সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

তন্ত্রমন্ত্র গনতন্ত্র

অনেকেই আমরা বলে থাকি , আমি হাজার বছরের শ্রেষ্ট মুজিববাদী আদর্শের রাজনীতি করি ,আমি সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা শহিদ জিয়ার আদর্শের রাজনীতি করি ,আমি ইসলামি আদর্শের রাজনীতি করি একটি গনতান্ত্রীকদেশের মানুষ কোন ব্যাক্তি বা দলের বিশেষ আদর্শ বা উদ্দেশ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে রাজনীতি করবে এটাই স্বাভাবিকবাংলাদেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবি রাজনীতির চেলাপ্যালা আজ এই  আদর্শ বাস্তবায়নে মহাব্যাস্তএতো আদর্শ ,আর এতো স্বপ্ন দেখা রাজনীতি চর্চা হয় যে দেশে সেই দেশতো আজ স্বর্গের লীলাভূমি হওয়ার কথা ছিলো তবে এই মূহুর্তে আমি বোধগম্য নই, আসলে উল্লেখিত আদর্শগুলো মূলতো কি ?আমি বাংলাদেশে বড় মাপের রাজনীতিবিদদের মতো রাজনীতি বুঝিনা,তাই সোজা সরল মগজে এই মূহুর্তে চলমান প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে মুজিবাদী আদর্শের রাজনীতি মানে ক্ষমতায় একবার গেলে নির্লজ্জ বেহায়ার মত হত্যা খুনের মধ্যেদিয়ে ক্ষমতা চেয়ার আজীবন খামচে ধরার চেষ্টা আর জিয়াবাদী আদর্শের রাজনীতি মানে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবন্ত কাবাপ বানিয়ে দগ্ধ লাশের উপর দিয়ে  ক্ষমতার মসনদ আরোহন করা ,আর দেশের বাদবাকী আদর্শ মুজিব জিয়ারই ড্যামো ভার্সন 
যে তন্ত্র মন্ত্রের দোহাই দিয়ে এতো হানাহানি সেই তন্ত্রমন্ত্র আসলে কাদের জন্য ……..রাজনীতির ভাষায় আপনারা বলেন, দেশের আপামর মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যমানুষের অধিকার আদায়ের নামে এই তন্ত্রমন্ত্রের কাইজা করতে গিয়ে যদি দেশের মানুষ হত্যা করে বিনাশ করা হয় তাহলে  এমন কচুর তন্ত্রমন্ত্র আসলেই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন আছে কিনা সেই ভাবনায় দ্বিধাদ্বন্দে পড়েয়াইযে দেশের অধিকাংশ মানুষ তন্ত্রমন্ত্র গনতন্ত্র বলতে ব্যালট পেপারে নৌকা কিংবা ধানের শীষে সিল মারা,আর টেলিভিশনের চটকদার টকশোকে বোঝেযেদেশে বছরের পর বছর ধরে এই তন্ত্রমন্ত্র গনতন্ত্রের সিল মেরে গনমানুষের তিনবেলা পেটপুরে খাওয়ার নিশ্চয়তা জুটেনি,শ্রমিকের ন্যায্য বেতন কাঠামো নির্ধারণ হয়নি,শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীর চাকুরির নিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়নি,হতদরিদ্রের চিকিৎসার ভরসা নাই,দিন শেষে নির্বিগ্নে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা নিশ্চিৎ হয়নি,তাহলে কেন শুধু ব্যালটে একটা নৌকা কিংবা ধানের শীষে সিল মারার জন্য বছরের পর বছর ধরে এই হত্যাযজ্ঞ নিরবে চেয়ে দেখা ?যে প্রতিকে সিল মারলে দূর্ণীতিবাজ পেটমোটা মন্ত্রী উপহার পেতে হয়,দেশের সোনার টুকরো যুবকরা  মানুষ কোপানো কষাইয়ে রুপান্তর হয়,সাধারণ মানুষকে আগুনে ঝলশানো অঙ্গপ্রতঙ্গ উপহার পেতে হয়,বিবেকহীন পশু উৎপাদন হয় যারা জীবন্ত মানুষকে পুরিয়ে মেরে জয়ের উল্লাশ করে,এক অখন্ড জাতীকে মিথ্যে ইতিহাসের বোঝা চাপিয়ে খন্ড খন্ড শত্রুগোত্রে বিভক্ত করা হয়,বাংলার দুই মহামানব (তাদের ভাষায়) মুজিব জিয়ার ব্যাক্তিপূজা ব্যাতিত জাতিকে আর কোন মনিষী ব্যাক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়া হয়নাতবুও কেন বার বার একই বৃত্তের মধ্যে এই ঘুরপাক খাওয়া?

আমরা অধিকাংশ মানুষই এই তন্ত্রমন্ত্র গনতন্ত্রের খেলার অভিশাপ থেকে মুক্তী চাই কিন্তু মুক্তি কে দেবে ?মুক্তি আমার আপনার হাতেই মধ্যেই, যতদিননা আপনার আমার ভেতরের প্রতিবাদকে প্রকাশ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে জানান দিতে নাপারবো,যতদিননা দলীয় চিন্তার বাইরে ভালোকে ভালো মন্দকে মন্দ বলতে নাপারবো,যতদিননা মার্কা এবং ব্যাক্তি পূজার রাজনীতি পরিহার করে গনমানুষের মৌলিক অধিকারের জন্য শোচ্চার নাহবো,যতদিননা বাঙালী এবং বাংলাদেশী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ নাহবো ততদিন এই দুঃভাগ্য সঙ্গী করে নিশ্চিৎ অন্ধকার গন্তব্যের দিকেই এগিয়ে যেতে হবে ………..
   

সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৫

আমার প্রবাস ডায়েরী

দিন মাস যোগ করে আমার প্রবাস জীবনের বয়স তিন বছর নয় মাস।জীবনের বৃহৎ অংশ মাতৃভূমির আলো বাতাসে কাটানোর পর নিজের পরিকল্পনা ও চিন্তার বাইরে হঠাৎ করেই বিদেশ বিভূঁইয়ে চলে আসা।এই সময়ের মধ্যে সুখ , দুঃখ, হতাশা, প্রাপ্তি,হারানো নানা বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতার সম্মুখিনের মধ্যদিয়ে আজকের এই পথচলা।গত ৩০ অক্টোবর থেকে আমার প্রবাস জীবনের সাথে যুক্ত হয়েছে আমার কন্যা মেহজাবিন মোর্শেদ (মিশেল) এবং আমার সহধর্মিনী জান্নাতুল ফেরদৌস (সুমি)।
ফরাসি ভূখন্ডে প্রবেশ করি ২০১১ সালে। এর পর থেকে নতুন দেশ,নতুন মানুষ,নতুন ভাষা,নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি ও পরিবেশের সাথে নিজেকে টিকিয়ে রাখার এক সংগ্রামরত সময় পার করতে হয়েছে।এই প্রতিকূল সময়ে কিছু বন্ধুর বাড়িয়ে দেওয়া হাত ও সুপরামর্শ আমাকে এখানে টিকে থাকতে ও সঠিক পথে এগিয়ে চলতে সহায়তা করেছে।যাদের নাম ও সেই সময় আমার স্মৃতিতে চির অম্লান।

মে মাসের শুরু , ২০১১ সাল ।তখন সমস্ত ইউরোপের প্রকৃতিতে শীতের রিক্ততা ও শীক্ততাকে বিদায় দিয়ে গ্রীষ্মের আগমনী আয়োজন চলছে, তবুও শীতল শুষ্ক বায়ু মাঝে মাঝে শরীরে শিহরণ জাগিয়ে যাচ্ছে।এমনি এক সাঝ বেলায় চাঁদপুরের কবির ভাইয়ের সাথে প্যারিসের উদ্দেশ্যে জার্মানির বার্লিন রেলষ্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে পড়েছিলাম।দ্রুতগামী ট্রেন বনবাদার মাঠ পাহাড় বিদীর্ণ করা রাস্তা ভেদ করে অন্ধকার এক নৈসর্গিক প্রকৃতির মধ্যেদিয়ে এগিয়ে চলছে।শংকিত মনে অজানা আশংকা দোল দিচ্ছে এই ভেবে যে, অচেনা প্যারিসে কোথায় উঠবো।কবির ভাইয়ের জন্য তার কলেজ জীবনের এক বন্ধু'র প্যারিসের গার দো লিষ্ট ষ্টেশনে অপেক্ষায় থাকার কথা রয়েছে। পঁচিশ বছর পর তাদের আবার দেখা হতে যাচ্ছে তাই তার মনে একটু পুলকিত শিহরণ জাগছে।যদিও আমাকে মাঝে মাঝে অভয় দিচ্ছে কোন চিন্তা না করার।বলছে,একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। 

গল্প গুজব করতে করতে আলো-ঝলমল এক সকালে এসে আমরা পৌঁছুলুম প্যারিসের গার দো লিষ্ট ষ্টেশনে।ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্ম দিয়ে একটু হাঁটতেই দেখা মিললো অপেক্ষমান দৃষ্টিতে দাড়িয়ে থাকা এক বাঙ্গালী দম্পতিকে।তাদের কাছে গিয়েই কবির ভাই চিনতে পারলেন তার সেই পঁচিশ বছর আগে দেখা বন্ধুটিকে , সাথে তার স্ত্রী।তারা আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলো।এই দম্পতি শুধু তাদের বন্ধু কবির ভাইকেই নয় , সাথে আমাকেও তাদের বাসায় নিয়ে গেলেন। সেলিনা ভাবী রান্না করে খাওয়ালেন ,গল্প করলেন ,কুশলাদী জিজ্ঞেস করলেন,আশিক ভাই কয়েক জায়গায় ফোন করে মাসিক ভাড়ায় একটা থাকার ব্যবস্থা করেদিলেন।এরপর থেকে প্রতিদিন আশিক ভাই চাকুরী থেকে ফিরে ফোন করে আমার খোঁজ খবর নিতেন, বাসায় ভালোকিছু রান্না হলে ডেকে পাঠাতেন।একটা চাকুরির ব্যবস্থা করার জন্য তাদের পরিচিতদের অনুরোধ করতে লাগলেন।ছুটির দিনে আমাদের নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে নানা পরামর্শ দিতেন।এই প্যারিসে আমার প্রথম পরিচয়ের মানুষ আশিক ভাই ও ভাবীর অভ্যর্থনার পর থেকে কখনো আমার মনে হয়নি যে এদের সাথে পূর্বে কোনো পরিচয় ছিলো না। অনুভূতিতে অনেকটা পরম আত্মীয়ের মত লাগতো।এখনো এই প্রবাসে কোন সমস্যা অনুভব করলে আশিক ভাইয়ের সাথে আলোচনার তাগিদ অনুভব করি একজন নিঃস্বার্থ বড় ভাইয়ের টানের অনুভূতির জায়গা থেকে। 

প্যারিসের প্রথম দিকের দিনগুলোতে অচেনা পথঘাট চলতে শেখা,নানাবিধ পরামর্শ এবং যে মানুষটির বন্ধুসুলভ সঙ্গ আমাকে কখনোই হতাশ হতে দেয়নি, সে ঢাকা দোহারের নুরু ভাই।যার জন্য বন্ধুত্বের বিশেষ একটি জায়গা হৃদয় জুড়ে এখোনো বিদ্যমান রয়েছে।
তাছাড়া ঢাকা দোহারের জসিম ভাই, টাঙ্গাইলের হাশেম ভাই ,এদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞা কারণ প্রবাস জীবনের প্রাথমিক অবস্থায় এদেরকেই ভালো বন্ধুরুপে পাশে পেয়েছি। 

যে মানুষটির সঠিক দিক নির্দেশনা ও পরিচর্যার ফলে আমাকে এই ফরাসি ভূখন্ডে আইন সম্মতভাবে বসবাসের পথকে সুগম করেদিয়েছে, তিনি আমার রাজবাড়ীর জেলা সদরের শ্রদ্ধেয় কামরুজ্জামান জুয়েল আংকেল।এই প্রবাসে তার সাথে সাৎক্ষাতের পর থেকে এখন পর্যন্ত অতি যত্নবান অভিভাবকের মত আমার যে কোন সমস্যায় ছায়ার মত পাশে আছেন।যদিও এখন পর্যন্ত আমি তার জন্য কিছুই করতে পারিনি।শুধু তাই নয়,এই নীতি ভ্রষ্টতার যুগে জ্ঞানহিতৈষী এই মানুষটির অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও নীতিবোধ আমাকে আকৃষ্ট করে, যা অনুসরণীয়।
ঝিনাইদহের লিটন দা,আমার দিশেহারা সময়ের দিনগুলোতে একান্ত বন্ধুর ন্যায় পাশে থেকে সাহস যুগিয়ে লক্ষ্য স্থির রাখতে মানসিকভাবে অটল রেখেছেন।এখনো তার সাথে কাটানো সুখ ও বেদনা সংমিশ্রিত সময়গুলো অনেক রঙিন মনে হয়।যা প্রবাস জীবনের স্মৃতির মনিকোঠায় বিশেষ হয়ে থাকবে । 

সেই ছেলেবেলার বন্ধু সাংবাদিক রিমন রহমান, যার সাথে রয়েছে জীবনের অনেক স্মৃতিবিজড়িত সময়।আমার ভালো মন্দের অনেক কিছুই তার জানা।সেই অধিকারের জায়গা থেকে এই প্রবাস জীবনের বিশেষ একটা সময় তার কাছে অনেকটা অসম্ভব কিছু চেয়েছিলাম।তার চরম কর্মব্যস্ত সময়ের মধ্যেদিয়েই সে আমার কাজগুলো করে দিয়েছে অত্যন্ত সুচারুরুপে।ওকে শুধু ছোট্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অকৃতজ্ঞ হতে চাইনা। আমার অন্তরে বন্ধুত্বের বিশেষ আসনে ওর অবস্থান রইলো সারা জীবন।
সৌভাগ্যবোধ করি বরিশালের নিজাম ভাই ও মিতা আপা দম্পতিকে এই প্রবাসে পারিবারিক বন্ধুরুপে পেয়ে।যাদের শুভকামনা সবসময় আমার সাথে রয়েছে।তাদের জন্যও আমার ভালোবাসা ও শুভকামনা অন্তর থেকে।
ফ্রান্সে আইন সম্মতভাবে বসবাসের কাগজ পাওয়ার পর আমার সাথে বিভিন্ন প্রশাসনিক অফিসে গিয়ে আমার মুখের বাংলা ভাষাকে ফরাসি ভাষায় রুপান্তরের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে জটিল কাজগুলোকে সহজ করেদিয়েছেন প্যারিসের চারণ দার্শনিক রেজাউর রহমান মতি ভাই সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। কৃতজ্ঞতা মতি ভাইয়ের কাছে, ও শুভকামনা তার জন্য।
আমার কন্যা ও স্ত্রীকে ফ্রান্সে আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোর ব্যাপারে শুশৃংখলভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন হবিগঞ্জের কবি সুমন আজাদ ভাই।যার সাথে আমার চিন্তার আদান প্রদানে দারুন এক ছন্দের মিল রয়েছে।সুযোগ পেলেই ফোনে আমার ভালোমন্দের খোঁজ খবর রাখেন।সৌভাগ্য প্যারিসে তারমত মুক্ত চিন্তাধারার একজন কবি বন্ধু পেয়ে।প্রতিভাবান এই কবি বন্ধুর জন্য রইলো গুচ্ছ গুচ্ছ ভালোবাসা । 

আমার পরিবার ফ্রান্সে আসার পর প্রাথমিক যেসব ঝক্কি ঝামেলায় পড়েছিলাম সেই মূহুর্তে প্রশান্তির পরশের মত পাশে পেয়েছি ঢাকা দোহারের আতিয়ার ভাই, যাকে আমার দৃষ্টিতে একজন উদারমনা এবং মায়া মমতা-সম্পূর্ণ মানুষ মনে হয়েছে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জের কবিতা অনুরাগী শামীম ভাইয়ের বন্ধুসুলভ সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

বড় বোনসম প্রিয় মানুষ এ্যাডভোকেট নাজনীন নাহার দীপু আপা,প্যারিসের কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব নারায়নগঞ্জের শাহেদ আলী ভাই,পারিবারিক বন্ধু শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বিপুল,ছোট ভাইসম মাসুদ রানা এদের আন্তরিক সহয়োগিতায় আমি ঋনি ।এদের প্রতিও আমার আন্তরিক ভালোবাসা। 

অবশেষে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আশা ও সমস্ত অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে প্যারিসের সুউচ্চ পাহাড়ের উপর (মনমাদ) ছোট্ট এক বাসায় আমাদের নতুন সংসারের যাত্রা শুরু হয়েছে। আমাদের চার বছর আগের সংসারের সদস্য ছিলাম দুজন আর এখনকার নতুন সংসারে যুক্ত হয়েছে আমার কন্যা মিশেল। তাই নতুন সংসারের ভিন্নতর এক অনুভূতির মধ্যদিয়ে আমাদের নিত্য দিনাতিপাত ……। আমি যখন পরবাসের উদ্দেশ্যে বহির্পানে পা বাড়াই তখন মাতৃগর্ভে মিশেলের বয়স দুই মাস ,তাই তার পৃথিবীতে আগমনী আনন্দের মুহূর্তে পরিবারের সাথে আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়নি।এই প্যারিস থেকেই শুনেছিলাম তার এই ধরণির বুকে পদার্পন বার্তা।ভূমিষ্টের পর থেকেই স্কাইপির কল্যাণে এই সারে সাত হাজার কিলোমিটার দূরত্বের ব্যবধান থেকেই ধীরে ধীরে মিশেলের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো।স্কাইপিতেই দেখেছি তার এক পা দু পা করে হেঁটে চলার চেষ্টা, শুনেছি এলোমেলো শব্দের বুনোনে বাক্য বলা এবং মধুর শব্দ বাবা ডাক।সাক্ষাৎবিহীন এই দূরত্ব থেকেই ভিডিও কথোপকথনের মাধ্যমে মিশের জ্ঞানে আমার আবির্ভাব বাবারুপে । শুধু প্রতিক্ষা ছিলো সরাসরি কন্যাকে দেখা এবং ওর মুখ থেকে বাবা ডাক শোনার।আমার সেই প্রতিক্ষার যবনিকাপাত ঘটে গত ৩০ অক্টোবর প্যারিসের সার্স দ্য গল এয়ারপোর্টে।ওকে কাছে পেয়ে আমার ভেতরের পিতৃত্বের অনুভূতির আজ পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে।এখন মিশেলের মিষ্টি কন্ঠের বাবা ডাক শোনার টানে দ্রুত ঘরে ফিরি ,ওর সাথে খেলা করি ,ঘুরতে বেরোইওর ছোট ছোট দুষ্টমিতে প্রতিমুহূর্তে আমাদের ঘর হয়ে ওঠে উৎসব আনন্দ-মুখর ….এ এক অন্যরকম ভালোলাগা…..। 

ইতোমধ্যে আমাদের কন্যা একটি ফরাসি স্কুলে ভর্তি হয়েছে।গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৪ ছিলো মিশেলের জীবনের প্রথম স্কুলের দিন।প্রথম দিকে বাংলা ভাষা আয়ত্ব করা শিশুটি ভিনদেশী ভাষার স্কুলে যেতে ভীতি ,অনিহা ও সংশয় প্রকাশ করলেও এখন নিত্যদিন মনমাদের পাহাড়ী কোলঘেষা পথ বেয়ে মিশেলের স্কুলে যাওয়া আসা স্বানন্দচিত্তে।আমাদের আদর ভালোবাসা শ্নেহ মায়া-মমতার মধ্যদিয়েই কাটছে মিশেলের প্রাত্যহিক দিনপঞ্জি ,সেই সাথে ধীরে ধীরে আয়ত্ব করছে এই মানব সভ্যতার জটিল নিয়ম কানুন।
তাছাড়া ,আমার স্ত্রী'র সুপ্ত-বাসনা ছিলো প্রবাস জীবনের দূরত্ব থেকে দেশের মাটির টান অনুভব করা এবং পৃথিবীর নানা বৈচিত্রময় চিন্তাধারা ও রঙয়ের মানুষের সাথে বসবাসের মাধ্যমে জীবনের স্বাদটাকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে উপভোগ করা ,তার সেই ইচ্ছাটাও পূরণ হয়েছে। 

প্যারিসে ও বাংলাদেশে আমার অনেক প্রিয় মানুষ ,বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে যাদের ভালোবাসার জন্য পৃথিবীটাকে অনেক সুন্দর মনে হয়, ভালভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছে জাগে।তাদের জন্য আমার আশীর্বাদ, সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সুস্থ সুন্দর জীবন দান করুন …….আমাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন

সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৫

দেশের চলমান পরিস্থিতি যেন দুই অশুর শক্তির আধিপত্যের লড়াই

বাংলাদেশে যে আন্দোলন চলছে তা শুধু একটি ক্ষমতা পিপাশু অশুর শক্তিকে হটিয়ে আর একটি অশুর শক্তির অবস্থান নেয়ার চেষ্টা মাত্র। অশুর  শক্তি বললাম কারন ১৯৯১ এর  স্বৈরাচার পতনের পর থেকে আমরা অনেকবার এই  শক্তিগুলোর ক্ষমতার  পালাবদল দেখেছি। এই পরিবর্তনের  ভিতর দিয়ে এদের দ্বারা দেশে কিছু ইমারত নির্মান হয়েছে ,ব্রিজ কালবার্ট হয়েছে ,মানুষকে ডিজিটাল করার নামে হাতে হাতে মোবাইল ,প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিস চ্যানেলের ব্যবহার ইত্যাদি পরিবর্তন দেখেছি, যা  উন্নয়নের চলমান ধারা।যার ধারাবাহিকতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমল থেকে আজকের একরোখা শেখ হাসিনা আমল পর্যন্ত চলমান।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে রাজনৈতিক ও ব্যক্তি নৈতিক চরিত্রের যে উন্নয়ন ঘটার কথাছিলো তা ক্রমান্বয়ে উন্নতি না ঘটে অবনতি হয়েছে। কমেনি রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, লুটপাট । সৃষ্টি হয়নি সহনশীল চিন্তাধারা ও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের রাজনীতি।এই দুই উভয় শক্তির কাজ হলো ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও লুটপাট, আর বিরোধী দলে গিয়ে আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও জানমালের ক্ষতি সাধন  করা।এই গুনের দিক থেকে আওয়ামেলীগ ও বিএনপি যেন একই মায়ের গর্ভে জন্মানো আপন জমজ সহদর ভাই।যদিও আজ আমরা বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ এদের অশুভ যাদু মন্ত্রের মায়ায় আছন্ন হয়ে বুঝে না বুঝে দুই ভাগে ভাগে ভাগ হয়েগেছি।তাই যতই ভালো কথা, পরিবর্তনের কথা বলিনা কেন আমার আপনার কথায় যাদুর মায়ায় আছন্ন সিংহভাগ মানুষের এত সহজে নিরপেক্ষ ও শুভচিন্তার উদয় হবেনা।কিন্তু আওয়ামী বিএনপি এই দুই ভাইয়ের অন্তরের মধ্যে সৃষ্টিকর্তা যদি একটু ভাগবাটোয়ারা করে খাওয়ার মানুসিকতা  উদয় করে দিতো তাহলে এদের আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার যুদ্ধে এতো নিরীহ মানুষের প্রাণহানি হতো না।

আজ গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে একে অপরের মধ্যে যে ছুরি চাকুর ধার দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে এর মধ্যে  কি গণতন্ত্রের কোন রঙ রস রুপ গন্ধ আছে।গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হচ্ছে মত প্রকাশের অধিকার ও অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। বর্তমান শক্তি প্রয়োগ করে যারা ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন আসলেই কি এই প্রক্রিযায় ঠিকে থাকতে পারবেন ?পূর্বে বিএনপি যেমন চেষ্টা করেছিলো আপনারা যেমন টিকতে দেননি , ঠিক তেমনি বিএনপি জামাতকে আপনারা রাজাকার বললেও এরাও আপনাদের মত এইদেশের লুটপাটের রাজনীতির বৃহৎ শক্তি, এই বৃহৎ শক্তিকে বাদ দিয়ে দেশকে অস্থিশীলতার মধ্যে ফেলে কতক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব।

 বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলা হলেও তিনি এক ভোটবিহীন নির্বাচনের সাংবিধানিক সরকার প্রধান কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান নন।হয়তো বাধ্য হয়েই দেশের  চলমান অস্থিরতার মধ্যদিয়ে এই অগণতান্ত্রিক সরকারের অসম্মানের সহিত ক্ষমতার পতন ঘটবে, কিন্তু সেই ক্ষমতা অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্মানের সহিত হলে কতগুলো তাজা প্রান ঝড়ে না গিয়ে বাংলার  আলো বাতাসে বেড়ে উঠতো।  আপনাদের ভাষ্য অনুযায়ী আওয়ামী মতাদর্শ ব্যতিত সবাই স্বাধিনতা বিরোধী শক্তি হলেও এই শক্তিকেও মানুষ ভোট দেয়, এদের মধ্যে থেকেও মানুষ প্রতিনিধি নির্বাচন করে।এদের উপেক্ষা করে কোন নির্বাচকে নির্বাচন বলা যায়না।তাছাড়া স্বাধিনতা বিরোধী শক্তি,পাকিস্থানী দালাল,ভারতীয় দালাল,জঙ্গীবাদ এই শব্দগুলো আপনাদের মুখে এখন শুধুই রাস্তায় দাড়ানো মলম বিক্রেতা ক্যানভাসারের ডায়ালগের মতই ।কারন বিএনপি ক্ষমতা থাকা অবস্থায় দেশ পাকিস্থান হয়ে যায়নি আর আওয়ামী শাসন আমলে দেশ ভারত হয়ে যায়নি আর যাওয়ার কোন সম্ভাবনাও নাই, কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য  ১৬কোটি মানুষের ৩২কোটি হাতই যতেষ্ঠ, সাধারণ মানুষ চায় শুধু রক্তপাত ও হানাহানী ব্যতিরেখে  সুষ্ঠ ও সমযথার মাধ্যমে আপনাদের ক্ষমতার দফারফা হোক।জানি দেশের সরকার বিরোধী এই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলেও দেশের সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেনীর মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবেনা, তবু একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের দ্বারা ক্ষমতা লুটের এই সহিঞ্চতা বন্ধের মাধ্যমে মানুষ হত্যা বন্ধ হোক, স্বস্তি ফিরে আসুক সবার দেহমনে।  

রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

আমার স্মৃতিতে কবি জামাল হাবিব হাবু

পৃথিবীর অমোঘ নিয়মে মানুষের জীবনে মৃত্যু আসবে এটাই চিরন্তনকিন্তু কিছু মানুষের মৃত্যুকে কখনোই মৃত্যু বলা যায়না,বরং মৃত্যুর মধ্য দিয়েই যেন নতুন করে পুনর্জন্মজীবন যদি হয় মহৎ কর্মে পরিবাহিত তাহলে সেই জীবনের অবসানের মধ্যেই পরম সার্থকতাকারন তার রেখে যাওয়া কর্মের মধ্যে দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানবগোষ্ঠীর মস্তিস্কের চিন্তা ও চেতনার বহি:প্রকাশে আরো সুন্দর ও মহিরুপে পৃথিবীতে বিচরণ ঘটে।  কবি জামাল হাবিব হাবু ঠিক তেমনি একটি  প্রদীপের নাম
  সুদূর প্রবাসে বসে কবির  এই ধরনির লোকারণ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে আমি স্তম্বিত হয়েছিলাম,এই ভেবে যে, তার সাথে আর দেখা হবেনা 

আমার জীবনে কবির শিল্প সত্বার সাথে পরিচয় ঘটার পূর্বে পরিচয় ঘটেছিলো তার ব্যক্তি সত্বার সাথে, আমার বাবার কর্মজীবনের সহকর্মী হওয়ার সুবাদেব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন আমার অভিভাবক সমতুল্যতার অনেক উপদেশ  আমার জীবনে এগিয়ে চলার পথে নির্দেশনা দিয়েছেযা আজীবন কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ থাকবেতাছাড়া, জীবনদশায়  প্রত্যেক শ্রেনীর মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক ব্যতিক্রম উদাহরণ ছিলেন  অতি সাধাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত এই কবিদৃষ্টান্ত স্বরুপ, আমার সম্পাদনায়  ২০০৪ সালে প্রয়াস নামে রাজবাড়ী সরকারী কলেজ ছাত্র সংসদের বার্ষিকী প্রকাশনায় তার লেখা একটি স্মৃতি সংগীত প্রকাশের সুযোগ ঘটেগীতি কবিতাটিতে তার কর্মস্থল  রাজবাড়ী সরকারী কলেজের প্রত্যেক অধ্যক্ষের মহৎ গুন ও অবদানের বর্ণনা এত উদারতা,কাব্যিক এবং ছান্দ্যিক রুপে উপস্থাপন করেছেন যে আকাশের মত বিস্তৃত হৃদয় না থাকলে তা সম্ভব নয়

যখন একটু পরিণত বয়সে উপনিত হই,  তখন আমার পরিচয় হয় কবি  জামাল হাবিব হাবুর এক দার্শনিক স্বত্বার সাথেপ্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা,মানব জীবনের রীতি নীতি, আধ্যাত্মিকতা  ইত্যাদি বিষয়ে ছিলো তার এক নিজস্ব চিন্তাধারাযা তার লেখা গান, কবিতা ও অন্যন্য লেখালেখি এবং তার জীবনাচর্চায় ফুটে ওঠে এক  স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্টেআলাপচারিতায় ফুটে উঠতো,সমাজের শোষিত শ্রেনীর  পক্ষে এবং শোষক শ্রেনীর বিপক্ষে তার নৈতিক অবস্থানএছাড়া জগত সৃষ্টিকর্তার   প্রতি তার গভীর বিশ্বাস ও ভক্তির বহি:প্রকাশ ঘটতো  কৃতজ্ঞচিত্তে
কবির স্পর্শকাতর ও ভাবাবেগ হৃদয়ের কারনে অনেক সময়ই  তাকে পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছেফলোশ্রুতিতে তার রচিত অনেক পান্ডুলিপি প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যায় এবং অনেক লেখা নষ্ট হয়ে যায়এ জন্য  গভীর বেদনা বয়ে বেড়ানোর ভাব ফুটে উঠতো তার একান্ত আলাপচারিতায়

তিনি যেমন বিভিন্ন গুনিজন সংবর্ধনায় সম্মানিত হয়েছেন তেমনি তারও দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন ছিলো রাজবাড়ীর জেলার সকল সাংস্কৃতিক কর্মী ও গুনিজনদের এক মঞ্চে সংবর্ধনা আয়োজনের মাধ্যমে সম্মানিত করা সেই চেষ্টায়  দীর্ঘদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও নানা প্রতিকূলতার কারনে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে  তার বেদনাভরা কন্ঠে

কবি জামাল হাবিব হাবুর উপস্থিতি ছিলো রাজবাড়ীর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অভিভাবকসমতার এই চলে যাওয়ায় একটা শূন্যতা তৈরী হলেও তার রেখে যাওয়া সৃষ্টিকর্ম  দিক নির্দেশনা দেবে এবং তার সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন গভীর শ্রদ্ধাভরে


কবির জীবন কাল :জন্ম ১৯৩৬-মৃত্যু ২৭ এপ্রিল ২০১৪

শনিবার, ২ আগস্ট, ২০১৪

বাঙ্গালীর নৈতিকতাবোধ

কোন এক সময়  মানুষের অশিক্ষা ,অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে ন্যায় অন্যায় বিচারবোধ উপলব্ধি না করে নানা লোমহর্ষক কর্মকান্ড ঘটাতো। আমরা দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলে থাকি সেই মধ্যে যুগিয় বর্বরতার কথা। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে আবির্ভাব হয়েছে নানা দার্শনিক ,সামাজিক ,রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং ধর্মীয় বিধিবিধান। অনেক মহামানবদের আত্বত্যাগ,সাধনা ও রক্তের ফসল আমাদের আজকের এই ধরনী এবং সভ্যতা।

মানব সভ্যতার স্বর্ণ যুগে আজ আমাদের অবস্থান। আজও জ্ঞান বিজ্ঞানে অগ্রগামী জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা  তাদের পূর্ববর্তীরদের ভূল থেকে শিক্ষা নিয়ে  মানবতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার চর্চায় মগ্ন রেখেছে। ঠিক তখন আমারা কি চর্চা করছি ?যে বাঙ্গালী জাতীগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের এত গর্ব সেই অহংকারের  জাতীকে আজ কোন পথে নিয়ে যাচ্ছি। অনেক গ্লানী ,দুঃখ  ,দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম ও রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে শত শত বছরের পরাধীনতার শৃংখল ছিন্ন করে আমাদের পূর্ববর্তীগন একটি স্বাধীন জাতীগোষ্ঠী উপহার দিয়ে গেলো। সেই স্বাধীনতার ফলাফল কি ?কি চর্চা করছে এই জাতীগোষ্ঠীর মানুষ। আজ বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর বৃহত্তর চারটি ধর্মীয় দর্শন চর্চা করে,কেউ কেউ কোন ধর্মীয় দর্শন বিশ্বাস না করে নিজেকে মানবতাবাদী পরিচয় দিয়ে সেরা মানুষ দাবি করে থাকে,অনেকেই আবার বাংলাদেশ বলতেই চেতনায় কাতর হয়ে যায় ,মঙ্গল প্রদীব জ্বালায় , পতাকার রঙে শাড়ী পানজাবী পড়ে,কেউ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিজম আন্দোলন করে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে,কেউ বাংলার মানুষের মত প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গনতন্ত্রের আন্দোলন সংগ্রাম করে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞানের সমস্ত শাখা প্রশাখা আজ বাংলাদেশে রপ্তানী হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কেউ হয়েছেন গনতন্ত্রের মানষ কন্যা ,কেউ আপসহীন নেত্রী ,কেউ পল্লীবন্ধু ,আরো অনেক উপাধিতে ভূষিত আমাদের কান্ডারী জাতীর মাঝি মাল্লাগন। এদের   নেতৃত্বাধীন জাতীর সমস্ত জ্ঞান চর্চার ফলাফল স্বরুপ আজ যা দেখতে পাচ্ছি  তাহলো,বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী ধারী যুবক রাষ্ট্রের সেবক ও সম্মানে আসনে বসে নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ভিক্ষুকের মনোবৃত্তি নিয়ে হাত বাড়িয়ে ঘুস খাচ্ছে। একজন জনপ্রতিনিধি জনগনের প্রতিশ্রুতি পূরণের পরিবর্তে, নিজেকে সর্বোচ্চ তুষ্টির জন্য সৌদি আরবের গরিব মিস্কিনের উদ্দেশ্যে পাঠানো দুম্বার  মাংস গরিবকে না দিয়ে নিজের বাড়িতেই  রান্না করে পরিবার পরিজন ও নেতাকর্মী   নিয়ে ভূরিভোজ করছে। এখন একজন ছাত্রের আর পড়াশুনার পাশাপাশী শিল্প সাংস্কৃতিতে মন বসেনা, লুটতরাজ রাজনৈতিক দলের ফ্রন্ট লাইনে আসার জন্য সে মানুষ কোপাতেই ভালোবাসে।  একজন ছদ্দবেশী কমিউনিষ্ট নিজেকে গণমানুষের নেতা দাবি করলেও পাজামা পানজাবির ভাঁজ , পাজেরো গাড়ি ও মন্ত্রীত্বের স্বাধ দীর্ঘায়ী করার জন্য লুটেরাদের দালালী করতে আর লজ্জাবোধ করেনা। একজন চিকিৎসকের এখন আর একজন মুমূর্ষু রোগীকে দেখে হৃদয়ের মানবিকতার দুয়ার খোলেনা,বরং গুলশানের ফ্লাটের কিস্তির টাকা পরিশোধের জন্য একজন রোগীকে একবারের পরিবর্তে তিনবার পেটে সার্জারির ছুরি চালানোর ব্যবস্থা করে। একজন বুদ্ধি ব্যাবসায়ী  রাষ্ট্রীয় পদক ধরার দৌড়ে এগিয়ে থাকার জন্য অশিক্ষিত ও মূর্খ রাজনৈতিক নেতার ভিত্তিহীন মন্তব্যকে সত্য রুপে প্রতিষ্ঠার জন্য টিভি টকশোতে ঘন্টার পর ঘন্টা যুক্তি প্রদার করে। অনেক ধার্মিক নিজেকে সমাজের সেরা মানুষ দাবি করলেও অন্য ধর্মের মানুষের উপর অত্যাচার ও উপাসনালয় ভেঙ্গে ফেলা পূর্ণের কাজ মনে করে। আর মানুষ হত্যা যেন ইদুর বিড়ালের মৃত্যুর মত, বিচারতো দুরের কথা যা আজ রাষ্ট্রীয়  রেজিষ্টার খাতায় এন্ট্রিই   হয়না, ফলে সরকারের ষ্টেশনারী খরচ সাশ্রয় হয়। আর এসবের দোহাই দিয়ে অনেক এনজিও ও মানবাধিকারের ফেরিওয়ালারা বিদেশী দাতা সংস্থার ভিক্ষা এনে নিজেদের ব্যাংক ব্যালেন্স ভারী করছে।   মাছ ব্যাবসায়ী ফল ব্যাবসায়ীকে,ফল ব্যাবসায়ী  মাছ ব্যাবসায়ীকে ফরমালিন খাওয়াচ্ছে , এরুপ সবার মধ্যে দ্রুত অর্থ বিত্তের মালিক হওয়ার লালসা ডুকিয়ে দিয়ে আমাদের  সবাইকে একে অপরকে দ্বারা বিষ খাত্তনোর ব্যাবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে পূঁজিপতিদের ব্যাবসার বাজার সৃষ্টি করে জাতিকে ধংসের মুখে ঠেলে দিয়ে  এ্যাপোলো,স্কয়ার, ল্যাব এইড,ইউনাইটেডের মত রক্তচোষাদের রমরমা স্বাস্থ্য বানিজ্যের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে । মূলত, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী চোর খুনিদের লালন পালন ও চরিত্রবানের সনদ প্রদান করে সেই দেশের সারারণ মানুষের চরিত্রহীনতায় অবাক হওয়ার কিছু থাকেনা।দেশের প্রধান আদর্শের চেয়ার যদি আদর্শহীনতার মডেল হয় সেই জাতির চেয়ে হতভাগা জাতি আর থাকতে পারেনা। আর তাইতো জাতির চেতনার উৎস ও শ্রেষ্ট সন্তান মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ক্রেষ্টের বরাদ্ধকৃত স্বর্ণের অর্থ চুরি  একজন মন্ত্রী  বা সচিবের স্বাভাবিক কর্মকান্ডের আওতায়ই পড়ে। যে দেশের মানুষের বৃহৎ একটা অংশে আফ্রিকার বুভুক্ষ জনগোষ্ঠীর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, সেই দেশে শত কোটি টাকা খরচে  বৃহৎ মানব পতাকার রেকর্ড সৃষ্টির সৌখিন দেশ প্রেম হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না।

আজকের এই সভ্যতার মোড়কে ঢাকা বর্বরতার যুগে যে মানুষগুলো এখনো সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের ঝান্ডা হাতে দাড়িয়ে আছে এবং জাতীর মুক্তির স্বপ্ন দেখে আত্নবিসর্জন দিয়ে সংগ্রাম করছে তাদেরকে সশ্রদ্ধ ছালাম ও সমর্থন এবং তাদের ডাকে সাড়া দেবার আহবান।

মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০১৪

আমার ঈদ আনন্দ

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে মুসলিম সম্প্রদায়ের খুশির পবিত্র ঈদ উল ফিতরের দিনটি। এই দিনটিকে ঘিরে সেই ছেলে বেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত নানা অনুভূতি ও অনেক স্মৃতি জরিত।সেই ছেলে বেলায় যখন ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম তখন দেখতাম কিছু মানুষ ঈদ গাঁয়ের প্রবেশ দ্বারে ভিক্ষার থালা হাতে দাড়িয়ে থাকতো, আবার কিছু মানুষ ঈদের আগে ফিতরার টাকার জন্য সচ্ছল মানুষদের দ্বারে দ্বারে হানা দিতো। তখন এ ব্যাপারগুলো তেমন ভাবাতোনা কিন্তু যখন বড় হয়েও ঐ মানুষগুলোকই এত বছর পরেও এই খুশির দিনে ঈদ গাঁয়ে ভিক্ষা করতে দেখেছি, ফিতরার টাকার জন্য দৌড়াতে দেখেছি তখন সত্যি ভাবনার দোলায় দোল খেয়েছি।বাংলাদেশের কত মানুষ মাস বছরের মধ্যেই ভাগ্য বদলে শত শত কোটি টাকার মালিক হচ্ছে কিন্তু এই জনগোষ্ঠীর ভাগ্য যেন যুগের পর যুগ পার হলেও পরিবর্তন হয়না। এই জনগোষ্ঠীর জন্মই হয়েছে যেন ভিক্ষাবৃত্তির জন্য। যখন ভাবি আমরা সবাই উলঙ্গ দেহে পৃথিবীতে আসি কিন্তু এই সমাজ ব্যবস্থা কাউকে খুশির দিনেও ভিক্ষার থালা হাতে রাস্তার ধারে বসিয়ে দেয় আর কাউকে ঝলমলে পোষাকের ঝলকানিতে সুন্দর করে তোলে তখন আামার ঈদ আনন্দ ফিকে হয়ে যায়। যেদিন দেখবো বাংলাদেশের কোন মানুষ যাকাতের কাপড়ের জন্য কোন ধনির বাড়ীর গেটের সামনে ভিড়ে পায়ে পিষ্ঠ হয়ে মারা যাবেনা,ঈদের খুশির দিনে অনাথের  মলিন মুখ দেখা যাবেনা, ফিতরার অর্থ গ্রহনের কোন মানুষ খুজে পাওয়া যাবেনা, সেই দিন সত্যি নিজেকে একজন গর্বিত বাঙ্গালী এবং মুসলিম মনে হবে।

বুধবার, ১৮ জুন, ২০১৪

বত্রিশ কোটি হাতে আজ নেশাখোরদের পড়ানো শৃংখল...!

হত্যা , রাহাজানি ,নতুনত্ব লোমহর্ষক ঘটনার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের প্রতিদিনের সূর্ষ্য পশ্চিম আকাশে অস্তমিত হচ্ছে। কিন্তু যারা দেশের চালকের আসনে ষোল কোটি মানুষের অবিভাবক হয়ে বসে আছেন ,তাদের দৃষ্টিতে দেশ তাদের হাতে সেরা সময় পার করছে। রঙিন শাড়ী ,মুক্ত ঝড়া হাসি , স্যুট কোর্ট এবং তাদের গলায় পেচানো টাই এর বন্ধন দেখে মনে হয় আসলেই তারা কত সুখী ও সফল জাতীগোষ্ঠীর অভিভাবক। অন্তরে সুখ না থাকলে কি এমন বেশভূষা শোভা পায়। ক্ষমতা বলে কথা ! ক্ষমতা স্বাদ মাদকের নেশার মত । এক জন মাদক সেবী নেশা নিবারণের জন্য কোন খুন বা অপকর্ম করলে যেমন আমাদের অবাক হওয়ার কিছু থাকেনা। আবার নেশাখোর যখন খুন করে নেশার ঘোরে থাকে তখন তার কাছে খুনের জন্য অনুতপ্ততা বা অনুশোচনা কাজ করেনা বরং পৃথিবীকে স্বর্গের মত সুন্দর মনে হয়। তেমনি বাংলাদেশ আজ ক্ষমতা আসক্ত নেশাখোরদের দখলে……ক্ষমতার নেশা কাটানোর জন্য ক্ষমতা খেকুরা শত শত লাশের ওপর সওয়ার করে ক্ষমতার আসনে বসলেও তাই আজ আমাদের অবাক লাগেনা। ক্ষমতার নেশার ঘোরে তাই ওদের কাছে মনে হয় বাংলাদেশ সুখী সমৃদ্ধ স্বর্গভূমি। ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাতে আজ নেশাখোরদের পড়ানো শৃংখল।

শনিবার, ১৪ জুন, ২০১৪

র‍্যাব এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

২৬ মার্চ ২০০৪ সালে বাংলাদেশের সামরিক,আধাসামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় রাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)। শুরুতে এই বাহিনীর কার্যকক্রম সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জনে সমর্থ হয় কারণ তৎকালীন সময়ে অস্থিতিশীল সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন ও সন্ত্রাস,চাঁদাবাজীর মূল উৎপাটনের জন্য তরিৎ অভিযান পরিচালনা সক্ষম ও বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পর্ণ এমন একটি শক্তিশালী আইন শৃংখলা বাহিনী সময়ের দাবী ছিলো ।এছাড়া অনেক বড় বড় সন্ত্রাসী সংগঠন ও সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অনেক দুঃসাহসী সফল অভিযান পরিচালনা করে তাদের সক্ষমতার স্বাক্ষর মানুষের কাছে তুলে ধরেন। শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও এ ধরনের বিশেষ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। শুরুতে এই বাহিনীর কার্যক্রম আশা জাগানোর হলেও এর পরের গল্প শুধুই হতাশার,বেদনার এবং কান্নার। আইন শৃংখলা রক্ষার নামে এর অন্তরালে এই বাহিনীকে দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের ক্ষমতাশীনরা এই দশ বছরে কি করেছে তার বিশদ বিশ্লেষন এবং কি উদ্দেশ্যে মূলত ব্যবহার করা হচ্ছে তা আজ গভীর ভাবে ভেবে মানুষের সচেতন ও শোচ্চার হবার সময় এসেছে।

একটি দেশের দুষ্কৃতিকারী মহল দ্বারা নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংগঠিত হবে ও তৎপরতা চলবে এবং তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীকে ধরে আইনের আওতায় এনে বিচারের সম্মুখীন করা ও সমাজের অপতৎপরতামূলক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করাই মূলত দেশের আইন শৃংখলা বাহিনীগুলোর কাজ। সেই বাহিনীই যদি কোন প্রকার জবাবদিহিতা ছাড়া নিজ হাতে বিচার বিভাগের দায়িত্ব তুলে নিয়ে জল্লাদের কাজটিও সম্পন্ন করে ফেলে এবং তা সরকারের নির্দেশেই তাহলে সেই সংগঠন বা বাহিনীকে জনগনের বন্ধু সংগঠন বলা যায় কি? এবং এমন কর্মকান্ড সমর্থনকারী সরকার বা রাষ্ট্রকে মানবিক ও আধুনিক গণতান্ত্রীক রাষ্ট্র বলা যায় কি? ধরে নিতে হবে দেশ আসলে গণতন্ত্রের ছদ্দবেশে মূলত সেই সম্রাট আকবরে পাইক পেয়াদার একনায়কতান্ত্রিক শাসনের দিকে ধাবিত হয়েছে।

একটি বেসরকাারী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের ক্ষমতাশীন সরকার এ পর্যন্ত র‌্যাবকে দিয়ে প্রায় ২০০০ মানুষকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করিয়েছে। রাষ্ট্র ও র‌্যাব এর কাছে এই দুই হাজার মানুষের পরিচয় সন্ত্র্রাসী হিসেবে। যদি সন্ত্রাসী হয়েও থাকে তবুও প্রাথমিক দৃষ্টিকোন থেকে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিলো এই মানুষগুলোকে আইনের আওতায় এনে দেশের প্রচলিত  আইন অনুযায়ী শাস্তি ও সংশোধনের ব্যবস্থা করা। একজন মানুষের সম্পর্কে আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ থাকলেই একজন মানুষ সন্ত্রাসী বা অপরাধী হয়না, অভিযোগকারী ব্যক্তিকে প্রামানিক তথ্য উপাত্ত ও বিচার বিশ্লেষনের উপর ভিত্তি করে একমাত্র আদালত সন্ত্রাসী বা অপরাধী সাবস্থ্য করতে পারে আবার নিরাপরাধও প্রমান হতে পারে।

যে মানুষগুলোকে হত্যা করা হয়েছে এই মানুষগুলোর আত্নকথন দেশের মানুষ জানেনা। সরকার কেন তাদের বক্তব্য শোনেনি ?কেন সরাসরি হত্যা করলো ? বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই কেন সন্ত্রসী হিসেবে চিহ্নিত করলো ? এই হত্যা প্রক্রিয়া কি সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের স্বার্থে ?নাকি বিশেষ কোন গোষ্ঠীর স্বার্থে ?যদি কল্যাণের স্বার্থেই হয়, তাহলে দুই হাজার বড় বড় সন্ত্রাসী হত্যা করার পরও দেশ কেন আজ হত্যা, গুম, খুন ও অপকর্মের চারণভূমি ? এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে আসলে কি ঘটছে তা আজ দেশের বিবেকবান ও সমাজ সচেতন মানুষদেরকে ভাবিয়ে তুলছে।

যে মানুষগুলো হত্যা করা হয়েছে তারা প্রত্যেই রাষ্ট্র অনুমোদিত গল্প অনুযায়ী র‌্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধ করতে গিয়ে ক্রসফায়ারে মারা গিয়েছে। কিন্তু এই সাজানো যুদ্ধের আসল ঘটনা একমাত্র অপারেশনাল ফোর্স ও ভিকটিম ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানতে পারেনা ।ভিকটিম ব্যক্তিকে যেহেতু পরপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাই আসল ঘটনা আর জনসম্মুখে আসার সুযোগ থাকেনা। পরবর্তিতে র‌্যাবের মিডিয়া উইং কর্তৃক ঘটনার সাথে রং রস লাগিয়ে মিডিয়ার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। আমাদের মিডিয়াগুলোও উপস্থাপিত গল্পকে অত্যন্ত গুরত্ব সহকারে অনুসন্ধান ছাড়াই খুন হওয়া ব্যক্তিককে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে প্রচার করে থাকে,আর যেসব সাহসী সংবাদ সংস্থা ও সাংবাদিক ঘটনার নেপথ্যে অনুসন্ধানের চেষ্টা চালিয়েছে তাদেরকে অনেক সময় সরকারের এই পাইক পেয়াদা বাহিনী দ্বারা হয়রানীর স্বীকার হতে হয়েছে।

এই বাহিনীর কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার প্রতিবাদ করে আসলেও কোন সরকারই তা কর্ণপাত না করে রাষ্ট্রীয় এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালু রেখেছে। আবার দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতা বাইরে থেকে র‌্যাবের বিরুদ্ধে কথা বললেও ক্ষমতা গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থেই এই বাহিনীকে ব্যবহার করছে।

আজ যে মানুষগুলোকে রাষ্ট্রীয় ভাবে হত্যা করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকের জীবনের উপর একটু গবেষনা চালিয়ে যদি জানার চেষ্টা করা হয় ঘটনার নেপথ্যের গল্প, তাহলে একটু গভিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে দেখা যাবে , এই মানষগুলোর জীবন যাপন স্বাভাবিক ছিলো, কিন্তু জীবনের কোন এক পর্যায়ে অপ্রাপ্তি ,হতাশা ও ব্যর্থতা থেকে জীবনের প্রয়োজনে কোন সমাজ বিরোধী চক্রের প্ররোচনায় অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে, আবার অনেকেই কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতি করতে এসে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহারের হাতিয়ার হয়ে পরে নামের সাথে লেগেছে সন্ত্রাসীর তকমা।

আমাদের দেশে বর্তমান যে ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু রয়েছে এই ধারায় মাঠ পর্যায়ে সশস্ত্র ক্যাডার,সুদক্ষ খুনি,চাঁদাবাজ,ত্রাস সৃষ্টিকারী বোমাবাজ,দখলদারিত্বে পারদর্শী নেতাকর্মী ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক রেসের ময়দানে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই রাজনীতির প্রয়োজন থেকে এবং ক্ষমতা লুটের লড়াইয়ে শক্তি বৃদ্ধির জন্য আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সমাজ থেকে কিছু মানুষকে প্রয়োজনের তাগিদেই লাঠিয়াল হিসেবে তৈরী করে এবং উদ্বুদ্ধ করে। এই ছোট্ট লাঠিয়ালই লাঠিবারি খেলতে খেলতে কোন একসময় হয়ে যায় লাঠিয়াল সরদার। সরদার থেকে যখন অর্থ বিত্তের পাশাপাশী তৈরী করে ফেলে আন্ডার ওয়াল্ডে বিশেষ প্রভাব ঠিক তখনি এই মানুষগুলোকে সমাজের কাছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ত্রাস সৃষ্টি করে এদেরকে দিয়ে আড়ালে বসে স্যুট কোট ও পাজামা পানজাবী পরিহিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধারী স্বচ্ছ ইমেজের সমাজ বিরোধী স্বার্থান্বেষী মানুষেরা চালায় যাবতীয় অপকর্ম ও তৎপরতা। এই আন্ডার ওয়াল্ডের মানুষগুলো যখন আমাদের স্বচ্ছ ইমেজের ভন্ড নেতাদের মুখোস উন্মোচনের কারণ হয়ে দাড়ায়, ঠিক তখনি জনগনের অর্থে কেনা গোলা বারুদ ও বেতন ভাতায় পোষ্য সরকারী পাইক পেয়াদা দিয়ে সুস্থ মাথায় হত্যা করিয়ে জনসাধারণকে বোঝানো হয় তারা দেশের আইন শৃংখলা ও জান মাল রক্ষায় আপোসহীন ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এভাবেই আমাদের শোষক শ্রেণী যেমন নিজ স্বার্থে সমাজ থেকে সন্ত্রাসী সৃষ্টি করছে অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকেও নিজেদের ক্ষমতার প্রভাব প্রতিপত্তি আরো সুদৃঢ়  করার জন্য অপব্যবহার করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের মাথার ওপর যে শোষক শ্রেনী পাথরের মত চেপে বসেছে এবং তাদের রক্তচোষা নেতৃত্বের কারণে আজ জনগনের টাকায় পোষ্য আইন শৃংখলা বাহিনীগুলো জনসাধারণের সেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়ে প্রতিনিয়ত জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ঘাতকতা করে চলছে। হত্যা প্রক্রিয়াই যদি সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতার সমাধান হতো তাহলে যে দুই হাজার মানুষকে সন্ত্রাসী হিসেবে হত্যা করা হলো এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়েই বাংলাদেশ শান্তির স্বর্গভূমি হওয়ার কথা ছিলো। মূলত এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপকর্মের মূল শিকড়ে পানি ঢেলে সতেজ করে শুধু ডালপালা ছেঁটে দিয়ে সন্ত্রাসকে আরো শৈল্পীক ভাবে পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে গ্রাসীত করা হয়েছে।
রাষ্ট্র যদি আজ কল্যাণমুখী হতো তাহলে একজন মানুষের সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার কারণ খুজে বের করে তা সমাধানের নানা পদক্ষেপ গ্রহন করতো এবং আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মৃত্যু হওয়া প্রত্যেকটি ঘটনার প্রকৃত রহস্য খুজে বের করতো এবং যথাযত পদক্ষেপ গ্রহন করে এই অনৈতিক হত্যালীলা বন্ধ করতো।

আসলে যে রাষ্ট্র বা সরকার ব্যবস্থা মানুষকে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার যোগ্যতা রাখেনা, সেই রাষ্ট্রের মানুষ হত্যার অধিকার কতটা যৌক্তিক ?

আজ র‌্যাব শব্দটি মানুষের কাছে এক শঙ্কার নাম। কোন পরিবারের কোন সদস্য যদি এই বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়, তাহলে সেই পরিবারের সকল সদস্যদের আতংক ও সংশয়ের মধ্যে প্রতি মুহূর্ত চিন্তা করতে হয় যে, মানুষটি সুস্থ শরীরে আবার ফিরে আসবে কি ?নাকি প্রিয় মানুষটির লাশ রূপে দেখা মিলবে খালে বিলে অথবা কোন মর্গে। এমন শত শত পরিবার  প্রিয়জনের দুঃসহ স্মৃতি বুকে নিয়ে আজ দিনাতিপাত করছে।আজকের সরকার এই বাহিনীকে দিয়ে অনেকেরই পুঙ্গত্বের জীবন উপহার দিয়ে জীবনের বেঁচে থাকার সোনালী স্বপ্নকে ধূসর করে দিয়েছে।র‌্যাবের আক্রশের স্বীকার পঙ্গু লিমন চাইলেই আর কোন দিনও দুই পায়ে খেলার মাঠে দৌড়াতে পারবেনা,পারবেনা দরিদ্র পিতামাতার সংসারের হাল শক্ত ভাবে  ধরতে,সারা জীবন খোড়া হয়েই জীবন অতিবাহিত করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে।

এক সময় সমাজের কালো টাকার মালিকেরা শত্রু বা প্রতিপক্ষকে খুন করার জন্য পেশাদার খুনি চক্রের সাথে টাকা বিনিময়ে চুক্তি করতো,কিন্তু আজ সময়ের বিবর্তনে র‌্যাব সেই কালো টাকার মালিকদের কাছে আশির্বাদ হয়ে আবর্ভাব হয়েছে ,কারণ এখন খুন করার জন্য টাকার বিনিময়ে র‌্যাব এর সাথে চুক্তি করলেই, খুবই নিখুতভাবে ঝুকিমুক্ত খুনের সেবা প্রদান করে র‌্যাব সমাজ বিরোধী চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারায়নগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনাই যেন তার উজ্জল দৃষ্টান্ত। আবার অনেকের জমিজমা দখলের ব্যাপারেও মাস্তানদের পরিবর্তে এই বাহিনীর সদস্যদের সাথে চুক্তির করছে, সেই দৃষ্টান্তও আজ দৃশ্যমান ।

...... আপনারদের বিবেকের কাছে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই, রাষ্ট্রের বড় চেয়ারে বসে ও মর্যদার পোষাক পরে আজ আপনারা যারা যে টাকার বিনিময়ে ঘৃন্য কাজে লিপ্ত হয়ে রাষ্ট্র ও জাতিকে নিয়ে যে ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছেন, সেই টাকায়  গুলশান বনানীতে কেনা ফ্লাটের দক্ষিনা জানালার বাতাস কি আপনার শরীরকে শীতল করবে? যে নরম বিছানায় স্ত্রীর সাথে আরাম করে ঘুমানোর জন্য মানুষ হত্যা করলেন, আপনার কি সত্যির আয়েশের ঘুম হবে? মনে হবেনা,  আপনি আসলে নরম বিছানায় নয়, বরং লাশের ওপর শুয়ে আছেন?একবারও কি মনে প্রশ্ন জাগেনা, আপনার অভিশপ্ত টাকার ফ্লাটে পরিবারের সবার আয়েশের ঘুম হলেও অপঘাতে আপনার হাতে খুন হওয়া মানুষগুলো আত্না আপনার চিন্তার জগতে আনাগোনা করে আমৃত্যু  দংশন করবে। একটু অন্যভাবে চিন্তা করে দেখুন ,আপনার যে প্রজন্মকে উচ্চবিলাশী জীবন উপহার দেওয়ার জন্য আজ আপনার অর্জিত শিক্ষা, জ্ঞান ও বিবেককে বলিদান করলেন,সেই প্রজন্মকে মূলত কি দিয়ে গেলেন? আপনি আসলে আপনার প্রজন্মজকে এক ঘৃনার ইতিহাস মানুষের রক্ত দিয়ে রচনা করে দিয়ে গেলেন।
যদিও জংধরা তালাবদ্ধ বিবেকেরবানদের কাছে বিবেক ও নৈতিকতার গল্প হাস্যকর।

আজ শুধু র‌্যাবের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে শোচ্চার হলেই সমস্যার সমাধান মিলবেনা মূলত সন্ত্রাস ও অপকর্মের যে ফলবান বৃক্ষ আমাদের মাথার উপর ছেয়ে আছে সেই ফলবান বিষবৃক্ষের মূলশিকড় উপরে ফেলার দিকে লক্ষ্য স্থির করে, সাধারণ মানুষের মধ্যে গনসচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য প্রত্যেক সমাজ সচেতন ও যারা শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে দৃঢ়  সংকল্পবদ্ধ তাদের প্রত্যেককেই আজ যার যার অবস্থান থেকে দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে কথা বলা শুরু করতে হবে। যেদিন সামাজিক জাগরণের মধ্যেদিয়ে এক মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সংঘবদ্ধ গণশত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চূড়ান্ত করতে পারবো সেই দিনই জাতীর মুক্তি। তানাহলে সমাজ আজ যে ধারায় বহমান সেই ধারা অব্যহত থাকলে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোন একসময় লিমন কিংবা দু হাজার অপমৃত্যুর স্বীকারদের মত ভাগ্য বরণ করা লাগতে পারে।