বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০২৪

মানব জীবনের বৃত্ত

আমাদের জীবনটা হলো যোগ বিয়োগের খেলা। দুঃখ জরা, হতাশা,বিচ্ছেদ,বিরহ বাধা, বিপত্তি,সংগ্রাম, মৃত্যু ,জন্ম, প্রাপ্তি,আনন্দ, উচ্ছ্বাস ইত্যাদি দিয়ে আমাদের প্রত্যেকটা মানুষের জীবন সাজানো । এই নিয়মের বৃত্তের বাইরে পৃথিবীর একটি মানুষও নেই ।রাস্তার ফকির থেকে সিংহাসনের উপবিষ্ট রাজা বাদশা পর্যন্ত এই বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে মানব সৃষ্টির পর থেকে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে পৃথিবীর শেষ অবধি। আমরা জন্মের  আনন্দ উপভোগ করতে ভালবাসি, যাবতীয় প্রাপ্তিতে গর্বিত হই ।আমাদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে শুধু পাওয়ার প্রত্যাশা, হারানোটাও যে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করিনা বা ভাবনায় রাখিনা।তাই হঠাৎ কোন দুর্ঘটনা বা বিয়োগের  কবলে পরলে আমরা প্রথমেই ভেঙ্গে পরি, হতাশ হই।আমরা হারানো নিয়ে না ভাবলেও  আমাদের প্রত্যেকের নিয়তিতে হারানোর বেদনা অবধারিত ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জরিয়ে রয়েছে। এর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ সবাইকেই করতে হয়।এছাড়া  জীবন চলার পথে কোন প্রাপ্তির আনন্দকে ধরাও  সহজ নয়, এটা  উপভোগ করতে হলে বহু প্রতিবন্ধকতার পথ পারি দিয়ে সুখের গন্তব্যে পৌঁছেতে হয়। রাস্তার ফকিরের জীবনের সব চেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ক্ষুধা নিবারণের অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা মাথায় রেখেই প্রতিদিন সে রাস্তায় নামে ক্ষুধা নিবারণের আনন্দ উপভোগ এবং জীবন রক্ষার তাগিদে ।ক্ষুধাকে জয় করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়তই তাকে যেমন হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়  অপর দিয়ে রাষ্ট্রের মসনদে বসা রাষ্ট্রপতির ক্ষুধা নিবারণের চিন্তা না থকেলেও ক্ষমতা ও অবস্থান ধরে রাখার জন্য তাকেও রাজনীতির নানা প্রতিবন্ধকতা পথ পারি দিতে গিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুরাশা দ্বারা  গ্রাসিত হতে হয় প্রায়  প্রতিনিয়ত ।একজনের ক্ষুধা নিবারণের অন্যজনের অবস্থান ধরে রাখার হতাশা দুরাশার জীবন । সমাজের এই উঁচু নিচু দুটি মানুষের দেহের আবরণের পোশাকের বৈচিত্র্যতার তারতম্য থাকলেও দেহের আকৃতি সমান এবং সেই দেহের মধ্যে  অবস্থিত মস্তিষ্ক  জীবন ভেদে যার যার অবস্থানে টিকে থাকার অনিশ্চয়তা ও  দুশ্চিন্তামুক্ত নয়।আমরা রাষ্ট্রপতির জীবন যাপনের  বহিরাবরণ দেখে সুখী মানুষ হিসেবে  ভাবলেও ক্ষমতা হারানোর অনিশ্চয়তায় বিনিদ্র রাত্রি যাপনের সংখ্যা আমরা জানি না , আবার ফকিরের পোশাক দেখে দুঃখী মানুষ ভাবলেও শুধু রাতে উদরপূর্তির আনন্দে কত অসংখ্য রাত তার সুখনিদ্রায় পার হয় তাও আমাদের উপলব্ধিতে ধরা পড়েনা । 


সুতরাং,জীবন ভেদে অবস্থান যেখানেই হোক, সুখ দুঃখ, বিরহ বেদনা,প্রাপ্তি এবং হারানোর নিয়মের উপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।।তাই এই বিষয়গুলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভেবে প্রতিটি বিষয়কে আলিঙ্গন করার মানসিক পরিপক্বতা যে মানুষ অর্জন করতে পারে তার কাছে জীবন সহজ হয়ে ধরা দেয়।যে কোন প্রতিবন্ধকতার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা মানে দুমড়ে মুচড়ে স্থবির হয়ে যাওয়া। 

এ ক্ষেত্রে মাদার তেরেসা’র «  জীবন »  কবিতার  প্রতিটি লাইন খুব তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনুপ্রেরণার:  

                  

                     Life 


Life is an opportunity, benefit from it.

Life is beauty, admire it.

Life is bliss, taste it.

Life is a dream, realize it.

Life is a challenge, meet it.

Life is a duty, complete it.

Life is a game, play it.

Life is a promise, fulfill it.

Life is sorrow, overcome it.

Life is a song, sing it.

Life is a struggle, accept it.

Life is a tragedy, confront it.

Life is an adventure, dare it.

Life is luck, make it.

Life is too precious, do not destroy it.

Life is life, fight for it.


জীবনে সুস্থতার পাশে থাকে অসুস্থতা,

অর্জনের পাশাপাশি ব্যর্থতার আনাগোনা, 

মিলন থাকলে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা 

পৃথিবীর একদিকে শান্তিতো অন্যদিকে যুদ্ধ

আবার দীর্ঘ দিনের শান্তির বসতি হারিয়ে মুহূর্তেই হতে হয় বাস্তুহারা । 


অবধারিত মৃত্যুরকে ঘাড়ের উপর রেখে যে জীবন চলে  

সেই জীবনের  শেষ নিশ্বাসের পূর্ব পর্যন্ত থাকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকার স্বপ্ন সংগ্রাম। 

এটাই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ।  


সর্বশেষ কথা হচ্ছে, মানব দেহের মধ্যে ধারণ করা জীবনটাই হচ্ছে আমাদের  সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের প্রাপ্তি ।জীবনকে সহজ করতে জীবন চক্রের অবধারিত বিষয়গুলোকে জীবনে ধারণ এবং গ্রহণ করার শক্ত মানসিকতা তৈরি করা  অন্যতম বড় দায়িত্ব ।যে মানুষ এই যোগ্যতা অর্জন করতে পারে একমাত্র সেই মানুষের কাছেই পৃথিবীর স্বল্প সময় কালের জীবনে স্বর্গের অনুভূতি নেমে আসে।   


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ

প্যারিস, ফ্রান্স ।

বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৪

পরবাসে পরিযায়ী

পরবাসে পরিযায়ী মূলত আমার একটি ভ্রমণ কাহিনী উপজীব্য বই।আমার কাছে এই পৃথিবীটা একটি বৃহৎ পর্যটন স্থান। একটি নশ্বর শরীরকে অবলম্বন করে  আমাদের অস্তিত্ব বা আত্মার এই ভবে কিছু সময়ের জন্য আগমন। প্রকৃতির ধ্রুব কঠিন বাস্তব নিয়মের মধ্যে প্রাণীজগতের আমরা সবাই আবর্তিত।এই দেহ ছেড়ে আত্মার প্রস্থান কার কখন তা কেউ জানেনা। দেহে আত্মার অবস্থানকালে পৃথিবীকে ঘিরে থাকে আমাদের  নানা রঙ্গিন স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। কিন্তু, প্রকৃতির ডাক আসলে সবকিছু ফেলে হুট করেই প্রিয় দেহটিকে ছেড়ে আমাদের  মূল গন্তব্যের দিকে যাত্রা করতে হয়। এই পৃথিবীতে অবস্থানের সময় কার কতটুক তা আমরা কেউ জানিনা। তাই, স্বল্প সময়ের অনিশ্চিত সময় সীমার মধ্যে  প্রতিনিয়ত  প্রাণ প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবেনর সুখ সন্ধান করা আমার অন্যতম নেশা। নতুন স্থান, সেখানকার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি,মানুষের জীবনযাপেনর বৈচিত্রতা ,সংস্কৃতি  সব সময় আমাকে  দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।

সেই আকর্ষণে প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝে সুযোগ হলেই  ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি ।সঙ্গে থাকে  মুহূর্ত ধরে  রাখার আমার  প্রিয় ক্যামেরা।ঘুরে বেড়ানোর বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা লিখে বর্ণনা করা আমার  প্রিয় সখগুলোর মধ্যে একটি।পরবাসে পরিযায়ী মূলত আমার সেই অভিজ্ঞতার এক ডায়েরী। 


ভ্রমণ সম্পর্কে আমার নিজস্ব একটি মূল্যায়ন আমার বইয়ের পাতা থেকে তুলে ধরছি ,


«  আমরা পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ এই বিশ্বের কোন এক প্রান্তে জন্মগ্রহণ করে ঐ প্রান্ত থেকেই বিদায় নেই।কিন্তু,  আমাদের এই ধরিত্রী যে কত বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যে ভরপুর তার কিঞ্চিত অংশও দুচোখ মেলে দেখার সৌভাগ্য হয়না।পৃথিবীর কোথাও সমভূমিতে ফসলী মাঠের বাতাসে নেচে চলা,কোথাও আকাশমুখী পাহাড়ের দাঁড়িয়ে থাকা,কোথাও বৃক্ষরাজিহীন উত্তপ্ত ধূধূ মরু প্রান্তর,কোথাও আগুনের লাভা উদগীরণকারী আগ্নেয়গিরি,কোথাও সবুজে সবুজময় প্রাণ প্রকৃতিতে ভরপুর বনভূমি,কোথাও অবিরাম ঝরে পড়া স্বচ্ছ জলের ঝর্নাধারা, কোথাও তুষার ধবল বরফে ঢাকা অঞ্চল,আবার কোথাও ধুধু জলরাশির নীলচে সমুদ্র। এই বৈচিত্র্যতার সবকিছু যে মানুষ দেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারলো,আমার মনে সেই মানুষটিই পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান।যে মানুষ সারা জীবন অর্থ উপার্জন করে শুধু ব্যাঙ্কের জমা অর্থের পরিমাণের অংক দেখে জীবন কাঁটালো কিন্তু দুচোখ মেলে পৃথিবীর এই বৈচিত্র্যতা দেখার সময় বের করতে পারলো না, তার থেকে হতভাগা কেউ হতে পারে বলে আমার মনে হয় না »  


এটি ভ্রমণ কাহিনীর একটি সচিত্র গ্রন্থ। ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে ছবিগুলো বইয়ের পাতায় চার রঙয়ে স্থান পেয়েছে। যা পাঠকে ভ্রমণ স্থানের বর্ণনা পড়তে পড়তে যে কল্পনার সৃষ্টি হবে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতায় নামিয়ে আনবে। 


বইটিতে মোট ষোলটি ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে। প্রতিটি ভ্রমন কাহিনীতে ঐ অঞ্চলের বিশেষত্ব,সংক্ষিপ্ত ইতিহাস,ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, ,ঐতিহ্য, খাবার, মানুষের জীবনাচারণ  এবং আমার নিজস্ব মূল্যায়ন সংমিশ্রিত হয়েছে।যা পাঠকে নতুন কোন অঞ্চল সম্পর্কে জানার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে, এটা আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি। বইটি বাংলাদেশ, স্পেন, এবং বিশেষ করে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার উপর লেখা। 


বইয়ের পাতায় বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে  সাগরপারে গড়ে ওঠা শহর ও মানুষের কথা। রয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন পর্যটন শহর ও গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর ইতিবৃত্তান্ত।  


নন্ত শহরের লোয়ার নদীর পারে দাঁড়িয়ে আমার স্মৃতির পটে ভেসে ওঠা ছেলে বেলার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মার সুতো নদীকে কেন্দ্র করে সোনালী স্মৃতিকথা কিছু সময়ের জন্য অনেকেই আশির দশকের বাংলার গ্রামীণ জীবনের ফিরিয়ে নেবে।যে নদীকে হত্যা করা হয়েছে ।রাজবাড়ীর নতুন প্রজন্ম পরবাসে পরিযায়ীর মাধ্যমে জানতে পারবে একটি বিলীন হওয়া নদীর সেকালের চিত্র এবং ইতিহাস।     


যাদের পর্বতে ঘুরে বেড়ানোর নেশা রয়েছে, তারা আমার « বরফে ঢাকা আল্পস ভ্রমণের দিনগুলো » শিরোনামের পাঁচ পর্বের লেখার ভেতর দিয়ে এক ভিন্ন রকম পাঠ আনন্দ লাভ করবে।পর্বগুলোতে ইউরোপের  আল্পস পর্বতমালার  সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মোঁ ব্লঁ, সারা বিশ্বের পর্যটকদের স্বপ্নের নগরী শামনি,বরফের চাদরে ঢাকা শামনি গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে সরু লারভ  lArve নদীর বরফ শীতল জলের  তির-তির করে বয়ে চলার দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে।সেই সাথে  ভূমি থেকে ২৫২৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লো ব্রেভো (Le Brévent) চূড়া থেকে উড়ন্ত পাখির দৃষ্টির মত ভূমি দেখার দেখার ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং ভূমি,আকাশ ও আদিগন্ত পাহাড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে নিজের অবস্থানের অনুভূতির বর্ণনা অনেকের ভাবানার ঘোরাক যোগাবে। 


যারা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন,প্রকৃতি ভালোবাসেন,প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবনের আনন্দ খোঁজেন, যারা পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্যই আমার বই « পরবাসে পরিযায়ী »   

 মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল)

বুধবার, ১ নভেম্বর, ২০২৩

মানুষের অপ্রত্যাশিত পার্থিব প্রাপ্তির পরিণাম

মানুষ জীবনের যে কোন  পর্যায়ে তার প্রত্যাশার থেকে প্রচুর অর্থের অধিকারী হতে পারে, কখনো অকল্পনীয় ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে, আবার কখনো যোগ্যতার চেয়েও বড় পদের ভার নিজের উপর পড়তে পারে,দৈবক্রমে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাও দুয়ারে হাজির হতে পারে।


এমন সময়ে অধিকাংশ মানুষই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা।ফলে, ন্যায় নীতি ও মনুষ্যত্ব জ্ঞান হারিয়ে আচরণে বন্য হিংস্র প্রাণিতে পরিণত হয়ে ওঠে।ক্রমাগত এমন ঔদ্ধত্য আচরণের ফলে একটা সময় তার চারপাশের মানুষের মনে তার প্রতি ঘৃণা ও অশ্রদ্ধার উদ্ভব হতে থাকে।এতে ঝড়ের গতিতে উত্থান হওয়া মানুষটা একটা সময় জনবিছিন্ন হতে থাকে। এক পর্যায়ে আত্মবিশ্বাস হীনতা জেগে বসে ।তখন অর্থ ক্ষমতা ও পদ থাকলেও সে আর এসবের মধ্যে সুখ খুঁজে পায় না।জীবনটাকে তার কাছে  অন্তঃসারশূন্য  মনে হতে থাকে। তখন তার প্রকৃত উপলব্ধি জ্ঞান ফিরে আসলেও মানুষের অন্তরে আর পুনরায় প্রবেশের  সুযোগ থাকে না।পরিশেষে এমন মানুষের সমাজে আবির্ভাব ঘটে শুধুই একটা পদার্থ রূপে।


যারা প্রাজ্ঞ ও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ তারা পার্থিব প্রাপ্তির এই সময়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আরও ধিরস্থিরসম্পন্ন ও বিনয়ী মানুষ হয়ে ওঠে।কারণ, তাদের মধ্যে এই নশ্বর জীবন ও জগতের গতি প্রকৃতির জ্ঞান থাকার কারণে জগতের এই পার্থিব প্রাপ্তি কখনোই মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার থেকে বড় হয়ে উঠতে পারেনা। ফলে,জীবনের কোন এক পর্যায়ে জগতের পার্থিব অর্জন ও মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা মিলে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে মহান হয়ে ওঠেন।পৃথিবী থেকে প্রস্থানের পর এরা হয়ে ওঠেন জ্বলজ্বলে এক ধ্রুবতারা,আপামর মানুষের আদর্শ।  



রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

প্রসঙ্গ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

দেশের যে মানুষটা আওয়ামী লীগ করে, বি এন পি করে , জামাত করে,বাম রাজনীতি করে, পুলিশের চাকুরী করে, সাংবাদিকতা করে এরা কেউ অন্য দেশের মানুষ নয়, সবাই বাংলাদেশের ভূমিতে  জন্ম নেয়া মানুষ। মতাদর্শ ও পেশাগত কারণে যার যার অবস্থান ও দায়িত্ব ভিন্ন হতে পারে কিন্তু কেউ কারো শত্রু নয়। কারো আধিপত্য  প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে কাউকে শত্রুর সাড়িতে দাড় করিয়ে  খুনাখুনির জন্য উদ্যত হওয়া মানে নিজের দেশকে খুন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা,দেশের মানুষকে  ধ্বংস করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। দেশের মানুষকে সঠিক ভাবে পরিচালনা জন্য আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে একটি প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। সেই প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ দেশে জন্ম নেয়া প্রতিটি ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার।একটি রাজনৈতিক ও  গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যও দিয়ে যে কেউ সেই দায়িত্বের গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে যদি কেউ পেশী শক্তি ও তৃতীয় শক্তির সহায়তায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা চালায় তা সম্পূর্ণই স্বৈরতন্ত্রের শামিল এবং দেশের মানুষের সঙ্গে ঘাতকতা ছাড়া কিছু নয়। 


দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের মানুষের কল্যাণ সাধন ও রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং প্রতিটি দলই রাষ্ট্র স্বীকৃত।সেই সুবাদে, নিবন্ধিত প্রতিটি রাজনৈতিক দলই মর্যাদাপূর্ণ।প্রতিটি দলের মধ্যে একটি সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তা জনগণের কল্যাণ সাধনকে কেন্দ্র করে। এই প্রতিযোগিতায় যারা এগিয়ে থাকবে জনগণ তাদেরকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বেছে নেবে তাদের পরিচালনার জন্য।এটাই রাজনীতির সুস্থ ধারা।অন্যদিকে যারা, সুস্থ ধারাকে দূরে ঠেলে খুন,জখম ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও ভোট চুরির মত অনিয়মের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় বা ক্ষমতায় যেতে চায় তারা এক কথায় দেশ ও জনগণের শত্রু, তাদেরকে প্রতিহত করা আপামর জনগণের নৈতিক দায়িত্ব নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। 


বাংলাদেশে সামনে সংসদ নির্বাচন, যার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে দেশের কোন একটি রাজনৈতিক দল বা জোট । সামনের নির্বাচন কিভাবে করতে হবে , কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হলে জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে তা দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের এক টেবিলের  আলোচনার বিষয়বস্তু। এই বিষয়টি যদি কোন একক দল বা শক্তির সিদ্ধান্তে হয় তবে  সেখানে সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী।যদি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের এক টেবিলে বসানো না যায় তবে সংঘাত এড়াতে ভিন্ন পথে সুষ্ঠু সমাধান খুঁজতে হবে। 

বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহৎ এক অংশের দাবী একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের।যে প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অতীতে সাধারণ মানুষের  কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।যা বর্তমান সরকার ২০১১ সালে এই  তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে  বিলুপ্ত ঘোষণা করে। 

আমি মনে করি, কাগজে কালির হরফে লেখা সংবিধানের কথা যেমন দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য সংরক্ষন ও পালন যেমন সরকারের মহান দায়িত্ব , আবার সময়ের প্রয়োজনে ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দাবীর প্রেক্ষিতে সংবিধান পরিবর্তন ও পরিমার্জন করাও কখনো কখনো অপরিহার্য কর্তব্য। কারণ, জনগণের জন্যই দেশ ও দেশের সরকার ব্যবস্থা।  


বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রক্রিয়ার মতে এক হতে পারছে না সেহেতু কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে তার দায়িত্ব জনগণের উপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সরকার অনলাইন প্লাটফর্ম বা অন্য কোন মাধ্যমে একটি ভোটের আয়োজন করতে পারে, যে ভোটে দুটি অপশন থাকবে, এক। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দুই। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। এই দুইটি অপশন থেকে ভোটার একটি অপশন বেছে নিয়ে তার ভোটের মাধ্যমে মত প্রদান করবেন। দিন শেষে যে অপশনে জনগণের চাওয়ার আধিক্য অর্থাৎ ভোট বেশী পড়বে সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি বর্তমান সরকার সামনের সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে  তবেই বর্তমান সরকারকে জনগণের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিগণিত করা হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় রক্তপাতহীন একটি নির্বাচন ও সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে।  


নিজের ঘরের সমস্যা সমাধানে তৃতীয় শক্তির দ্বারস্থ হলে অধিকাংশ সময়ে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ সাধনের সম্ভাবনাই বেশী থাকে। দেখা যায়, তৃতীয় শক্তি অন্যের দুর্বলতার সুযোগে নিজ স্বার্থ হাসিল করে ঘর ধ্বংস করে বেরিয়ে যায়, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নিজের ঘরে যদি মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে কমবেশি ছাড় দিয়ে ঐকমত্যে এসে ঘর রক্ষার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকাই কল্যাণকর। নতুবা,যেদিন গোঁয়ারতুমি করে যাদের পরামর্শে ঘরহারা হবেন ঐদিন দেখবেন আপনার বুদ্ধিদাতা বন্ধুর ঘরে আপনার আর জায়গা হচ্ছেনা, জায়গা হবে রাস্তার খোলা আকাশের নিচে।নিজের ঘর সুন্দর থাকলেই অন্যের ঘরে অতিথির মর্যাদার পাওয়া যায়,আর নিজের ঘর না থাকলে অন্যের ঘরে আশ্রিত হতে হয়। এটাই পৃথিবীর বাস্তব নিয়ম।ঘর হারিয়ে সুবুদ্ধির উদয় হলে কোন লাভ নেই,বরং নিজের জীর্ণ ঘরে বসে ঘরের মানুষদের নিয়ে ঘরকে কিভাবে আরও মজবুদ করা যায় সেই ভাবনাই বুদ্ধিমানের কাজ। পৃথিবীর অনেক প্রতিষ্ঠিত দেশ আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে।যা থেকে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।  


অর্থাৎ, নিজের দেশের সমস্যা সমাধানে নিজ দেশের রাজনৈতিক দল ও জনগণের উপর আস্থা রাখুন।ইউরোপ, আমেরিকা,ভারতকে বন্ধু না বানিয়ে নিজের দেশের রাজনৈতিক দল ও জনগণকে বন্ধু বানান। তা, আপনার দলের  জন্য যেমন কল্যাণকর তেমনি দেশের প্রতিটি মানুষের জন্যও স্বস্তির বিষয় ।


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল)

প্যারিস,ফ্রান্স ।

শনিবার, ২৪ জুন, ২০২৩

বরফে ঢাকা আল্পস ভ্রমণের দিনগুলো (শেষ পর্ব - পাছি প্লেন জু )

২৪ ডিসেম্বর ২০২১, আমাদের ঘরে ফেরার দিন। ট্রেন সন্ধ্যা সাতটায়। এয়ারবিএনবি’র Airbnb শর্ত অনুযায়ী সকাল এগারটার মধ্যে আমাদেরকে ঘর ছেড়ে দিতে হবে।সমস্ত দিন হাতে থাকলেও কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা নেই ।কয়েকদিন সবার মধ্যে যে ছোটার তাড়া ছিল তা ভেতর থেকে চলে গিয়ে অবসাদ ভর করেছে।সকালে সবার ঘুম ভেঙ্গেছে আয়েশি ভঙ্গিতে। নাস্তা সেরে সবার ব্যাগ গোছানোর পর্বও শেষ হয়ে গেল।ট্রেন ছাড়বে দিনের শেষে তাই এতোগুলো বড় ব্যাগ সঙ্গে করে বাইরে অবস্থান করা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। বাসার মালিককে বাসা ছাড়ার আগে ফোন করে অনুরোধ করে বললাম, আমাদের ট্রেন সন্ধ্যায় তাই ভারি ব্যাগগুলো যদি কোথাও রাখার ব্যবস্থা করে দিতেন তবে মাঝের এই দীর্ঘ সময় আমাদের ঘোরাফেরার জন্য একটু সহজ হত।ভদ্রলোক উত্তরে বলল, আজ বাসায় কোন অতিথি উঠবেনা, চাইলে সারাদিন আপনারা বাসা ব্যবহার করতে পারেন।ভদ্রলোকের কথায় মনে হল, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পেয়ে গেলাম। দিনের সারাটা সময় আমাদের জন্য ঝরঝরে হয়ে গেল।আলো ঝলমলে এবং কুয়াশামুক্ত সকাল,জানালায় চোখ রাখতে দেখি সুদূরে পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়াগুলো জেগে উঠে উঠেছে। ঐ দিনের সকালে পাহাড় যে ভাবে দৃশ্যমান হয়েছে অন্যদিনগুলোতে সে ভাবে দেখা হয়নি।অধিকাংশ সময় পাহাড়ের উপরিভাগ মেঘ ও কুয়াশায় ডাকা থাকায় চূড়াগুলো দেখা যায়না। মাঝে মাঝে মেঘ সরে গেলে বা  কুয়াশা কেটে কিছু সময়ের জন্য চূড়ারগুলোর কিছু কিছু অংশ ভেসে ওঠে। ওদিন ছিল ব্যতিক্রম,চারপাশের সমস্ত পাহাড় চূড়াগুলো যেন একযোগে সমস্ত আবরণ ঝেড়ে ফেলে শরীরের সমস্ত রূপ মেলে ধরেছিল। দিনটি এমন, বেলকনিতে বসে পাহাড়ের এমন দৃশ্যকে সামনে রেখে কফির চুমুকে গল্প করে কাটিয়ে দেয়ার।কিন্তু মনে হল, দিনটি যেহেতু নিজের মত করে পাওয়া গেল তাই বাসে করে নতুন  কোন জায়গায় গেলে মন্দ হয় না।ওরা দুজন জানিয়ে দিয়েছে, সারা দিন বাসায় কাটিয়ে একবারে ফিরতি ট্রেনে উঠবে।তাই একাই বেরিয়ে পরলাম Auvergne-Rhône-Alpes নতুন কোন অঞ্চল আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে।  

ছা- জারভে লে বাঁ লো ফায়ে বাস স্টেশনে একটি বাস যাত্রীর জন্য অপেক্ষমাণ।চালককে বললাম,আমি প্যারিস থেকে কয়েকদিনের জন্য এই অঞ্চলে ঘুরতে এসেছি,দুদিন শামনি শহর ও এর আশেপাশের অঞ্চল ঘুরেছি,এখান থেকে বাস অন্য আর কোন পর্যটন স্থানে যায়, জানাবেন কি? ভদ্রলোক বলল, আমি পাছি প্লেন জু (Passy Plaine-Joux)যাবো,এটি একটি স্কি সেন্টার এবং খুব আকর্ষণীয় স্থান,আমি একটু পরেই রওনা হবো, আপনি চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন। আমি কোন চিন্তা না করে চালকের কাছ থেকে ছয় ইউরোতে একটি টিকেট সংগ্রহ করে বাসের ভেতরে গিয়ে বসলাম।

 

বাস কিছু সময়ের মধ্যে সমতল উপত্যকা গ্রাম পেরিয়ে প্রবেশ করলো পাহাড়ি পথে।পাহাড়ের কোল ঘেঁষা পথ একে বেঁকে উপড়ে উঠে গেছে।পথের মাঝে মাঝেই ভয়ঙ্কর বাক। চালক খুব সতর্কতার সঙ্গে সেগুলো পেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো।মোটরযান চালনায় বিশেষ দক্ষতা না থাকলে এই পথে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেক।রাস্তার কোথাও কোথাও ভয়ঙ্কর পাহাড়ি ঢালু কিন্তু তেমন কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী বেড়া নেই।বাস যতই উপড়ে উঠছিল দূরের পাহাড়ি গ্রাম ও বিস্তীর্ণ উপত্যকা ভূমি ছবির দৃশ্যের মত ধরা দিচ্ছিল দৃষ্টিতে।এই খাড়া পাহাড়ি পথের পাশদিয়ে কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছে ছোট ছোট আবাসিক এলাকা, দোকানপাট, বিনোদন কেন্দ্র, হোটেল, রেস্তরাঁ।রাস্তার দুধারে ঘন পাইনের বন।সুশীতল বরফের ছায়াঢাকা পথ।বেশ রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে চলার পথের সময়টা উপভোগ করছিলাম আর ওদেরকে মনে পড়ছিল।প্রায় চল্লিশ মিনিটের পাহাড়ি এক দুর্গম খাড়া পথ বেয়ে বাস তার গতি থামাল পাছি প্লেন জু স্টেশনে। আমি বাস থেকে নেমেই আশেপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করে নিলাম।    

 

উপত্যকা ভূমি থেকে ১৩৬০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ছোট্ট একটি স্কি ষ্টেশন।পর্যটক ও স্কিয়ারদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি দারুণ স্থান।রেস্তরাঁ,পর্যটন তথ্য কেন্দ্র,জাদুঘর,স্কি শেখার স্কুল এবং স্কি ভাড়া ও বিক্রয় সামগ্রীর দোকান সবই রয়েছে।স্থানটির একপাশে ৩৮২ মিটার উচ্চতার পাহাড়ের প্রাচীরে ঘেরা এবং চূড়া ধূসর মেঘের সঙ্গে জড়াজড়ি করছিল। অন্য পাশে  উন্মুক্ত আকাশের নিচে উপত্যকা ভূমি আর আদিগন্ত পর্বতমালা। মেঘ আর রৌদ্রের লুকোচুরি খেলায় প্রতিনিয়ত অদ্ভুতভাবে পর্বতচূড়াগুলোর রূপ পরিবর্তন হচ্ছে।আমি বরফের স্তরের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়ালাম পাহাড়ের পারের উপর।পারের জায়গায় জায়গায় সতর্ক সংকেত দেয়া রয়েছে।পার এতোটাই খাড়া এবং উঁচু যে কেউ দুর্ঘটনার কবলে পড়লে বাঁচার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।বিমান থেকে যে ভাবে ভূমি দেখা যায় এখানে দাঁড়িয়ে সামনের দৃশ্যপট সেভাবে ধরা দিলো আমার সামনে।কয়েক দিনের অতি পরিচিত এলাকাকে এক পৃষ্ঠায় অঙ্কিত একটি মানচিত্রের মত লাগছিল। সুউচ্চ স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো ২২৭৫ মিটারের দীর্ঘ সেতুর ভিয়াদুক দে এগ্রাত (Viaduc des Égratz), যেটির উপর দিয়ে আমরা বাসে করে শামনি গিয়েছিলাম সেটি একেবেঁকে চলা একটি চিকন সরীসৃপের মত দেখাচ্ছিল।ক্যামেরার লেন্স জুম করে খুঁজে পেলাম ছা- জারভে লে বাঁ লো ফায়ে  (St-Gervais-les-Bains-le-Fayet)ট্রেন স্টেশন এবং আমাদের ক্ষণিকের আবাস এলাকা। বুঝতে পারলাম আমি কোথায় অবস্থান করছি। কয়েকদিন ছা-জারভে লে বাঁ এলাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি পাহাড়ের বিশালতার দিকে দাঁড়িয়ে মনের ভেতর নানা প্রশ্ন জাগছিল,ঐ উচ্চতায় উপর কি মানুষ যেতে পারে?ঐপাহাড়ের ভাজে কি কোন বসতি আছে? ইত্যাদি। দূর থেকে খাড়া পাহাড়টির অবয়ব দেখলে এতোই দুর্ভেদ্য মনে হয় যে, যে কারো মনে এমন ভাবনার জন্ম দেবে।

পাছি প্লেন জু’র পারে দাঁড়িয়ে আমি আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলাম।দূর থেকে যে পাহাড় দেখে আমার মধ্যে নানা কৌতূহল জন্ম নিয়েছিল আমি বাসে করে সেই পাহাড়ের গা বেয়ে তারই শীর্ষ  চূড়ায় এসে পৌঁছেছি।ব্যাপারটা যে এভাবে বাস্তব হবে তা ভেবেই অবাক হচ্ছিলাম।

পাছি জু’র পারে দাঁড়িয়ে Auvergne-Rhône-Alpes অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও মানুষের জীবন যাপন সম্পর্কে একটি ধারনা পেলাম।খালি চোখে সমস্ত অঞ্চলকে একটি পেন্সিলে আঁকা ধূসর রঙয়ের স্কেচের মত লাগছিল।ক্যামেরার লেন্স জুম করে ধরার চেষ্টা করছিলাম দূর পাহাড়ি অঞ্চলের জীবন চিত্র। বিস্তীর্ণ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে উপত্যকা ভূমি। তার মাঝে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম, আবার কোথাও পাহাড়ের গায়ে গায়ে বিচ্ছিন্ন মানব বসতি ঘরবাড়ী।



মেসেঞ্জারের ভিডিও কলের মাধ্যমে সুমিকে আমার অবস্থান দেখিয়ে বললাম, দুপুরের খাবার সেরে যদি আসতে পারো তবে আল্পসকে আরও নতুন করে আবিষ্কার করতে পারবে। চারপাশের দৃশ্য দেখাতেই ও সহজেই রাজী হয়ে গেল। আমি ওদেরকে এখানে আসার বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে আবার আল্পস উপভোগে নিমগ্ন হলাম। 


 


পাছি’র ছোট্ট পর্বত পৃষ্ঠ যেন একটি বিনোদন কেন্দ্র।খ্রিস্টমাস উপলক্ষে নানা আয়োজনে মেলার ইমেজ বিরাজ করছিলো।বাচ্চাদের আনন্দ দেবার জন্য অনেকে পের নোয়েল বা স্যান্টাক্লজ সেজে এসেছে, কেউবা ধর্মীয় রূপকথার নানা চরিত্রের পোশাক পরে বা বাচ্চাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল।

কুকুরের স্লেজ গাড়ি কিভাবে ছুটে চলতো পাহাড়ি বরফ ঢাকা পথে তা সিনেমার পর্দায় দেখেছি, কিন্তু এবার সেই ঐতিহ্যবাহী স্লেজ গাড়ীর দর্শন মিলল এখানে।শেয়াল সদৃশ এক দল সুদর্শন  কুকুর পর্যটকদের পেছনে বসিয়ে টেনে চলছিলো বরফের উপর দিয়ে।



পাহাড়ের নানা রূপ ক্যামেরায় ধারণ করতে করতে ছোট্ট যন্ত্রটি দুর্বল হয়ে পরল তাই ওকে চার্জ দেবার জন্য একটি ক্যাফে বারে ঢুকলাম।কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যাফে বারের বৈদ্যুতিক হিটারের উষ্ণতায় শরীরে বেশ চনমনে ভাব ফিরে এলো।ক্যাফের চুমুকে নিজে সতেজ হওয়ার পাশাপাশি ছবি তোলার যন্ত্রটি বৈদ্যুতিক সংযোগে কিছুটা  শক্তি সঞ্চার করে নিলো।সুমি ফোনে জানালো, ওরা প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে।   

বিকেল সাড়ে তিনটের দিকে আমার জন্য একটি পিজার বক্স হাতে করে পাছি পৃষ্টে এসে নামলো। চারপাশের দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই উৎফুল্ল ভাব ফুটে উঠল সুমির মধ্যে।আল্পস ভ্রমণে পাছি দর্শন সুমি ও মিশেলের কাছে বাড়তি পাওয়া।  ওদের পরিকল্পনার বাইরে এমন একটি জায়গায় আসতে পেরে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানালো।হাতে সময় কম থাকায় ওরা নেমে পরল পাছি’র সৌন্দর্য উপভোগে আর আমি ক্ষুধা নিবারণের স্বার্থে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া পিজা অনেকটা জোর করেই পেটে ঢোকাতে লাগলাম পাছি’র এককোণে পেতে রাখা অবকাশ চেয়ার বসে।      


ওরা আসাতে আমার আল্পস ভ্রমণের শেষ সময়টুকু বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠল।স্মৃতি ধরে রাখতে নিজেদের একে ওপরের  ছবি তুলে কাটল বেশ কিছু সময়।সবাই একসাথে হেঁটে বেড়ালাম পাছি পৃষ্ঠের বরফ ভূমির উপর দিয়ে।  



যেহেতু,আমাদের প্যারিস ফেরার ট্রেনের সময় সাতটায় তাই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য কিছুটা সময় হাতে রেখে বিকেল পাঁচটার বাস ধরার প্রস্তুতি নিয়ে স্টপেজে গিয়ে দাঁড়ালাম।বাস আসার নির্ধারিত সময় অতিক্রম হলেও স্টপেজে বাসের দেখা মিলল না।প্রায় পনের মিনিট পার হয়ে গেল।কিছুটা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে পাছি’র প্রবেশ পথের দিকে বাসের জন্য আমরা অধীর প্রতীক্ষায় রইলাম।ফ্রান্সে পাবলিক যানবাহনগুলো সাধারণত সময় সূচি মেপে চলাচল করে, তবে কোন কারণে ট্রাফিক সমস্যার সৃষ্টি হলে ট্রান্সপোর্টগুলোর সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে। বুঝতে পারলাম আমরা তেমনি সমস্যার কবলে পরেছি।প্রতিটি অতিতিক্ত মিনিট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হতে লাগলো।নির্ধারিত সময়ের প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পাছি’র প্রবেশদ্বারে বাসের আগমন ঘটল।স্টেশনে যাত্রী তোলার জন্য বাস আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে  ছা- জারভে লে বাঁ লো ফায়ে’র উদ্দেশ্যে রওনা করলো।আমরা অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে রওনা করলাম।সময়টা এমন যে পথের মধ্যে কোনও প্রকার ট্রাফিক সমস্যায় সময় ক্ষেপণ হলেই আমাদের ট্রেন মিস হবে। পাহাড়ের ঢালু পথে ঘুরে ঘুরে বাস নামতে লাগলো।বাস নিচ থেকে থেকে যখন উপড়ে উঠছিল তখনকার পাহার দেখার অনুভূতি থেকে নামার অনুভূতি সম্পূর্ণই ভিন্ন লাগছিল। আসার সময় নিশ্চুপ ভাবে সময় কাটলেও যাবার বেলার গল্প গুজব আমাদের আল্পস ভ্রমণের স্মৃতিটাকে রাঙ্গিয়ে তুলল।যা অপরিকল্পিত ভাবে হয়ে গেল।বাস দুই একটি স্টপেজ থেকে যাত্রী তোলা ছাড়া সময় ক্ষেপণ না করে এগিয়ে যেতে লাগলো।সন্ধ্যার জনমানবহীন পাহাড়ি পথটা এমন, যদি কেউ পথের মধ্যে কোন কারণে শেষ বাস মিস করে তবে তার জন্য মহাবিপদ।গা ঝমঝমে পাহাড়ি সড়কটিতে কোন পথচারী হাঁটার ফুটপাত নেই।এক স্টপেজ থেকে অন্য স্টপেজের দূরত্বও অনেক।পাহাড়ের কোল ঘেঁষা সড়কটি এতোই খাড়া যে এই পথ ধরে হেঁটে ওঠা এবং নামা দুটোই কষ্টকর এবং বিপদজনক। তাই হয়তো কর্তৃপক্ষ পথচারী চলাচলের ব্যবস্থা রাখেনি।মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে স্থানীয়দের যে দু চারতে বসতি রয়েছে তাদের এক মাত্র চলাচলের মাধ্যম ব্যক্তিগত মটরগাড়ি। পর্যটকরাই মূলত পাছি পৃষ্ঠে ওঠা ও আশেপাশের অন্যান্য পর্যটন স্থানে যাওয়ার  জন্য পাবলিক বাস ব্যবহার করে থাকে।দুচার দিন ঘোরার জন্য এমন এলাকা আকর্ষণীয় হলেও যাদের এসব অঞ্চলে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে হয় তাদের যে নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে সন্ধি করে দৈনন্দিন জীবন কাটাতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও ফ্রান্সের নাগরিক জীবনে আধুনির সুযোগ সুবিধার সবকিছুই প্রত্যন্ত রয়েছে।যা হোক,বাস প্রায় চল্লিশ মিনিটের সতর্ক যাত্রার ইতি টানল ছা- জারভে লে বাঁ লো ফায়ে স্টেশনে।আমরা প্যারিস ফেরার ট্রেনে উঠতে হাতে ত্রিশ মিনিট পেলাম।বাক্সপ্যাঁটরা গোছানোই রয়েছে।দ্রুত পায়ে হেঁটে বাসায় পৌছুলাম।যার যার ব্যাগ নিজ দায়িত্বে নিয়ে বেরিয়ে এলাম আমাদের ক্ষণিকের ছোট্ট নীড় থেকে।দরজার পাশের ছোট্ট একটি বাক্স। বাসার চাবিটি বক্সের মধ্যে ফেলে দেয়ার মধ্যদিয়ে শেষ হল আমাদের আল্পসের গায়ে ছুটে চলার দিন কয়েকের গল্প ।



মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল)

পারিস ,ফ্রান্স ।