শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯

শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টির অন্তরায়

সৃষ্টির নেশা স্রষ্টাকে সৃষ্টির আনন্দে মাতায়।।সৃষ্টির আনন্দ থেকেই স্রষ্টা সৃষ্টি করে অনিন্দ্য সুন্দর যা কিছু। পৃথিবীতে সুন্দর যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, যে সুন্দর সৃষ্টির আলোয়  ধরণী আলোকিত হয়েছে,সেই প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে ছিল স্রষ্টার আত্মতৃপ্তির প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা।

শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি,বিজ্ঞান, সমাজ, রাষ্ট্র, সংগঠন সহ যা কিছু পৃথিবীর মানুষের কল্যাণের জন্য উদ্ভব হয়েছে এর প্রতিটি উদ্ভাবনের পেছনেই ছিল কোন মহৎ আলোকোজ্জ্বল হৃদয়ের সৃষ্টির আনন্দে ভেসে বেড়ানোর তাড়া ।আত্ম তৃপ্তির তাড়া থেকে সৃষ্টি যেমন স্রষ্টাকে আনন্দে ভাসায়,সেই আনন্দের আকাঙ্ক্ষা থেকে যে সৃষ্টি, সেই সৃষ্টির আলোয় মানুষ প্রশান্তি লাভ করে।কারো সৃষ্টি যখন অন্যকে প্রশান্তি দেয়, মানুষ তখন সেই সৃষ্টির স্রষ্টাকে খুঁজে বের করে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেন এবং প্রশস্তি গায়। 

একজন সমাজ সংস্কারক একটি স্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যক্তি জীবনের ভোগ বিলাসিতা ত্যাগ করে সুবিধাবাদী শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেন।এই কাজটি বাস্তবায়নের সংগ্রাম করতে গিয়ে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হন, তবুও তিনি পিছু পা হন না।আমাদের সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয় এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি কতইনা কষ্টে নিমজ্জিত আছেন।প্রকৃত পক্ষে তিনি এই কষ্টের পথ বেছেই  নিয়েছেন আনন্দের আশায়।এই কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে যে দিন তার স্বপ্নের স্থিতিশীল ন্যায় প্রতিষ্ঠার সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হবে, সে দিনই  তিনি আনন্দের সাগরে তরী ভাসিয়ে তার মানব জনমের সার্থকতার স্বাদ নেবেন।তার আনন্দের নেশায় যে সুন্দর সমাজ সৃষ্টি হবে, সেই সমাজের সুফলতার বাতাস ভোগ করবে ওই গোষ্ঠীর মানুষ যুগের পর যুগ।বিনিময়ে নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি লাভ করা সমাজের মানুষ তাদের মুক্তির বিনিময়ে ওই স্বপ্ন তাড়িত মহান মানুষকে দেবেন সমাজের শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানের মর্যাদা।কারো লড়াইয়ের লক্ষ্য যদি হয় নিজের  শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা তাহলে তার ব্যক্তিগত প্রশান্তির কোন এক পর্যায়ে লড়াই থেমে যাবে।ফলে সামগ্রিক মানুষের কল্যাণকর কিছু সৃষ্টি হবেনা, আর জাতিও এমন মানুষের নাম এবং কর্ম মনে রাখে না।  

মূলত সৃষ্টির আনন্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব। 

মানুষ মূলত নিজেকে জোর খাটিয়ে কোন কিছু করাতে চায়না।যা কিছুর মধ্যে তৃপ্তি আনন্দ লুকিয়ে থাকে সে দিকেই মূলত ধাবিত হতে চায়।অনেক সময় পরিবেশ পরিস্থিতি সামাজিক নিয়ম কানুন তার ইচ্ছের প্রতিকুলে অবস্থান নিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।কিন্তু অদম্য মানুষেরা সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে তার মনের ভেতরে লালিত ইচ্ছেকে বাস্তবে রূপ দেয়।
ভোগবাদী মানুষ ভোগের মধ্যে সুখ খোঁজে, কারণ তার অন্তর দৃষ্টির সীমারেখা সুদূর প্রসারী নয়।পৃথিবীর বৃহত্তর ভোগবাদী মানুষের দৃষ্টিতে ত্যাগী মানুষের ত্যাগকে জীবনের অর্থহীনতা মনে হলেও, ত্যাগী মানুষ ভোগের চেয়ে ত্যাগের মধ্যেই জীবনের মাহাত্ম্য খুঁজে পায় তার অর্জিত জ্ঞান সাধনার মধ্য দিয়ে।নিজের মধ্যে জীবন জগতকে আবিষ্কার করা পথিক কবি রাস্তার ধারে বসে কবিতা লিখে জীবনের স্বাদ আবিষ্কার করতে পারলেও, জ্ঞানহীন ভোগবাদী দশ তোলা বাড়ী বানিয়েও ন্যূনতম ঘুমের প্রশান্তি আনতে অক্ষম হয়    

একজন কবি যখন একটি কবিতা লিখেন,প্রথমত নিজের সৃষ্টির আনন্দের তাড়া থেকেই তিনি লিখেন এবং কবিই তার কবিতার সৌন্দর্যের  আলোয় নিজেই প্রথমে স্নান করেন।এমন সৃষ্টির সৌন্দর্য আনন্দের ধারা যখন অন্যের হৃদয়কে আন্দোলিত করে তখন কবির সৃষ্টি  শুধু কবির সম্পদ না থেকে সমগ্র মানুষের সম্পদ হয়ে যায়।এক্ষেত্রে নজরুল রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে অনায়াসেই উল্লেখ করা যেতে পারে।যার মধ্যদিয়ে তারা শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু কোন কবি যখন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, অথবা অন্যকে খুশী করে কোন কিছু প্রাপ্তির জন্য ফরমায়েশি কবিতা লিখেন,তখন এমন কবিতার মধ্যে কবির আনন্দের সংস্পর্শ থাকেনা, ফলে কবিতা সৃষ্টি না হয়ে তৈরি হয় কবিতা নামক পণ্য।        

শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে সর্বদা অশান্তিতে নিপতিত করে, আর অশান্ত হৃদয় কখনো সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে পারেনা।পৃথিবীর যা কিছু অসুন্দর তা সুন্দর হৃদয়ের মানুষকে আকৃষ্ট করে না। 

শিল্পকলার বহুবিধ মাধ্যম। প্রতিটি মাধ্যমেই মানুষ আকৃষ্ট হয় শিল্পের সৌন্দর্যের আলোয়।শিল্পের সাধনা সেই করে,যিনি অন্তরে সৌন্দর্য ধারণ লালন করে।
একজন শিল্পী (সংগীত শিল্পী,নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিকার,আলোকচিত্র, নাট্যশিল্পী)যখন তার শিল্প মাধ্যমকে ভালোবেসে শিল্পের ভেতর দিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার পথ খোঁজেন তখনি শিল্পের সৌন্দর্য তার দেহ মনে প্রকাশ ঘটে।কিন্তু শিল্পকে  মাধ্যম করে একজন শিল্পী যখন একটি মেটালিক ক্রেস্ট, কাগজের সার্টিফিকেট অর্জনের ভেতর দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের নেশায় ধাবিত হয় তখন শিল্পের প্রকৃত সৌন্দর্য তার মধ্যে থেকে দূরে সরতে থাকে। যে সৃষ্টির মধ্যে আবেগ ভালোবাসার অনুপস্থিত থাকে সেই সৃষ্টির সৌন্দর্যের রঙ ফিকে হয়। 

 সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে হলে প্রাপ্তির আশা না করে শুধু সৃষ্টির নেশায় মগ্ন থাকাই শ্রেয়। মানুষের আকৃষ্ট করার মত বা কল্যাণকর কিছু যদি কর্মের মধ্যদিয়ে সৃষ্টি হয়েই যায় তাহলে শ্রেষ্ঠত্বই আপনা আপনি স্রষ্টার পিছে ধাবিত হবে।ধরা দেবে  আজ অথবা হাজার বছর পরে।   

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখায় স্রষ্টা শব্দটি ব্যাকরণের বিশেষ্য পদের ব্রহ্ম, ঈশ্বর, আল্লাহ বা মহাদেব অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এখানে বিশেষণ পদের নির্মাতা বা সৃজনকর্তা রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।অর্থাৎ কোন কিছু যিনি সৃষ্টি করেন তিনিই ওই সৃষ্টির স্রষ্টা, নির্মাতা, উদ্ভাবক বা সৃষ্টিকর্তা। যেমন কোন গানের সুরকারকে বলা হয় সুরস্রষ্টা ......।  

শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯

বাতাসের জীবন

বাতাস যদি আসে ফিরে বসতি এপার ,
ফিরে না আসে আবার বসত ওপার ,
বাতাসের এই জীবন নিয়ে অহম অপার …………

শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

হিম শরতের বিবর্ণ প্রকৃতির মাঝে ফরাসি জীবন ধারা।



গ্রীষ্মের
তাপদাহকে  বিদায় দিয়ে ফ্রান্সের প্রকৃতিতে এসেছে হিম শরতের পাতা পাতা ঝরার দিন।২৩ সেপ্টেম্বর  থেকে  ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্যালেন্ডারের নিয়ম অনুযায়ী ফ্রান্সে শরতের সময়কাল।বাংলার প্রকৃতিতে শিশির ভেজা ঘাসের উপর  বিছিয়ে থাকা শিউলি ,নদীর ধারে ফুটে থাকা কাশ ফুলের শুভ্রতায় শরৎ উদ্ভাসিত হয় ।তীব্র গরমের অস্বস্তির  মাঝে জনজীবনে শরতের শীতল বাতাস নিয়ে আসে স্বস্তির ছোঁয়া,কিন্তু  ফ্রান্সের প্রকৃতিতে শরৎ আসে ভিন্ন রূপ বৈচিত্র্যে  আমাদের শরতের বিপরীত মুখী বৈশিষ্ট্যে  শীতের প্রকৃতির মত এখানে শরত শুরু হয়  বৃক্ষরাজির পাতা ঝরার মধ্য দিয়ে ।পাতাহীন কান্ডবিশিষ্ট গাছগুলো ধারণ করে  অসাধারণ শৈল্পিক রূপ , পাশাপাশি অনেক বৃক্ষ যৌবনের সবুজ পাতার রঙ বদলে রূপান্তরিত হয়  হলুদ লাল রঙয়ে। সৌন্দর্যবর্ধক লতাবিশিষ্ট গুল্ম, ক্যাকটাস পুষ্প ফোটানো গাছগাছালি বসন্ত গ্রীষ্মের প্রকৃতিকে সুষমায়িত ফুল ফোটানোর মহান দায়িত্ব পালন করে ক্লান্ত দেহকে অবসর দেয় অপেক্ষা শুরু হয় তুষারের আবরণে শেষ সমাধির, কিন্তু  ক্রিসেনথিমাম ফুলের নানা রঙ, আকৃতি বৈচিত্রতা কিছুটাহলেও  রাঙ্গিয়ে রাখে এখানকার হিম শরতের বিবর্ণ প্রকৃতিকে  

ফ্রান্সের শরতের জড়োসড়ো প্রকৃতিতে পাখপাখালির কলকাকলি প্রায় থেমে এসেছে। বাহারি রঙ ডিজাইনের টি শার্ট, জিন্স শর্ট পোশাকের পরিবর্তে সবার শরীরে উঞ্চতাবর্ধক শীতের পোশাক। মেঘযুক্ত আকাশ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিধারা এখন জীবনধারার প্রাত্যাহিক অংশ। সূর্য মাঝে মাঝে মেঘ ভেদ করে তার অস্তিত্বকে জানান দিয়ে লুকোচুরি খেলায় মগ্ন। এমন প্রকৃতিতে একচিলতে রোদ যেন সদ্য যৌবনা ষোড়শী কন্যার মুখ দর্শন। পর্যটকের দল প্যারিসের যে সব পথঘাট, রেস্তোরাঁ কোলাহলমুখর করে রেখেছিল তা নিঝুম নিস্তব্ধতায় রূপান্তর করে সবাই আপন নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে।গ্রীষ্মকালীন ছুটির   ভ্রমণ, আনন্দ হৈ-হুল্লোড় শেষ করে ফরাসিদের চলছে কর্ম মুখর সময়।রেস্তোরাঁর তেরাসের আড্ডাগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। উৎসব মুখর পার্কগুলো অনেকটাই কোলাহল মুক্ত।বৈদ্যুতিক রুম হিটার চালিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি সিরিয়াল বা সিনেমা দেখাই  সময়ে  এখানকার জীবনধারার প্রাত্যহিক বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য  অংশ। বাইরের কনকনে ঠাণ্ডা আবহাওয়া কারণে অন্দর  ভিত্তির বিনোদন কেন্দ্রগুলো সরব হয়ে ওঠে,  তাই এখন থেকেই সিনেমা হলগুলোর টিকেট কাউন্টারে শুরু হবে  লম্বা লাইন। 

গোটা ইউরোপ জুড়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি চলবে  খ্রীষ্টধর্মীয় সবচেয়ে বড় উৎসব ক্রিসমাস ডে পালনের। ফ্রান্সও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে এই উৎসবকে ফরাসি ভাষায় বলা হয় নোয়েল। হিম শরতের  সমস্ত রিক্ততা সিক্ততাকে আনন্দে রূপান্তরের ক্ষেত্রে নোয়েল তুলনাহীন। দিনটি একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর উৎসব হলেও এখানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবের আনন্দে নিজেকে রাঙ্গাতে কার্পণ্যতা করে না। এখন থেকেই সুপার মার্কেট বিশেষায়িত দোকানগুলো নয়েল টুপি, চকলেট, কেক নানাবিধ উপহার সামগ্রীর পসরা সাজাতে শুরু করেছে অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ পণ্য সামগ্রীর ওপর বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেবে। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই ফ্রান্সের সকল শহরগুলো জেগে উঠবে চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জায়। ফুলের দোকানগুলোতে লেগে যাবে ক্রিসমাসট্রি বিক্রির ধুম।
প্রত্যেক ফরাসি উপহার বিনিময় করবে প্রিয় মানুষ, বন্ধু আত্মীয়স্বজনের মধ্যে। শীতের তীব্রতা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে এই উৎসব আনন্দের কাছে। তুষারের সাদায় রূপ নেবে এক ভিন্ন প্রকৃতি।

শরতের  হিম বাতাসের  তীব্রতা বৈরী প্রকৃতিতে থেমে থাকে না ফরাসি জীবন জীবিকা। ভোরের আলো ফোটার আগেই কর্মব্যস্ত মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেট্রো-ট্রাম-বাসস্টেশন এবং রাস্তাঘাট। চারদিকে থাকে স্বাভাবিক জীবনধারা। মানুষের  প্রতীক্ষা শরত   শীতের জীর্ণ প্রকৃতিকে বিদায় দিয়ে জীবনধারায়  আবার কবে লাগবে  বসন্ত সমিরণ। 





শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৯

বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার এক একটি ফরাসি দেশ, ফরাসি দেশটাই একটি বাংলাদেশী পরিবার।

আমার দুটি দেশ। একটি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, অন্যটি জীবন ও জীবিকার দেশ ফ্রান্স । আমার মা স্নেহের পরশ দিয়ে আমাকে  বড় করে তুলেছেন,আর পিতা তার শ্রম ঘাম দিয়ে আমার নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। আমার জীবনে দুটি দেশের ভূমিকাও আমার পিতা মাতার মতই। ।সেই অর্থে একটিকে আমি মাতৃভূমি বলি অন্যটিকে বলি পিতৃভূমি ।মাতৃভূমির আলো বাতাস মাটির সোঁদা গন্ধ আমাকে দেয় মায়ের ভালোবাসার মতই আদরের ছোঁয়া ও বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী শক্তি  আর পিতৃভূমি দেয় মাথার উপর প্রখর রোদের উত্তাপ থেকে রক্ষার শীতল ছায়া। 


বাংলাদেশ এবং  ফ্রান্স এই দুটি দেশের মানুষের  জীবন যাপন,রীতি নীতি'র মধ্যে পার্থক্যের ফারাক বিস্তর, কিন্তু একটি বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে দারুণ এক সাদৃশ্য বিদ্যমান।সেটা হল, বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার ফরাসি দেশের মত, আর ফরাসি দেশটাই এক একটি বাঙালী পরিবারের মতো। 

রাষ্ট্র এবং পরিবারের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়না কারণ রাষ্ট্র হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সীমানার অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি মানুষকে নিয়ে একটি বৃহত্তর পরিবার, আর পরিবার হচ্ছে রাষ্ট্র নামক বৃহত্তর পরিবারের মধ্যে অবস্থিত এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ।


আমার মাতৃভূমির পরিবারের বৈশিষ্ট্য হল,প্রতিটি পরিবারে এক কি দুজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকে এবং এদের উপর গড়ে পাঁচ থেকে সাত জন মানুষের ভরণ পোষণের দায়িত্ব থাকে। যেমন বৃদ্ধ পিতা মাতা,নিজ সন্তান  স্ত্রী, যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে ছোট ভাই বোন কখনো পরিবারের কোন প্রতিবন্ধী সদস্য।পরিবারের কর্তা ব্যক্তিরা নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে তার উপর নির্ভরশীল পোষ্যদের সামাজিক আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য,শিক্ষা এবং বিনোদনের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান, যতদিন না তাদের মধ্য থেকে আর্থিক উপার্জনক্ষম মানুষ তৈরি না হয়। এদের মধ্য থেকে যে মানুষটি আগে কর্মক্ষম বা উপার্জনক্ষম হয়, সে তার আয়ের অংশ পরিবারের শেয়ার করে মূল কর্তাব্যক্তির দায়িত্বের বোঝা অনেকটা লাঘব করেন।সময়ের প্রবাহে মূল কর্তাব্যক্তি একদিন দেহের বার্ধক্য জনিত অবসাদ থেকে অবসরে চলে গিয়ে রোজগারহীন হয়ে পড়েন।তখন তার জীবনের দায়িত্বভার চলে যায়,পরিবারের যে মানুষগুলোকে সক্ষম করে তোলার জন্য বিরামহীন পরিশ্রম করে গেছেন সেই উপার্জনক্ষম সন্তান বা অন্যদের হাতে। 

আমাদের রাষ্ট্র নামক যে যন্ত্রটি রয়েছে, সেটি মূলত একটি নির্দিষ্ট সীমা রেখার একটি স্বীকৃত মানচিত্র।জনগণের জন্য রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটির যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা মূলত সংবিধানের লিপিবদ্ধ কালীর হরফ মাত্র। 

মাথার উপর আচ্ছাদনহীন  রাস্তার ধারে যেসব  ক্ষুধার্ত শীর্ণ দেহের কঙ্কালসার মানুষ পড়ে থাকে। ওই মানুষগুলোকে নিয়ে মূলত রাষ্ট্রের কোন চিন্তা বা পরিকল্পনা নেই।তাদের  জীবন চলে সমাজের মানবিক মানুষদের দয়া বা দানের উপর ভিত্তি করে, বরং রাষ্ট্রের কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তির পাঁজেরো গাড়ীর  চাকা যদি দুর্ঘটনাক্রমে ওই সব  রাস্তার অসহায় মানুষগুলোর বুকের পাঁজর মাড়িয়ে চলে যায় এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের কোন জবাবদিহিতা নেই। 

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইন আদালত প্রকৃত পক্ষে সর্ব স্তরের মানুষের জন্য নয়। সাধারণ মানুষকে তাদের প্রয়োজনে অর্থের বিনিময়ে সেবা কিনতে হয়। সমাজের প্রভাবশালী ও উচ্চবিত্তদের রক্ষার জন্যই মূলত এই সব  প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়।  

দেশে সার্টিফিকেট ভিত্তিক বৈষম্য মূলক  শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, কিন্তু কেন রাষ্ট্র সার্টিফিকেট দিচ্ছে এবং সার্টিফিকেটধারী মানুষগুলোকে কি কাজে রাষ্ট্র ব্যবহার করবে তা নিয়েও সরকারের নেই কোন উদ্বেগ, কোন বৃহৎ পরিকল্পনা। বরং অর্থ ও জীবনের মূল্যবান পঁচিশ ছাব্বিশ বছর ব্যয় করার পর মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে দেশের দায়িত্বশীলদের দ্বারে ধর্না দিতে হয় শুধু খেয়ে পড়ে একটু সম্মান বেঁচে থাকার অবলম্বন একটি চাকুরীর আশায়। চাকুরীর জন্য ঘুষের টাকা দিয়ে চাকুরী না পাওয়ায়, টাকা ফেরত চেয়ে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। 


চিকিৎসার মতো অতি মানবিক ক্ষেত্রটিও এখন হাট বাজারে পরিণত। অর্থ থাকলে সেবা কেনা যায়, না থাকলে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে ভিক্ষা করতে হয়।এ নিয়ে রাষ্ট্রের না আছে মাথা ব্যথা না আছে না আছে মানুষের জন্য নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা। 


এখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে  জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। রাষ্ট্র এবং জনগণ দুটি বিচ্ছিন্ন অংশ। রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা প্রভু ও দাসত্বের।ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা যায় তারা জনগণের স্বার্থের চিন্তা না করে ক্ষমতাকালীন সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটে কে কত বড় বিত্তশালী হতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত সময় পার করে। অর্থ বিত্ত ও রাষ্ট্রীয় যাবতীয় সেবা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ যেহেতু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহলের নিয়ন্ত্রণে,সেহেতু বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কিছু পেতে হলে ওদের দাসত্বও করা ছাড়া এই সমাজের সাধারণ মানুষের অন্য কোন উপায় থাকে না।   

এমন রাষ্ট্র  কাঠামো সাধারণ মানুষদের জন্য স্বস্তি নয় বরং একটা শোষণ ও নিষ্পেষণ যন্ত্র। 


বাংলাদেশের একটি পরিবারের পাঁচ ছয় জন সদস্য যেমন এক জন কর্তা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে জীবনের প্রশান্তি অনুভব করেন। তেমনি ফরাসি দেশের প্রতিটি মানুষ রাষ্ট্রকে কর্তা ভেবে শির উঁচু করে নিশ্চিন্ত মনে জীবনের স্বাদ গ্রহণ করেন।কোন মানুষকে তার মৌলিক চাহিদার জন্য বিশেষ কোন মানুষের নিকট পদানত হয়ে করুণা ভিক্ষা করতে হয় না।কারণ ফরাসি রাষ্ট্র ব্যবস্থায়  প্রতিটি জনগনই রাষ্ট্রের সন্তান এবং রাষ্ট্র সরাসরি প্রতিটি জনগণের জন্য পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ।পিতা যেমন সন্তানকে বুকে আগলে রেখে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য চিন্তিত থাকেন এবং পরিশ্রম করেন,জনগণের জন্য ফরাসি রাষ্ট্রের ভূমিকাও তেমন।এখানে মানুষ পরিবারভুক্ত হয়ে বাস করলেও, প্রতিটি মানুষ মূলত রাষ্ট্র নামক বৃহৎ পরিবারের সদস্য এবং তার সুরক্ষিত জীবন নিশ্চিতের চিন্তা রাষ্ট্রের মাথার উপর।এখানে কোন মানুষ ক্ষুদ্র পরিবারের বোঝা বা চিন্তার বিষয় নয়।একজন মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।এই কাজটি রাষ্ট্র মূলত জনগণের উপার্জিত অর্থের একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে সমন্বয় করে থাকেন।এখানে যে মানুষটি উপার্জন করেন তার আয়ের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কর হিসেবে রাষ্ট্র কেটে রাখেন। সেই কেটে রাখা অংশ দিয়ে রাষ্ট্রের যে মানুষটি এখনো কর্মক্ষম বা উপার্জনক্ষম হয়ে ওঠেনি তাকে কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তার শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় করেন,সামগ্রিক মানুষের স্বাস্থ্য সেবা,স্বল্প আয়ের মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা, যে মানুষ পঙ্গু বা কাজ করে উপার্জন করতে অক্ষম তার জীবনের নিরাপত্তার বিধান,মানুষের চিত্ত বিনোদনের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড,অবকাঠামো উন্নয়ন,রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনা, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ হতে জাতিকে নিরাপদ রাখার জন্য সামরিক এবং আধাসামরিক বাহিনীর পরিচালনা ইত্যাদি খাতে ব্যয় করে থাকেন।

একজন মানুষ অসুস্থ হলে তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্র নিশ্চিত করেন।এজন্য তাকে বিত্তবান বা প্রভাবশালী মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নেই, নেই কোন সমাজের বিশেষ পদ পদবীর মানুষ হবার।শুধু এই সীমানাভুক্ত একজন মানুষ হলেই হল।হোক তিনি এই সীমানার বৈধ কিংবা অবৈধ নাগরিক।হঠাৎ কেউ চাকুরীচ্যুত হলে,এই দুর্যোগকালীন সময়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রতি মাসে তার পূর্বের বেতনের পঁচাত্তর শতাংশ ভাতা প্রদান অব্যাহত রেখে নতুন একটি চাকুরীর সন্ধানে জোর প্রচেষ্টা চালায় রাষ্ট্র। যাতে হঠাৎ করে একজন মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত হতে না হয়।যে মানুষটির কর্ম মিলছেনা, অর্থাৎ বেকার রয়েছেন। আমাদের দেশে পরিবারের বেকার ছেলেটির চলার জন্য পিতা বা উপার্জনক্ষম বড় ভাই যেমন তার পকেটে নীরবে টাকা ঢুকিয়ে দেয়। ফরাসি দেশে প্রতিটি বেকারের জন্য এই কাজটি করে থাকেন সরাসরি রাষ্ট্র।এই বেকার ছেলেটি যখন কর্মে প্রবেশ করে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করে, তখন আবার তার আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর হিসেবে কেটে রেখে রাষ্ট্র তার  উল্লেখিত দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যয় করে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখেন এবং যাদের আয়ের উপর ভিত্তি করে একজন মানুষের কর্মক্ষম হওয়ার এতোটা পথ পাড়ি দিতে হয় সেইসব অবসর গ্রহণকারী সম্মানিত প্রবীণ মানুষদের নিশ্চিন্ত জীবন উপহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।এখানে যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ডও আবর্তিত হয় জনগণের জন্য উল্লেখিত সুযোগ সুবিধা সমুন্নত রাখা এবং সেগুলোকে আরও বৃদ্ধি করাকে কেন্দ্র করে।   

ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন সম্মিলিত ভাবে রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক হাতকে  শক্তিশালী করার জন্য প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করেন, এবং প্রত্যেকেই তার জন্য নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ও অধিকার রাষ্ট্রের কাছ থেকে বুঝে নেন।এখানে কোন ব্যক্তি বিশেষের জনগণের উপর মহিরুহু রূপে আবর্তিত হওয়ার সুযোগ নেই।জনগণের কল্যাণে জনগণ কর্তৃক প্রবর্তিত আইন ও সংবিধানই হচ্ছে জনগণের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার শক্তি।

এছাড়া, তাদের দেশ পরিচালনা ও রাষ্ট্রের কাছে গচ্ছিত সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ফরাসি জনগণ বেছে নেন  সময়ের সেরা, সৎ,সুশিক্ষিত,চৌকস কোন রাজনৈতিক নেতা ও দলকে।দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতা ও রাজনৈতিক দল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ কালীন সময় এই মহান দায়িত্ব পালনের চ্যাঁলেঞ্জ অতি সতর্কতার সহিত পার করেন স্বচ্ছ জবাবদিহিতার মধ্যদিয়ে।  


 রাষ্ট্র যদি তার প্রতিটি জগণকে বৃহত্তর পরিবারের অংশ ভেবে তাদের শ্রমের উপার্জন সঠিক ভাবে সংরক্ষণ,   সমবণ্টন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে ব্যয় করেন তাহলে ফরাসি দেশের মতো আমার মাতৃভূমিও হয়ে উঠতে পারে একটি পরিবার রাষ্ট্র ।তাই বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণের স্লোগান হওয়া উচিত,

 রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থ দেব, আমার অধিকার বুঝে নেবো, অথবা আমার টাকায় রাষ্ট্র চলছে, আমার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে।।


ছবি ইন্টারনেট থেকে নেয়া ।



শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৯

মানুষ মূল্যায়ন

পেশা,শিক্ষা,সম্পদের স্তর বিন্যাস করে মানুষকে মূল্যায়ন করেন যিনি ,
অসুন্দর ,অসম্পন্ন মানুষ তিনি ।
সদাচারণ,সততা, ন্যায়-পরায়ণ গুন বিচারে মানুষকে মূল্যায়ন করেন তিনি ,
প্রকৃত প্রাজ্ঞজন যিনি ।

মঙ্গলবার, ১ অক্টোবর, ২০১৯

আরাগঁ এলসা'র সাহিত্য সৃষ্টির নীড়ে একদিন


"আরাগঁ এলসা'র বাসগৃহ"

সাহিত্য সংগঠন অক্ষর  প্রতি বছর গ্রীষ্মের সময়কালে  আয়োজন করে সাহিত্য আড্ডা।  প্যারিসের সাহিত্যপ্রেমী বন্ধুদের নিয়ে কোন ছায়াঢাকা সবুজ পার্কের পড়ন্ত বেলায়  চলে কবিতা পাঠের আসর আড্ডা ।গ্রীষ্মের উষ্ণতা প্রায় শেষের পথে,  তাই সাহিত্য অনুরাগী হাসনাত জাহানের উদ্যোগে ২৯ অগাস্ট অক্ষরের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে প্যারিসের অদূরে Moulin de Villeneuve -তে অবস্থিত প্রয়াত ফরাসি লেখক দম্পতি লুই আরাগঁ ও এলসা ট্রায়োলেটের গৃহে আয়োজন করা হয় কবিতা পাঠের আসর।


 কবি আরাগঁ'র নাম শুনেছি কিন্তু তার জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে আমার তেমন জানা ছিলোনা, তাই কবির সমাধির পাশে দাঁড়ানোর পূর্বে কবির জীবন ও সৃষ্টিকর্ম জানার তাগিদ অনুভব করে কয়েকদিন ইন্টারনেটকে মাধ্যম করে  আরাগঁকে খোঁজাখুঁজি করে পেয়ে গেলাম কিছু আরাগোঁ সাহিত্যের অনুবাদ এবং তার বৈচিত্র্যময় জীবন বৃত্তান্ত।আরাগঁকে জানার পর আরও দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম কবির বাসগৃহ পরিদর্শনের নির্ধারিত দিনটির জন্য।


দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ২৯ আগস্ট প্যারিসের মনপাননাস Montparnasse থেকে ট্রেনে একঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা মিলিত হলাম রম্বুলে Rambouillet রেল ষ্টেশনে। Transdev Express 10 বাসে উঠে আমরা রওনা হলাম Moulin de Villeneuve তে অবস্থিত আরাগঁ এলসার আবাস গৃহের দিকে।বাস কিছুক্ষণের মধ্যে প্রবেশ করল বিস্তীর্ণ ফসলী মাঠের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ফরাসি গ্রামীণ পিচঢালা পথে।উঁচুনিচু পথের পাশে কোথাও ঘন জঙ্গল আবার একটু পথ পেরুলেই তৃণভূমিতে সাদা ধেনু ও ভেড়ার পালের বিচরণের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম Chaudières বাস স্টেশনে।ছায়াঢাকা গ্রামীণ পরিবেশ, জনমানবের কোলাহল মুক্ত, পাখ-পাখালীর কিচির মিচির আওয়াজ ভেসে আসে কানে।এমনই এক  নৈসর্গিক প্রকৃতির মধ্যে আরাগঁ এলসা'র সাহিত্য সৃষ্টির নীড়।


"আরাগঁ এলসা বাসগৃহের উঠানের একাংশ" 
"আরাগঁ এলসা বাসগৃহের উঠানের একাংশ"














"পুরুষের ভবিষ্যত হচ্ছে নারী"  জনপ্রিয় এই বিখ্যাত উক্তিটি  করেছিলেন ফরাসি সাহিত্যিক  লুই আরাগঁ।আরাগঁ মূলত তার পারিবারিক নাম নয়, ছদ্ম নাম।প্রকৃত নাম  গ্রাদেল। ফরক্যালকুয়ার সংঘের সিনেটর লুই অ্যান্ড্রুক্স তার পিতা হলেও কখনো পিতৃ স্বীকৃতি তার কপালে জোটেনি।এ নিয়ে কোন অস্থিরতাও ছিলোনা আরাগোঁর মধ্যে।বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী বিশিষ্ট এই রোমান্টিক কবি, ঔপন্যাসিক,প্রবন্ধকার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিকের জন্ম ১৮৯৭ সালের ৩ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিস শহরে।ছেলেবেলা কেটেছে মা ও নানীর লালন পালনে। অসম্ভব মেধাবী, জেদি,আত্মবিশ্বাসী আরাগোঁর শৈশব কাটে অনেকটাই কঠোর অধ্যবসায়ের মধ্য  দিয়ে। ছাত্র অবস্থাতেই প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় সহকারী চিকিৎসক হিসেবে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতি সম্মানও পান।


মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি বিভিন্ন সাহিত্য আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সারা পৃথিবীতে যখন  মন্দা অবস্থা, সমস্ত ইউরোপ জুড়ে অস্থিরতা তখন রাশিয়ার শ্রমিকরা বিপ্লবের ভেতর দিয়ে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সমাজতন্ত্র।এই যুগসন্ধি কালে সচেতন কবি সাহিত্যিকেরা পুরনো ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক বিস্ময়ের অনুসন্ধানে নিমগ্ন হন। এই অনুসন্ধান ছিল গভীরতম সত্যকে উপলব্ধির। এই সত্য উপলব্ধির অনুপ্রেরণায়  তরুণ ফরাসি সাহিত্যিক আরাগঁ অতিক্রম করেছেন দাদাইজম, কিউবিজম, সুররিয়ালিজম, সিমবলিজম, রিয়ালিজম মতো সাহিত্য আন্দোলনের মতো নানা স্তর।

আজন্ম বিদ্রোহী আরাগঁকে মার্কসবাদী লেলিনের রুশ বিপ্লব  সাম্যবাদের দিকে অনুরক্ত করে। ফলে ১৯২৭ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন।


সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় বিচরণ করা আরাগঁ ছয় সাত বছর বয়সে গল্প লেখার মধ্যদিয়ে লেখালেখির হাতে খড়ি হয়। অপরিপক্ব বয়সের লেখা হলেও লেখাগুলোর মধ্যে ছিল পরিপক্বতার ছাপ।তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন দশ বছর বয়স থেকে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ » ফো দ্যা বোয়া «  প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। প্রথম উপন্যাস «  আনিসে ঊ ল পানোরামা » প্রকাশকাল ১৯২১।তার লেখা  উল্লেখযোগ্য  নাটক «  এক রমণীয় সন্ধ্যায় মুকুর বসানো আলমারি।


সাম্যবাদী আরাগঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনটি হচ্ছে লা কুপেলে রেস্তোরায় ১৯২৮ সালের ৫ নভেম্বর তারিখে এলসার সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষণটি।বিখ্যাত রুশ বিপ্লবী কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি  প্যারিসে আসেন আরাগঁর সাথে পরিচয় হতে। তখন মায়াকোভস্কি তার শালিকা এবং বান্ধবী এলসার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।এলসা ছিলেন মাক্সিম গোর্কি'র  স্নেহধন্য রুশ লেখিকা। বয়সে আরাগঁর বছর খানেকের বড়।১৯২৩ সালে  এলসার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, এর পূর্বে  আরাগঁর তার প্রণয় সঙ্গী নানসি কানার্ডের সঙ্গেও সম্পর্কের ছেদ ঘটে।ফলে প্রথম সাক্ষাতেই  একে অপরের প্রতি এক ভালোলাগা এবং ভালোবাসার দৃষ্টি বিনিময় হয়। পরবর্তীতে তাদের প্রণয় এবং পরিণয় ঘটে।এর পর থেকে এলসা আরাগঁর জীবনে সুখে দুঃখে,আনন্দ বেদনায়, সংগ্রামে, আবেগ, অনুরাগে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে ছিলেন। আরাগঁ আবেগ,ভালোবাসার উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশে বলতো, এলসা পাশে থাকা মানে কোন যুদ্ধাভিযানের অর্ধেক আগেই জয় করা। এলসা রুশ লেখিকা হলেও আরাগঁর সাথে ফ্রান্সে স্থিতি হবার পর পরবর্তীতে ফরাসি সাহিত্যেও নিজেকে একজন অগ্রণী লেখিকা হিসেবে আত্ম প্রতিষ্ঠা করেন।


১৯৩০ সালে রাশিয়ার মস্কোতে অনুষ্ঠিত হয় বিপ্লবী লেখক সম্মেলন। সেই সম্মেলনে চির বিদ্রোহী আরাগঁ আমন্ত্রিত হয়ে প্রিয়তমা এলসা এবং বন্ধু ঝর্ঝ সাদুলকে সঙ্গী করে যোগ দেন। রাশিয়া দর্শন করে ফিরে এসে আরাগোঁ লেখেন “ লাল সীমান্ত নামের একটি কবিতা”যেটি ১৯৩১ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত পেরসেক্যুতে পেরসক্যতর কাব্যগ্রন্থে স্থান পায় । সংকলনটি প্রকাশ হওয়ার পর ১৯৩২ সালে জানুয়ারি মাসে  রাষ্ট্রীয় গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ফরাসি সরকার গ্রেপ্তার করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করেন।কিন্তু পৃথিবীর বড় বড় লেখক, রাজনৈতিক মনীষীদের প্রতিবাদ ও চাপ প্রয়োগের কারণে সরকার সেই দণ্ডাদেশ তুলে নিতে বাধ্য হন।


 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরাগঁ লেখা সাহিত্য কর্মকে বলা হয় আরাগঁ সাহিত্যের তৃতীয় স্তর। ইউরোপের  ছোট ছোট সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো যখন নিজেদের দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত তখন পৃথিবীর বড় দেশগুলো পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় বিশ্বকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রেখেছে । আরাগঁ মনে করেন দেশ স্বাধীন হলেও  প্রকৃত শান্তির পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা এখনো ফিরে আসেনি। এজন্য এই যোদ্ধা কবিকে বিশ্ব শান্তির জন্য অক্লান্ত কাজ করতে হয়েছে। অন্যদিকে স্নায়ুযুদ্ধের  অস্থিরতা, নৈরাশ্য, হতাশা, বেদনা, অতীতের স্মৃতি আরাগোঁর  হৃদয় পটে গভীর ভাবে রেখাপাত করে।এরই প্রেক্ষাপটে আরাগঁ সৃষ্টির উত্তরণ। এ পর্যায়ে লুই আরাগোঁ সাহিত্যের বিকাশ ঘটে বিস্ময়কর ধরণের বিষয় বৈচিত্র্যে।


১৯৫৪ সালে লুই আরাগঁ  ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য নির্বাচিত হন এবং একই বছরে লেলিন শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত হন।এ পর্যায়ে রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সৃষ্টি করেন অসংখ্য সাহিত্যকর্ম।এসময়ের লেখা কাব্যগ্রন্থের মধ্যে লেজিয়ো এ লা মেমোয়া,ল রমা ইনাশভে,এলসা,লে পোয়েৎ,পোয়েজী,লো ফু দেলসা, লো ভয়েজ এন হুলাদ,লে শবির, এলেকি আ পাবলো নেরুদা এবং  উপন্যাসের মধ্যে লা সোমেন সাৎ, লা মীজ আ মর, ব্লাশ উ লুবলি,লিসতোরার পারালেল  বিশেষ ভাবে  উল্লেখযোগ্য।


 ১৯৭০ সালে এলসা ট্রিওলের আকস্মিক মৃত্যু এই সংগ্রামী কবিকে শোকে বিহ্বল করে দেয়। তার রক্তধারায় এই নারীর অস্তিত্ব এতোটাই বহমান ছিল যে এলসা'র বিদায় বেদনার শোক কাটিয়ে নিঃসঙ্গ আরাগোঁ আর কখনোই ছন্দময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি।এলসা প্রতি আরাগঁ র ভালোবাসার নিদর্শন মেলে আরাগোঁর সাহিত্যে এলসার বিজয়গাথা বন্দনার মধ্যদিয়ে। এলসার প্রস্থানের পর  আরাগঁ’র  কলমে সৃষ্টি হয়নি তেমন কোন সৃষ্টিশীল সাহিত্য কর্ম । ১৯৭৫ সালে ফরাসি কবি সাঁ-কন পেরসে’র নোবেল বিজয়ের পর তাকে নিয়ে লেখা একটি ছোট্ট প্রবন্ধই সম্ভবতই আরাগঁ’র  জীবনের শেষ লেখা। এলসার মৃত্যুর পর অনেকটাই  ভভঘুরে জীবন নিয়ে বেঁচে ছিলেন বিশ্বের এই শ্রেষ্ঠ বিদগ্ধ কবি ও সাহিত্যিক।১৯৮২ সালের ২৮ ডিসেম্বর এই পৃথিবীতে তার সৃষ্টি ও কর্মময় জীবন রেখে দেহ ত্যাগের মাধ্যমে প্রাণবায়ু নিয়ে অদৃশ্য শূন্যের দিকে যাত্রা শুরু করেন।


"আরাগঁ এলসার আঙ্গিনায় ফোটা ফুল "
আরাগঁ সম্পর্কে পড়ে মনে হয়েছিলো তিনি যতটা প্রেমিক কবি তার চাইতে দ্বিগুণ দৃঢ় প্রতিবাদী এবং জীবন যাপনে অগোছালো প্রকৃতির মানুষ ছিলেন।কিন্তু ২৯ আগস্ট কবি দ্বয়ের বাড়ীর প্রবেশ দ্বারে পৌঁছুনোর পর থেকেই আমার ধারণা পরিবর্তন হতে শুরু হল। মনে হল আরাগঁ যতটা প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন ঠিক তটটাই শৌখিন,শিল্প অনুরাগী,প্রকৃতি প্রেমিক, নারীর ভালোবাসার কাঙাল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি।

পুরনো বাড়ীর লোহার গেটে টাঙানো একটি পোস্টারে লেখা এলসা ট্রিওলে  আরাগঁ’র বাড়িতে আপনাকে স্বাগতম।চারিদিকে প্রাচীরে ঘেরা গাছ পালা বেষ্টিত সবুজের মাঝে অবস্থিত বাসগৃহটি এখন এলসা  আরাগঁ স্মৃতি সংগ্রহশালা যাদুঘর।আমরা  বাড়ীটিতে  প্রবেশ করেই স্মৃতি যাদুঘর পরিদর্শনের জন্য প্রত্যেকে  ১০ ইউরো মূল্যে টিকেট সংগ্রহ করলাম, শুধু ছড়াকার লোকমান আপন ভাই সাংবাদিক পরিচয়ে শুভেচ্ছা মূল্যে টিকেট পেলো। বিকেল চারটায় একজন গাইডের নেতৃত্বে আমাদের স্মৃতি যাদুঘর পরিদর্শন। আমাদের হাতে একঘণ্টা সময় তাই দুপুরের মধ্যাহ্ন ভোজের পর্ব সেরে নিলাম দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য  টেবিল বেঞ্চ সম্বলিত আমাদের দেশের কাচারি ঘর প্রকৃতির একটি  ছাউনি ঘরে।বাচিক শিল্পী সাইফুল ইসলামের রন্ধন শৈলীর স্বাদ আস্বাদনে ক্ষুধা নিবারণের পর আমরা কবি দম্পতির বাগান বাড়ীটি ঘুরে দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম।বাড়ীর উঠোনের সামনে সুতোর মতো ছোট্ট ক্যানালে ছোট ছোট মাছের সাঁতার কাটার দৃশ্য পল্লী গ্রামের কোন খাল বা বিলের পাড়ে দাঁড়ানোর শিহরণ এনে দিলো।ক্যানালের উপর কাঠের পাটাতনের ব্রিজ পার হয়ে একটু হাঁটলেই ঘন গাছপালা বেষ্টিত এক জংলা প্রকৃতির উঁচুভূমি।এরমধ্যে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম থেকে ভেসে আসছে বেহালা ও বাঁশীর  সংমিশ্রিত মৃদু সুর।বড় বড় বৃক্ষের নিচে লতা গুল্ম ঢাকা জংলার পাশে একটি শান বাধা কবর।এই একটি কবরের মধ্যে দুই প্রেমিক প্রেমিকার ( আরাগঁ এলসার)   সমাহিত দেহ।  চারিদিকে শুনশান নীরবতা। সাজানো বিশাল বাগান বাড়ীর চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই লেখক যুগলের স্মৃতি চিহ্ন ও রুচির বহিঃপ্রকাশ।চারপাশ ভালোভাবে একটু পর্যবেক্ষণ করলে মনে হবে এ যেন আরাগঁ এলসা স্বর্গোদ্যান।আমি অবাক হচ্ছিলাম, শুধু লেখার অনুভূতি জাগাবার জন্য একজন কবি এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।চারপাশের পরিবেশ থেকেই থেকেই অনুমান করা যায় আরাগঁ এলসা’র  মনের সৌন্দর্যের গভীরতা।  

বিকেল চারটায় এখানকার যাদুঘর কর্তৃপক্ষের একজন আমাদেরকে  আরাগঁ এলসার বাসগৃহটি পরিদর্শনের জন্য পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিলেন।আমাদের চৌদ্দ সদস্যের দলের সঙ্গে একজন তরুণ গাইড যুক্ত হলেন যিনি লেখক যুগলের বাসগৃহের স্মৃতি সংগ্রহশালাটি ঘুরে দেখাবেন।রান্না ঘর থেকে শুরু করে দ্বিতল বাড়ীটির প্রতিটি কামরায় স্মৃতি আর শিল্পের সমারোহ।আমাদের গাইড তরুণটি যখন প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুভেনির হাতে নিয়ে এগুলোর আদি বৃত্তান্ত ব্যাখ্যা করছিল তখন আরাগঁ এলসার উপস্থিতি মনের পটে ছবির মত ভেসে উঠছিল।ঘরের দেয়ালের তাকে  সাজানো ৩০ হাজার বইয়ের সারির  মাঝে ব্যবহার্য নানা আসবাস পত্র সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো গোছানো।প্রতিটি স্মৃতি চিহ্নের সাথে এক একটি গল্প জড়িয়ে রয়েছে, সেই গল্পেরই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে আমাদের গাইড।দেয়ালে টাঙানো জগত বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পিকাসো’র শুভেচ্ছা স্বারক ছবি, খাবার টেবিল ও দেয়ালে ভিনসেন ভ্যানগগের হাতে সৃষ্টি  সিরামিক কর্ম, ভ্রমণ প্রিয় আরাগঁ’র বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত সুভেনীরের সমাহারে সমস্ত ঘর যেন এক শিল্পের সমাহারে পরিণত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন তার বাড়ীর পাশ দিয়ে ফরাসি সৈনিকদের দল যেতো তখন আরাগঁ তাদের তামাক বিতরণ করত,  সেই তামাকের ক্ষুদ্রাকৃতির কয়েকটি খণ্ডও সংগ্রহ রয়েছে এই স্মৃতি সংগ্রহশালায় ।মানুষের চিন্তার প্রকাশ হচ্ছে লেখা।সেই চিন্তার রস সৃষ্টি হয় পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি থেকে। আরাগঁ এলসার বাসগৃহ ও বাগান দেখে মনে হবে,  চেয়ার টেবিল থেকে শুরু করে শোবার ঘর কিংবা উঠানের প্রতিটি ঘাসকে শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করা হয়েছে চিন্তার রস বা আবেশ সৃষ্টির কথা চিন্তা করে।খাবার ঘরের পাশেই আরাগঁ’র লেখার ঘর।দেয়ালের চার পাশের তাকে  সুসজ্জিত বইয়ের বেষ্টনীর মাঝে আরাগঁ’র লেখার চেয়ার টেবিল, রুমটি  দেখতে কোন আইনজীবীর চেম্বার সদৃশ। লেখার টেবিলের সামনে কাঠের তৈরি প্রবেশ দরজা, দরজার মাঝে স্থাপিত স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে বাইরের প্রকৃতির দৃশ্য দেখা যায়, যা সত্যি মনোহর।অতিথিদের বৈঠকখানার ঘরটির মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম ঝর্না, এই  ঝর্নার জলের আঁচড়ে  পরার শব্দে  কিছু সময় প্রকৃতির সংস্পর্শের অনুভূতিতে বুদ হয়ে থাকা যায়।বাড়ীর দ্বিতলে ছিমছাম গোছানো এলসার লেখার ঘর, সামনের জানালা খোলা, বিকেলের মিষ্টি রোদের আলো ছিটকে পড়ছে ঘরের মধ্যে, জানালার ফাঁক দিয়ে বাগানের সুউচ্চ সেঞ্চুরি গাছের বাতাসে দুলে যাওয়ার দৃশ্য।মনে হচ্ছিলো আমরা চলে যাওয়ার পরই হয়তো এলসা এসে তার চেয়ারে বসে এই নির্জন প্রকৃতিকে সামনে রেখে লিখবে কোন রোমান্টিক কবিতার পংক্তিমালা।

"আরাগঁ এলসার সমাধির পাশে বাচিক শিল্পী সাইফুল ইসলাম এবং সংস্কৃতি অনুরাগী রাহুল চৌধুরী "
"আরাগোঁ বাড়ির কাঠের সেতুর উপর  দাঁড়িয়ে ভ্রমণ উদ্যোগতা  হাসনাত জাহান "

আরাগঁ এলসার খাবার ঘরে আমাদের দর্শনার্থী দল।
খাবার ঘরের দেয়ালে টাঙানো চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যান গগের হাতে করা একটি  সিরামিক শিল্প কর্ম ।
আরাগঁকে উপহার দেয়া চিত্রকর পিকাসোর একটি চিত্র কর্ম।
সুসজ্জিত বইয়ের বেষ্টনীর  মাঝে  আরাগঁ’র লেখার চেয়ার টেবিল ।
বৈঠকখানায় আমাদের দর্শনার্থী দল ।





" অতিথিদের বৈঠকখানার ঘরটির মধ্যে স্থাপিত কৃত্রিম ঝর্না"
"অতিথিদের বসার চেয়ার টেবিল "

"দেয়ালে টাঙানো চিত্রকর্ম "
"গাইডের বর্ণনায় গভীর মনোনিবেশে আমাদের  ভ্রমণ সঙ্গীদের একাংশ "













"আরাগঁ এলসার শয়ন কক্ষের দেয়ালে টাঙানো একটি সিরামিক শিল্পকর্ম "
"এলসার ড্রেসিং টেবিল"














"এলসার সংগৃহীত কিছু সুভেনীর"  


"আরাগঁ এলসার শয়ন কক্ষ"












 
"আমাদের গাইড "
"বাড়ীর দ্বিতলে ছিমছাম গোছানো এলসার লেখার ঘর"












"প্রদর্শনী হল রুম" 
"কবিতা অনুরাগী ও রেডিওর সোনালি দিনের অনুষ্ঠান ঘোষক মুনির কাদিরের সঞ্চালনায় আমাদের কবিতা পাঠের আসর"

"বিদায় বেলায়  কাচারি ঘরে আমার ক্যামেরায় আলোকচিত্রী  শাখাওয়াত হোসেন হাওলাদার














"ফেরার বেলায় আরাগঁ এলসার আঙ্গিনায় আমদের কয়েক জন "

" আরাগঁ এলসার বাসগৃহের প্রবেশ দ্বারের সামনে সংস্কৃতি অনুরাগী রাহুল চৌধুরী"
"ফেরার বেলায় আরাগঁ এলসার আঙ্গিনায় আমরা সবাই 

আরাগঁ এলসার বাসগৃহ পরিদর্শন কালে স্মরণ হয়েছে  আমাদের রবীন্দ্র নজরুলের কথা । আরাগঁ'র মধ্যে খুঁজে পেয়েছি রবীন্দ্র নজরুলের সমন্বিত এক সত্তার সন্ধান । আরাগঁ লেখায় ও কর্মে আমাদের বিদ্রোহী নজরুলের স্বভাবের হলেও রুচি ও জীবনাচারণ মনে হয়েছে  রবীন্দ্রনাথের মতো।

 নিয়ম অনুযায়ী বিকেল ছয়টায় বন্ধ হবে আরাগঁ এলসার স্মৃতি বাসগৃহের দরজা, তাই একটু তাড়াহুড়া করেই প্রশস্থ আঙিনার ছায়া শীতল ছোট্ট লেকের ধারের কোণ ঘেঁসে বসলো কবিতা অনুরাগী ও রেডিওর সোনালি দিনের অনুষ্ঠান ঘোষক মুনির কাদিরের সঞ্চালনায় আমাদের কবিতা পাঠের আসর।আরাগঁ এলসার সম্মানে আগত কবি ও আবৃত্তিকাররা পড়লো তাদের  পছন্দের কবিতা।

 আরাগঁ’র লেখা  ।। গোলাপকে পুনর্ব্যাখ্যা করবো তোমার জন্য ।।কবিতাটি আমার কণ্ঠে পাঠের মধ্যে দিয়ে শেষ হল এক স্মৃতিময় বিকেল ও একটি সোনালী  সুন্দর দিনের।



গোলাপকে পুনর্ব্যাখ্যা করবো তোমার জন্য

কেননা, তুমিই সেই বর্ণনাতীত গোলাপ

যথাশব্দের ব্যাকরণসম্মত বিন্যাসেও ফোটে না যার স্বরূপ

তুমি সেই গোলাপ, গোলাপ-বহির্ভূত শব্দাবলীই যার বর্ণনার ভাষা

ভাবাবিষ্ট ক্রন্দন আর ভয়ানক বিষন্নতা দিয়েই কেবল অনুবাদ সম্ভব যার

প্রণয়ের অতলগহ্বরের ওপরেও ফুটে থাকে আননন্দিত যে তারকাপুঞ্জ

সেখানে ব'সে পুনরার্থ করবো প্রণয়িনীর আঙুলে ধরা টাটকা গোলাপের

যেগুলোকে তাদের মুঠোয় জড়ানোর মুহূর্তে চক্রনাভী হয়ে ওঠে কিন্তু সহসাই ঝরে যায় পাঁপড়িগুলো

তোমার জন্য গোলাপের নতুন ব্যাখ্যা দেবো আমি

গোলাপ হলো ব্যালকনির ছায়ায় আশ্রিত ওইসব প্রেমিক-প্রেমিকা

পরস্পরের বাহুবন্ধন ছাড়া যাদের নেই কোনও প্রণয়-শয্যাও


স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেবারও সুযোগবঞ্চিত পাথুরে ভাস্কর্য হয়ে যাওয়া

ওইসব মানুষের হৃদয়__  গোলাপ

সেই কৃষক, যে তার নিজের শস্যক্ষেতেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে স্থলমাইনের আঘাতে__

সেই-ই তো গোলাপ

গোলাপ হলো কুড়িয়ে পাওয়া লাল টকটকে রক্তের ঘ্রাণময় সেই চিঠি

যার সম্ভাষণে আমার জন্য না আছে ঘৃণা না কোনও সম্মান


কিছু কিছু জমায়েতস্থল যেখানে আর কেউ আসে না


খুব ঝড়ো একটা দিনে একযোগে উড়ে যাওয়া গোটা একটা সৈনিক-দল

কারাগারের ফটকে মায়ের পদশব্দ

অলস দুপুরে জলপাইতলায় নিঃসঙ্গ মানুষের গান

কুয়াশার কাফনে মোড়া গ্রামদেশে মোরগের লড়াই

একজন যোদ্ধাকে তার মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া

এইসব প্রতিটি বোধ ও যন্ত্রণাই তো একেকটি গোলাপ!


ও আমার গোলাপ, তোমার জন্য গোলাপকে পুনরাবিস্কার করবো আমি

এবং আরও আরও গোলাপের জন্য


যেহেতু সবগুলি সমুদ্রের জলে তলিয়ে আছে অগণন হীরক

যেহেতু দুনিয়াব্যাপী বায়ুমণ্ডলের ধুলায় ভাসছে অনেকগুলি বিগত শতাব্দী

যেহেতু মাত্র একটাই খেয়ালি-শিশুর মাথাভর্তি আছে স্বপ্নসমূহ


যেহেতু এ-সবকিছুরই প্রতিবিম্বায়ন সম্ভব এক অশ্রুফলকে।


(আরাগোঁ’র জীবন ও সাহিত্যকর্মের তথ্য অনুসন্ধান করতে অসিত সরকারের লেখা প্রবন্ধ এবং উইকিপিডিয়ার সাহায্য নেয়া হয়েছে)