শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২০

প্রসঙ্গ বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনা।

ধর্ষণ বাংলাদেশের একটি দীর্ঘদিনের সংক্রমিত সামাজিক সমস্যা । বিভিন্নজন এটিকে বিশেষ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। কিন্তু এটি ঘুস, দুর্নীতি,লুণ্ঠন, চুরি, অপহরণ, হত্যা,কালোবাজারি মত অনন্যা অপরাধের মতই একটি সামাজিক অপরাধ।যা রাষ্ট্রের বল্গাহীন অনিয়ম অব্যবস্থার কারণে অন্যান্য অপরাধ যেভাবে সংগঠিত হয় এটিও তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। 


আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় নীরবে  নিভৃতে প্রতিদিন কেউনা কেউ ধর্ষিত হয়। কিন্তু কারও ঘটনা যখন প্রকাশ্যে চলে আসে তখন আমরা প্রতিবাদমুখর হই।রাজপথে ধর্ষণ বিরোধী প্রতিবাদী শ্লোগান দেই, ফেচবুকে নিজের মত করে প্রতিবাদ জানাই। বিভিন্ন চিন্তাধারার মানুষ বিভিন্ন  দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষণের কারণ, প্রতিরোধ নিয়ে মতামত দেই।এই মতামতগুলো মূলত একান্তই প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব জীবন যাপন ও বিশ্বাস নির্ভর।গবেষণা নির্ভর ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।আমাদের সমাজে  ধর্ষণের জন্য কেউ কেউ নারীর পোশাককে দায়ী করে থাকি, কখনো নারীর আধুনিক জীবন যাপনকে দায়ী করি, নারী স্বাধীনতাকে দায়ী করি, ধর্মীয় বিধিবিধান বহির্ভূত জীবন যাপনকেও সমাজের বড় অংশ অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।অনেক সময় একটি ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসলে অনেক সময় ধর্ষকের অপরাধকে গৌণ মনে করে  উল্লেখিত কারণ সামনে এনে ধর্ষিত নারীর দিকেই আঙ্গুল তোলা হয়।দেশের নারীবাদীদের বড় অংশ পুরুষকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে সরাসরি পুরুষের বিকৃত যৌনাকাঙ্ক্ষা বা মনোবৃত্তিকে ধর্ষণের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করে থাকে।কোন এক সময় আমি নিজেও ধর্ষণের কারণ হিসেবে অন্যান্যদের মত করেই ভাবতাম। কিন্তু এখন ধর্ষণের উল্লেখিত কারণগুলোর একটিকেও মুখ্য কারণ হিসেবে মনে করি না।    

নারী পুরুষের শত্রু নয়, পুরুষ নারীর শত্রু নয়।নারী ধর্ষিত হলেই পুরুষকে নারীর শত্রু ভাবা একটি উন্মাদ চিন্তা । নারী পুরুষ মিলেই সমাজ রাষ্ট্র এবং পৃথিবী। দিন শেষে পুরুষ নারীর কাঁধে মাথা রেখে জীবনের প্রশান্তি খোঁজে, নারীও একজন পুরুষের মাঝে খোঁজে জীবনের সুখ।ধর্ষণ মূলত একটি অপরাধ। সেটিকে শুধু অপরাধ ভাবাই উত্তম। সেই অপরাধ নির্মূলের জন্য ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য নারী পুরুষের হাতে হাত রেখে প্রতিবাদ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা অপরিহার্য।   


ধর্ষণ হচ্ছে সবল কর্তৃক দুর্বলের উপর নির্মম বর্বরতা,একজন মানুষের নিজের মত বেঁছে থাকার স্বাধীনতার উপর আগ্রাসন।আমাদের সমাজে এমন বর্বরতা সর্বনিম্ন স্তরের মানসিকতা সম্পন্ন শারীরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে সবল মানুষদের দ্বারা সংগঠিত হয়ে থাকে।এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টিতে গর্হিত অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ক প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। একজোড়া নারী পুরুষ সামাজিক,রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে একে ওপরের সম্মতিক্রমে ও ইচ্ছের পোষণ করে যৌন সঙ্গমে মিলিত হওয়া মধ্যে সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। এই কর্মটি যখন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিয়ম উপেক্ষা করে কারো উপর বলপূর্বক ও জোরজবরদস্তি করে করা হয় তখনই এটি ধর্ষণ। ধর্ষণ শুধু নারীই হয়না,স্থান ভেদে পুরুষও হয়, কখনো স্বয়ং রাষ্ট্রও ধর্ষণের স্বীকার হয়।তবে যে রাষ্ট্র নিজেই ধর্ষণের স্বীকার সেই রাষ্ট্রের প্রতিটি নারী পুরুষ প্রতি মুহূর্তে ধর্ষণের ঝুঁকির মধ্যে থাকবে এবং ধর্ষণের স্বীকার হবে, এটা  অস্বাভাবিক নয়।একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি বিশৃঙ্খলার পেছনে একটি সূত্র থাকে সেই বিশৃঙ্খলার নাভিমূলে পৌছুতে না পারলে এবং সেই সূত্র অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, দুই একটি ঘটনার দেখানো বিচার করে এবং কঠোর আইন বানিয়ে এর স্থায়ী সমাধান আদৌ সম্ভব নয়। 

নিয়ম বহির্ভূত বলপূর্বক যৌনসঙ্গমকে যদি ধর্ষণ বলা যায় তাহলে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অসম্মান করে  বলপূর্বক রাষ্ট্র ক্ষমতা লুণ্ঠন করাকে রাষ্ট্র ধর্ষণ বললে খুব অসঙ্গত হবে বলে আমি মনে করি না। 


আমাদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরাই ধর্ষণসহ নানা ধরণের অত্যাচারের স্বীকার হয়।পুরুষ ধর্ষণের আনুপাতিক হার উল্লেখ করার মত নয় । আমাদের প্রথমেই জানা দরকার, আমাদের সমাজে নারীরা কেন ধর্ষণ ও অত্যাচারের স্বীকার হয় ? 

 আমাদের দেশের নারীদের পুরুষ নিয়ন্ত্রিত বা শাসিত সমাজের মধ্যে বসবাস।দেশের অধিকাংশ নারী পুরুষের মুখাপেক্ষী ও আর্থিক ভাবে পুরুষের উপর নির্ভরশীল। ফলে আমাদের দেশের নারীরা মানসিক ভাবে দুর্বল। তাকে বাঁচতে হলে অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে বাঁচতে হবে, এই মানসিকতা নিয়েই দেশের অধিকাংশ নারীকে ছোট থেকে বেড়ে উঠতে হয়।এমন সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেশের অধিকাংশ পুরুষের নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত নয়। তারা নারীকে দুর্বল মানুষ ভেবে থাকে।এর বড় কারণ নারীর প্রতিরোধ, প্রতিবাদ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি ও আইন কানুন তার অনুকূলে নয়। 

দেশের অনেক শিক্ষিত গৃহিণী নারী রয়েছে যারা আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী নয় অর্থাৎ স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল।এমন নারীরা  যখন বিভিন্ন কারণে স্বামীহীন হয়ে পড়ে তখন নিজের ও বাচ্চাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব ঐ নারীর ঘাড়ে এসে পড়ে।আমাদের দেশে ইচ্ছে করলেই মধ্য বয়সের শিক্ষিত নারীর চাকুরী বা কাজের সুযোগ নেই।অনেক চাকুরীর ক্ষেত্রে একজন নারীর শিক্ষা ও যোগ্যতার চেয়ে তার শারীরিক সৌন্দর্য ও বয়সকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এমন ক্ষেত্রগুলোতে যোগ্যতা থাকলে একজন বিপদগ্রস্ত  মধ্য বয়সী নারীকে কাজের সুযোগ দেয়া হয় না। স্বাধীন ভাবে কিছু করার জন্য যে অর্থ দরকার সেটাও যাদের নেই। এমন নারীদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সৎ উপায়ে কিছু করার জন্য পরিবার ও সমাজের অনেকের কাছে দ্বারস্থ হতে হয়। এমন অনেক শিক্ষিত নারীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সমাজের অনেক মুখোশধারী সাধু মানুষদের দ্বারা ধর্ষণের স্বীকার হতে হয়।যা লোকলজ্জা ও ভয় ভীতির কারণে এই অন্যায়কে মেনে নিয়ে মুখবুজে জীবন যাপন করতে হয় অনেক নারীর। 

তাছাড়া, প্রাইভেট সেক্টরের চাকুরীর ক্ষেত্রগুলোতে একজন কর্মীর চাকুরী থাকা না থাকা নির্ভর করে  প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি ও মালিকদের ইচ্ছে অনিচ্ছার উপর।কোন কর্মী যদি কোন কারণে চাকুরী হারায় তাহলে বেকার কালীন সময়ের এই সেক্টরের কর্মীদের জন্য রাষ্ট্রের কোন প্রণোদনার ব্যবস্থা নাই।বড় ধরনের এই অনিশ্চয়তা এই সেক্টরের শিক্ষিত নারী কর্মীদের নিভৃতে যৌন হয়রানির ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছে।

দারিদ্র্যতার কারণে অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে অনেক মেয়েকে গৃহকর্তা কর্তৃক ধর্ষণ এবং গৃহকর্ত্রী কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়।এমন শ্রেণীর নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোন প্রণোদনার ব্যবস্থা না থাকায় পেটের প্রয়োজনে যাবতীয় অন্যায় সহ্য করেই কাজ করতে হয়। 

সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নারীর শরীরটাই যেন নারীর পরাধীনতা,নিজের মত করে  জীবন যাপনের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।সমাজের চার পাশের শিয়াল শকুন মনোবৃত্তির মানুষদের শ্যেন দৃষ্টির মধ্যেই তাদের জীবনের যাপন করতে হয়। এমন নারীরা নির্যাতনের স্বীকার হলেও সামাজিক অবস্থানের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে পারে না, কেউ দ্বারস্থ হলেও তার সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানের কারণে বিচারের রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অপরাধীর পক্ষে যেতে দেখা যায়। 

তৃনমূল নারীদের দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর কাজ করতে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়েও যৌনদাসীতে পরিণত হয়ে নির্যাতনের চিহ্ন বহন করে প্রতিনিয়ত দেশে ফিরে আসে আমাদের বাংলাদেশের নারীরা। 

আমাদের যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো তা জন্মগত ভাবেই একজন নারীর স্বাধীন ভাবে অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার প্রতিকূলে।   


 বর্তমানে দেশের এক শ্রেণীর যুব সমাজের নৈতিকতার অবক্ষয় চূড়ান্ত শিখরে।দেখা যায় এদের মাথার উপর বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা,এরশাদ, খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমানের ছবি, এই যুব সমাজ রাজপথে উল্লেখিত ব্যক্তিদের আদর্শ মেনে স্লোগান দেয়।যাদের মাথার উপর রাষ্ট্রের এতো বড় বড় ব্যক্তিবর্গের ছবি, যারা তাদের আদর্শ ,তাদেরতো সমাজের নিপীড়িত মানুষের সেবক হওয়ার কথা। অথচ এমন যুবকদের দেখা যায়  নারী ধর্ষণ,মানুষ হত্যা সহ সমাজের অনৈতিক কাজের এমন কোন কর্ম নেই যে তাদের দ্বারা সংগঠিত হয় না।কেন এমন অনৈতিক কর্ম তাদের দ্বারা সংগঠিত হয়? রাষ্ট্রের আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে কোথা থেকে তারা এমন অনৈতিক কাজের সাহস পায়?অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে চলে আসে।


আমাদের দেশের সংবিধানে যে চারটি মূলনীতি উল্লেখ রয়েছে, অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, মূলত এই চারটি নীতির একটিরও বাস্তবতা নেই। কাগজে কলমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হলেও শাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো বাস্তবে বিদ্যমান নয়।দেশে রাজনৈতিক বড় যে দলগুলো  রয়েছে সেখানে প্রকৃত রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা হয়না।কারণ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের জন্য জনগণের আস্থা অর্জন করতে হয় আপামর জনগণের স্বার্থে কাজ করার মধ্য দিয়ে।জনগণ যে দলকে তাদের পক্ষের শক্তি মনে করবে তাদেরকে স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্পণ করবে।আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় কোটি কোটি টাকা খরচের নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা বিদ্যমান থাকলে জনগণের ভোট দেবার সুযোগ নাই।ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ব্যালট ডাকাতির মাধ্যমে।এই ব্যালট ডাকাতিতে যে দল  পেশী শক্তি,অপকৌশল,অসততা, নীতিহীনতা,মিথ্যাবাদিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যত এগিয়ে থাকবে রাষ্ট্র ক্ষমতা তার হাতে কুক্ষিগত হবে।এই বিষয় গুলো মাথায় রেখেই রাজনীতিতে বিনিয়োগকারী বড় বড় দলের নেতারা দেশের যুব সমাজের বৃহৎ একটি অংশকে তাদের ব্যবহারের স্বার্থে নীতি বিবর্জিত করে গড়ে তোলে।


আজ রাজনৈতিক পরিচয়ের যে ছেলেটিকে ধর্ষণের দায়ে ঘৃণা করছি, গালি দিচ্ছি, তার শাস্তি চেয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ সভার মাধ্যমে বিচার প্রার্থনা করছি  প্রশ্ন?  কার কাছে বিচার প্রার্থনা করছি ?  রাষ্ট্রের অধিপতির চেয়ারে বসা  যাদের কাছে বিচার প্রার্থনা করছি, ঐ চেয়ারে বসা অধিপতি কি আমাদের? আমরা কি তাদের অধিপতি বানিয়েছি ? ঐ অধিপতির চেয়ার ছিনিয়ে আনতে দলের তৈরি নীতি বিবর্জিত যুবক ছেলেগুলোই ব্যালট ডাকাতিতে অংশ নেয় জীবন বাজী রেখে।এমন পরিশ্রমের অর্জনে যে রাষ্ট্র ক্ষমতা, সেই ক্ষমতার যথেচ্ছা  ব্যবহারের স্বাদ কারই না জাগে।তাই রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিনিয়ে আনার পর ওদের মনের মধ্যে বীরের অনুভূতি জেগে বসে।একটু আরাম আয়েস করা ওদের প্রাপ্য অধিকার বলে মনের মধ্যে উঁকি দেয়।দলের ক্ষমতার শক্তিতে বলিয়ান হয়ে ওরা মাদক ব্যবসা করে, চাঁদাবাজী করে,খুনখারাপি করে,কোন মেয়েকে ধর্ষণের ইচ্ছে জাগলে বন্য জানোয়ারের মত প্রকাশ্য দিবালোকে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।ওরা মনে করে, দেশের সাধারণ মানুষ ওদের ক্ষমতার দাস। মধ্যযুগের দাসদের যেমন মুনিবের ক্ষমতার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে যথেচ্ছা ব্যবহার হতে হতো, তেমনি বাংলাদেশর মানুষ আজ বর্বর রাজনৈতিক শক্তির বৃত্তে বন্দী হয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে দিন যাপন করছে। 


একটি দেশের নিয়মতান্ত্রিক ও সুসভ্য রাজনৈতিক পরিবেশের উপর নির্ভর করে দেশের সামগ্রিক শৃঙ্খলা।এই ভিত্তির উপর  নির্ভর করে সমাজের বিবর্তন।সেই বিবর্তনে গড়ে উঠতে পারে একটি সুসভ্য সমাজ ব্যবস্থা ও আপামর মানুষের উন্নত মানুসিকতা। অন্যথায় সমাজ ধাবিত হবে বর্বরতার দিকে। আমরা আজ আমাদের সমাজের বিবর্তনের যে প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি তাতে খুব সহজেই অনুমেয় কেমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা অতিবাহিত করছি।    


 আমরা একটি রক্ষণশীল সমাজের মানুষ।পরিবার ও সমাজ নির্ভর আমাদের জীবন।যৌথ পরিবার ব্যবস্থা  প্রায় বিলুপ্তির পথে।এক সময় যৌথ পরিবারের সম্পদ ও সকলের উপার্জন এক হাতে থাকত। পরিবারের সম্পদ রক্ষা, কাজকর্ম,পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে  অনেক বেকার ছেলেকে বিবাহ দেয়া হতো।পরিবারের সামগ্রিক আয়ের উপর ভর করে ওই বেকার বিবাহত  ছেলে স্বাবলম্বী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিবাহিত দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারতো।যুগের বিবর্তনে এখন গড়ে উঠেছে একক পরিবার। আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সমাজ ব্যবস্থায় নারী পুরুষের জৈবিক চাহিদা পূরণের এক মাত্র বৈধ পন্থা হচ্ছে বিবাহ।বিবাহ করতে হলে একজন পুরুষকে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হতে হয়।অর্থাৎ বিবাহ করতে হলে পরিবার পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা তাকে অবশ্যই অর্জন করতে হবে।তা নাহলে সাধারণত একজন বেকার পুরুষ বড় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ভালোগুণের অধিকারী হলেও তার সঙ্গে আমাদের দেশের মেয়ে পরিবারগুলো বিবাহ দিতে সম্মত হয়না এবং এর যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে দেশের কর্মসংস্থান একেবারেই অপ্রতুল।অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্র ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা শাসকদের দেশের অর্থনীতির সমবণ্টন,বেকার সমস্যার মত ইত্যাদি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ও প্রকল্প লক্ষণীয় নয়।যা রয়েছে তা লোক দেখানো। যে সব প্রকল্প হাতে নেয়া হয় সেগুলো মূলত মহৎ উদ্দেশ্যে নয় বরং ঐ প্রকল্পকে ভিত্তি সরকারের দায়িত্বশীলদের ব্যক্তিগত অর্থ লোটার মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহারের জন্য।দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকালীন সময় জুড়ে ব্যস্ত থাকতে হয় ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘ করার মাস্টার পরিকল্পনা নিয়ে এবং তাদের সময় কাটে রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের তাড়াহুড়ার মধ্যে।সৎ পথে  সারা জীবন ব্যবসা ও চাকুরী করে এক কোটি  টাকার মালিক হওয়ার  হিসাব মেলানো যায়না অথচ শূন্য হাতে রাজনীতির করতে এসে বা রাজনীতির সংস্পর্শে গিয়ে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এক সময়ে অন্যের কাছে চেয়ে খাওয়া ভবঘুরের শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার নজির আমাদের সমাজে ভূরি ভূরি।ক্ষমতার কল্যাণে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতা ছাত্রজীবন থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়।এই হল আমাদের দেশের জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক বাস্তবতা। এমন বাস্তবতায় সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণী বৈষম্য যেমন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে,এর প্রভাবে  বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের  উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভোগবাদী মানুসিকতা।ফলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও আমূল পরিবর্তন এসেছে। আমাদের সমাজে এখন একজন মানুষের সামাজিক মূল্যায়ন তার শিক্ষা, সততা ও মানবিক গুণাবলীর উপর নির্ভর করেনা, নির্ভর করে আর্থিক মানদণ্ডে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ফলে বিবাহ-শাদীর ক্ষেত্রে একজন ছেলের শিক্ষা,সৎ উপার্জন ,মহৎ গুণাবলীর চেয়ে গুরুত্ব পায় তার দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ।সেই সম্পদ কি উপায়ে উপার্জিত তা বিচার বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়না। ন্যায় অন্যায় বিবেচনাবোধ আমাদের সমাজ থেকে আজ বিলুপ্তির পথে হাঁটা ধরেছে।নীতি বিবর্জিত মানসিকতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফলে সমাজে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধ।এমন সামাজিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের চলে আসা নিয়ম ও দৃষ্টিভঙ্গির  পরিবর্ত আনা সময়ের দাবী বলে মনে করি। আমাদের দেশে নারী উচ্চশিক্ষার হার বেড়েছে।পুরুষদের পাশাপাশি শিক্ষাদীক্ষা, চাকুরী, ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীরা তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে।পড়াশুনা শেষ করা অনেক নারীকেই এখন স্বাবলম্বী দেখা যায়।যা আমাদের সামাজিক অগ্রগতির বড় এক অর্জন এবং অনুপ্রেরণা। একজন মেয়ে আত্মনির্ভর বা স্বাবলম্বী হলে বিবাহের ক্ষেত্রে তার থেকে উচ্চ পদমর্যাদা বা বেশী যোগ্য ছেলে খুঁজতে হন্য হতে হয়। এমন ছেলে না পাওয়া গেলে বিবাহের সময় ক্ষেপণ করতে করতে অনেক সময় এমন নারীদের বিবাহের উপযুক্ত বয়স পেড়িয়ে যায়।মানুষের জৈবিক চাহিদা সহজাত।বিবাহের উপযুক্ত হওয়ার জন্য বা উপযুক্ত পাত্র পাত্রী পাওয়ার আশায় পেছনে যে সময় নারী পুরুষ অতিবাহিত করে সেই সময়টায় হয়তো তারা ব্যক্তিগত ভাবে জৈবিক কষ্ট স্বীকার করে জীবন যাপন করে, নতুবা গোপনে বিকল্প পন্থায় জৈবিক চাহিদা পূরণ করে। একটি বিবাহবদ্ধ শৃঙ্খল জীবন যাপনের জন্য যেহেতু একটি উপার্জনের উৎস দরকার এ ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারা বা প্রথার ছেলের ভূমিকায় একজন মেয়ে যদি অবতীর্ণ হতে শুরু করে তাহলে সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছুটা হলেও প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেতে পারে। অর্থাৎ, একটি শিক্ষিত স্বাবলম্বী মেয়ে তার চেয়ে যোগ্য ছেলে পাওয়ার আশায় জীবনের সীমিত সময়ের মূল্যবান দিনগুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে জৈবিক চাহিদার যে ত্যাগ স্বীকার করে, তা না করে  একজন শিক্ষিত,সৎ ও চরিত্রবান বেকার ছেলেকে বিয়ে করে বিবাহিত সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের মাধ্যমে জীবনর মূল্যবান সময়গুলো উপভোগ করতে পারে। একজন সুশিক্ষিত সৎ মানুষ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ হয়ে থাকে। এমন মানুষ সময়ের বাস্তবতায় কারো সহযোগিতা নিলেও সারা জীবন কারো উপর নির্ভরশীল হয় না। সে নিজে কিছু একটা করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে।পৃথিবীতে কেউ স্বাবলম্বী হয়ে জন্মগ্রহণ করেনা।দীর্ঘ চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে হয়, তবে সেই কঠিন  পথে যদি কেউ একটু সহযোগিতার কোমল হাত বাড়িয়ে দেয় তবে পথটা আরও মসৃণ হয়ে যায়। 


আমাদের দেশে যৌনতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়,সামাজিক ও ধর্মীয় কঠোর বাধ্যবাধকতার বিপরীতে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মহীনতা ধর্ষণের মত সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ সৃষ্টি করছে তা অস্বীকার করার নয়।                


মানুষ মূলত জন্মগত ভাবে সাধু হয়ে জন্মায় না, আবার অপরাধী হয়েও জন্মায় না। অন্যান্য প্রাণীর মতই একটি জীবন নিয়ে দেহসর্বস্ব অতি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে জন্মায়। জন্মের পর থেকে তার মস্তিক ধীরে বিকাশ লাভ করতে থাকে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও শিক্ষার মাধ্যমে। সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে একজন মানুষের নীতি নৈতিকতার বিকাশ লাভের ক্ষেত্রে।মানুষ মাত্রই প্রত্যেকের মধ্যে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই রিপুগুলো বিদ্যমান। আবার এই মানুষই দেবত্ব গুনের অধিকারী।একজন মানুষ অতি সহজেই ভেতরের পশুত্বকে বর্জন করে দেবত্ব গুনের অধিকারী হতে পারে না।তাকে সাধনা করতে হয়। তবে পৃথিবীতে কিছু মানুষ প্রবল মানবিক গুনের অধিকারী হয়।রাষ্ট্রীয় আইন কানুনের বাধ্যবাধকতা,নীতি নৈতিকরা ও ধর্মীয় বিধিবিধান অনুসরণ ছাড়াই এমন বিশেষ গুণসম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রখর কাণ্ডজ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির  অধিকারী ছাড়া এমন মানুষ হওয়া সম্ভব নয়। সমাজের অধিকাংশই মানুষই স্বাভাবিক  প্রবৃত্তি সম্পন্ন হয়ে থাকে। অর্থাৎ তার সামনে কাম বাসনা বা কোন নিষিদ্ধ আনন্দ পূরণের সুযোগ আসলে বা পরিবেশ অনুকূলে থাকলে সে বৈধ অবৈধ নীতি নৈতিকতার বোধ হারিয়ে তার প্রবৃত্তি পূরণের জন্য লালায়িত হয়ে ওঠে।হোক সে নারী অথবা পুরুষ। উদাহরণ স্বরূপ, যখন কোথায়ও যুদ্ধবস্থা বিরাজ করে তখন সেই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশী অনিরাপদ হয়ে পড়ে। আমরা দেখেছি ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার পুরুষ সৈনিকদের দ্বারা নারী ধর্ষণের ঘটনা এবং নারী সৈনিক দ্বারা নিরীহ পুরুষ ধর্ষণের দৃশ্য।সৈনিকদের মূলত যুদ্ধ করার কথা ছিল প্রতিপক্ষ সৈনিকদের সঙ্গে, আঘাত আনার কথা ছিল প্রতিপক্ষ ঘাঁটিতে। নিরীহ নারী পুরুষদের ধর্ষণের দায়িত্ব নিয়ে তারা রণাঙ্গনে আসেনি। অথচ তারা উন্নত দেশের সুশিক্ষিত সৈনিক।তাহলে কেন এমন কর্ম তারা করলো? একটি দেশ যখন যুদ্ধাবস্থায় থাকে তখন দেশের আইন শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে। জনগণের  প্রতিরক্ষার  প্রতিটি সংস্থা কার্যকারিতা হারায়।অর্থাৎ নিরীহ মানুষের পাশে এমন কেউ থাকে না যারা তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।এমন পরিস্থিতিতে সশস্ত্র সৈনিকের সামনে নিরীহ মানুষের জান এবং মাল অধীন হয়ে যায়।অনেক সৈনিক হারিয়ে ফেলে তার নীতি নৈতিকতার বোধ ও মানবিকতা।তার ভেতর জেগে ওঠে আদিমতা, তাই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নিরীহ নারী,পুরুষ এবং শিশু হয়ে ওঠে আদিম কামনা বাসনা পূরণের খেলনা। পৃথিবীর যে কোন যুদ্ধাঞ্চল এই বিশৃঙ্খলার বাইরে নয়। 

আমরা জানি ধর্মীয় গুরুরা মানুষের নীতি নৈতিকতার পথ দেখায়, শান্তির কথা বলে অথচ অনেক পাদ্রী,পুরোহিত,সন্ন্যাসী, মোল্লা দ্বারা নারী ধর্ষণ ও শিশু কিশোর বলৎকার হওয়ার ঘটনা যুগে যুগে কম হয়নি।যা এখনো বিদ্যমান।  

সমাজে রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে গিয়ে পাশাপাশি যে বন্ধুর হাতে হাত রেখে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত পথ হাঁটা হয়েছে  মাইলের পর মাইল, সেই বন্ধুর দ্বারাই ধর্ষণের স্বীকার হওয়ার নজিরও রয়েছে।

অর্থাৎ সাধুর লেভাজ দেখলেই একজন মানুষকে সাধু ভাবা অযৌক্তিক।কারণ লেভাজেের ভেতরে মানুষ আকৃতির দেহে বসবাস করা পশু কতটা জাগ্রত আর কতটা সুপ্ত সেটা অন্যের বোঝার কোন পরিমাপ যন্ত্র নেই।একজন মানুষের ভেতরে প্রকৃতই কি খেলা করে তা শুধু সেই মানুষই জানে।তার চেহারা বা লেভাজ দেখে কিছু বোঝা সম্ভব নয়।  


দেশে বাস্তব জীবনে এমন বেশ কিছু বাস্তবতা দেখার সুযোগ হয়েছে।একবার এক বন্ধুর কাছে একটি গল্প শুনেছিলাম, বাস্তব গল্প ।

একবার একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির অফিসে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তা যোগদান করলেন।বিশেষ একটি রুমে আধুনিক চেয়ার টেবিল কম্পিউটার দিয়ে তার কার্যালয় সাজানো হল।দুই তিনজন সিনিয়র কর্মকর্তা ব্যতীত ঐ অফিসের অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মচারী সদ্য শিক্ষা জীবন শেষ করা বয়সে তরুণ। এতো বড় কর্মকর্তার আগমনে অফিসের তরুণ কর্মীরা বেশ খুশী।সরকারের এত বড় কর্মকর্তা যে সরকারি চেয়ারে থাকা অবস্থায় সাধারণত এমন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করা সাধারণ মানুষের জন্য দুরূহ ব্যাপার।অফিসের তরুণ কর্মীরা এমন একজন মানুষের সংস্পর্শে কাজ করতে পেরে বেশ উজ্জীবিত।তিনিও তরুণদের সঙ্গে বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ করেন।মাঝে মাঝে অনেকের সঙ্গে খোলামেলা গল্পও করেন,চাকুরী জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।অনেক সময় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা হলে সবাইকে তার রুমে ডেকে এক সাথে খেলা দেখেন।এমন বন্ধুসুলভ আচরণে  অফিসের তরুণ কর্মীরা তাকে  ফেরেশতার মত  শ্রদ্ধা করে।তার বিগত চাকুরী জীবনে সততার খুব সুনাম রয়েছে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির অফিসে তার মূলত নির্দিষ্ট কোন কাজ নেই।তিনি অফিসে আছেন এটা জেনে সবাই যার যার টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করে আর সরকারি অফিসে কোন সমস্যা হলে তিনি সেই অফিসের কর্তাকে ফোন করে বলেন আমি অবসর প্রাপ্ত , এই কোম্পানির পদে আছি, আমাদের কোম্পানির ফাইলটা আটকে আছে যদি একটু দেখতেন।তবে নিজ অফিসের প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের কোন ফাইল বা বিল ম্যানেজিং ডিরেক্টরের টেবিলে যাওয়ার পূর্বে তাকে দেখানোর নির্দেশ রয়েছে।অফিস টাইমে বেশির ভাগ সময় সে তার রুম বন্ধ করে অবস্থান করেন।অভ্যর্থনায় কর্মরত মেয়েদের মাঝে মাঝেই তার রুমে ডেকে দীর্ঘ সময় অফিস পরিচালনার নিয়ম কানুন,শৃঙ্খলা সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।অভ্যর্থনার মেয়ে কর্মীরাও তার খুব ভক্ত।তার অতি ভালোবাসায় অনেক সময় অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের কোন প্রয়োজন অভ্যর্থনা কর্মীদের  কাছে গুরুত্ব পায় না।বড় কর্তার বাসা অফিসের পাশেই, অফিস টাইমে হঠাৎ হঠাৎ তিনি তার রুমে থাকেন না।বাসায় চলে যান।ইঞ্জিয়ারিং, মার্কেটিং,প্রকিউরমেন্ট,হিসাব বিভাগের সব কর্মকর্তারই বিভিন্ন প্রয়োজনে মাঝে মাঝে তার রুমে যেতে হয়।একদিন একটি প্রোজেক্টের ডিজাইন দেখানোর জন্য  এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ার তার রুমের দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো,ভেতরে ডুকে দেখল তিনি তার চেয়ারে নেই।ভাবল ফাইলটা তার টেবিলে রেখে আসলে তিনি যখন অফিসে ফিরবেন তখন ডিজাইনটা দেখতে পাবেন।ডিজাইনের ফাইলটি টেবিলে রাখতে গিয়ে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার যা দেখলেন তা অবিশ্বাস্য।বড়কর্তার ডেস্কটপে ভেসে আছে পর্ণ ওয়েবসাইটের রগরগে দৃশ্য।এই দৃশ্য দেখে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বাস করেনি এই কাজটি বড় কর্মকর্তার।বয়সে প্রবীণ, তাছাড়া তিনি ইন্টারনেট, কম্পিউটার ব্যাবহারেও পারদর্শী নয়।তাছাড়া তার কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংক্রান্ত কাজে সাহায্যের জন্য মাঝে মাঝেই অফিসের তরুণ কর্মীদের তার রুমে ডেকে নেন।অফিসে দুইটি গ্রুপ রয়েছে।এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের প্রতিপক্ষ। তরুণ ইঞ্জিনিয়ার তার নিজের গ্রুপের বিশ্বস্ত এক কর্মকর্তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলো। তার ধারণা, বড়কর্তা যখন তার অফিস রুম ছেড়ে বাসায় যায় তখন অন্যগ্রুপের বিশেষ একজন তরুণ কর্মকর্তা তার রুমে ডুকে পর্ণ সাইট দেখে। তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের সন্দেহ খুব গাঢ় অন্যগ্রুপের নির্দিষ্ট ঐ তরুণ কর্মকর্তার প্রতি।সে ভাবছে, এমন এক সম্মানিত ব্যক্তির অফিস কক্ষে ডুকে এমন কাজ গর্হিত অপরাধ, ঐ দিন স্যার যদি কক্ষে প্রবেশ করে এই অবস্থা দেখত তাহলে অফিসের সবাইকে কি ভাবতো! অফিসের তরুণদের প্রতি তার যে ভালো ধারণা সেই বিশ্বাস ও ভালোবাসায় ফাটল ধরত। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অন্যগ্রুপের স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন এক তরুণ মার্কেটিং কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালো সত্যতা উন্মোচনের জন্য। মার্কেটিং কর্মকর্তা নিজ গ্রুপের সন্দেহভাজন কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি খুলে বলল,এবং জানতে চাইলো সে এই কাজ করে কিনা। বিষয়টি জেনে সন্দেহভাজন তরুণ উল্টো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের চাপ সৃষ্টি করলো। কারণ, তাকে সন্দেহ করায় সে অপমানবোধ করেছে। সত্য উদঘাটনের জন্য দুই গ্রুপের মধ্যে সমযথা হল।দুইগ্রুপের দুই জন প্রতিনিধি নির্বাচন করে দায়িত্ব দেয়া হল প্রকৃত সত্য উন্মোচনের জন্য।এদের দুজনই আইটি জ্ঞানে পারদর্শী।বড়কর্তা তার রুম ছেড়ে গেলে কখনো রুম লক করে যায় না। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় দুপুর এক টার পর তিনি বাসায় মধ্যাহ্ন আহারে যান। ফেরেন এক দের ঘণ্টা পরে। একদিন বড়কর্তার এই বিরতি সময়ে দুই গ্রুপের দুই প্রতিনিধি প্রবেশ করলো তার রুমে।তার কম্পিউটারের ওয়েব ব্রাউজারে প্রবেশ করে তারা ব্রাউজিং হিস্টরি চেক করে দেখলো যে এই  ব্রাউজার থেকে কোন কোন ওয়েব সাইটে প্রবেশ করা হয়। ফলাফল, ব্রাউজিং হিস্টরিতে প্রচুর পর্ণ ওয়েবসাইটে প্রবেশের রেকর্ড। পরীক্ষা করে দেখা গেলো এই সাইটগুলোতে প্রবেশের যে সময়ের রেকর্ড রয়েছে সেই  সময়গুলোতে বড়কর্তা তার অফিস কক্ষেই অবস্থান করেন।বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটাই প্রমাণ হল যে বড়কর্তা অফিস চলাকালীন সময়ে বদ্ধ কক্ষে বসে পর্ণ সাইট দেখেন।ঐ দিন হয়তো মনের ভুলে সাইটটি খোলা অবস্থায় রেখে চলে গেছেন।  কিন্তু আইটি জ্ঞানের অভাবে তিনি জানেনই না যে কোন  ব্রাউজার দিয়ে কোন সাইটে প্রবেশ করলে ঐ সাইটের রেকর্ড ব্রাউজার হিস্টোরিতে থেকে যায়। তাই রেকর্ডগুলো মোছেননি।তাই এই অজ্ঞতাই সত্য উদঘাটনের নিয়ামক হিসেবে কাজে লেগেছিল।তা নাহলে একটি ভুল সন্দেহ সত্য রূপে প্রতিষ্ঠা পেতো। 


আমরা অনেক সময় মানুষের জীবনযাপন,ধর্মীয় বিশ্বাস, চালচলন, পোশাক আসাক,আচার ব্যবহার, সামাজিক অবস্থান দেখে নিজের মধ্যে কারো নৈতিক চরিত্রের একটি ধারণা তৈরি করি করি।বাহ্যিক অবয়ক ও অবস্থান দেখে কারো সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা বা বিশ্বাস স্থাপন করি তা অধিকাংশই ক্ষেত্রেই ভুল। যা উল্লেখিত একটি বাস্তব গল্পের মধ্য দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হল। যার চালচলন সন্দেহের উদ্বেগ ঘটিয়েছিল সে সত্যিকার্থে ধারণার নোংরা মানুষ নয়।অথচ যাকে অফিসের সবাই সাধু হিসেবে গ্রহণ করেছিল সে যে এমন নোংরা মনের অধিকারী একজন মানুষ তা কেইবা জানতো ।এই সত্য উদঘাটন না হলে সবার কাছে সাধু হিসেবেই অবস্থান করতো। এমন গোপন ঘাতক চরিত্রের অধিকারী বসের অধীনস্থ একজন মহিলা কর্মী কতটা নিরাপদ তা একটু গভীর ভাবে অনুধাবন করলেই বোঝা যায়।অথচ এই মানুষটাই সরকারের যে ধরণের কর্মকর্তা ছিলেন এমন কর্মকর্তারাই কখনো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এমন সাধুর সুরতে হাজারো নোংরা মনে মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে  আমাদের দেশের অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ প্রত্যন্ত জায়গায়।যাদের দ্বারা অনেক নারী নিভৃতে নির্যাতনের স্বীকার হয় যা আমরা জানিনা। জামালপুর জেলার সাবেক ডিসি আহমেদ কবির কর্তৃক অধনস্থ নারী কর্মীর সাথে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, এছাড়া ফেনী জেলার সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা কর্তৃক ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়ন এবং পরবর্তীতে প্রতিবাদ করায় তাকে আগুনে পুড়িয়ে নির্মম ভাবে হত্যা ঘটনা যেন তারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। 


মার্জিত পোশাক উন্নত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ আর শৃঙ্খলিত জীবন যাপনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ। সমাজের নানা ধর্মীয় বিশ্বাস, অবিশ্বাস,রুচি পছন্দ,পেশা ও সংস্কৃতিগত কারণে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসরত মানুষের পোশাক পরিচ্ছদ  ও জীবন যাপনের মধ্যে বৈচিত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়, এই বৈচিত্র্যতাই যেন একটি রাষ্ট্রের সৌন্দর্য।এই প্রতিটি শ্রেণীর মানুষের জীবনযাপন প্রণালীর প্রতি একে ওপরের শ্রদ্ধাবোধের দৃষ্টি ভঙ্গি একটি সহনশীল সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওপরদিকে প্রতিটি বৈচিত্র্যময় মানুষের নিরাপত্তার ব্যাপারের রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে নিরপেক্ষ। 


আমি যে দেশটিতে থাকি, এখানে নারী পুরুষের যৌনতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিশেষ কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিবাহ বাধ্যতামূলক নয়। দুইজন মানুষের সম্মতি বা ইচ্ছাই যৌনতার আইনগত অনুমোদন দেয়।তবে ১৫ বছরের নিচে কোন শিশুর সঙ্গে প্রাপ্ত বয়স্ক কোন মানুষের যৌন সম্পর্ক স্থাপন অপরাধ । কিন্তু ১৫ বছরের নিচে দুজন মানুষের সম্মতি যৌন সম্পর্ক বৈধ।সেই যৌন সম্পর্ক একজোড়া নারী পুরুষ বিবাহ করে করবে অথবা বিবাহ বহির্ভূত ভাবে করবে তা একান্তই তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা। যৌনতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নিয়ম কানুনের সঙ্গে রাষ্ট্রের কোন সম্পর্ক নেই।পাপ পূর্ণ, বিশ্বাস অবিশ্বাস একান্তই ব্যক্তির।রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে  রাষ্ট্র অনুমোদিত প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন বিরুদ্ধ প্রতিটি কর্মের বিচার সুনিশ্চিতের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ধরে রাখা।এখানে যৌন স্বাধীনতা আছে কিন্তু বর্বরতা নেই।ধর্ষণ বা যৌন অপরাধ সংক্রান্ত আইনের কঠোর প্রয়োগ বিদ্যমান থাকায় ধর্ষণের মত সামাজিক অপরাধ বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার মত নয়।রাস্তায় বা গণপরিবহণে যৌন হয়রানির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার বিধান রয়েছে৷ এ ক্ষেত্রে অপরাধ বিবেচনায় যৌন নিপীড়ককে ৯০ থেকে ৭৫০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।হয়রানির স্বীকার কোন মহিলা জরুরী পুলিশ সেবা নম্বরে কল করলে যৌন নিপীড়কে তাৎক্ষণিক এই শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।আইন আদালত পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে বড় শাস্তি পুলিশের রেকর্ড বইতে এই অপরাধ লিপিবদ্ধ হওয়ায়  ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অনেক নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে  বাধার সম্মুখী হওয়ার ঝুঁকি অপরাধীর মাথার উপর ঝুলতে থাকে। যা এই দেশের প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনে কারাগারের বন্দী দশার চেয়ে বেশি ভয়ংকর।আমাদের দেশে কোন নাগরিকের  কোন প্রশাসনিক প্রয়োজনে চারিত্রিক সনদের প্রয়োজন হলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের কাছে যেতে হয়।সমাজের সর্বোচ্চ খারাপ মানুষ বা অপরাধীও যদি এই সব প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয় তবে দায়িত্বশীল চেয়ারম্যান বা মেয়র চোখ বন্ধ করে ঐ খারাপ মানুষকে উত্তম চরিত্রের সনদপত্র দিয়ে দেয়।ফলে সমাজের সর্বোচ্চ অপরাধীর রাষ্ট্রীয় কোন সুযোগ সুবিধা পেতে বাধা পেতে হয় না।সুতরাং সমাজের ভালো ও খারাপ মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের বিশেষ কোন পার্থক্যের দৃষ্টি নেই।যার দরুন আমাদের দেশে একজন সন্ত্রাসী, ঋণ খেলাপি,দুর্নীতিবাজ, মাদক ব্যবসায়ী,ধর্ষণকারীর মত খারাপ মানুষেরা রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধি হয়ে সমাজের সাধারণ মানুষের প্রতি চোখ রাঙায় পারে।ফরাসি দেশেও  প্রশাসনিক নানাবিধ প্রয়োজনে একজন নাগরিকের চারিত্রিক সনদের প্রয়োজন হয়,যেমন ব্যাংক ঋণ নেয়া, নির্বাচনে প্রতিনিধি হওয়া,নাগরিকত্বের আবেদন করা সহ বহুবিধ প্রয়োজনে এই সনদের প্রয়োজন হয়। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ সনদটি স্থানীয় প্রশাসনের কোন সংস্থা প্রদান করে না, প্রদান করে এখানকার পুলিশ প্রশাসন। কারণ একজন মানুষের দৃশ্যমান বা ধরাপড়া অপরাধ ও অপকর্মের রেকর্ড পুলিশের নথিতে লিপিবদ্ধ থাকে। তাই একজন নাগরিক যখন এমন সনদের জন্য পুলিশ প্রশাসনের নিকট আবেদন করে তখন ঐ নাগরিকের ব্যক্তিগত রেকর্ড পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট আইন অনুসরণের মাধ্যমে আবেদনকারীকে চারিত্রিক সনদপত্র সরবরাহ করা হয়। যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী তারা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষের দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান প্রতিটি ভালো  মন্দ কর্মের হিসাব লিপিবদ্ধ করেন দুই কাঁধে অবস্থান নেয়া কেরামিন ও কাতেবিন নামে দুই ফেরেশতা। তাদের এই রেকর্ডকৃত কর্মের উপর ভিত্তি করে হাশরের ময়দানের বিচারে দিনে নির্ধারণ হবে একজন মানুষের বেহেশত ও দোযখ।ধর্ম বিশ্বাসের মতই ফরাসি দেশের একজন নাগরিকের রাষ্ট্র নির্দেশিত ভালো ও মন্দ কর্ম রেকর্ডের দায়িত্বে থাকেন পুলিশ প্রশাসন।প্রতিটি নাগরিকের নাগরিকত্ব নম্বর পুলিশ প্রশাসনের সার্ভারের প্রবেশ করে সার্চ দিলেই কম্পিউটার মনিটরে ভেসে ওঠে ফরাসি বৃত্তের একজন মানুষের ন্যায় অন্যায়ের খতিয়ান।সেই খতিয়ান অনুযায়ী ফলাফলও ভোগ করতে হয় প্রত্যেকের। ধর্ম বর্ণ, শ্রেণী পেশার ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় আইনের যথাযত প্রয়োগের কারণে সামাজিক অপরাধের হার এখানে নিম্নমুখী।এজন্য এখানে একজন নারীকে রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,অফিস বা কর্মস্থলে যৌন হয়রানির মত বর্বরতার ভয়ে থাকতে হয়না।কোন মেয়ে যদি অর্ধনগ্ন হয়ে মধ্য রাত্রে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়ায় তাহলে তার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে কেউ তাকাবে না, কেউ তাকালে বা খারাপ ইচ্ছে পোষণ করলেও আইনের ভয়ে তাকে স্পর্শ করবেনা।  পৃথিবীর নানা জাতিগোষ্ঠী,ধর্ম, বর্ণের মানুষের বসবাস এই ভূখণ্ডে।প্রত্যেকের জীবন যাপন অভ্যাস অনুযায়ী পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে,এখানে অনেক নারীই একটু খোলামেলা পোষাকের  জীবন যাপনে অভ্যস্ত তাই বলে তার প্রদর্শিত শরীর দেখে পশুর মত ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত দেখা মেলে না। শিক্ষিত ও সুসভ্য জাতির মানুষ নিজের স্বাধীনতাকে উপভোগের ব্যাপারে যেমন সচেতন তেমনি অন্যের স্বাধীনতার প্রতিও  শ্রদ্ধাশীল হয়। যা ফরাসি দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন যাপন ও আচার আচরণে প্রতি মুহূর্তে ফুটে ওঠে।বনের হিংস্র বাঘ বা সিংহের শাবককে যদি একটি মানব পরিবারে আদর যত্নে বড় করে তোলা যায় তাহলে  দেখা যাবে বড় হওয়া পর ঐ পূর্ণাঙ্গ বাঘ বা সিংহের মধ্যে সহজাত হিংস্রতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং হিংস্রতার পরিবর্তে মানুষের সঙ্গে বসবাস করারা দরুন উল্টো মানবিক আচরণ করছে। একটি সুসভ্য জাতি বিনির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে শ্রেণীর ঊর্ধ্বে গিয়ে আইনের যথার্থ প্রয়োগ।একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যদি আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থা স্বচ্ছ হয় তাহলে ঐ জাতিগোষ্ঠীর মানুষ আইন ও বিচারের ভয়ে এবং কোন এক সময় নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হওয়ায় দরুন  অন্যায় করা ভুলে যায়।এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সুসভ্য সমাজ।


ব্যক্তিগত ভাবে একবার আমার ফরাসি জেলখানা দেখার সুযোগ হয়েছিল।এক পরিচিত ছোট ভাই কোন এক কারণে ফরাসি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলখানায় প্রেরিত হয়।একদিন প্রোগ্রাম করে এখানকার কয়েকজন বন্ধু মিলে  তাকে দেখতে জেলখানায় যাই। জেলখানার প্রবেশমুখে আমাদের মত অন্যান্য  কারাবাসী স্বজনদের ভির।অনেকগুলো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কঠোর সতর্কতার মধ্যদিয়ে আমরা জেলখানায় প্রবেশ করলাম।একজন পুলিশ আমাদের সঙ্গে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট রুমে বসতে দিলো। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমাদের ঐ ভাইটিকে নিয়ে আসা হল কথা বলার জন্য।আমরা জানতে চাইলাম,সে কেমন আছে সে? পুলিশ কোন খারাপ আচরণ করছে কিনা?কয়েদ খানায় তার সঙ্গে কারা আছে? ইত্যাদি। তাকে কিভাবে মুক্ত করা যায় সে ব্যাপারে তাকে আশ্বস্ত করে আমরা চলে এসেছিলাম।ঐ দিন ঐ ভাইয়ের সঙ্গে অল্প কিছুক্ষণের আলোচনায় তার বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা শুনে এখানকার জেলখানা সম্পর্কে দারুণ কিছু তথ্য জানতে পেরেছিলাম।


সে জানিয়েছিল, ফরাসি জেলখানায় তার দিন কাটছিল একজন অতিথির মতই। কয়েদিদের সঙ্গে কোন অমানবিক আচরণ হয় কিনা, তা পর্যবেক্ষণের জন্য জেলখানার মধ্যেই মানবধিকার সংস্থার কর্মী রয়েছে যারা কয়েদিদের পর্যবেক্ষণ করেন, তাই ভেতরে ভয়ের কোন কারণ ছিলনা। তার অন্যান্য কয়েদি বন্ধুদের সবাই ভিনদেশি,অর্থাৎ আলজেরিয়া,মরক্কো,তিউনিসিয়া,পাকিস্থান এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের জনগণ।তার কয়েদী বন্ধুদের কেউ ফরাসি বংশোদ্ভূত নয়।কয়েদিরা বাইরে যে যাই করুক কিন্তু ভেতরে সবাই বন্ধুর মত ছিল। 


আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম ফরাসি জেলখানায় ফরাসি আসামী নেই জেনে। কারণ আমি তখন এই দেশে নতুন। এই দেশের মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে বাস্তব ধারণে ছিলনা। তবে আজ বুঝি ফরাসি জেলখানায় কেন ফরাসি বংশোদ্ভূত কয়েদি খুঁজে পাওয়া যায়না।প্রায় দশ বছরের ফরাসি ভূখণ্ডের জীবন যাপন থেকে এই দেশের সমাজ ও সমাজের মানুষ সম্পর্কে কিছু বাস্তব সত্য আবিষ্কার করেছি।তাহলো  অধিকাংশ ফরাসিদের মধ্যে মিথ্যে বলার প্রবণতা নেই, অন্যকে ঠকানোর প্রবণতা নেই, অন্যের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণের প্রবণতা নেই,ওজনে কম দেবার প্রবণতা নেই,খাদ্যে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা নেই,অন্যের সঙ্গে ছল-চাতুরীর প্রবণতা নেই,অর্থ  ও ক্ষমতা বড়াই করে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের প্রবণতা নেই, আর ধর্ষণের মত এমন বর্বরর আচরণ হয়তো চিন্তাই করতে পারে না। একটা সমাজের মানুষের এমন চারিত্রিক গুনের অধিকারী হওয়ার জন্য অনেক কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে।ফরাসিরা বই পড়া জাতি। আমরা বলতে পারি পড়াশুনার ভেতর দিয়ে তারা এমন নৈতিক গুনের অধিকারী হয়েছে। এ কথার অবশ্যই যৌক্তিকতা রয়েছে, কারণ জ্ঞান চর্চার ভেতর দিয়ে মানুষ মহামহিম গুনের অধিকারী হয়।এ কথা ধ্রুব সত্য।ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকে ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খ্রিস্টান হলেও বৃহৎ অংশ ধর্মীয় রীতিনীতি ও আনুষ্ঠানিকতা পালন না করে না।আবার অবিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।অনেক বিখ্যাত ক্যাথলিক গির্জায় ধার্মিকদের চেয়ে পর্যটকদের ভীর বেশী লক্ষ্য করা যায়।তবুও এদেশে সুসভ্য সমাজ বিদ্যমান। আমি মনে করি মানুষ মূলত সুসভ্য হয় একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্য দিয়ে। যা ফরাসি দেশে বিদ্যমান। এই দেশের মূলমন্ত্র সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। যা তারা ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে।এখন এই তিনটি শব্দের মধ্যে ফরাসি নাগরিকের জীবনের যে স্বাদ অন্তর্নিহিত রয়েছে তা দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে আরম্ভ করে তৃনমূলের একজন মানুষ পর্যন্ত সমান ভাবে উপভোগ করে। যা সম্ভব হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে।রাষ্ট্রের আইনের বেড়াজালে সবাই একই ভাবে আবদ্ধ।ফলে কেউ ক্ষমতাবান হলেও ক্ষমতার অপব্যবহারের দুঃসাহস দেখানোর স্পর্ধা দেখায় না পরিণতির ভয়ে।দীর্ঘদিনের এমন নিয়ন্ত্রিত শাসন কাঠামোর মধ্যে বসবাস করতে করতে ফরাসি জনগোষ্ঠীর মানুষের চিন্তা চেতনা ও ধ্যান ধারণায়  সততা এবং মানবতা জাগ্রত হয়েছে, ফলে সহজাত ভাবে ব্যক্তি,পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের দ্বারা ন্যায় সঙ্গত আচরণ প্রকাশ পায়। সারা পৃথিবীর নানা বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এই ভূখণ্ডে।অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর মানুষকে বাদ দিয়ে যদি  দেশটির প্রতিচ্ছবি কল্পনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে এই দেশটির পুলিশ প্রশাসন ও আইন আদালত বিভাগের খুব একটা প্রয়োজন পড়ছে না, এই বিভাগগুলোর কাজ তিনভাগ কমে গেছে।     


ফ্রান্সে উদার ও রক্ষণশীল সমাজের মাঝে  উগ্র জীবন যাপনও রয়েছে তবে কারো দ্বারা কারো স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা নেই। 


যৌনতা প্রতিটি সমাজে বিদ্যমান। যে সমাজ যৌনতার স্বাধীনতা দেয় সেই সমাজে যৌনতার বাস্তব প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়ে ওঠে।যৌন স্বাধীনতা বলতে যতেচ্ছ যৌনাচার বোঝায় না।মনে হতে পারে এমন সমাজের মানুষ পশুপাখির মত যেখানে সেখানে যৌন সঙ্গম করে বেড়ায়।বস্তুত এমন চিন্তার সঙ্গে বাস্তবতার বিন্দু পরিমাণ কোন মিল নেই।ফ্রান্সে দীর্ঘ দিনের বসবাসের অভিজ্ঞতায় এমন চিত্র কখনো আমার চোখে ধরা পড়েনি।রক্ষণশীল সমাজে যেমন দুইজন মানুষ ভালবেসে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে,কারো প্রয়োজন হলে পতিতালয়ে গিয়ে যৌনতা কেনে।প্রেমিক প্রেমিকা পার্কের নির্জন ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে চুপিসারে অভিসার করে। এখনেও তেমন। পার্থক্য শুধু এতোটুকু এমন রাষ্ট্রে একজোড়া মানুষ বিবাহ বহির্ভূত ভাবে দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারে।এমন দাম্পত্যের ফলে কোন শিশুর পৃথিবীতে আগমন ঘটলে সেই শিশু রাষ্ট্রের অন্যান্য শিশুর মত সামাজিক ভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার লাভ করে।কোন পার্থক্য করা হয় না।


 যে সমাজ যৌন স্বাধীনতায় রক্ষণশীল সে সমাজে যৌনতা আড়ালে হয় ফলে রক্ষণশীলতার পর্দায় ঢেকে থাকার কারণে বাস্তব চিত্র দেখা যায়না।অর্থাৎ এমন সমাজে বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের অনুমোদন না থাকায় এমন সম্পর্কগুলো অতি আড়ালে সম্পাদিত হওয়ার প্রধান কারণ।ফলে এমন সমাজ বা রাষ্ট্রে বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কারণে কোন শিশুর আগমন ঘটলে সেই শিশুর স্থান হয় ডাস্টবিনে। কারণ রক্ষণশীল রাষ্ট্র ও সমাজ এমন শিশুর সম অধিকার নিয়ে সামাজিক ভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার সংরক্ষণ করে না।  


কোন সমাজ ভালো, কোন সমাজ মন্দ, কোন সমাজ ব্যবস্থা আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে গ্রহণ করা উচিত সেই পরামর্শ বা বিচারের দায়িত্বে উপরোক্ত কথাগুলো উল্লেখ করিনি। একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে ঐ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের জীবনাচার,কৃষ্টি কালচার,রীতিনীতির উপর ভর করে। তাই কোন প্রথা ভালো, কোন প্রথা মন্দ তা নির্ধারণ করবে ঐ সমাজ বা রাষ্ট্রের মানুষ।এতো বড় পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের বসবাস।বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সামাজিক রীতিনীতি,সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে এক একটা সমাজ ও রাষ্ট্র স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে বিভক্ত।  

কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য আমাদের সমাজে কোন নারী ধর্ষিত হলে ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক,আধুনিক জীবন যাপন,ধর্মীয় বিধিবিধান বহির্ভূত জীবন যাপন ইত্যাদি বিষয়কে সামনে এনে  আমরা ধর্ষণকে পরিত্রাণ দেবার চেষ্টায় মেতে উঠি।যা বাস্তবতার সঙ্গে এমন অভিযোগের বড় রকমের কোন সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়না। 


ধর্মীয় নীতি আদর্শ ও বিধিবিধান অনেক ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তার মানে এই নয় রাষ্ট্র ও সমাজের সকল সমস্যার সমাধান এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে,  শুধু বিশেষ আদর্শ অনুসরণ করলেই সুন্দর ও শান্তির সমাজ বিনির্মাণ করা যাবে। 


এমন যদি হতো তবে ইসলাম ধর্মের পুণ্যভূমি সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশী নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন  নির্যাতনের স্বীকার হয়ে দেশে ফিরত না।যেখানে প্রতি ওয়াক্ত নামাজে মধ্যে তাদের মাতৃভাষায় ধর্মীয় আদর্শ,ন্যায়,নীতি ও মানুষে মানুষের সমতা ও মানবতার বানী শোনানো হয়।  

এমন যদি হতো, তাহলে ভারতের ধর্মগুরু রাম রহিম কর্তৃক পূজারীদের ধর্ষণের গোপন যৌন রাজত্ব গড়ে উঠত না। 

ভারতের কেরালায় রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিশপ কর্তৃক নান ধর্ষণের স্বীকার হয়ে বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামতে হতোনা।

দেশের বোরকা পরা পর্দাশীল নারীরা ধর্ষিত হতোনা।

প্রতিদিন সংবাদ পত্রের পাতায় দাঁড়ি,টুপী, জোব্বা পরা দরবেশ সুরতের মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক শিশু ছাত্র বলৎকারের সংবাদ শুনে আশ্চর্য হতে হতো না। 

তাই যদি হতো, তাহলে পশ্চিমা বিশ্বের নারীরা স্বল্প বসনের পোশাক পরার দরুন প্রতিদিন ধর্ষণের স্বীকার হয়ে রাস্তাঘাটে পড়ে থাকতো। 


একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলতার জন্য কি প্রথা বা নিয়মনীতিকে বৈধতা দিতে হবে তা ঐ সমাজের মানুষের জীবনাচারকে  প্রাধান্য দিয়ে সমাজ বিজ্ঞানীরা গবেষণা করবে। তাদের গবেষণালব্ধ তত্ত্বকে বিচার বিবেচনা করে রাজনীতিবিদরা আইন বানাবে এবং প্রশাসন সেই আইন নিরপেক্ষ ভাবে প্রয়োগ করবে। এটাই প্রক্রিয়া। 


একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি বিশৃঙ্খলার মূল কারণ থাকে অর্থনৈতিক বৈষম্য।যে রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বেশী সেই রাষ্ট্রে অপরাধের হার ততো বেশী।এর প্রধান কারণ একটি রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক শ্রেণী বৈষম্য গড়ে ওঠে  দীর্ঘদিনের বিরাজমান অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা সূত্রপাত হয় যখন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি আইন, শাসন বিচার বিভাগ ভেঙ্গে পড়তে থাকে।এই তিনটি স্তর যখন  রোগাক্রান্ত হয়ে যায় তখন ঐ রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের দুর্ভোগের কোন সীমা থাকে না। যে দুর্ভোগের ক্রান্তিকালের মধ্যে কাটছে বাংলাদেশের মানুষের জীবন। তাই, শুধু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আইন করে এই সমস্যার সমাধান মিলবে বলে যারা আশা করে যারা বসে আছেন তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। যদিনা রাষ্ট্রের রোগাক্রান্ত আইন,শাসন ও বিচার বিভাগকে পরিপূর্ণ ভাবে আরোগ্য লাভ করানো না যায় তবে ধারাবাহিক গুম,খুন,দুর্নীতি,ঘুষের মতই ধর্ষণের মত বীভৎসতা থেকে রেহাই মিলবেনা।এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।   


সূত্রঃ 

১। সৌদিতে গণধর্ষণের শিকার বাংলাদেশি তরুণী


২। ২০০০ নারীকে ধর্ষণ করেছেন রাম রহিম! 


৩। ভারতে খ্রিস্টান বিশপের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে আন্দোলন করছেন সন্ন্যাসিনীরা


৪। তিনি একজন ‘মানবিক’ বলাৎকারকারী

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০

স্মৃতিতে শিল্পী মুহিত আহমেদ জ্যোতি

 


মুহিত আহমেদ জ্যোতি, ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙ্গালী কমিউনিটির সংস্কৃতি অঙ্গনের এক দ্যুতিময় নক্ষত্রের নাম।তিন বছর আগে এই অক্টোবর মাসে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অন্তর্ধান হন এই জ্যোতিময় নক্ষত্র। অদৃশ্যবাস হলেও এখনো প্রিয়জন বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্মৃতিতে জীবন্ত ও হাস্যোজ্জল হয়ে তার ঘুরেফিরে নিত্যদিন। প্রতিবছর অক্টোবর মাস আসলেই সেই বেদনাঘন দুঃখ ভরা দিনটির স্মৃতি দগদগে হয়ে ভেসে ওঠে অনেকের মনে।কবি শামসুর রহমানের কবিতার কয়েকটি পক্তিমালায় মতই এক অভিমান জেগে বসে হৃদয়ের কোনে...... 


তোমার কিসের তাড়া ছিল অত ? 

কেন তুমি সাত তাড়াতাড়ি এই গুলজার আড্ডা থেকে 

গুডবাই বলে চলে গেলে, কেন ? 

আমরা ক’জন আজো, তুমিহীন, বসি এখানেই- 

তক্কে-গপ্পে,গানে-পানে,জমে ওঠে কিছু সন্ধ্যেবেলা।           


৯ অক্টোবর ২০১৭, কাজ শেষ করে কর্মস্থল ত্যাগ করেই হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলাম। যাওয়ার সময় পথে সংগীতশিল্পী আরিফ রানা ভাইয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে একটু থমকে গেলাম।

তিনি লিখেছেনআজকে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পেরেছি বন্ধু মুহিতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ডাক্তারেরা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। একজন সেবিকা জানালেন তোমাদের যা কিছু করণীয় শুরু করতে পার...কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না...একটি অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় আছি... কেন এখনই চলে যাওয়ার তাড়া, অনেক কাজ আছে বাকি, শেষ করতে হবে অসমাপ্ত সব ছবি, ঝগড়া, অভিমান এখনো যে বাকি...।
স্ট্যাটাসটা পড়ে বুকের মধ্যে একটা কাঁপন অনুভব করলাম। মেট্রো থেকে নেমেই এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করে হাসপাতালের দিকে দ্রুত ছুটে গেলাম। হাসপাতালের নিজতলায় সংস্কৃতিকর্মী অলকা দিদিসহ প্যারিসের আরও কয়েকজন মুহিত ভাইকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। দ্বিতীয়তলায় কেবিনের সামনে বসা কয়েকজন সমমনা বন্ধুর বিমর্ষ মুখচ্ছবি বলে দিচ্ছে সত্যি কোনো খারাপ সময়ের অপেক্ষায় আছি। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মুহিত ভাইয়ের কেবিনের আমরা কয়েকজন এগোতে লাগলাম। কেবিনের বিছানায় নিথর পড়ে আছে দেহ, দুই চোখে প্রশান্তির ঘুম। মুখের সঙ্গে লাগানো যন্ত্রের সাহায্যে চলছে শ্বাসপ্রশ্বাস।
আমি কেবিনে দাঁড়িয়ে বুকের স্পন্দন দেখছি আর আশায় বুক বাঁধছিমুহিত ভাই জেগে উঠবেন, সৃষ্টিকর্তা দয়া করে আবার আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেবেন তাঁকে। কিছুক্ষণ পর করিডরে অবস্থান নিলাম। ২০ মিনিট পর ঘড়িতে রাত ৮টা ৪৫ মিনিট। অলকাদি কান্নাভেজা চোখে করিডরে এসে জানালেন, শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র খুলে ফেলা হয়েছে। বুঝতে দেরি হলো না, আশাভঙ্গ হয়েছে, মুহিত ভাই দেহত্যাগ করে ওপারে রওনা হয়েছেন। অর্থাৎ কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেছেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল যে মানুষটি আমাদের মাঝে ঘুরে বেড়াতেন, তিনি এভাবে অতীত হয়ে যাবেন ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল। আবার ভেতরে প্রবেশ করলাম, এবার যন্ত্রপাতি ছাড়া বিছানায় শুধুই মুহিত ভাইয়ের নিথর দেহ। তাঁর সাত-আট বছরের কন্যাসন্তানটি কিছুক্ষণ আগে আশপাশে স্বাভাবিকভাবে ঘুর ঘুর করছিল বাবার সুস্থতার অপেক্ষায়। তাকে এবার দেখলাম অপেক্ষমাণ কক্ষে বাবা হারানোর বেদনায় কান্নাভেজা চোখে। এমন দৃশ্য দেখা ছিল সত্যি কঠিন। 


মুহিত ভাই ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু আচরণে ছিলেন প্রতিভার অহংকারমুক্ত একজন সংস্কৃতি শ্রমিক। দূর পরবাসে বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশের জন্য যে মানুষগুলো নিঃস্বার্থ ও নিবেদিতপ্রাণ, মুহিত ভাই ছিলেন ইউরোপের বাংলা কমিউনিটির সংস্কৃতি অঙ্গনে তেমনি এক শিল্প ভাবনার এক সাধক মানুষ। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা বা আড্ডার সুযোগ আমার খুব কম হয়েছে। যতটুকু কথা, যোগাযোগ ও আন্তরিকতার সৃষ্টি হয়েছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে। তিনি মিডিয়ার ঘোষিত কোনো তারকা শিল্পী ছিলেন না,কিন্তু তার শিল্পকর্মের মধ্যে তারার জ্যোতি ছিল। শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে যে ধরনের আদর্শিক ও চারিত্রিক গুনের মানুষ হওয়া যায়, সেই গুণাবলি তাঁর চলনবলন, কথা ও মানুষের সঙ্গে মেশার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেত। প্যারিসের কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠান তাঁর রং-তুলির আঁচড় কিংবা তাঁর উপস্থাপনা ছাড়া যেন একটু অসম্পূর্ণ থেকে যেত। নিজে নানা গুনের অধিকারী হলেও, সামান্য গুনের মানুষকেও অন্যের কাছে বড় করে উপস্থাপন করতেন। বন্ধু মনে করে কখনো ঠাট্টার ছলে কাউকে কিছু বললে, তা কেউ গ্রহণ করতে না পারলে তা আবার ঠাট্টা মধ্য দিয়ে মুহূর্তেই পরিবেশ আনন্দঘন করার এক সম্মোহনী গুনের অধিকারী ছিলেন। 


প্যারিসে অক্ষর নামে কবিতাভিত্তিক একটি সংগঠনের সঙ্গে আমি জড়িত। ডিজিটাল যুগে সব অনুষ্ঠানে ডিজিটাল প্রিন্টিং ব্যানার ব্যবহার হলেও আমাদের কবিতার অনুষ্ঠানগুলোর ব্যানার হতো মোহিত ভাইয়ের শৈল্পিক হাতের রং তুলির তৈরি ব্যানার দিয়ে। শুধু ব্যানারের কারণেই অনুষ্ঠানের ষাট ভাগ সৌন্দর্য বেড়ে যেত। অনুষ্ঠানের দিন কখনো ব্যানারটি আমাদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন না। নিজের থেকেই মঞ্চসজ্জা থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত সার্বিক সহযোগিতায় পাশে থাকতেন। এত কিছু করার পর আবার মঞ্চে গিয়ে কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতে কোনো বিচ্যুতি ধরা পড়ত না।


একজন শিল্পীর শৈল্পিক সেবার পাশাপাশি যে সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে, সেই কর্তব্যের জায়গায় তিনি ছিলেন যথেষ্ট সচেতন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকটে প্রবাসের যে প্রতিবাদ, মানববন্ধন হয়, সেই সব জাতীয় ও আপামর মানুষের স্বার্থের কর্মসূচিগুলোতে মুহিত ভাইয়ের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত।
প্যারিসের বৃহৎ বাংলা কমিউনিটির মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির তারকা ব্যক্তিত্ব অনেকই রয়েছেন। কিন্তু মুহিত ভাইয়ের মতো সেবক বা শ্রমিকমনা সংস্কৃতি কর্মী আজও সৃষ্টি হয়নি।তাঁর  প্রস্থানে  কমিউনিটির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা আজও পূরণ হয়নি।


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ

সংস্কৃতিকর্মী 

সদস্য,অক্ষর 

প্যারিস, ফ্রান্স ।

ইউরোপের এক বাঙালি সংস্কৃতিকর্মীকে স্মরণ

প্যারিসপ্রবাসী শিল্পী মুহিতের অকালপ্রয়াণ



শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ছাত্রলীগের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরা সময়ের দাবী ।

আওয়ামেলীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তাণ্ডব ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভীত সন্ত্রস্ত সারা দেশের মানুষ।রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী অনৈতিক কর্মকাণ্ডের এমন কোন কর্ম নেই যে তারা করছেনা। বল্গাহীন এই উচ্ছশৃঙ্খলতার লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের দাবী। 

 

ছাত্রজীবনে দুটি ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আমাকে ছাত্র রাজনীতির প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে ছিল।একটি আওয়ামী ছাত্রলীগ অন্যটি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।তখন এই দুটি ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের চিন্তা ভাবনায় প্রগতিশীল মনে হতো।আচার আচরণে মধ্যেও ছাত্রত্ব ভাব ফুটে উঠত। আমার ছাত্র জীবনের ছাত্র রাজনীতির অভিজ্ঞতা বড় কোন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নয়।রাজবাড়ী জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজবাড়ী সরকারী কলেজে অধ্যায়ন কালে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রী’র আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।জেলার সবচেয়ে পুরাতন কলেজ হওয়ায়,স্বাধীনতা পূর্ব থেকেই এখানে ছাত্র রাজনীতির ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত ছিল।বাংলাদেশের প্রতিটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো এই ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে তাদের আন্দোলন সংগ্রামে সরব ছিল।ছাত্র রাজনীতির আমাদের সময়ে এবং পূর্বে ছাত্রলীগকে দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসে সুসভ্য ও নিয়মতান্ত্রিক  ভূমিকায়। ছাত্রলীগকে কখনো ক্যাডার ভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা করতে দেখিনি।অবশ্য তাদের সাংগঠনিক কাঠামোও বেশ দুর্বল ছিল।বরং ক্যাম্পাসে ছাত্র মৈত্রী ও ছাত্র দলের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে মাঝে মাঝেই কলেজ ক্যাম্পাস সহ পুরো শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠত। আমাদের দেশের রাজনীতিতে সাধারণত দল ক্ষমতাসীন হলে ঐ দলের ছাত্র সংগঠন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডে দলের বড় বড় নেতাদের সমর্থন ও ইশারা থাকায় ছাত্র নেতারা অপকর্ম করে পার পেয়ে যায়।কিন্তু, ১৯৯৬ সালে আওয়ামেলীগ ক্ষমতায় আসার পর, আমার মনে পড়ে  না তৎকালীন আওয়ামী ছাত্র সংগঠন  ছাত্রলীগের নেতারা  রাজবাড়ীর বুকে ক্ষমতা অপব্যাবহার করে রাজবাড়ী শহরে উল্লেখ করার মত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, ধর্ষণের মত একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে।এই না ঘটার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, বর্তমানে যিনি রাজবাড়ী ১ আসনের সংসদ সদস্য, তিনি তখনও এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।মানুষ পরিবর্তনশীল, বর্তমানে তিনি কেমন সেটা আমার জানা নেই, তবে তখনকার সময় তিনি ছাত্র সংগঠনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিতেন না। যার ফলে, তৎকালীন রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগকে আওয়ামেলীগের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকালীন সময়েও কখনো দানবীয় চরিত্রে দেখা যায়নি। তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতাদেরকে এখনো আমরা ভদ্র মানুষ হিসেবেই জানি।তাদের নৈতিকতার অধঃপতন এখনো এতো নিম্নগামী নয়।গত বছর দেশে গিয়েছিলাম আমাদের সময়কার ছাত্রলীগের বড় ভাই ও ছোট ভাই যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছে তাদেরকে  দেখেছি কেউ ব্যবস্যা করছে,কেউ চাকুরী করছে, আবার কেউ রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় থাকলেও তাদের নামের পাশে এখনো নোংরা ইমেজের ছায়া যুক্ত হয়নি। রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের বর্তমানের কর্মকাণ্ড কেমন,সেটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আমাদের সময়ের রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগ একটি আদর্শ ছাত্র সংগঠন ছিল তা বুকে হাত দিয়ে বলা যায়।   


মূল রাজনৈতিক দল যদি ছাত্রলীগের কর্মীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আশ্রয় প্রশ্রয় না দেয় এবং তাদের তারুণ্যের শক্তিকে মাঠের রাজনীতিতে অপব্যাবহার না করে, তবে সারা দেশে ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনটি তৎকালীন রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগের মত একটি আদর্শ ছাত্র সংগঠন হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পৃথিবীর নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশান্তি ও অশান্তি

পৃথিবীতে দুই ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যমান।নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র একটি যথাযত আইন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে জনগণের অধিকার সংরক্ষণ করে। অপরদিকে, অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বইয়ের পাতায় লিখিত সাংবিধানিক আইন ও প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।ফলে পদে পদে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুন এমন রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের অনাস্থা সৃষ্টি হয়।জনগণ যে কোন পন্থায় নিজের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব বাধ্য হয়ে নিজেই নিশ্চিতের চেষ্টা করে।ফলে সমাজ এক অনিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়ে। 


একটি মানবিক, জবাবদিহিতামূলক  ও নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ তার আর্থিক সামাজিক নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের আইন ও নীতির উপর আস্থা রেখে নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করে।এমন রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রাপ্তিটুকু রাষ্ট্র জনগণকে বুঝিয়ে দিতে সচেষ্ট থাকে, আবার জনগণের নিকট রাষ্ট্রের প্রাপ্যটুকু রাষ্ট্র নিয়মের মধ্যদিয়ে বুঝে নেয়। জনগণ ও রাষ্ট্র একে অপরের উপর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও আস্থাশীল।রাষ্ট্র ও জনগণ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমন সমাজের মানুষ সৎ কর্মকে জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখে।  


অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ তার জীবনের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য অর্থ ও ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল হয়। রাষ্ট্রের সংবিধানের উপর নয়।ফলে অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের নেশা এমন রাষ্ট্রের মানুষকে চরম দুর্নীতি পরায়ণ ও অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ করে ।নীতি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে পার্থক্যের  বিশেষ কোন ফারাক খুঁজে পাওয়া যায়না।উভয় শ্রেণীর মানুষ বিশ্বাস করে যত বেশী টাকা উপার্জন করা যাবে  জীবন ততো বেশী স্বাচ্ছন্দ্যময়, আরাম আয়েশে ভরা ও নিরাপদ হবে।অধিক অর্থ ক্ষমতার উৎস আর ক্ষমতা মানে মানুষের কুর্ণিশ আর দুঃসাধ্যকে সাধ্যে রূপান্তর। গভীর বিশ্বাস, তাদের বিপদে অর্থ ছাড়া মুক্তির আর কোন মাধ্যম খোলা নেই এবং কোন কিছু অর্জনের জন্য ক্ষমতা ছাড়া প্রাপ্তি নেই।তাই, অর্থ ও ক্ষমতাকে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে এমন রাষ্ট্রের মানুষ যাবতীয় কর্ম পরিকল্পনা সাজায়। কারণ তারা জানে, রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের জন্য প্রদত্ত কল্যাণের প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার বিজ্ঞাপন মাত্র।ফলে জনগণ তার রাষ্ট্রের সংবিধানকে বিশ্বাস করেনা,রাষ্ট্রও জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছা, আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মাথা ঘামায় না।এখানে জনগণ রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়, দুইটি বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা। 

এই সমাজের মানুষ ভাগ্য ও কুসংস্কারের উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। যা আধুনিক, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান মনস্ক ও প্রগতিশীল জাতি গঠনের চরম অন্তরায়।এছাড়া "পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি"এমন প্রবাদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিত্তিহীন। কারণ এমন সমাজে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যেহেতু কোন কিছু সম্পন্ন হয় না তাই গাধার মত পরিশ্রমের পরিবর্তে সুযোগ সন্ধানী হতে হয়।পরিশ্রম করে যোগ্যতা অর্জনের পর যোগ্য আসন মেলে না, কিন্তু অযোগ্য মানুষ তোষামোদি,ব্যক্তিপূজা ও ধূর্ত পথ অবলম্বন করে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বের আসন অলংকরণ করে। এমন নজীর এমন সমাজে ভূরি ভূরি।       

রাষ্ট্রের প্রতি এমন আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস এ সকল রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে আরম্ভ করে একজন শ্রমিক পর্যন্ত প্রতিটি মানুষকে প্রচণ্ড অর্থলিপ্সু,লোভী ও আত্মকেন্দ্রিক  করে গড়ে তোলে।জনগণ নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক উভয় উপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও জীবনের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়। প্রতিমুহূর্তের অবিশ্বাস ও অনিরাপত্তার ভীতি প্রতিটি মানুষকে  উৎকণ্ঠার মধ্যে রাখে।এমন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকেও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অন্যায়ের আশ্রয় নিতে হয় এবং চলমান অনিয়ময়ের ফল অদূরে ভোগের ভয়ে ভবিষ্যতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আরও অনিয়ম করার ছক বা কূটকৌশল আঁটতে হয়। রাষ্ট্রের প্রধান চেয়ার মানুষের কুর্ণিশ এনে দিলেও সেই কুর্ণিশ তাকে আত্মতৃপ্তির প্রশান্তি দেয় না। কারণ তিনি জানেন, এই কুর্ণিশ শ্রদ্ধার অর্জন নয়, এই কুর্ণিশ ভয়ের। রাষ্ট্রের চেয়ার সরে গেলেই কুর্ণিশের পরিবর্তে জনগণের ঘৃণার ঢিল নিশ্চিত ধেয়ে আসবে তার দিকে।


নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একজন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী  জীবনের যে স্বাদ উপভোগ করে জীবন পাড়ি দেয়, একটি অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক ও রাষ্ট্রপ্রধান সেই সেই সুখের কাছাকাছিও যেতে পারে না।  


একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ ব্যক্তিগত অর্থ বিত্তের মালিক না হলেও রাষ্ট্রের উপর ভরসা রেখে নিশ্চিন্ত জীবন যাবন করে। অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ টাকার পাহাড় ও ক্ষমতার চূড়ায় অবস্থান করেও  রাষ্ট্রের উপর আস্থাহীনতা অবিশ্বাস ও অনিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় একটি অনিরাপদ ও দুশ্চিন্তার জীবন অতিবাহিত করে। 


আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবন সুন্দর ভাবে পরিবাহিতের জন্য দরকার একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় ও ক্ষমতার চূড়া  নয়।প্রতিটি মানুষের মধ্যে এই বোধ সৃষ্টি হওয়া একান্ত অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে প্রত্যেকের ভূমিকা অত্যাবশ্যক । 

বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২০

পেই দো লা লোয়ার'য়ে চারদিন। পর্ব - ১


গ্রীষ্মের ছুটি মূলত ইউরোপিয়ানদের নিকট সারা বছরের এক উৎসব আনন্দের প্রতীক্ষা।ইউরোপ জুড়ে গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হয় জুলাই থেকে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রগুলোতে চলে কর্মীদের অবকাশে যাপনের উৎসব।সারা বছরের কর্ম ক্লান্তির বিষাদ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নতুন বছরের জন্য কর্মোদ্যমী হবার লক্ষ্যে বায়ু বদলের জন্য স্থান পরিবর্তনের হুলুর পরে যায় এই সময়।দিগুণ বেড়ে যায় দূরবর্তী বিমান, ট্রেন,বাসের টিকেটের  দাম ।হোটেলে রেস্তোরাগুলো অতিথিদের সেবায় ক্লান্তিহীন কর্ম ব্যস্ত সময় পার করে। 

গ্রীষ্মের ছুটিতে মিশেল ও জান্নাত বাসায় অবসর সময় পার করছে।ইচ্ছে ছিল ওদের নিয়ে এবার সক্রেটিস, প্লেটোর দেশ গ্রিসের রাজধানী এথেন্স ঘুরতে যাবো।প্রথমত এথেন্সের হোটেল ভাড়া ও রেস্তোরাঁর খাবার খরচ ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম এবং অনেক আগে বিমান টিকেট বুকিং করলে সাশ্রয়ী মূল্যে বিমানে যাতায়াত করা যায়।

আমার ছুটির সময় নিয়ে একটু দ্বিধান্বিত থাকায় বিমানের টিকেট দু মাস পূর্বে বুকিং করার পরিকল্পনা থাকলেও তা আর করা হলো না।যখন ছুটির সময় নিশ্চিত হলাম তখন তাৎক্ষণিক টিকেট কাটতে হবে।ইন্টারনেট ঘেঁটে প্যারিস এথেন্সের যাওয়া আসার বিমানের ভাড়া দেখে হতাশ হলাম। কারণ ভ্রমণ বাজেট শুধু বিমান ভাড়াতেই নিঃশেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম ফ্রান্সের মধ্যে কোন সমুদ্রের নিকটবর্তী শহরে এবারের গ্রীষ্মের ছুটি কাটাবার। ইন্টারনেটে ঘোরাঘুরি করে আমাদের ভ্রমণ গন্তব্য নির্ধারণ হলো ফ্রান্সের পেই দে লোয়া (Paye des loir) অঞ্চলের প্রধান শহর শহর নন্তে (Nantes)।ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী ৯ আগস্ট ২০১৯ আমাদের যাত্রা, এবং ফেরা ১৩ আগস্ট।   

বুকিং ডট কমের মাধ্যমে নন্ত শহরের তেরত এলাকায় চার দিনের জন্য একটি এপার্টমেন্ট ভাড়া করা হলো।

Oui sncf এর সাইটে গিয়ে ৯ আগস্টের প্যারিস থেকে নন্তের ভ্রমণ মূল্য তালিকা দেখে নিলাম। সকাল ৭,০০ টায় ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের টিকেটের মূল্য সুলভ হওয়ায় ভোরের ট্রেনে আমাদের যাত্রা নিশ্চিত করলাম।ইউরোপের যাত্রী পরিবহন ভাড়া গন্তব্য অনুযায়ী নির্ধারিত নয়, অনেকটা আমাদের দেশের শেয়ার বাজারের মত, একই গন্তব্যস্থলের ভাড়া একই দিনে শুধু সময়ের তারতম্যে দিগুণ হয়ে যায়,আবার অর্ধেকে নেমে আসে।তাই, ইন্টারনেটে ভালো ভাবে অনুসন্ধান করলে যে কোনো পরিবহণের টিকেট সাশ্রয়ী মূল্যে কেনা যায়।


এখানকার ট্রেনগুলো খুব দ্রুতগামী, তাই যাত্রা পথের বাইরের দৃশ্য ট্রেন থেকে ভালোভাবে দেখা যায়না। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমদের ফেরাটা হবে বাসে।  যদিও ট্রেনের থেকে দুই ঘণ্টা সময় বেশী ব্যয় করতে হবে বাসে ফেরার পথে। 


আমাদের মেয়ে মিশেল, কিছু দিনের জন্য অন্য কোথাও সময় কাটানো তার প্রিয় শখগুলোর মধ্যে একটি। নতুন জায়গায় তার নিজের  বিছানায় শোয়া ,নিজের রুমে ইচ্ছে মত সময় কাটানো খুব উপভোগ করে। ২০১৬ সালে আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম ফ্রান্সের Cean ক শহরে।ছিল দুই দিনের ছোট্ট ভ্রমণ।হোটেলের একটি কামরা ভাড়া করেছিলাম।সেই কামরায় তার জন্য আলাদা ছোট্ট একটি বিছানা ছিল।তার নিজস্ব বিছানা এই ভেবে যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলো, তা দেখে আমি অনেকটাই আশ্চর্য হয়েছিলাম। পাঁচ বছরের এক শিশু,তার নিজের মত কিছু পাওয়ার মধ্যে এতো আনন্দ দেখে আমি ভাবছিলাম, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই  নিজের মত করে চাওয়া থাকে, কারো প্রাপ্তি ঘটে, কারো ঘটে না। প্রাপ্তি যদি ধরা দেয় তাহলে উচ্ছ্বাসটা এমনি হয়।সেটা হোক কোন শিশু বা পূর্ণাঙ্গ কোনো মানুষের।  


এবার পুরো একটা আধুনিক এপার্টমেন্ট চার দিনের জন্য আমাদের।এপার্টমেন্টের সমস্ত স্পেসের ছবিগুলো বুকিং ডটকমের সাইটে রয়েছে।মিশেলের রুমটি ছবিতে বেশ ছিমছাম দেখাচ্ছে।এপার্টমেন্ট বুকিংয়ের পর থেকে সুযোগ পেলেই মিশেল আমাকে তার রুমের ছবি দেখাতে বলে, ছবি দেখার পর সে কি ভাবে দিন কাটাবে সেই পরিকল্পনা সাজায় আমার সাথে।

এর মধ্যে ট্রেনের টিকেটের শর্ত অনুযায়ী তিনটি নির্ধারিত মাপের আলাদা আলাদা লাগেজ কেনা হয়েছে।মিশেলের ব্যস্ততা শুরু হল তার প্রয়োজনীয় খেলনা  সামগ্রী ও কাপড় চোপড় গোছগাছ করতে। যাত্রার পূর্ব দিন পর্যন্ত চলল এই ব্যস্ততা। 

 

আমার চিন্তা বেল্কনি বাগানের ফুল গাছগুলোকে নিয়ে।গ্রীষ্মের সময় প্রতিদিন নিয়ম করে দু বেলা ওদের শরীর ভিজিয়ে না দিলে প্রাণ যায় যায় অবস্থা।এতদিনের যত্নে বেড়ে ওঠা প্রাণগুলো চারদিনের অনাহারে নিঃশেষ হবে, এই ভেবে ভ্রমণ আনন্দ উপর এক কালো ছায়া ছেয়ে আছে।প্যারিসে আমাদের বেশ কিছু পারিবারিক বন্ধু রয়েছে, যেকোনো বিপদে আপদে যখন ডাকি আত্মার টানে পাশে এসে দাঁড়ায়।কিন্তু এবার ফুল গাছগুলোর  জীবন রক্ষার্থে কোন বন্ধুর সাহায্য চাইতে দ্বিধান্বিত হলাম।এখানকার ব্যস্ততা একটু ভিন্ন রকম।কারো পেশাগত কাজের ব্যস্ততা, আবার পেশাগত কাজ না থাকলেও সরকারী প্রশাসনিক দৌড়াদৌড়ি লেগেই থাকে। তাছাড়া পরিবারের নিজস্ব কাজকর্ম এখানে নিজেদেরই করতে হয়।ঘড়ির কাঁটায় সময় মেপে আমাদের প্রবাস জীবন।তবুও এরমধ্যেই একে অন্যের প্রয়োজনে ছুটে যেতে হয়।এভাবেই গড়ে উঠেছে আমাদের প্রবাসী বাঙ্গালি সমাজ।আবার তিক্ত অভিজ্ঞতাও কম নয়।প্রবাসে প্রত্যেকেরই নতুন অবস্থায় জীবনেই চরম বাস্তবতা পাড়ি দিয়ে স্থিতি অর্জন করতে হয়।এই দুর্যোগকালীন সময়ে প্রত্যেকের জীবনেই কোন মহৎ হৃদয়ের মানুষের সংশ্রব ঘটে।যাদের পরামর্শ ও সহায়তায় দুঃসময় থেকে সুময়ের তীরে উঠতে সহজতর হয়। সুসময়ের তীরে ওঠার পর অনেকেই মনে রাখে ওই দুঃসময়ের দুঃসহ স্মৃতি।এমন মানুষেরা সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার বাস্তবতা অনুধাবন করে নতুন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায় হৃদয় দিয়ে।এর বিপরীত মানুসিকতার মানুষের সংখ্যা এই প্রবাসে কম নয়। যারা অন্যের হাত ধরে বিপদ সীমানা পাড়ি দেবার পর বেমালুম ভুলে যায়, তার সেই করুণ সময়ের মুহূর্তগুলো। প্রকাশ ভঙ্গী হয়ে যায়, কখনোই এই প্রবাসে তাকে বিপদ স্পর্শ করেনি।বিশেষ মর্যাদায় তিনি ফ্রান্স সরকারের অতিথি হয়েছেন।অনেকে নিজেদের অনেক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষও ভাবতে থাকেন।এরা নিজেরা খায়দায়, পয়সা জমায়, চার পাশে অন্যের ঝক্কি জামেলা থেকে নিজেদের মুক্ত রেখে নিরিবিলি জীবন যাপন করে।একমাত্র নিজের বিপদ ছাড়া অন্যের সংস্পর্শে যায়না।এদের জীবন ও জগতের একমাত্র সংগ্রাম শুধু নিজেদের ভালো রাখা।আমার নিজের প্রবাস জীবনে বেশকিছু এমন মানুষের সাথে চলার সুযোগ হয়েছে।এদের মূল চরিত্র বুঝতে না পেরে অনেক সময় সামান্য ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি।এমন আচরণে অপমান বোধ করেছি।কিন্তু এই প্রবাসে এদের জীবনে একটু হলেও আমার অবদান ছিল।সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমার নিজের মধ্যে ভিন্ন এক উপলব্ধি জন্ম নিয়েছে। »প্রবাসের প্রকৃত বন্ধু বলতে এখন বুঝি, প্রবাসে নিজের বসবাসের আইনগত অনুমোদিত কাগজ এবং জীবিকা নির্বাহের পেশাগত কাজ » ।এই দুটি জিনিসই হচ্ছে প্রবাসের বুকে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।যাইহোক, এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা কারণে এখন নিজের সমস্যাগুলো নীরবে নিজেই সমাধানের চেষ্টা করি।পরিক্ষিত আপন মানুষদের কাছেও সাহায্য চাইতে দ্বিধায় পড়ে যাই।অনেক সময় বিপদকালীন সময় পার করার পর পেছনের গল্প শেয়ার করি।অনেকে অভিমানও করে,কেন তাদেরকে জানানো হলনা।যাইহোক, ফুল গাছগুলোর জীবন রক্ষার জন্য কাছের দুই একজন বন্ধুকে অনুরোধ করতে চাইলাম, দুই দিন যেন  আমার বাসায় এসে গাছগুলোকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।কিন্তু  দারুণ দ্বিধা চেপে বসায় কাউকেই আর বলা হলনা।

আমাদের ট্রেন ভোরে ,তাই আগের দিন বাসার বড় বড় পাত্রের মধ্যে পানি ঢেলে যতগুলো সম্ভব ফুলের গাছ একত্রিত করে গোড়ার অংশগুলো ডুবিয়ে  দিলাম পানির মধ্যে।চার দিনের মধ্যে প্রিয় গাছগুলোর পরিণতি কি হবে তা না ভেবেই উপস্থিত বুদ্ধিতে এমনটাই করতে হল। 


আমাদের ট্রেন ছাড়বে  প্যারিসের মোঁপারনাস (Montparnasse) স্টেশন থেকে। ০৯ আগস্ট সকালে আমাদের ট্রেন ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়ের কয়েক মিনিট পূর্বে উপস্থিত হলাম প্লাটফর্মে।আমাদের নির্ধারিত ট্রেনের কামরা সহজেই খুঁজে পেলাম।ট্রেনের জানালার পাশের সিটে বসে মিশেল ব্যস্ত হয়ে পড়লো বাইরের দৃশ্য দেখতে।আমাদের গল্প গুজবে কেটে গেলো তিনঘণ্টা সময়।সকাল দশটায় নন্ত ট্রেন স্টেশনে পৌঁছেই বৃষ্টির অঝর ধারা আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল।চুক্তি অনুযায়ী আমাদের এপার্টমেন্টে ওঠার সময় বিকেল তিনটে।আমার হোটেলে চাকুরীর অভিজ্ঞতা রয়েছে।কোন কক্ষ যদি চুক্তি সময়ের পূর্বে প্রস্তুত থাকে তাহলে হোটেল কর্তৃপক্ষ আগত অতিথিকে আসার সঙ্গে সঙ্গে রুমের চাবি দিয়ে দেয়।সেই চিন্তা করে আমাদের এপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের দেয়া ফোন নম্বরে কল করে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কি এখন এপার্টমেন্টে উঠতে পারব কিনা? উত্তরে বলল, এখনো পূর্বের অতিথিগণ এপার্টমেন্টে অবস্থান করছে তাই নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ফ্লাটে চাবি দেয়া সম্ভব হবে না।মাঝে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগেজ নিয়ে ঘোরাঘুরি বিড়ম্বনার সৃষ্টি করবে ভেবে কর্তৃপক্ষকে আমাদের লাগেজগুলোকে কোথাও রাখার অনুরোধ করলাম। তারা একটি ঠিকানা এস এম এস করে পাঠাল। 

এর মধ্যে সবারি  পেটে টান অনুভব হচ্ছে।স্টেশন থেকে বের হবার মুখে একটি রুটির দোকান।ক্ষুধার্ত অপেক্ষমাণ ও আগত  যাত্রীদের উপচে পড়া ভীর।বসার জায়গা না পেয়ে মিশেল ও জান্নাতকে স্টেশনের বিশ্রাম কক্ষে বসিয়ে রেখে শহরের আশপাশ একটু ঘুরে দেখা এবং কিছু খাবার কেনার জন্য বাইরে বের হলাম।স্টেশন থেকে একটু দূরবর্তী এলাকা বেশ নির্জন।আশেপাশের রাস্তা ও অলিগলি হেঁটে একটাও বুলনজারী (রুটির দোকান)  পেলাম না।একটু হতাশ হলাম,পয়সা খরচ করে কোন ভূতুড়ে শহরে এসে পড়লাম কিনা?প্যারিসের বাইরে ফ্রান্সের অন্য শহরগুলোতে যে জনশূন্য ভাব পরিলক্ষিত হয়, সে পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে।রাস্তার মধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হল, তাই বেশী দূর আর না এগিয়ে আবার ট্রেনষ্টেশনের দিকে ফিরলাম।নন্ত রেলস্টেশনটি বেশ বড় এবং ব্যস্ত, এখান থেকে পেই দে লোয়া অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত ছোট শহর ও ফ্রান্সের অন্যান্য বড় শহরগুলোর উদ্দেশ্যে দ্রুতগামী ট্রেনগুলো ছেড়ে যায়।ফিরে এসে দেখি স্টেশনের রুটির দোকানের কয়েকটি চেয়ার টেবিল ফাঁকা পড়ে আছে।আমার স্ত্রী জান্নাতকে ফোন করে রুটির দোকানে  আসতে বললাম। বাইরে থেমে থেমে প্রবল বৃষ্টি।কিছু কেক ও কফি নিয়ে বৃষ্টি থামার প্রতীক্ষায় খাবার দোকানটির মধ্যে কাটিয়ে দিলাম প্রায় এক ঘণ্টা সময়।

স্টেশন থেকে বেড়িয়ে কয়েক পা দূরে বাস স্টেশন।এখান থেকে বড় বড় বাস পেই দে লোয়া অঞ্চলের বিভিন্ন পর্যটন স্থানের  দিকে আগত পর্যটকদের নিয়ে ছুটে যায়।পাশেই রেন্ট এ কারের কাউন্টার,এখানে মটর গাড়ি ভাড়া দেয়া হয়।যাদের ফ্রান্সের অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্সে রয়েছে তারা নির্ধারিত ভাড়া মূল্যে ইচ্ছে অনুযায়ী কয়েক দিনের জন্য এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে পারে।কাউন্টারে বসা এক তরুণীকে বোঁজু(bonjour শুভ সকাল)বলে আমাদের এপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের পাঠানো ঠিকানা দেখিয়ে বললাম,মাদাম কি ভাবে যেতে পারি এই ঠিকানায়, আমরা এই শহরে নতুন কিছুই জানি না। ।ফরাসিরা প্রতিটি ক্ষেত্রে ভদ্রতা সূচক সম্ভাষণ ব্যবহার করে থাকে।যদি সেটা কেউ না করে তাহলে অভদ্রতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।মেয়েটি খুব আন্তরিকতার সহিত আমাদেরকে মেট্রোপলিটন বাস স্টেশনের পথ দেখিয়ে দিলো।প্যারিসে হাতে একটি স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট থাকলে পুর শহরটাই যেন নিজের হাতে, কোথাও যাওয়ার জন্য কাউকে জিজ্ঞাসা না করলেও চলে। গুগল ম্যাপে শুধু গন্তব্যের ঠিকানা লিখে অনুসন্ধান করলেই, কিভাবে,কোন বাস,ট্রাম, কত নম্বর মেট্রো বা ট্রেন ধরতে হবে এবং কোন পথে কতটুকু পথ হাঁটতে হবে সব তথ্য মোবাইলের মনিটরে ভেসে ওঠে।প্যারিসের জীবন যাপনে এভাবেই অভ্যস্ত কিন্তু এখানে এসে একটু হোঁচট খেলাম।গুগল ম্যাপ শুধু দূরত্ব দেখায় কিন্তু কিভাবে যাবো সেই তথ্য দেখায় না।যাই হোক,একটু হেঁটে মেট্রোপলিটন বাস স্টেশন পেলাম, কিন্তু কত নম্বর বাস ধরতে হবে সেই বিড়ম্বনায় পড়তে হল আবার।স্টেশনে অপেক্ষমান এক বাস চালকে আমাদের ঠিকানাটা দেখিয়ে জেনে নিলাম কোন বাস ধরে যেতে হবে।বাসে করে মূল শহরের মধ্যে প্রবেশ করার পর নতুন শহর সম্পর্কে নতুন ধারণা সৃষ্টি হতে লাগলো।আধুনিক শহর কিন্তু জনমানবের তেমন হুড়োহুড়ি নেই। আমরা এই শহরে অচেনা,তাই বাসের ড্রাইভার খুব গুরুত্ব দিয়ে আমাদের ঠিকানা অনুযায়ী কমার্স এলাকার আশে পাশের একটি বাস স্টপেজে নামিয়ে দিলেন।এখান থেকে গুগল ম্যাপের সাহায্যে পায়ে হেঁটে দশ মিনিটের মধ্যে আমরা  গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।আমাদের লাগেজগুলো যেখানে রাখতে এসেছি সেটা মূলত বুকিং ডট কমের মাধ্যমে আমরা যাদের কাছ থেকে এপার্টমেন্ট ভাড়া করেছি সেই প্রতিষ্ঠানের অফিস।আমাদের পরিচয় দেবার পর কর্মরত এক তরুণী লাগেজগুলো রেখে দিলো।এরা মূলত একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে হোটেল ব্যবসা করে।একটি অফিসের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে অথবা মিডিয়া হয়ে কমিশনের ভিত্তিতে এপার্টমেন্ট মালিকদের বাসা ভাড়া দিয়ে থাকে। সুসজ্জিত এপার্টমেন্টগুলো পর্যটকরা ওঠার সময় একবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দেয়, এবং কোন সমস্যা বা প্রয়োজনে এদের অফিসে ফোন করে সমাধান করতে হয়।এখানে এসে ভিন্ন রকমের এক পর্যটন ব্যবসার সাথে পরিচিত হলাম।আমার ধারণা ছিল আমরা হয়তো কোন ব্যক্তির কাছ থেকে এপার্টমেন্ট ভাড়া করছি এবং এপার্টমেন্ট মালিকের কাছ থেকে চাবি বুঝে নেবো। সেই ধারণা এই অফিসে এসে পরিবর্তন হল।তিনতে বাজতে এখনো অনেক দেরী, দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজের সময় হয়ে গিয়েছে।এখান থেকে বেরিয়ে নতুন শহরটি একটু ঘুরে দেখতে লাগলাম আমরা তিনজন।রাস্তার পাশ দিয়ে শৃঙ্খলিত সারি সারি ইউরোপীয় ডিজাইনের ইমারত।রেস্তোরাগুলোতে চলছে ফরাসিদের মধ্যাহ্ন ভোজের আড্ডা। আমাদের পছন্দের রেস্তোরা খুঁজে বের করতে চোখ রাখছি রাস্তার দুই ধারে।ফরাসি রেস্তোরাঁ প্রতিটি শহরেই সহজলভ্য কিন্তু ফরাসি খাবার মেন্যু স্বাস্থ্য সম্মত হলেও আমাদের বাঙালী জিহ্বার পরিপূর্ণ তৃপ্তি মেটাতে অক্ষম এবং দামও বেশী।ইউরোপের কোথাও গেলে আমি প্রথমত খুঁজি তুর্কী গ্রেক স্যান্ডউইচের রেস্তোরা। পোড়ান মাংস,সালাদ এবং বিভিন্ন স্বাদের সস রুটির মধ্যে মুরিয়ে এই স্যান্ডউইচ বানানো হয়।এটি মূলত তুর্কীর খাবার হলেও এই খাবারটির মধ্যে আমি দেশী স্বাদের পরিতৃপ্তি পাই।তা নাহলে, খুঁজি মাকডোণাল্ড, কেএফসি ও অথবা সাবওয়ে চেইন রেস্তোরাঁ। 


অচেনা শহরে বুকে এলোমেলো কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে চোখে ধরা দিলো একটি মাকডোণাল্ড রেস্টুরেন্ট।পাশেই দুটি তার্কিশ কাবাবের রেস্তোরা।মিশেলের একটা ব্যবস্থা হল ভেবে স্বস্তি অনুভব করলাম।কারণ মাকডোণাল্ডের বাচ্চাদের মেন্যুর সাথে একটি খেলনা উপহার থাকে,সেই লোভে মাকডোণাল্ডেরের প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক।

মিশেল মাকডোণাল্ডের মেন্যু আর আমরা দুজন আলজেরি সসের স্বাদে তার্কিশ গ্রেক স্যান্ডউইচ দিয়ে দুপরের খাওয়ার পর্ব শেষ করলাম।খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে রেস্তোরা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে এগুতেই চোখে পড়লো বিশাল এক চত্বর। চত্বরটির মাঝে স্থাপিত  বৃহৎ আকারের একটি ভাস্কর্য।ভাস্কর্যের চারিধার দিয়ে উছলে পড়ছে পানির ধারা।ঝর্ণাধারার ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে পুরো চত্বরে জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত ছোট বড় ভাস্কর্য। যেগুলো মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত ভাস্কর্যের কপি।যেমন আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। এমন সব ভাস্কর্যের সাথে এই চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে  পৌরাণিক গ্রিক দেব দেবতা ও রূপকথার নানা কাল্পনিক চরিত্রের মূর্তি।মনে হল,চত্বরটিতে পৃথিবীর সকল বিখ্যাত ভাস্কর্যদের মিলনমেলা চলছে। এই সম্মিলনে অংশগ্রহণ করতে বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলো ছুটে এসেছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।


এই স্থানটির নাম প্লাস রয়্যাল, নন্ত শহরের কেন্দ্রস্থল বলা হয়।এই বিশাল চত্বরের মাঝে বৃহৎ গোলাকার একটি ঝরনা স্থাপিত এবং ঝরনার চারপাশ দিয়ে কয়েকটি মূর্তি বসানো। নন্তের স্থপতি মাথুরিন ক্রুসি ১৭৮৬ সালে এটির নকশা করেন এবং ১৭৯০ সালে নির্মিত হয়। এই চত্বরে ফ্রান্সের অনন্যা স্থানের মত বিশেষ কোন রাজার মূর্তি রাখা হয়নি কিন্তু স্থানটির আলাদা এক প্রতীকী মূল্য রয়েছে। স্থানটি এই শহরের উৎসব আনন্দ, আড্ডা, রাজনৈতিক সমাবেশ জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। 

আমরা চত্বরের মূল ভাস্কর্য বা ঝরনার চারপাশে সুজজ্জিত ভাবে সাজানো শত শত যে ভাস্কর্যগুলো দেখলাম এগুলো মূলত স্মৃতিসৌধ নির্মাণ শিল্পী স্তেফান ভাগনি  সৃষ্টি ভাস্কর্য।এগুলো মূলত ২০১৯ সালে পর্যটকদের জন্য প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের জন্য এই ঐতিহ্যবাহী চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে।   

কিছু কিছু মূর্তির গায়ে লাগান রয়েছে ছোট ছোট কিছু পোস্টার। একটি পোস্টারের লেখা দেখে ভাবনার জন্ম দিলো। পোস্টারে ফরাসি ভাষায় লেখা «. est la justice» অর্থাৎ বিচার কোথায়।ফ্রান্স নারী পুরুষের সমঅধিকারের দেশ। ঐতিহ্যকে  ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিটি মানুষের রাষ্ট্রীয় ভাবে অধিকার সংরক্ষণ করা হয়।

দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পথ পেরিয়ে ফরাসি জাতি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে।ফরাসি বিপ্লব ফরাসিদের এক অনুপ্রেরণা ও ঐতিহ্য।সেই ইতিহাস অনুসরণ করে কোন ফরাসি জনগণ যদি ভাবে রাষ্ট্রের তরফ থেকে তারা বৈষম্য মূলক আচরণের স্বীকার হচ্ছে, তবে তারা অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠে, রাজপথে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরাও মানুষের চাওয়াকে গুরুত্বের সহিত নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে, মানুষের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।মূর্তির গায়ে লাগান পোস্টারগুলো সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দিলো।এই চত্বরটি যে আন্দোলন সংগ্রাম ও প্রতিবাদ প্রকাশের জায়গা তারই প্রমাণ মিলল সংগ্রামী মানুষদের লাগান পোস্টারে। 


এই চত্বরের মূর্তিগুলির সাথে আমাদের ভালো একটা সময় কাটল। ঘড়ির কাঁটায় বেলা দুটো বাজতেই আমরা ছুটে গেলাম আমাদের লাগেজগুলো সংগ্রহ করতে।এপার্টমেন্ট ভাড়া প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের অফিসের কর্মরত তরুণী আমাদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন, কিভাবে আমাদের এপার্টমেন্টে পৌঁছুতে হবে।এই শহরে মেট্রো- রেল নেই।।পাবলিক ট্রান্সপোর্ট মধ্যে ট্রাম ও বাস সার্ভিস রয়েছে।তিনটি ট্রাম লাইনের মাধ্যমে শহর ও শহরতলিতে সহজে যাতায়াত করা যায়। জটিলতায় না জরিয়ে আমরা হেঁটে মিডিয়াটেক ট্রামষ্টেশনে এলাম।আমাদের যেতে হবে তেরত নামক স্থানে।স্টেশনে ম্যাপ দেখে ট্রামের আমাদের সঠিক দিক নির্ধারণ করে ট্রামে উঠে পরলাম।আমার ধারনা ছিল, নন্ত শহরের আশে পাশে হবে আমাদের এপার্টমেন্ট। কিন্তু ট্রাম একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল।ট্রামের জানালা দিয়ে দেখছি নতুন শহরের চারিধার।গ্রীষ্মের আলোঝলমল দুপুর,সূর্যের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে,রাস্তার ধার ও বাড়ীর আঙ্গিনায়গুলোতে ফুলের সমাহার।সুপরিকল্পিত শহর কিন্তু জনমানবের আনাগোনা খুব কম। যতগুলো বিল্ডিং দাঁড়িয়েছে ততগুলো মানুষ চোখে পড়লনা। মনে হচ্ছে একটি ফুল বাগানের মধ্যদিয়ে আমাদের ট্রাম এগিয়ে যাচ্ছে। এতটাই সুপরিকল্পিত শহর।প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে চলে এলাম আমাদের গন্তব্যের তেরত স্টেশনে।এক পথচারীকে আমাদের ঠিকানা দেখিয়ে জানতে চাইলাম কিভাবে যেতে হবে।ট্রাম স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ।তাই বাসা খুঁজে পেতে খুব বেশী বেগ পেতে হলনা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এলাকা। আমাদের বাসার বিল্ডিংটিও আধুনির নকসায় গড়া।চুক্তি পত্রে উল্লেখিত বাসায় প্রবেশের কোড ও নির্দেশাবলী অনুসরণ করে বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করলাম কিন্তু আমাদের নির্ধারিত ফ্লাট নম্বরের পাশে এসে একটু বিড়ম্বনায় পরতে হল। ধারনা ছিল কেউ একজন এপার্টমেন্টের চাবি এখানে এসে বুঝিয়ে দেবে।কাউকে না পেয়ে একটু হতাশ হলাম।ফ্লোরের অন্যান্য ফ্লাটে উঁকিঝুঁকি দিয়ে কারও দেখা মিলল না।ঠিকানা মত চলে এসে এখন বন্ধ দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে তার উপর এতোবেলা বাইরে এলোমেলো ঘোরাঘুরির ধকলে সবার মধ্যে ক্লান্তি চলে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ এলোমেলো চেষ্টা করে বাধ্য হয়েই এপার্টমেন্ট ভাড়া প্রদানকারী অফিসে ফোন দিলাম। সমস্যা খুলে বলার পর, ফোনের অপর প্রান্তের দায়িত্বরত ব্যক্তি বললেন, আপনার এপার্টমেন্টের প্রবেশ দরজার ডানপাশের নিচে ছোট্ট একটি বাক্স লাগানো রয়েছে, বাক্সটি আপনার চুক্তিপত্রে উল্লেখিত কোড নম্বর দিয়ে খুলতে হবে, ওই বাক্সটির মধ্যে চাবি রয়েছে।ভদ্রমহিলার কথা মত নিচের দিকে তাকাতেই দেখা মিলল দরজার এক কোণে কোড নম্বর সম্বলিত চিকন ম্যাচ বাক্স আকৃতির ছোট্ট কিছু।উল্লেখিত কোড নম্বর সঠিক ভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেলাতেই ছোট্ট বাক্সের দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রবেশ দরজার চাবি।এমন ব্যতিক্রম পদ্ধতির সাথে জীবনে এই প্রথম সাক্ষাত ঘটলো আমাদের। কোন মানুষ ছাড়াই শুধু পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ব্যবস্যা পরিচালনা।বেশ ভালো লাগলো। 

ঘরে প্রবেশ করে দারুণ ভাবে হোঁচট খেতে হল।আমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা পুর এপার্টমেন্ট নোংরা করে রেখেগিয়েছে।সাধারণ ভাবে চুক্তি অনুযায়ী আমাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি এপার্টমেন্ট পাওয়ার কথা।পরিষ্কার বিছানার চাদর ও লেপের কাভার বাইরে প্রবেশ দরজার পাশের তাকে রাখা হয়েছে। ভাবলাম নিজেই রুমগুলো পরিষ্কার করে নেই।কিন্তু বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত মনে করে ফোন দিলাম। কারণ ভাড়া চুক্তির টাকাতো আমাকে সম্পন্নই পরিশোধ করতে হয়েছে। তাহলে তাদের সার্ভিসটাও পরিপূর্ণ দেয়া উচিত।সবকিছু খুলে বলার পর তারা দুঃখ প্রকাশ করলো, বলল দ্রুত একজন Femme de chmbre অর্থাৎ রুম পরিষ্কার কর্মীকে পাঠিয়ে দিচ্ছি  , সে রুমগুলো পরিষ্কার করে দেবে। পনেরো মিনিটের মধ্যে একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণী এলো এপার্টমেন্টে।চারদিন থাকতে হবে, বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি তবুও অনেক কিছু কিনতে হবে। পরিচ্ছন্নকারী তরুণীকে জিজ্ঞেস করলাম আশেপাশে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কারফো বা লিদল আছে কিনা। মেয়েটি বলল, এখান থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথে বড় কারফো স্টোর পাবেন। মেয়েটিকে বললাম, আপনি নিজের মত করে কাজ করুন, আমরা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে এক ঘণ্টা পর ফিরছি। 


রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেল, জনমানবের কোলাহল মুক্ত এলাকা। রাস্তার পাশে একটি গ্রেক স্যান্ডুইচের দোকানে কিছু আরবি তরুণ আড্ডা দিচ্ছে। ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কারফো সুপার স্টোরে কিভাবে যাবো। খুব সহজ করে রাস্তা দেখিয়ে দিলো। নতুন এলাকা আমরা হেঁটে হেঁটে এগুচ্ছি। খুব ভালো লাগছে। আসলে প্রতিটি নতুনের এক আলাদা ভালোলাগা রয়েছে। সে জন্যই হয়তো নতুন এলাকা দেখে মুগ্ধ হচ্ছি।সুবিশাল মার্কেট, প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দোকান রয়েছে।আমরা কারফো সুপার স্টোরে ঘুরে ঘুরে চাল, ডাল, সকালের নাস্তার কিছু ফল ও মিশেলের প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রী কিনলাম।ফিরে এসে দেখি আমাদের এপার্টমেন্টটি চকচকে তকতকে করে মেয়েটি চলে গিয়েছে। মিশেল তার নিজস্ব রুম পেয়ে খুব খুশি। তার লাগেজ রুমে নিয়ে গেল।নিজস্ব কাপড় চোপরগুলো তার আলামারির মধ্যে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখল। মিশেলর রুমে বিশাল বড় জানালা। জানালর ওপাশের প্রশস্ত আঙ্গিনা। রুমের ভেতর থেকে সুবিশাল আকাশ দেখা যায়।সে অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এলাকার আশপাশ দেখতে লাগলো। আমাকে তার রুম থেকে বের করে দিলো।রুমের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত করলো নিজের মত করে।  


আজকে আমরা বাইরে বের হওয়ার কোন কর্মসূচী হাতে রাখলাম না।সবাই গোছল করে ফ্রেস হয়ে নিলাম।নিজেদের কাপড় চোপর গুলো লাগেজ থেকে বের করে আলমারিতে সাজিয়ে রাখলাম। এপার্টমেন্টটি এমনভাবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যে কেউ হঠাৎ করে এসেই থাকতে পারবে। কিচেন, বাথরুম, ড্রয়িংরুম, বেলকনিতে যা কিছু প্রয়োজনীয় সব সাজিয়েগুছিয়ে রাখা হয়েছে।তবে একটা সমস্যায় পড়তে হল। মিশেল কাটুন দেখার জন্য টিভি চালু করলো কিন্তু কোন চ্যানেল দেখা গেলো না। আমাদেরকে ইন্টারনেটের যে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড দেয়া হয়েছে সেটা দিয়ে ইন্টারনেটও চালু করতে পারলাম না। কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলাম, ওরা কিছু নির্দেশনা দিলো কিন্তু সেভাবে চেষ্টা করেও টিভি ও ইন্টারনেট চালু করা গেলনা। মিশেল নতুন বাসা পেয়ে খুব খুশি কিন্তু টিভি দেখতে না পেরে খুবই হতাশ। কিভাবে তার সময় কাটবে। এ বিষয়ে আর সময় ক্ষেপণ  না করে আমি চলে গেলাম রান্নার দিকে। রাতের খাবার তৈরি করতে হবে। আমরা আসার সময় রেডিমেড তেহারি মসলা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। কারফো মার্কেট থেকে কিনে আনা আসিদ্ধ চাল আর গরুর মাংস দিয়ে তেহারি রান্না করে ফেললাম।সারাদিনের ধকলের পর নিজেদের রান্না করা বাঙ্গালি খাবার দারুণ এক পরিতৃপ্তি দিলো। খাবার পর আবার টিভির প্রয়োজনীয়তা অনুভব হল। কিন্তু কোন উপায় নেই


আমরা তিনজন বারান্দায় গিয়ে বসলাম। রাত দশটা বাজলেও সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে।চারদিকে বিজলি বাতি জ্বলে উঠলেও প্রকৃতিতে রাতের আবহ এখনো নামেনি। দিনের আলো কিছুটা রয়ে গিয়েছে।বারান্দার সামনে কোন বড় বিল্ডিং নেই। ছোট ছোট পাভিয় বাড়ী। তাই সন্ধ্যার ফুরফুরে বাতাস হু হু করে ছুটে এসে গায়ে লাগছে।আমাদের এপার্টমেন্টটি দ্বিতীয় তলায়। বিল্ডিঙয়ের নিচে গাড়ি পারকিংয়ের প্রশস্ত জায়গা।পারকিংয়ের পাশের একটি বাড়ীর আঙ্গিনায় চলছে উৎসব আনন্দ।হালকা গানের সাথে অনেকে নাচছে, কেউ পান করছে।বারান্দায় গল্প করতে করতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে এলো। আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় রয়েছে প্রথম দিন নন্ত শহর ঘুরে দেখা।তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার তাড়ায় মধ্যরাতের আড্ডা ভেঙে আমরা চলে গেলাম যার যার রুমে।


পেই দে লোয়া’য় চারদিন। পর্ব - ২


বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০

মধ্যরাতের আতঙ্ক।

১৪ জুলাই রাতে ড্রয়িং রুমে ঘুমিয়েছি। রাত দুটো বাজে, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।জাগতিক পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন প্রায়। চারপাশে কি হচ্ছে কিছুই আমার ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ছে না।পাশের রুম থেকে আমার স্ত্রীর মৃদু কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। ওঠো ওঠো  ……
হঠাৎ তার হাতের ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসলাম।
বললাম, কি হয়েছে ?
বাইরে থেকে কেউ কলিং বেল টিপছে শুনতে পাচ্ছনা?
উত্তরে বললাম শুনিনিতো ।
এবার ঘন ঘন কয়েকবার কলিংবেলয়ের আওয়াজ হলো।
সে বলল, দরজায় গিয়ে দেখ কে সুইচ টিপছে?
এত রাতে কলিংবেল, একটু ভয় কাজ করছে ভেতরে। কে টিপছে কলিংবেল এবং কেন টিপছে?
চোখ মুছতে মুছতে দরজার কাছে দাঁড়াতে আবারও কলিং বেল বেজে উঠল। দ্বিধা সঙ্কোচ ও ভয় নিয়ে দরজা খুলতেই দেখি চেনা মুখের এক তরুণ, উদ্ভ্রান্তের মত বলছে ফু ফু, ছোরতে দো ভোতর আপারতোম, অর্থাৎ আগুন আগুন আপনার এপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে যান। আগুনে পোড়া গন্ধ নাকে ভেসে আসছে। ছেলেটি অন্য একটি এপার্টমেন্টে গিয়ে কলিং বেলের সুইচ টিপতে লাগলো। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। আমার স্ত্রীকে বললাম বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে। আমি ঘুমের পোশাক পরেই শুধু মুঠোফোন এবং এপার্টমেন্টের চাবি পকেটে নিয়ে বের হতে উদ্যত হলাম। মেয়েকে ঘুম থেকে দ্রুত জাগানা হল।আমার স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যাগ সঙ্গে নিয়েই বের হল কিন্তু আমার প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র নেবার কথা মাথায় এলোনা। সম্পদের চেয়ে সময় ও জীবনের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত দরজায় তালা মেরে ওদেরকে নিয়ে বিল্ডিঙয়ের সিঁড়ির দরজার কাছে চলে গেলাম। আমাদের ফ্লোরের অন্যান্য প্রতিবেশীরাও বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে। প্রতিটি তলায় পুলিশ ও দুই আফ্রিকান বংশোদ্ভূত যুবক দরজায় দরজায় গিয়ে মানুষের ঘুম ভাঙ্গিয়ে বাহিরে বের করে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন সিঁড়ি বেয়ে নামছি তখন অন্যান্য এপার্টমেন্টের পরিবারগুলো তাদের শিশু বাচ্চাদের বিছানার কম্বল জড়িয়ে তড়িঘড়ি করে নামার চেষ্টা করছে। পোড়া গন্ধ আরও প্রকট হয়ে নাকে লাগায় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সিঁড়ির দরজায় পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের মধ্যদিয়ে আমরা বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। ১৩ জুলাই বিকেল থেকে আমাদের এলাকায় অসংখ্য পুলিশ সশস্ত্র অবস্থায় প্রহরারত রয়েছে। ১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস, এই দিন রাতে সাধারণত এলাকার তরুণেরা ককটেল ফাটিয়ে আনন্দ উল্লাস করে থাকে। এই উন্মাদনার কারণে অনেক সময় নানা অঘটন ঘটে থাকে।তাই পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন এলাকা অতিরিক্ত নজরদারির মধ্যে রাখে।
রাস্তায় এই গভীর রাতে অসংখ্য মানুষের ভিড় জমে গেছে। পুলিশ বিক্ষিপ্ত লোকজনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিল্ডিঙয়ের দ্বিতীয় তলায় রাস্তার ধারের এপার্টমেন্টে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমেই বেড়ে চলছে। তখন ফায়ার ব্রিগেড এসে পৌঁছেনি। এপার্টমেন্টটিতে একটি পরিবারের বসবাস। এপার্টমেন্টের কলিং বেল টিপে ভেতরে অবস্থানরত মানুষদের জাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু কোন সারা পাওয়া যায়নি। তাই, আফ্রিকান এক যুবক বিল্ডিংয়ের কার্নিশ বেয়ে চলে গেলো এপার্টমেন্টটের রারান্দায়।তার সন্নিকটে জ্বলছে আগুন কিন্তু সে সাহসিকতার সঙ্গে একটি লোহার রড দিয়ে দেয়ালের কাঁচ ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলো।বাহির থেকে ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে সন্ধান করলো ভেতরে কেউ আছে কিনা। কিন্তু কারো সারা না মেলায় ছেলেটি নিচে নেমে এলো। আমরা যখন নিজের জীবন রক্ষায় ব্যস্ত তখন ওই যুবকটি অন্যের জীবন রক্ষার চিন্তায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে ভাবে আগুনের সামনে এগিয়ে গেলো তখন মনে হল পৃথিবীতে মানুষ কত মহান ও মানবিক হতে পারে। সৃষ্টিকর্তা মনে হয় কিছু মানুষকে বিশেষ অনুভূতি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠায়। যারা অন্যের বিপদ দেখলে নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এগিয়ে যায়
পাঁচ মিনিট পর ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি চলে এলো।ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা দ্রুত আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। হালকা পোশাক পরে বাহিরে চলে এসেছি, ঠাণ্ডায় শরীর কাঁপছে। বিল্ডিংয়ের সকল লোকজন রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। সবাই আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রতীক্ষায় উৎকণ্ঠিত সময় পার করছে। দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগায় ফায়ার ব্রিগেড টিমের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে খুব বেশী কসরত করতে হল না। পনেরো মিনিটের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসল।কিন্তু অন্যতলায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য আমাদের কাছ থেকে চাবি সংগ্রহ করে ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা বিভিন্ন তলায় চলে গেলো।সেই সাথে পরিপূর্ণ ভাবে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চলতে লাগলো। সম্পূর্ণ ভাবে নেভানোর কাজ শেষ হতে প্রায় ভোর চারটা বেজে গেলো।কিন্তু কারো বিল্ডিংয়ের ভেতর প্রবেশের অনুমোদন মিলছে না। ফায়ার ব্রিগেডের যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ভোর পাঁচটায় আমরা পুনরায় বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করলাম।
একটি আতঙ্কের রাত পাড়ি দিতে হল।টিভি পর্দায় শুধু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার দৃশ্য দেখেছি কিন্তু ঐ রাতে বাস্তবতার সম্মুখীন হলাম। যে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণকে রাস্তার মোড়ে আরব বখাটে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখি, সেই তরুণই আমাদের মধ্যরাতের ঘুম ভেঙ্গে জাগিয়ে তুলেছিল । অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই তোমাকে ……………
ধারনা করা হচ্ছে রাস্তা থেকে উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের ছোড়া ককটেল ফুটে এই আগুনের সূত্রপাত। যে এপার্টমেন্টটি পুড়ে ছাই হয়েছে, ঐ ফ্লাটের পরিবার গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনে বাইরে রয়েছে। একটি বাসায় একটি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, আসবাস ও দীর্ঘদিনের সংগৃহীত সৌখিন জিনিসপত্র থাকে। নিজেদের রুচি অনুযায়ী সাজানো হয় নিজ বাসস্থল।যদিও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ক্ষতিপূরণ পাবে কিন্তু তাদের শখের সাজানো বাসাটি আগের মত করে পাবে না। দেয়ালে টাঙ্গান শখের পেইন্টিং ও সংগৃহীত সুভেনিরগুলো পাবে না । যখন পরিবারটি ফিরে এসে দেখবে রেখে যাওয়া সাজানো গোছানো নীড়টি ছাই হয়ে বাতাসে উড়াউড়ি করছে তখন কি কষ্টটাই বুকের মধ্যে জমাট বাঁধবে ............।

আতঙ্কের এক রাত  প্রথম আলো 

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

আজ ফ্রান্সে পালিত হল ভিন্ন এক জাতীয় দিবস।

অস্ত্র হাতে ও সমর পোশাকে একটি দেশকে রক্ষার দায়িত্ব শুধু সামরিক বাহিনীর উপরই ন্যস্ত থাকেনা ।একটি দেশের অভ্যন্তরে প্রতিটি পেশাজীবীও দেশকে রক্ষার ভূমিকায় সমান্তরালে অবদান রেখে থাকে ।  ডাক্তার নার্সদের ভূমিকাও যে সৈনিকের মত হতে পারে তা পূর্বে আমরা এতটা গভীর ভাবে ভেবে দেখিনি।কিন্তু করোনাকালে আমরা সেভাবে দেখছি । ফ্রান্সের অর্থনীতির অন্যতম খাত পর্যটন।এর সাথে জড়িত হোটেল, রেস্টুরেন্ট সহ নানাবিধ প্রতিষ্ঠান।এসব খাতে কর্মরত কর্মীগণ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ঘাম ঝরান সৈনিক। এদের শ্রমে ঘামের উপার্জন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ হয়। দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য সৈনিকের অস্ত্র ও পোশাক ঐসব ঘাম ঝরানো কর্মীদের ঘামের মূল্যে কেনা হয়। আমরা সাধারণত কাঁধের উপর রাঙ্কব্যাচ পরিহিত জেনারেলদেরকে বিশেষ ভাবে মূল্যায়ন করে থাকি । রাষ্ট্রের সম্মানের উপর নির্ভর করে একজন জেনারেলের আন্তর্জাতিক মর্যাদ।আর রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মর্যাদা নির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর। সেই ভিত্তিটাই মজবুদ করতে দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির নানা খাতে কর্মরত কর্মীগণ।

আজ ফ্রান্সের জাতীয় দিবস। প্রতি বছর এই দিনে প্যারিসের শনজেলিজে এভিনিউ থেকে প্লাস দ্যো লা কনকর্ড পর্যন্ত থাকে দেশের সামরিক, আধা সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও সামরিক মহড়ার নানা আয়োজন।উপস্থিত থাকে দেশ বিদেশের সম্মানিত অতিথিবৃন্দ ।
এই আয়োজনে প্রধানত গুরুত্ব পেয়ে থাকে দেশের সামরিক বাহিনী। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার জন্যই এই আয়োজন।সাধারণত কুচকাওয়াজ শেষে প্লাস দ্যো লা কনকর্ড অতিথি মঞ্চের সামনে দেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দাঁড়িয়ে মার্চপাস্ট প্রতিবেদনের ক্ষণিক সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করেন তিন বাহিনীর প্রধান। এভাবেই প্রতিবছর দেখি। কিন্তু এবার টিভি পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য সম্পন্ন ব্যতিক্রম মনে হল। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাখোঁ’র মঞ্চের সামনে তার সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছেন তিন বাহিনীর প্রধান, তাদের সঙ্গে আরও দাঁড়িয়ে রয়েছেন কয়েকজন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ।তারা হচ্ছে, ডাক্তার, নার্স, রেস্টুরেন্ট, হোটেল এবং অন্যান্য পেশার পোশাক পরিহিত কয়েকজন বেসামরিক মানুষ। দেখে সত্যি অভিভূত হলাম। দেশের জনগণ দেশের জন্য কাজ করবে আর দেশের সরকার জনগণকে প্রকৃত মূল্যায়ন ও সম্মান প্রদর্শন করবে।এটাই নিয়ম। সেই মূল্যায়ন ও সম্মান এতটা উঁচু পর্যায়ের তাই ভেবেই মনে হয় দুই একজন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দকে অশ্রু ভেজা চোখে দেখা যাচ্ছিলো ।

করোনা শুধু কেরেই নেইনি , উপলব্ধির উন্মেষও ঘটিয়েছে। করোনাকালের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো অন্যান্য পেশার গুরুত্ব নতুন ভাবে উপলব্ধি করছে। তারই চিত্র মিলল আজকের বাস্তিল দিবসের অনুষ্ঠানে।
Vive la France et vive la république

                                   ( লেখা কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়া মানে নিজের মস্তিষ্ককে নিজেই অপমান করা)

শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

বাংলার বর্ষা, প্রবাসী মন ও করোনা কাল।

বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যে বর্ষার আসে এক অনন্য সাজ সজ্জায়। বর্ষার সাথে বাঙালী মনের এক দারুণ সংযোগ।বর্ষা মানে রিমঝিম বৃষ্টির শব্দে হৃদয়ে শিহরণ জাগা।বর্ষা শব্দটি শুনলে, চোখে ভেসে ওঠে থোকা থোকা  ফোটা কদম ফুলের শুভ্র প্রকৃতি,যৌবন ফিরে পাওয়া নদীর বুকে ঢেউয়ের খেলা, জলে টৈটুম্বর খাল বিল, বাদল ঝরা দিনের অলস সময়ে বন্ধুদের তাসের আড্ডা অথবা অজপাড়া গায়ের বৃষ্টি ভেজা মাঠে দুরন্ত ছেলেদের ফুটবল খেলার দৃশ্য।আষাঢ়ের ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি দেখলেই মন চায় ভাপ ওঠা সর্ষে ইলিশের গন্ধে প্রাণ জুড়িয়ে জিহ্বার তৃপ্তি মেটাতে।   
বাংলার বর্ষা মানেই একাকী নির্জনে রবীন্দ্র সুরে বুঁদ হয়ে প্রথম প্রেমে পড়া প্রিয় মানুষের স্মৃতি রোমন্থন অথবা দূরে চলে যাওয়া মনের মানুষের বিরহ ব্যথায় কাতর হওয়া।আবার, হাসনাহেনা, গন্ধরাজের সুবাসিত সন্ধ্যায় দেহ মন সজীব হয়ে ওঠা। আষাঢ় শুধু নিজেই বারি ঝরিয়ে শুষ্ক প্রকৃতির প্রাণ ফিরিয়ে আনে না,বাংলার প্রেমিক প্রেমিকার হৃদয়কেও রসসিক্ত করে তোলে,প্রেমের অনুভূতিগুলো নতুন রূপে ডালপালা মেলে দেয়।হৃদয় হয়ে ওঠে কাব্যময়। তাইতো বর্ষা, বৃষ্টি ও  শ্রাবণ নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র কবিতা গান,যা সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যকে।বর্ষা যেন বাংলার প্রকৃতিতে ঈশ্বরের বিশেষ উপহার।  
বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যে প্রতিটি ঋতু সুশৃঙ্খলিত। বিশেষ রঙ, রস, রূপ,গন্ধে প্রত্যেক ঋতু প্রতিটির থেকে আলাদা এবং স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। যেমন, চারিদিকে যখন প্রচণ্ড তাপদাহ,মাটি ফেটে চৌচির,মানুষ একটু শীতলতার খোঁজে গাছের ছায়া খুঁজে ফেরে,ঘাম ঝরা প্রকৃতিকে শান্ত করতে আকাশে মেঘের গুরুগর্জন ডাক ছেড়ে আষাঢ়ের আগমন ঘটে,ঝুম ঝুম বারি ঝরিয়ে প্রশান্তির পরশ এনে দেয় চারিধারে।অঙ্কুরিত হওয়ার উন্মুখ প্রতীক্ষায় থাকা উদ্ভিদ বীজ মাটি ফুঁড়ে পাতা ছড়িয়ে বেড়িয়ে আসে।খাল বিলে বয়ে যায় মাছের দলের আনন্দধারা।  
প্রবাস জীবনে বাংলার বাদল ঝরা  প্রকৃত বর্ষার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হয়।ফরাসি ঋতু পরিক্রমায় বর্ষা নামে কোন ঋতু নেই।কিন্তু এখানেও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ঝরে, কখনো আচমকা প্রবল বৃষ্টির ধারা এসে ধুয়ে দিয়ে যায় চারিপাশ। কিন্তু এই বৃষ্টি নিয়ে কোন উচ্ছ্বাস নেই ফরাসিদের মধ্যে, বরং বৃষ্টি জেনো ফরাসি জনগোষ্ঠীর মনে গভীর বিষণ্ণতা বয়ে আনে, বিরক্তির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে প্রত্যেকের মুখে। ফরাসি সাহিত্যেও  মর্যাদা পায়নি বৃষ্টি বাদল। এখানকার জীবনধারার  অধিকাংশ সময় কাটে মেঘঢাকা হিমশীতল প্রকৃতির মাঝে।শৃঙ্খলহীন গোমড়ামুখো আকাশ যখন তখন এই ঠাণ্ডা প্রকৃতির মাঝে ঝিরি বৃষ্টি ঝরিয়ে বিষণ্ণ মনের নিরানন্দ আরও বাড়িয়ে তোলে।ফলে বর্ষা বাদল মুক্ত একটি আলো ঝলমল রোদেলা দিনের অপেক্ষা থাকে প্রতিটি ফরাসির মন।তাই, বৃষ্টির সৌন্দর্য ফরাসি হৃদয়ে তেমন আঁচড় কাটতে পারেনা। কিন্তু আমাদের প্রবাসী বাঙ্গালী চোখ  কখন এক পশলা বৃষ্টি ঝরার দৃশ্য দেখলে বাংলার আষাঢ় শ্রাবণ ভেবে আনন্দে শিহরিত হয়। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনলে স্মৃতিকাতর হয়ে কল্পনার  ডানায় পাখা মেলে মন  চলে যায় গ্রামের কোন টিনের চালা ঘরে।    
বাংলার ঋতু পরিক্রমায় এখন চলছে বর্ষা কাল।ঝরছে আষাঢ়ের বাদল। প্রকৃতি জেগে উঠেছে বর্ষার সৌন্দর্যে কিন্তু প্রাণের উচ্ছ্বাস থামিয়ে দিয়েছে করোনা মহামারী।যে প্রাণ বৃষ্টির ছন্দে নেচে উঠবে, সেই প্রাণে আজ মৃত্যু ভয়।ইতোমধ্যে সারা বাংলাদেশে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় আঠারোশ মানুষ। প্রত্যাশা, বর্ষার জলের ধারা যেমন ময়লা আবর্জনা ধুয়ে মুছে প্রকৃতিকে উপহার দেয় নতুন এক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চারিধার , তেমনি আমাদের একে ওপরের চেষ্টা ও সহযোগিতায় অতিশিগ্রই  করোনামুক্ত হয়ে আবার জেগে উঠবে নতুন এক উদ্যমী বাংলাদেশ।আবার বৃষ্টি বাদলের ছন্দ ঢেউ জাগাবে প্রতিটি বাঙ্গালী প্রাণে। 
বাংলার বর্ষা, প্রবাসী মন ও করোনাকাল / প্রথম আলো