহাড়ের দাঁড়িয়ে থাকা,কোথাও বৃক্ষরাজিহীন উত্তপ্ত ধূধূ মরু প্রান্তর,কোথাও আগুনের লাভা উদগীরণকারী আগ্নেয়গিরি,কোথাও সবুজে সবুজময় প্রাণ প্রকৃতিতে ভরপুর বনভূমি,কোথাও অবিরাম ঝরে পড়া স্বচ্ছ জলের ঝর্নাধারা, কোথাও তুষার ধবল বরফে ঢাকা অঞ্চল,আবার কোথাও ধুধু জলরাশির নীলচে সমুদ্র। এই বৈচিত্র্যতার সবকিছু যে মানুষ দেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারলো,আমার মনে সেই মানুষটিই পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান।যে মানুষ সারা জীবন অর্থ উপার্জন করে শুধু ব্যাঙ্কের জমা অর্থের পরিমাণের অংক দেখে জীবন কাঁটালো কিন্তু দুচোখ মেলে পৃথিবীর এই বৈচিত্র্যতা দেখার সময় বের করতে পারলো না, তার থেকে হতভাগা কেউ হতে পারে বলে আমার মনে হয় না »  


এটি ভ্রমণ কাহিনীর একটি সচিত্র গ্রন্থ। ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে ছবিগুলো বইয়ের পাতায় চার রঙয়ে স্থান পেয়েছে। যা পাঠকে ভ্রমণ স্থানের বর্ণনা পড়তে পড়তে যে কল্পনার সৃষ্টি হবে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতায় নামিয়ে আনবে। 


বইটিতে মোট ষোলটি ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে। প্রতিটি ভ্রমন কাহিনীতে ঐ অঞ্চলের বিশেষত্ব,সংক্ষিপ্ত ইতিহাস,ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, ,ঐতিহ্য, খাবার, মানুষের জীবনাচারণ  এবং আমার নিজস্ব মূল্যায়ন সংমিশ্রিত হয়েছে।যা পাঠকে নতুন কোন অঞ্চল সম্পর্কে জানার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে, এটা আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি। বইটি বাংলাদেশ, স্পেন, এবং বিশেষ করে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার উপর লেখা। 


বইয়ের পাতায় বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে  সাগরপারে গড়ে ওঠা শহর ও মানুষের কথা। রয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন পর্যটন শহর ও গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর ইতিবৃত্তান্ত।  


নন্ত শহরের লোয়ার নদীর পারে দাঁড়িয়ে আমার স্মৃতির পটে ভেসে ওঠা ছেলে বেলার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মার সুতো নদীকে কেন্দ্র করে সোনালী স্মৃতিকথা কিছু সময়ের জন্য অনেকেই আশির দশকের বাংলার গ্রামীণ জীবনের ফিরিয়ে নেবে।যে নদীকে হত্যা করা হয়েছে ।রাজবাড়ীর নতুন প্রজন্ম পরবাসে পরিযায়ীর মাধ্যমে জানতে পারবে একটি বিলীন হওয়া নদীর সেকালের চিত্র এবং ইতিহাস।     


যাদের পর্বতে ঘুরে বেড়ানোর নেশা রয়েছে, তারা আমার « বরফে ঢাকা আল্পস ভ্রমণের দিনগুলো » শিরোনামের পাঁচ পর্বের লেখার ভেতর দিয়ে এক ভিন্ন রকম পাঠ আনন্দ লাভ করবে।পর্বগুলোতে ইউরোপের  আল্পস পর্বতমালার  সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মোঁ ব্লঁ, সারা বিশ্বের পর্যটকদের স্বপ্নের নগরী শামনি,বরফের চাদরে ঢাকা শামনি গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে সরু লারভ  lArve নদীর বরফ শীতল জলের  তির-তির করে বয়ে চলার দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে।সেই সাথে  ভূমি থেকে ২৫২৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লো ব্রেভো (Le Brévent) চূড়া থেকে উড়ন্ত পাখির দৃষ্টির মত ভূমি দেখার দেখার ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং ভূমি,আকাশ ও আদিগন্ত পাহাড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে নিজের অবস্থানের অনুভূতির বর্ণনা অনেকের ভাবানার ঘোরাক যোগাবে। 


যারা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন,প্রকৃতি ভালোবাসেন,প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবনের আনন্দ খোঁজেন, যারা পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্যই আমার বই « পরবাসে পরিযায়ী »   

 মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল)

বুধবার, ১ নভেম্বর, ২০২৩

মানুষের অপ্রত্যাশিত পার্থিব প্রাপ্তির পরিণাম

মানুষ জীবনের যে কোন  পর্যায়ে তার প্রত্যাশার থেকে প্রচুর অর্থের অধিকারী হতে পারে, কখনো অকল্পনীয় ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে, আবার কখনো যোগ্যতার চেয়েও বড় পদের ভার নিজের উপর পড়তে পারে,দৈবক্রমে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাও দুয়ারে হাজির হতে পারে।


এমন সময়ে অধিকাংশ মানুষই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা।ফলে, ন্যায় নীতি ও মনুষ্যত্ব জ্ঞান হারিয়ে আচরণে বন্য হিংস্র প্রাণিতে পরিণত হয়ে ওঠে।ক্রমাগত এমন ঔদ্ধত্য আচরণের ফলে একটা সময় তার চারপাশের মানুষের মনে তার প্রতি ঘৃণা ও অশ্রদ্ধার উদ্ভব হতে থাকে।এতে ঝড়ের গতিতে উত্থান হওয়া মানুষটা একটা সময় জনবিছিন্ন হতে থাকে। এক পর্যায়ে আত্মবিশ্বাস হীনতা জেগে বসে ।তখন অর্থ ক্ষমতা ও পদ থাকলেও সে আর এসবের মধ্যে সুখ খুঁজে পায় না।জীবনটাকে তার কাছে  অন্তঃসারশূন্য  মনে হতে থাকে। তখন তার প্রকৃত উপলব্ধি জ্ঞান ফিরে আসলেও মানুষের অন্তরে আর পুনরায় প্রবেশের  সুযোগ থাকে না।পরিশেষে এমন মানুষের সমাজে আবির্ভাব ঘটে শুধুই একটা পদার্থ রূপে।


যারা প্রাজ্ঞ ও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ তারা পার্থিব প্রাপ্তির এই সময়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আরও ধিরস্থিরসম্পন্ন ও বিনয়ী মানুষ হয়ে ওঠে।কারণ, তাদের মধ্যে এই নশ্বর জীবন ও জগতের গতি প্রকৃতির জ্ঞান থাকার কারণে জগতের এই পার্থিব প্রাপ্তি কখনোই মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার থেকে বড় হয়ে উঠতে পারেনা। ফলে,জীবনের কোন এক পর্যায়ে জগতের পার্থিব অর্জন ও মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা মিলে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে মহান হয়ে ওঠেন।পৃথিবী থেকে প্রস্থানের পর এরা হয়ে ওঠেন জ্বলজ্বলে এক ধ্রুবতারা,আপামর মানুষের আদর্শ।  



রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

প্রসঙ্গ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

দেশের যে মানুষটা আওয়ামী লীগ করে, বি এন পি করে , জামাত করে,বাম রাজনীতি করে, পুলিশের চাকুরী করে, সাংবাদিকতা করে এরা কেউ অন্য দেশের মানুষ নয়, সবাই বাংলাদেশের ভূমিতে  জন্ম নেয়া মানুষ। মতাদর্শ ও পেশাগত কারণে যার যার অবস্থান ও দায়িত্ব ভিন্ন হতে পারে কিন্তু কেউ কারো শত্রু নয়। কারো আধিপত্য  প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে কাউকে শত্রুর সাড়িতে দাড় করিয়ে  খুনাখুনির জন্য উদ্যত হওয়া মানে নিজের দেশকে খুন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা,দেশের মানুষকে  ধ্বংস করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। দেশের মানুষকে সঠিক ভাবে পরিচালনা জন্য আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে একটি প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। সেই প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ দেশে জন্ম নেয়া প্রতিটি ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার।একটি রাজনৈতিক ও  গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যও দিয়ে যে কেউ সেই দায়িত্বের গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে যদি কেউ পেশী শক্তি ও তৃতীয় শক্তির সহায়তায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা চালায় তা সম্পূর্ণই স্বৈরতন্ত্রের শামিল এবং দেশের মানুষের সঙ্গে ঘাতকতা ছাড়া কিছু নয়। 


দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের মানুষের কল্যাণ সাধন ও রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং প্রতিটি দলই রাষ্ট্র স্বীকৃত।সেই সুবাদে, নিবন্ধিত প্রতিটি রাজনৈতিক দলই মর্যাদাপূর্ণ।প্রতিটি দলের মধ্যে একটি সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তা জনগণের কল্যাণ সাধনকে কেন্দ্র করে। এই প্রতিযোগিতায় যারা এগিয়ে থাকবে জনগণ তাদেরকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বেছে নেবে তাদের পরিচালনার জন্য।এটাই রাজনীতির সুস্থ ধারা।অন্যদিকে যারা, সুস্থ ধারাকে দূরে ঠেলে খুন,জখম ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও ভোট চুরির মত অনিয়মের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় বা ক্ষমতায় যেতে চায় তারা এক কথায় দেশ ও জনগণের শত্রু, তাদেরকে প্রতিহত করা আপামর জনগণের নৈতিক দায়িত্ব নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। 


বাংলাদেশে সামনে সংসদ নির্বাচন, যার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে দেশের কোন একটি রাজনৈতিক দল বা জোট । সামনের নির্বাচন কিভাবে করতে হবে , কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হলে জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে তা দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের এক টেবিলের  আলোচনার বিষয়বস্তু। এই বিষয়টি যদি কোন একক দল বা শক্তির সিদ্ধান্তে হয় তবে  সেখানে সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী।যদি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের এক টেবিলে বসানো না যায় তবে সংঘাত এড়াতে ভিন্ন পথে সুষ্ঠু সমাধান খুঁজতে হবে। 

বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহৎ এক অংশের দাবী একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের।যে প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অতীতে সাধারণ মানুষের  কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।যা বর্তমান সরকার ২০১১ সালে এই  তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে  বিলুপ্ত ঘোষণা করে। 

আমি মনে করি, কাগজে কালির হরফে লেখা সংবিধানের কথা যেমন দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য সংরক্ষন ও পালন যেমন সরকারের মহান দায়িত্ব , আবার সময়ের প্রয়োজনে ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দাবীর প্রেক্ষিতে সংবিধান পরিবর্তন ও পরিমার্জন করাও কখনো কখনো অপরিহার্য কর্তব্য। কারণ, জনগণের জন্যই দেশ ও দেশের সরকার ব্যবস্থা।  


বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রক্রিয়ার মতে এক হতে পারছে না সেহেতু কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে তার দায়িত্ব জনগণের উপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সরকার অনলাইন প্লাটফর্ম বা অন্য কোন মাধ্যমে একটি ভোটের আয়োজন করতে পারে, যে ভোটে দুটি অপশন থাকবে, এক। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দুই। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। এই দুইটি অপশন থেকে ভোটার একটি অপশন বেছে নিয়ে তার ভোটের মাধ্যমে মত প্রদান করবেন। দিন শেষে যে অপশনে জনগণের চাওয়ার আধিক্য অর্থাৎ ভোট বেশী পড়বে সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি বর্তমান সরকার সামনের সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে  তবেই বর্তমান সরকারকে জনগণের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিগণিত করা হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় রক্তপাতহীন একটি নির্বাচন ও সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে।  


নিজের ঘরের সমস্যা সমাধানে তৃতীয় শক্তির দ্বারস্থ হলে অধিকাংশ সময়ে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ সাধনের সম্ভাবনাই বেশী থাকে। দেখা যায়, তৃতীয় শক্তি অন্যের দুর্বলতার সুযোগে নিজ স্বার্থ হাসিল করে ঘর ধ্বংস করে বেরিয়ে যায়, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নিজের ঘরে যদি মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে কমবেশি ছাড় দিয়ে ঐকমত্যে এসে ঘর রক্ষার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকাই কল্যাণকর। নতুবা,যেদিন গোঁয়ারতুমি করে যাদের পরামর্শে ঘরহারা হবেন ঐদিন দেখবেন আপনার বুদ্ধিদাতা বন্ধুর ঘরে আপনার আর জায়গা হচ্ছেনা, জায়গা হবে রাস্তার খোলা আকাশের নিচে।নিজের ঘর সুন্দর থাকলেই অন্যের ঘরে অতিথির মর্যাদার পাওয়া যায়,আর নিজের ঘর না থাকলে অন্যের ঘরে আশ্রিত হতে হয়। এটাই পৃথিবীর বাস্তব নিয়ম।ঘর হারিয়ে সুবুদ্ধির উদয় হলে কোন লাভ নেই,বরং নিজের জীর্ণ ঘরে বসে ঘরের মানুষদের নিয়ে ঘরকে কিভাবে আরও মজবুদ করা যায় সেই ভাবনাই বুদ্ধিমানের কাজ। পৃথিবীর অনেক প্রতিষ্ঠিত দেশ আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে।যা থেকে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।  


অর্থাৎ, নিজের দেশের সমস্যা সমাধানে নিজ দেশের রাজনৈতিক দল ও জনগণের উপর আস্থা রাখুন।ইউরোপ, আমেরিকা,ভারতকে বন্ধু না বানিয়ে নিজের দেশের রাজনৈতিক দল ও জনগণকে বন্ধু বানান। তা, আপনার দলের  জন্য যেমন কল্যাণকর তেমনি দেশের প্রতিটি মানুষের জন্যও স্বস্তির বিষয় ।


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল)

প্যারিস,ফ্রান্স ।