বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০২৪

মানব জীবনের বৃত্ত

আমাদের জীবনটা হলো যোগ বিয়োগের খেলা। দুঃখ জরা, হতাশা,বিচ্ছেদ,বিরহ বাধা, বিপত্তি,সংগ্রাম, মৃত্যু ,জন্ম, প্রাপ্তি,আনন্দ, উচ্ছ্বাস ইত্যাদি দিয়ে আমাদের প্রত্যেকটা মানুষের জীবন সাজানো । এই নিয়মের বৃত্তের বাইরে পৃথিবীর একটি মানুষও নেই ।রাস্তার ফকির থেকে সিংহাসনের উপবিষ্ট রাজা বাদশা পর্যন্ত এই বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে মানব সৃষ্টির পর থেকে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে পৃথিবীর শেষ অবধি। আমরা জন্মের  আনন্দ উপভোগ করতে ভালবাসি, যাবতীয় প্রাপ্তিতে গর্বিত হই ।আমাদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে শুধু পাওয়ার প্রত্যাশা, হারানোটাও যে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করিনা বা ভাবনায় রাখিনা।তাই হঠাৎ কোন দুর্ঘটনা বা বিয়োগের  কবলে পরলে আমরা প্রথমেই ভেঙ্গে পরি, হতাশ হই।আমরা হারানো নিয়ে না ভাবলেও  আমাদের প্রত্যেকের নিয়তিতে হারানোর বেদনা অবধারিত ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জরিয়ে রয়েছে। এর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ সবাইকেই করতে হয়।এছাড়া  জীবন চলার পথে কোন প্রাপ্তির আনন্দকে ধরাও  সহজ নয়, এটা  উপভোগ করতে হলে বহু প্রতিবন্ধকতার পথ পারি দিয়ে সুখের গন্তব্যে পৌঁছেতে হয়। রাস্তার ফকিরের জীবনের সব চেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ক্ষুধা নিবারণের অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা মাথায় রেখেই প্রতিদিন সে রাস্তায় নামে ক্ষুধা নিবারণের আনন্দ উপভোগ এবং জীবন রক্ষার তাগিদে ।ক্ষুধাকে জয় করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়তই তাকে যেমন হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়  অপর দিয়ে রাষ্ট্রের মসনদে বসা রাষ্ট্রপতির ক্ষুধা নিবারণের চিন্তা না থকেলেও ক্ষমতা ও অবস্থান ধরে রাখার জন্য তাকেও রাজনীতির নানা প্রতিবন্ধকতা পথ পারি দিতে গিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুরাশা দ্বারা  গ্রাসিত হতে হয় প্রায়  প্রতিনিয়ত ।একজনের ক্ষুধা নিবারণের অন্যজনের অবস্থান ধরে রাখার হতাশা দুরাশার জীবন । সমাজের এই উঁচু নিচু দুটি মানুষের দেহের আবরণের পোশাকের বৈচিত্র্যতার তারতম্য থাকলেও দেহের আকৃতি সমান এবং সেই দেহের মধ্যে  অবস্থিত মস্তিষ্ক  জীবন ভেদে যার যার অবস্থানে টিকে থাকার অনিশ্চয়তা ও  দুশ্চিন্তামুক্ত নয়।আমরা রাষ্ট্রপতির জীবন যাপনের  বহিরাবরণ দেখে সুখী মানুষ হিসেবে  ভাবলেও ক্ষমতা হারানোর অনিশ্চয়তায় বিনিদ্র রাত্রি যাপনের সংখ্যা আমরা জানি না , আবার ফকিরের পোশাক দেখে দুঃখী মানুষ ভাবলেও শুধু রাতে উদরপূর্তির আনন্দে কত অসংখ্য রাত তার সুখনিদ্রায় পার হয় তাও আমাদের উপলব্ধিতে ধরা পড়েনা । 


সুতরাং,জীবন ভেদে অবস্থান যেখানেই হোক, সুখ দুঃখ, বিরহ বেদনা,প্রাপ্তি এবং হারানোর নিয়মের উপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।।তাই এই বিষয়গুলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভেবে প্রতিটি বিষয়কে আলিঙ্গন করার মানসিক পরিপক্বতা যে মানুষ অর্জন করতে পারে তার কাছে জীবন সহজ হয়ে ধরা দেয়।যে কোন প্রতিবন্ধকতার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা মানে দুমড়ে মুচড়ে স্থবির হয়ে যাওয়া। 

এ ক্ষেত্রে মাদার তেরেসা’র «  জীবন »  কবিতার  প্রতিটি লাইন খুব তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনুপ্রেরণার:  

                  

                     Life 


Life is an opportunity, benefit from it.

Life is beauty, admire it.

Life is bliss, taste it.

Life is a dream, realize it.

Life is a challenge, meet it.

Life is a duty, complete it.

Life is a game, play it.

Life is a promise, fulfill it.

Life is sorrow, overcome it.

Life is a song, sing it.

Life is a struggle, accept it.

Life is a tragedy, confront it.

Life is an adventure, dare it.

Life is luck, make it.

Life is too precious, do not destroy it.

Life is life, fight for it.


জীবনে সুস্থতার পাশে থাকে অসুস্থতা,

অর্জনের পাশাপাশি ব্যর্থতার আনাগোনা, 

মিলন থাকলে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা 

পৃথিবীর একদিকে শান্তিতো অন্যদিকে যুদ্ধ

আবার দীর্ঘ দিনের শান্তির বসতি হারিয়ে মুহূর্তেই হতে হয় বাস্তুহারা । 


অবধারিত মৃত্যুরকে ঘাড়ের উপর রেখে যে জীবন চলে  

সেই জীবনের  শেষ নিশ্বাসের পূর্ব পর্যন্ত থাকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকার স্বপ্ন সংগ্রাম। 

এটাই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ।  


সর্বশেষ কথা হচ্ছে, মানব দেহের মধ্যে ধারণ করা জীবনটাই হচ্ছে আমাদের  সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের প্রাপ্তি ।জীবনকে সহজ করতে জীবন চক্রের অবধারিত বিষয়গুলোকে জীবনে ধারণ এবং গ্রহণ করার শক্ত মানসিকতা তৈরি করা  অন্যতম বড় দায়িত্ব ।যে মানুষ এই যোগ্যতা অর্জন করতে পারে একমাত্র সেই মানুষের কাছেই পৃথিবীর স্বল্প সময় কালের জীবনে স্বর্গের অনুভূতি নেমে আসে।   


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ

প্যারিস, ফ্রান্স ।

বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৪

পরবাসে পরিযায়ী

পরবাসে পরিযায়ী মূলত আমার একটি ভ্রমণ কাহিনী উপজীব্য বই।আমার কাছে এই পৃথিবীটা একটি বৃহৎ পর্যটন স্থান। একটি নশ্বর শরীরকে অবলম্বন করে  আমাদের অস্তিত্ব বা আত্মার এই ভবে কিছু সময়ের জন্য আগমন। প্রকৃতির ধ্রুব কঠিন বাস্তব নিয়মের মধ্যে প্রাণীজগতের আমরা সবাই আবর্তিত।এই দেহ ছেড়ে আত্মার প্রস্থান কার কখন তা কেউ জানেনা। দেহে আত্মার অবস্থানকালে পৃথিবীকে ঘিরে থাকে আমাদের  নানা রঙ্গিন স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। কিন্তু, প্রকৃতির ডাক আসলে সবকিছু ফেলে হুট করেই প্রিয় দেহটিকে ছেড়ে আমাদের  মূল গন্তব্যের দিকে যাত্রা করতে হয়। এই পৃথিবীতে অবস্থানের সময় কার কতটুক তা আমরা কেউ জানিনা। তাই, স্বল্প সময়ের অনিশ্চিত সময় সীমার মধ্যে  প্রতিনিয়ত  প্রাণ প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবেনর সুখ সন্ধান করা আমার অন্যতম নেশা। নতুন স্থান, সেখানকার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি,মানুষের জীবনযাপেনর বৈচিত্রতা ,সংস্কৃতি  সব সময় আমাকে  দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।

সেই আকর্ষণে প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝে সুযোগ হলেই  ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি ।সঙ্গে থাকে  মুহূর্ত ধরে  রাখার আমার  প্রিয় ক্যামেরা।ঘুরে বেড়ানোর বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা লিখে বর্ণনা করা আমার  প্রিয় সখগুলোর মধ্যে একটি।পরবাসে পরিযায়ী মূলত আমার সেই অভিজ্ঞতার এক ডায়েরী। 


ভ্রমণ সম্পর্কে আমার নিজস্ব একটি মূল্যায়ন আমার বইয়ের পাতা থেকে তুলে ধরছি ,


«  আমরা পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ এই বিশ্বের কোন এক প্রান্তে জন্মগ্রহণ করে ঐ প্রান্ত থেকেই বিদায় নেই।কিন্তু,  আমাদের এই ধরিত্রী যে কত বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যে ভরপুর তার কিঞ্চিত অংশও দুচোখ মেলে দেখার সৌভাগ্য হয়না।পৃথিবীর কোথাও সমভূমিতে ফসলী মাঠের বাতাসে নেচে চলা,কোথাও আকাশমুখী পাহাড়ের দাঁড়িয়ে থাকা,কোথাও বৃক্ষরাজিহীন উত্তপ্ত ধূধূ মরু প্রান্তর,কোথাও আগুনের লাভা উদগীরণকারী আগ্নেয়গিরি,কোথাও সবুজে সবুজময় প্রাণ প্রকৃতিতে ভরপুর বনভূমি,কোথাও অবিরাম ঝরে পড়া স্বচ্ছ জলের ঝর্নাধারা, কোথাও তুষার ধবল বরফে ঢাকা অঞ্চল,আবার কোথাও ধুধু জলরাশির নীলচে সমুদ্র। এই বৈচিত্র্যতার সবকিছু যে মানুষ দেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারলো,আমার মনে সেই মানুষটিই পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান।যে মানুষ সারা জীবন অর্থ উপার্জন করে শুধু ব্যাঙ্কের জমা অর্থের পরিমাণের অংক দেখে জীবন কাঁটালো কিন্তু দুচোখ মেলে পৃথিবীর এই বৈচিত্র্যতা দেখার সময় বের করতে পারলো না, তার থেকে হতভাগা কেউ হতে পারে বলে আমার মনে হয় না »  


এটি ভ্রমণ কাহিনীর একটি সচিত্র গ্রন্থ। ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে ছবিগুলো বইয়ের পাতায় চার রঙয়ে স্থান পেয়েছে। যা পাঠকে ভ্রমণ স্থানের বর্ণনা পড়তে পড়তে যে কল্পনার সৃষ্টি হবে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতায় নামিয়ে আনবে। 


বইটিতে মোট ষোলটি ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে। প্রতিটি ভ্রমন কাহিনীতে ঐ অঞ্চলের বিশেষত্ব,সংক্ষিপ্ত ইতিহাস,ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, ,ঐতিহ্য, খাবার, মানুষের জীবনাচারণ  এবং আমার নিজস্ব মূল্যায়ন সংমিশ্রিত হয়েছে।যা পাঠকে নতুন কোন অঞ্চল সম্পর্কে জানার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে, এটা আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি। বইটি বাংলাদেশ, স্পেন, এবং বিশেষ করে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার উপর লেখা। 


বইয়ের পাতায় বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে  সাগরপারে গড়ে ওঠা শহর ও মানুষের কথা। রয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন পর্যটন শহর ও গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর ইতিবৃত্তান্ত।  


নন্ত শহরের লোয়ার নদীর পারে দাঁড়িয়ে আমার স্মৃতির পটে ভেসে ওঠা ছেলে বেলার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মার সুতো নদীকে কেন্দ্র করে সোনালী স্মৃতিকথা কিছু সময়ের জন্য অনেকেই আশির দশকের বাংলার গ্রামীণ জীবনের ফিরিয়ে নেবে।যে নদীকে হত্যা করা হয়েছে ।রাজবাড়ীর নতুন প্রজন্ম পরবাসে পরিযায়ীর মাধ্যমে জানতে পারবে একটি বিলীন হওয়া নদীর সেকালের চিত্র এবং ইতিহাস।     


যাদের পর্বতে ঘুরে বেড়ানোর নেশা রয়েছে, তারা আমার « বরফে ঢাকা আল্পস ভ্রমণের দিনগুলো » শিরোনামের পাঁচ পর্বের লেখার ভেতর দিয়ে এক ভিন্ন রকম পাঠ আনন্দ লাভ করবে।পর্বগুলোতে ইউরোপের  আল্পস পর্বতমালার  সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মোঁ ব্লঁ, সারা বিশ্বের পর্যটকদের স্বপ্নের নগরী শামনি,বরফের চাদরে ঢাকা শামনি গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে সরু লারভ  lArve নদীর বরফ শীতল জলের  তির-তির করে বয়ে চলার দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে।সেই সাথে  ভূমি থেকে ২৫২৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লো ব্রেভো (Le Brévent) চূড়া থেকে উড়ন্ত পাখির দৃষ্টির মত ভূমি দেখার দেখার ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং ভূমি,আকাশ ও আদিগন্ত পাহাড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে নিজের অবস্থানের অনুভূতির বর্ণনা অনেকের ভাবানার ঘোরাক যোগাবে। 


যারা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন,প্রকৃতি ভালোবাসেন,প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবনের আনন্দ খোঁজেন, যারা পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্যই আমার বই « পরবাসে পরিযায়ী »   

 মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল)