সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

মানব জনমের সাফল্য

সামাজিক সাফল্য আর মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে মানব জনমের সাফল্য অর্জনের মধ্যে পার্থক্যের ফারাক বিস্তর। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা অর্থকড়ি,ধন সম্পদ উপার্জনকারী মানুষকে সফল মানুষ বলে ভেবে থাকি।বৈধ পথে সম্পদ উপার্জনকারী ব্যক্তির সম্পদ যদি ব্যক্তি ,সমাজ ও রাষ্ট্রের উপকারে আসে তবে অবশ্যই তিনি সফল মানুষ। কিন্তু সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অবৈধ পথে উপার্জিত সম্পদের স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ ব্যক্তি জীবনে সবচেয়ে ব্যর্থ।কারণ এমন ক্ষমতাবান মানুষদের সমাজে বাহ্যিক গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান থাকলেও সর্বস্তরের মানুষের অন্তরের ভালোবাসা থাকেনা।বরং এমন মানুষের পতন হলে সমাজে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

মানব জনমের সফলতার মান নির্ণয় হয় সমাজের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা ও তাদের অন্তরের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের উপর।মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা ও কারো অন্তরের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ একজন মানুষের জন্য তখনি প্রকাশ পায় যখন কেউ সত্যবাদিতা, ন্যায় এবং সততার ভেতর দিয়ে জীবন প্রবাহিত করে সমাজে আলো ছড়ায়।এমন মানুষের আলোর বিচ্ছুরণে আশেপাশের মানুষের পথ চলা সহজ হয়ে যায়।

বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি পৌঁছে গেছে দেশের সব জায়গায় তবুও আমাদের সমাজে পথ চলা দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে, কারণ আলো ছড়ানো মানুষের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে ...।।

মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯

জীবনের সুখ,সংকট ও টানাপোড়ন

জীবনের সংকট ও টানাপোড়নের সময়গুলো মানুষকে নানা ভাবে কষ্ট দেয়, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেই মানুষ স্বপ্ন দেখতে শেখে এবং সামনে এগিয়ে যেতে সাহসী হয়ে ওঠে।এমন সময় একে অপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে জড়াজড়ি করে মিলেমিশে জীবন যাপন করে।এই দুর্যোগকালীন সময়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্যে ঘনত্ব থাকে ।
মানুষ জীবনের সংকট ও টানাপোড়ন ঘোচাতে, বাধা বিপত্তি মাড়িয়ে জীবনের কোন এক পর্যায়ে স্বনির্ভর হয়ে ভোগের সুখ সহজলভ্য করে তোলে।এ সময়,অতি আত্মনির্ভরতায় অনেকের মনের মধ্যে আত্মঅহংকার উদয় ঘটে, ফলে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমতে থাকায় আত্মার সম্পর্কগুলো হালকা হতে থাকে, এমন সময় মানুষ সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ানোর সাথে সাথে নিজের একাকীত্বও বাড়াতে থাকে।
জীবনের বিরূপ পরিস্থিতিগুলো কষ্টদায়ক হলেও এর মধ্যে গভীরতর আত্মার সুখ নিহিত থাকে, যা ভবিষ্যৎ পার্থিব সুখের আশায় গুরুত্বহীন ভাবে হেলায় পাড়ি দিয়ে আমরা আত্মবঞ্চিত করে থাকি।
সু-সময়ের পার্থিব সুখের মধ্যে যখন আত্মার সুখ খুঁজি, অনেক সময় তা জীবন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।

ডাকাতি

পৃথিবীতে দুই শ্রেণীর মানুষ ডাকাতি করে।এক শ্রেণী বেঁচে থাকার অস্তিত্বের জন্য সরাসরি অস্ত্র ঠেকিয়ে অন্যের সম্পদ লুটে নেয়, আর এক শ্রেণী ভোগ বিলাসী জীবন ও আধিপত্যের জন্য মস্তিষ্ক এবং আইনকে অস্ত্র বানিয়ে অন্যের সম্পদ কেড়ে নেয়।
প্রথম শ্রেণীর ডাকাতদের কর্ম ও নৃশংসতা চোখে দেখা যায় এবং বিত্তহীন শ্রেণী বলে আমরা এদেরকে প্রকাশ্যে ঘৃণা করে থাকি। সাধারণত ন্যায় অন্যায়ের নীতি কথায় ওদেরকেই উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়।

কিন্তু পরের শ্রেণী স্যুট কোট পরে কৌশলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিনা রক্তপাতে ডাকাতি করে বলে এদেরকে প্রকাশ্যে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা হয়না, বরং এদের হাত অর্থ কড়ি দিয়ে ভরা থাকে বলে সমাজ এই শ্রেণীর ডাকাতদের সম্মান ও সমীহ করে থাকে।অর্থাৎ এক শ্রেণী ডাকাতি করে ঘৃণা অর্জন করে ,আর এক শ্রেণী ডাকাতি করে সম্মান অর্জন করে শুধুই কর্ম প্রয়োগের ভিন্নতা ও সামাজিক মানসিকতার কারণে।দেশে প্রথম শ্রেণীর ডাকাতদের অস্তিত্ব অনেকটাই বিলুপ্তির পথে,কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর সম্মানিত ডাকাতদের আধিপত্য সর্বত্র জুড়ে …যারা ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ প্রতিনিয়ত লুটে নিচ্ছে …।।

কথা

বস্তুগত কোন কিছুর দ্বারা যদি কেউ আঘাত পায়, তাহলে সেই আঘাতের ব্যথা শুধু শরীর অনুভব করে এবং কোন এক সময় ব্যথা নিঃশেষ হয়,ক্ষতও শুকিয়ে যায়।কিন্তু,কেউ যদি কারো কথা ও আচরণ দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে সেই আঘাতে মানুষের হৃদয় ও শরীর উভয়ই পীড়িত হয়।চিকিৎসাহীন এই ব্যথা থেকে মানুষ কখনো আরোগ্য লাভ করে না।কোন এক সময় ব্যথা কমে গেলেও ক্ষতটা আমৃত্যু হৃদয়ের এককোণে থেকেই যায়।ক্ষেত্র বিশেষ মৃত্যুও ডেকে আনে।
কথা ও আচরণ যদিও দৃশ্যমান নয় তবুও ইহা বুলেটের চেয় ভয়ংকর এবং শক্তিশালী।যে জটিল সমস্যার সমাধান দীর্ঘ যুদ্ধ ও ভারী অস্ত্রের দ্বারা সুরাহা করা সম্ভব নয়, সেই সমস্যার নিষ্পত্তি শুধু মুখের কয়েকটি কথায় হতে পারে। আবার, শুধু দুটো ঠোটের মধ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া কয়েকটি বাক্য পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বের স্থিতিশীলতা অনেকটাই আমাদের মুখের কথার উপর নির্ভরশীল।
প্রতিটি ক্ষেত্রের জয় পরাজয় নির্ভর করে মুখের কথার ওপর।
অর্থাৎ, মুখেই জয়, মুখেই ক্ষয়।
আমাদের ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষণ,প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত কথা বলা ও অন্যের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে।
দিন চলে যায় কিন্তু কথা থেকে যায় ......।।

রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

রক্তের লাল রঙয়ে কতটা রাঙ্গিয়েছ তোমার পা ……?

যতবার,   তুমি উপরে উঠতে চেয়েছ
ততবার,    আমি পিঠ পেতে দিয়েছি,
যতবার,    স্পর্শ করেছ তোমার প্রত্যাশার সিঁড়ি
ততবারই,  চাবুকের আঘাতে দাগ কেটে ছবি এঁকেছ
              আমার প্রশস্ত বুকে।
তোমার সুউচ্চ চূড়া থেকে
এবার নিচের দিকে তাকিয়ে দেখ
তোমার পায়ের ভরে কতটা ক্ষত বিক্ষত হয়েছে সিঁড়িগুলো,
রক্তের লাল রঙয়ে কতটা রাঙ্গিয়েছ তোমার পা ……? 

শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯

শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টির অন্তরায়

সৃষ্টির নেশা স্রষ্টাকে সৃষ্টির আনন্দে মাতায়।।সৃষ্টির আনন্দ থেকেই স্রষ্টা সৃষ্টি করে অনিন্দ্য সুন্দর যা কিছু। পৃথিবীতে সুন্দর যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, যে সুন্দর সৃষ্টির আলোয়  ধরণী আলোকিত হয়েছে,সেই প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে ছিল স্রষ্টার আত্মতৃপ্তির প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা।

শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি,বিজ্ঞান, সমাজ, রাষ্ট্র, সংগঠন সহ যা কিছু পৃথিবীর মানুষের কল্যাণের জন্য উদ্ভব হয়েছে এর প্রতিটি উদ্ভাবনের পেছনেই ছিল কোন মহৎ আলোকোজ্জ্বল হৃদয়ের সৃষ্টির আনন্দে ভেসে বেড়ানোর তাড়া ।আত্ম তৃপ্তির তাড়া থেকে সৃষ্টি যেমন স্রষ্টাকে আনন্দে ভাসায়,সেই আনন্দের আকাঙ্ক্ষা থেকে যে সৃষ্টি, সেই সৃষ্টির আলোয় মানুষ প্রশান্তি লাভ করে।কারো সৃষ্টি যখন অন্যকে প্রশান্তি দেয়, মানুষ তখন সেই সৃষ্টির স্রষ্টাকে খুঁজে বের করে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেন এবং প্রশস্তি গায়। 

একজন সমাজ সংস্কারক একটি স্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যক্তি জীবনের ভোগ বিলাসিতা ত্যাগ করে সুবিধাবাদী শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেন।এই কাজটি বাস্তবায়নের সংগ্রাম করতে গিয়ে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হন, তবুও তিনি পিছু পা হন না।আমাদের সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয় এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি কতইনা কষ্টে নিমজ্জিত আছেন।প্রকৃত পক্ষে তিনি এই কষ্টের পথ বেছেই  নিয়েছেন আনন্দের আশায়।এই কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে যে দিন তার স্বপ্নের স্থিতিশীল ন্যায় প্রতিষ্ঠার সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হবে, সে দিনই  তিনি আনন্দের সাগরে তরী ভাসিয়ে তার মানব জনমের সার্থকতার স্বাদ নেবেন।তার আনন্দের নেশায় যে সুন্দর সমাজ সৃষ্টি হবে, সেই সমাজের সুফলতার বাতাস ভোগ করবে ওই গোষ্ঠীর মানুষ যুগের পর যুগ।বিনিময়ে নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি লাভ করা সমাজের মানুষ তাদের মুক্তির বিনিময়ে ওই স্বপ্ন তাড়িত মহান মানুষকে দেবেন সমাজের শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানের মর্যাদা।কারো লড়াইয়ের লক্ষ্য যদি হয় নিজের  শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা তাহলে তার ব্যক্তিগত প্রশান্তির কোন এক পর্যায়ে লড়াই থেমে যাবে।ফলে সামগ্রিক মানুষের কল্যাণকর কিছু সৃষ্টি হবেনা, আর জাতিও এমন মানুষের নাম এবং কর্ম মনে রাখে না।  

মূলত সৃষ্টির আনন্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব। 

মানুষ মূলত নিজেকে জোর খাটিয়ে কোন কিছু করাতে চায়না।যা কিছুর মধ্যে তৃপ্তি আনন্দ লুকিয়ে থাকে সে দিকেই মূলত ধাবিত হতে চায়।অনেক সময় পরিবেশ পরিস্থিতি সামাজিক নিয়ম কানুন তার ইচ্ছের প্রতিকুলে অবস্থান নিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।কিন্তু অদম্য মানুষেরা সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে তার মনের ভেতরে লালিত ইচ্ছেকে বাস্তবে রূপ দেয়।
ভোগবাদী মানুষ ভোগের মধ্যে সুখ খোঁজে, কারণ তার অন্তর দৃষ্টির সীমারেখা সুদূর প্রসারী নয়।পৃথিবীর বৃহত্তর ভোগবাদী মানুষের দৃষ্টিতে ত্যাগী মানুষের ত্যাগকে জীবনের অর্থহীনতা মনে হলেও, ত্যাগী মানুষ ভোগের চেয়ে ত্যাগের মধ্যেই জীবনের মাহাত্ম্য খুঁজে পায় তার অর্জিত জ্ঞান সাধনার মধ্য দিয়ে।নিজের মধ্যে জীবন জগতকে আবিষ্কার করা পথিক কবি রাস্তার ধারে বসে কবিতা লিখে জীবনের স্বাদ আবিষ্কার করতে পারলেও, জ্ঞানহীন ভোগবাদী দশ তোলা বাড়ী বানিয়েও ন্যূনতম ঘুমের প্রশান্তি আনতে অক্ষম হয়    

একজন কবি যখন একটি কবিতা লিখেন,প্রথমত নিজের সৃষ্টির আনন্দের তাড়া থেকেই তিনি লিখেন এবং কবিই তার কবিতার সৌন্দর্যের  আলোয় নিজেই প্রথমে স্নান করেন।এমন সৃষ্টির সৌন্দর্য আনন্দের ধারা যখন অন্যের হৃদয়কে আন্দোলিত করে তখন কবির সৃষ্টি  শুধু কবির সম্পদ না থেকে সমগ্র মানুষের সম্পদ হয়ে যায়।এক্ষেত্রে নজরুল রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে অনায়াসেই উল্লেখ করা যেতে পারে।যার মধ্যদিয়ে তারা শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু কোন কবি যখন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, অথবা অন্যকে খুশী করে কোন কিছু প্রাপ্তির জন্য ফরমায়েশি কবিতা লিখেন,তখন এমন কবিতার মধ্যে কবির আনন্দের সংস্পর্শ থাকেনা, ফলে কবিতা সৃষ্টি না হয়ে তৈরি হয় কবিতা নামক পণ্য।        

শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে সর্বদা অশান্তিতে নিপতিত করে, আর অশান্ত হৃদয় কখনো সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে পারেনা।পৃথিবীর যা কিছু অসুন্দর তা সুন্দর হৃদয়ের মানুষকে আকৃষ্ট করে না। 

শিল্পকলার বহুবিধ মাধ্যম। প্রতিটি মাধ্যমেই মানুষ আকৃষ্ট হয় শিল্পের সৌন্দর্যের আলোয়।শিল্পের সাধনা সেই করে,যিনি অন্তরে সৌন্দর্য ধারণ লালন করে।
একজন শিল্পী (সংগীত শিল্পী,নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিকার,আলোকচিত্র, নাট্যশিল্পী)যখন তার শিল্প মাধ্যমকে ভালোবেসে শিল্পের ভেতর দিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার পথ খোঁজেন তখনি শিল্পের সৌন্দর্য তার দেহ মনে প্রকাশ ঘটে।কিন্তু শিল্পকে  মাধ্যম করে একজন শিল্পী যখন একটি মেটালিক ক্রেস্ট, কাগজের সার্টিফিকেট অর্জনের ভেতর দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের নেশায় ধাবিত হয় তখন শিল্পের প্রকৃত সৌন্দর্য তার মধ্যে থেকে দূরে সরতে থাকে। যে সৃষ্টির মধ্যে আবেগ ভালোবাসার অনুপস্থিত থাকে সেই সৃষ্টির সৌন্দর্যের রঙ ফিকে হয়। 

 সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে হলে প্রাপ্তির আশা না করে শুধু সৃষ্টির নেশায় মগ্ন থাকাই শ্রেয়। মানুষের আকৃষ্ট করার মত বা কল্যাণকর কিছু যদি কর্মের মধ্যদিয়ে সৃষ্টি হয়েই যায় তাহলে শ্রেষ্ঠত্বই আপনা আপনি স্রষ্টার পিছে ধাবিত হবে।ধরা দেবে  আজ অথবা হাজার বছর পরে।   

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখায় স্রষ্টা শব্দটি ব্যাকরণের বিশেষ্য পদের ব্রহ্ম, ঈশ্বর, আল্লাহ বা মহাদেব অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এখানে বিশেষণ পদের নির্মাতা বা সৃজনকর্তা রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।অর্থাৎ কোন কিছু যিনি সৃষ্টি করেন তিনিই ওই সৃষ্টির স্রষ্টা, নির্মাতা, উদ্ভাবক বা সৃষ্টিকর্তা। যেমন কোন গানের সুরকারকে বলা হয় সুরস্রষ্টা ......।  

শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯

বাতাসের জীবন

বাতাস যদি আসে ফিরে বসতি এপার ,
ফিরে না আসে আবার বসত ওপার ,
বাতাসের এই জীবন নিয়ে অহম অপার …………

শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

হিম শরতের বিবর্ণ প্রকৃতির মাঝে ফরাসি জীবন ধারা।



গ্রীষ্মের
তাপদাহকে  বিদায় দিয়ে ফ্রান্সের প্রকৃতিতে এসেছে হিম শরতের পাতা পাতা ঝরার দিন।২৩ সেপ্টেম্বর  থেকে  ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্যালেন্ডারের নিয়ম অনুযায়ী ফ্রান্সে শরতের সময়কাল।বাংলার প্রকৃতিতে শিশির ভেজা ঘাসের উপর  বিছিয়ে থাকা শিউলি ,নদীর ধারে ফুটে থাকা কাশ ফুলের শুভ্রতায় শরৎ উদ্ভাসিত হয় ।তীব্র গরমের অস্বস্তির  মাঝে জনজীবনে শরতের শীতল বাতাস নিয়ে আসে স্বস্তির ছোঁয়া,কিন্তু  ফ্রান্সের প্রকৃতিতে শরৎ আসে ভিন্ন রূপ বৈচিত্র্যে  আমাদের শরতের বিপরীত মুখী বৈশিষ্ট্যে  শীতের প্রকৃতির মত এখানে শরত শুরু হয়  বৃক্ষরাজির পাতা ঝরার মধ্য দিয়ে ।পাতাহীন কান্ডবিশিষ্ট গাছগুলো ধারণ করে  অসাধারণ শৈল্পিক রূপ , পাশাপাশি অনেক বৃক্ষ যৌবনের সবুজ পাতার রঙ বদলে রূপান্তরিত হয়  হলুদ লাল রঙয়ে। সৌন্দর্যবর্ধক লতাবিশিষ্ট গুল্ম, ক্যাকটাস পুষ্প ফোটানো গাছগাছালি বসন্ত গ্রীষ্মের প্রকৃতিকে সুষমায়িত ফুল ফোটানোর মহান দায়িত্ব পালন করে ক্লান্ত দেহকে অবসর দেয় অপেক্ষা শুরু হয় তুষারের আবরণে শেষ সমাধির, কিন্তু  ক্রিসেনথিমাম ফুলের নানা রঙ, আকৃতি বৈচিত্রতা কিছুটাহলেও  রাঙ্গিয়ে রাখে এখানকার হিম শরতের বিবর্ণ প্রকৃতিকে  

ফ্রান্সের শরতের জড়োসড়ো প্রকৃতিতে পাখপাখালির কলকাকলি প্রায় থেমে এসেছে। বাহারি রঙ ডিজাইনের টি শার্ট, জিন্স শর্ট পোশাকের পরিবর্তে সবার শরীরে উঞ্চতাবর্ধক শীতের পোশাক। মেঘযুক্ত আকাশ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিধারা এখন জীবনধারার প্রাত্যাহিক অংশ। সূর্য মাঝে মাঝে মেঘ ভেদ করে তার অস্তিত্বকে জানান দিয়ে লুকোচুরি খেলায় মগ্ন। এমন প্রকৃতিতে একচিলতে রোদ যেন সদ্য যৌবনা ষোড়শী কন্যার মুখ দর্শন। পর্যটকের দল প্যারিসের যে সব পথঘাট, রেস্তোরাঁ কোলাহলমুখর করে রেখেছিল তা নিঝুম নিস্তব্ধতায় রূপান্তর করে সবাই আপন নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে।গ্রীষ্মকালীন ছুটির   ভ্রমণ, আনন্দ হৈ-হুল্লোড় শেষ করে ফরাসিদের চলছে কর্ম মুখর সময়।রেস্তোরাঁর তেরাসের আড্ডাগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। উৎসব মুখর পার্কগুলো অনেকটাই কোলাহল মুক্ত।বৈদ্যুতিক রুম হিটার চালিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি সিরিয়াল বা সিনেমা দেখাই  সময়ে  এখানকার জীবনধারার প্রাত্যহিক বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য  অংশ। বাইরের কনকনে ঠাণ্ডা আবহাওয়া কারণে অন্দর  ভিত্তির বিনোদন কেন্দ্রগুলো সরব হয়ে ওঠে,  তাই এখন থেকেই সিনেমা হলগুলোর টিকেট কাউন্টারে শুরু হবে  লম্বা লাইন। 

গোটা ইউরোপ জুড়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি চলবে  খ্রীষ্টধর্মীয় সবচেয়ে বড় উৎসব ক্রিসমাস ডে পালনের। ফ্রান্সও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে এই উৎসবকে ফরাসি ভাষায় বলা হয় নোয়েল। হিম শরতের  সমস্ত রিক্ততা সিক্ততাকে আনন্দে রূপান্তরের ক্ষেত্রে নোয়েল তুলনাহীন। দিনটি একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর উৎসব হলেও এখানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবের আনন্দে নিজেকে রাঙ্গাতে কার্পণ্যতা করে না। এখন থেকেই সুপার মার্কেট বিশেষায়িত দোকানগুলো নয়েল টুপি, চকলেট, কেক নানাবিধ উপহার সামগ্রীর পসরা সাজাতে শুরু করেছে অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ পণ্য সামগ্রীর ওপর বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেবে। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই ফ্রান্সের সকল শহরগুলো জেগে উঠবে চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জায়। ফুলের দোকানগুলোতে লেগে যাবে ক্রিসমাসট্রি বিক্রির ধুম।
প্রত্যেক ফরাসি উপহার বিনিময় করবে প্রিয় মানুষ, বন্ধু আত্মীয়স্বজনের মধ্যে। শীতের তীব্রতা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে এই উৎসব আনন্দের কাছে। তুষারের সাদায় রূপ নেবে এক ভিন্ন প্রকৃতি।

শরতের  হিম বাতাসের  তীব্রতা বৈরী প্রকৃতিতে থেমে থাকে না ফরাসি জীবন জীবিকা। ভোরের আলো ফোটার আগেই কর্মব্যস্ত মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেট্রো-ট্রাম-বাসস্টেশন এবং রাস্তাঘাট। চারদিকে থাকে স্বাভাবিক জীবনধারা। মানুষের  প্রতীক্ষা শরত   শীতের জীর্ণ প্রকৃতিকে বিদায় দিয়ে জীবনধারায়  আবার কবে লাগবে  বসন্ত সমিরণ। 





শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৯

বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার এক একটি ফরাসি দেশ, ফরাসি দেশটাই একটি বাংলাদেশী পরিবার।

আমার দুটি দেশ। একটি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, অন্যটি জীবন ও জীবিকার দেশ ফ্রান্স । আমার মা স্নেহের পরশ দিয়ে আমাকে  বড় করে তুলেছেন,আর পিতা তার শ্রম ঘাম দিয়ে আমার নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। আমার জীবনে দুটি দেশের ভূমিকাও আমার পিতা মাতার মতই। ।সেই অর্থে একটিকে আমি মাতৃভূমি বলি অন্যটিকে বলি পিতৃভূমি ।মাতৃভূমির আলো বাতাস মাটির সোঁদা গন্ধ আমাকে দেয় মায়ের ভালোবাসার মতই আদরের ছোঁয়া ও বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী শক্তি  আর পিতৃভূমি দেয় মাথার উপর প্রখর রোদের উত্তাপ থেকে রক্ষার শীতল ছায়া। 


বাংলাদেশ এবং  ফ্রান্স এই দুটি দেশের মানুষের  জীবন যাপন,রীতি নীতি'র মধ্যে পার্থক্যের ফারাক বিস্তর, কিন্তু একটি বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে দারুণ এক সাদৃশ্য বিদ্যমান।সেটা হল, বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার ফরাসি দেশের মত, আর ফরাসি দেশটাই এক একটি বাঙালী পরিবারের মতো। 

রাষ্ট্র এবং পরিবারের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়না কারণ রাষ্ট্র হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সীমানার অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি মানুষকে নিয়ে একটি বৃহত্তর পরিবার, আর পরিবার হচ্ছে রাষ্ট্র নামক বৃহত্তর পরিবারের মধ্যে অবস্থিত এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ।


আমার মাতৃভূমির পরিবারের বৈশিষ্ট্য হল,প্রতিটি পরিবারে এক কি দুজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকে এবং এদের উপর গড়ে পাঁচ থেকে সাত জন মানুষের ভরণ পোষণের দায়িত্ব থাকে। যেমন বৃদ্ধ পিতা মাতা,নিজ সন্তান  স্ত্রী, যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে ছোট ভাই বোন কখনো পরিবারের কোন প্রতিবন্ধী সদস্য।পরিবারের কর্তা ব্যক্তিরা নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে তার উপর নির্ভরশীল পোষ্যদের সামাজিক আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য,শিক্ষা এবং বিনোদনের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান, যতদিন না তাদের মধ্য থেকে আর্থিক উপার্জনক্ষম মানুষ তৈরি না হয়। এদের মধ্য থেকে যে মানুষটি আগে কর্মক্ষম বা উপার্জনক্ষম হয়, সে তার আয়ের অংশ পরিবারের শেয়ার করে মূল কর্তাব্যক্তির দায়িত্বের বোঝা অনেকটা লাঘব করেন।সময়ের প্রবাহে মূল কর্তাব্যক্তি একদিন দেহের বার্ধক্য জনিত অবসাদ থেকে অবসরে চলে গিয়ে রোজগারহীন হয়ে পড়েন।তখন তার জীবনের দায়িত্বভার চলে যায়,পরিবারের যে মানুষগুলোকে সক্ষম করে তোলার জন্য বিরামহীন পরিশ্রম করে গেছেন সেই উপার্জনক্ষম সন্তান বা অন্যদের হাতে। 

আমাদের রাষ্ট্র নামক যে যন্ত্রটি রয়েছে, সেটি মূলত একটি নির্দিষ্ট সীমা রেখার একটি স্বীকৃত মানচিত্র।জনগণের জন্য রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটির যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা মূলত সংবিধানের লিপিবদ্ধ কালীর হরফ মাত্র। 

মাথার উপর আচ্ছাদনহীন  রাস্তার ধারে যেসব  ক্ষুধার্ত শীর্ণ দেহের কঙ্কালসার মানুষ পড়ে থাকে। ওই মানুষগুলোকে নিয়ে মূলত রাষ্ট্রের কোন চিন্তা বা পরিকল্পনা নেই।তাদের  জীবন চলে সমাজের মানবিক মানুষদের দয়া বা দানের উপর ভিত্তি করে, বরং রাষ্ট্রের কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তির পাঁজেরো গাড়ীর  চাকা যদি দুর্ঘটনাক্রমে ওই সব  রাস্তার অসহায় মানুষগুলোর বুকের পাঁজর মাড়িয়ে চলে যায় এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের কোন জবাবদিহিতা নেই। 

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইন আদালত প্রকৃত পক্ষে সর্ব স্তরের মানুষের জন্য নয়। সাধারণ মানুষকে তাদের প্রয়োজনে অর্থের বিনিময়ে সেবা কিনতে হয়। সমাজের প্রভাবশালী ও উচ্চবিত্তদের রক্ষার জন্যই মূলত এই সব  প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়।  

দেশে সার্টিফিকেট ভিত্তিক বৈষম্য মূলক  শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, কিন্তু কেন রাষ্ট্র সার্টিফিকেট দিচ্ছে এবং সার্টিফিকেটধারী মানুষগুলোকে কি কাজে রাষ্ট্র ব্যবহার করবে তা নিয়েও সরকারের নেই কোন উদ্বেগ, কোন বৃহৎ পরিকল্পনা। বরং অর্থ ও জীবনের মূল্যবান পঁচিশ ছাব্বিশ বছর ব্যয় করার পর মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে দেশের দায়িত্বশীলদের দ্বারে ধর্না দিতে হয় শুধু খেয়ে পড়ে একটু সম্মান বেঁচে থাকার অবলম্বন একটি চাকুরীর আশায়। চাকুরীর জন্য ঘুষের টাকা দিয়ে চাকুরী না পাওয়ায়, টাকা ফেরত চেয়ে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। 


চিকিৎসার মতো অতি মানবিক ক্ষেত্রটিও এখন হাট বাজারে পরিণত। অর্থ থাকলে সেবা কেনা যায়, না থাকলে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে ভিক্ষা করতে হয়।এ নিয়ে রাষ্ট্রের না আছে মাথা ব্যথা না আছে না আছে মানুষের জন্য নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা। 


এখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে  জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। রাষ্ট্র এবং জনগণ দুটি বিচ্ছিন্ন অংশ। রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা প্রভু ও দাসত্বের।ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা যায় তারা জনগণের স্বার্থের চিন্তা না করে ক্ষমতাকালীন সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটে কে কত বড় বিত্তশালী হতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত সময় পার করে। অর্থ বিত্ত ও রাষ্ট্রীয় যাবতীয় সেবা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ যেহেতু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহলের নিয়ন্ত্রণে,সেহেতু বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কিছু পেতে হলে ওদের দাসত্বও করা ছাড়া এই সমাজের সাধারণ মানুষের অন্য কোন উপায় থাকে না।   

এমন রাষ্ট্র  কাঠামো সাধারণ মানুষদের জন্য স্বস্তি নয় বরং একটা শোষণ ও নিষ্পেষণ যন্ত্র। 


বাংলাদেশের একটি পরিবারের পাঁচ ছয় জন সদস্য যেমন এক জন কর্তা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে জীবনের প্রশান্তি অনুভব করেন। তেমনি ফরাসি দেশের প্রতিটি মানুষ রাষ্ট্রকে কর্তা ভেবে শির উঁচু করে নিশ্চিন্ত মনে জীবনের স্বাদ গ্রহণ করেন।কোন মানুষকে তার মৌলিক চাহিদার জন্য বিশেষ কোন মানুষের নিকট পদানত হয়ে করুণা ভিক্ষা করতে হয় না।কারণ ফরাসি রাষ্ট্র ব্যবস্থায়  প্রতিটি জনগনই রাষ্ট্রের সন্তান এবং রাষ্ট্র সরাসরি প্রতিটি জনগণের জন্য পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ।পিতা যেমন সন্তানকে বুকে আগলে রেখে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য চিন্তিত থাকেন এবং পরিশ্রম করেন,জনগণের জন্য ফরাসি রাষ্ট্রের ভূমিকাও তেমন।এখানে মানুষ পরিবারভুক্ত হয়ে বাস করলেও, প্রতিটি মানুষ মূলত রাষ্ট্র নামক বৃহৎ পরিবারের সদস্য এবং তার সুরক্ষিত জীবন নিশ্চিতের চিন্তা রাষ্ট্রের মাথার উপর।এখানে কোন মানুষ ক্ষুদ্র পরিবারের বোঝা বা চিন্তার বিষয় নয়।একজন মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।এই কাজটি রাষ্ট্র মূলত জনগণের উপার্জিত অর্থের একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে সমন্বয় করে থাকেন।এখানে যে মানুষটি উপার্জন করেন তার আয়ের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কর হিসেবে রাষ্ট্র কেটে রাখেন। সেই কেটে রাখা অংশ দিয়ে রাষ্ট্রের যে মানুষটি এখনো কর্মক্ষম বা উপার্জনক্ষম হয়ে ওঠেনি তাকে কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তার শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় করেন,সামগ্রিক মানুষের স্বাস্থ্য সেবা,স্বল্প আয়ের মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা, যে মানুষ পঙ্গু বা কাজ করে উপার্জন করতে অক্ষম তার জীবনের নিরাপত্তার বিধান,মানুষের চিত্ত বিনোদনের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড,অবকাঠামো উন্নয়ন,রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনা, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ হতে জাতিকে নিরাপদ রাখার জন্য সামরিক এবং আধাসামরিক বাহিনীর পরিচালনা ইত্যাদি খাতে ব্যয় করে থাকেন।

একজন মানুষ অসুস্থ হলে তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্র নিশ্চিত করেন।এজন্য তাকে বিত্তবান বা প্রভাবশালী মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নেই, নেই কোন সমাজের বিশেষ পদ পদবীর মানুষ হবার।শুধু এই সীমানাভুক্ত একজন মানুষ হলেই হল।হোক তিনি এই সীমানার বৈধ কিংবা অবৈধ নাগরিক।হঠাৎ কেউ চাকুরীচ্যুত হলে,এই দুর্যোগকালীন সময়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রতি মাসে তার পূর্বের বেতনের পঁচাত্তর শতাংশ ভাতা প্রদান অব্যাহত রেখে নতুন একটি চাকুরীর সন্ধানে জোর প্রচেষ্টা চালায় রাষ্ট্র। যাতে হঠাৎ করে একজন মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত হতে না হয়।যে মানুষটির কর্ম মিলছেনা, অর্থাৎ বেকার রয়েছেন। আমাদের দেশে পরিবারের বেকার ছেলেটির চলার জন্য পিতা বা উপার্জনক্ষম বড় ভাই যেমন তার পকেটে নীরবে টাকা ঢুকিয়ে দেয়। ফরাসি দেশে প্রতিটি বেকারের জন্য এই কাজটি করে থাকেন সরাসরি রাষ্ট্র।এই বেকার ছেলেটি যখন কর্মে প্রবেশ করে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করে, তখন আবার তার আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর হিসেবে কেটে রেখে রাষ্ট্র তার  উল্লেখিত দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যয় করে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখেন এবং যাদের আয়ের উপর ভিত্তি করে একজন মানুষের কর্মক্ষম হওয়ার এতোটা পথ পাড়ি দিতে হয় সেইসব অবসর গ্রহণকারী সম্মানিত প্রবীণ মানুষদের নিশ্চিন্ত জীবন উপহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।এখানে যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ডও আবর্তিত হয় জনগণের জন্য উল্লেখিত সুযোগ সুবিধা সমুন্নত রাখা এবং সেগুলোকে আরও বৃদ্ধি করাকে কেন্দ্র করে।   

ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন সম্মিলিত ভাবে রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক হাতকে  শক্তিশালী করার জন্য প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করেন, এবং প্রত্যেকেই তার জন্য নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ও অধিকার রাষ্ট্রের কাছ থেকে বুঝে নেন।এখানে কোন ব্যক্তি বিশেষের জনগণের উপর মহিরুহু রূপে আবর্তিত হওয়ার সুযোগ নেই।জনগণের কল্যাণে জনগণ কর্তৃক প্রবর্তিত আইন ও সংবিধানই হচ্ছে জনগণের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার শক্তি।

এছাড়া, তাদের দেশ পরিচালনা ও রাষ্ট্রের কাছে গচ্ছিত সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ফরাসি জনগণ বেছে নেন  সময়ের সেরা, সৎ,সুশিক্ষিত,চৌকস কোন রাজনৈতিক নেতা ও দলকে।দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতা ও রাজনৈতিক দল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ কালীন সময় এই মহান দায়িত্ব পালনের চ্যাঁলেঞ্জ অতি সতর্কতার সহিত পার করেন স্বচ্ছ জবাবদিহিতার মধ্যদিয়ে।  


 রাষ্ট্র যদি তার প্রতিটি জগণকে বৃহত্তর পরিবারের অংশ ভেবে তাদের শ্রমের উপার্জন সঠিক ভাবে সংরক্ষণ,   সমবণ্টন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে ব্যয় করেন তাহলে ফরাসি দেশের মতো আমার মাতৃভূমিও হয়ে উঠতে পারে একটি পরিবার রাষ্ট্র ।তাই বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণের স্লোগান হওয়া উচিত,

 রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থ দেব, আমার অধিকার বুঝে নেবো, অথবা আমার টাকায় রাষ্ট্র চলছে, আমার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে।।


ছবি ইন্টারনেট থেকে নেয়া ।