বুধবার, ১১ মে, ২০২২

পেই দো লা লোয়ার'য়ে চারদিন (শেষ পর্ব)

আমাদের পেই দো লা লোয়ার ভ্রমণের দিনগুলো স্বপ্নের মত শেষ হয়ে এলো।বিরামহীন যাত্রার মত গত তিনদিন ছুটে বেরিয়েছি নন্ত,ছা-নাজায়ার,পর্ণিক শহর।আবার কখনো এই অঞ্চলে আসা হবে কিনা, জানিনা।এই ছোট্ট শহরের রাস্তাঘাট,ট্রাম স্টেশন, রেস্তোরাঁ, লোয়ার নদী  আমাদের কাছে বেশ আপন হয়ে উঠেছে।তাই ফেরার বেলায় কিছুটা বিদায়ের বিরহ বেদনা হৃদয়ের এককোণে জেগে বসল। 

মনে হচ্ছিলো,প্যারিস ছেড়ে নন্ত শহরের এককোণে আমরা নতুন করে সংসার শুরু করেছি।আমাদের এই নতুন সংসারে কারুরই নিত্য দিনের কাজের তাড়া ছিলোনা,আমাদের প্রধান কাজ ছিল ঘোরাঘুরি  আর দিনশেষে ভ্রমণ ক্লান্তি নিয়ে ক্ষণিকের এই নীড়ে ফেরা।গত চারদিনের আমাদের রুটিনটা ছিল এমন।  

 ভাড়া চুক্তি অনুযায়ী সকাল এগারোটার পূর্বে আমাদের বাসা ছেড়ে দিতে হবে।প্যারিস ফেরার বাস ছাড়বে বিকেল চারটায়। দিনের অনেকটা সময় আমাদের হাতে। এই সময়টুকু শহরের মধ্যে ধীরস্থিরভাবে ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে সকাল সারে দশটার দিকে সবকিছু গোছগাছ করে আমাদের ক্ষণিকের সংসারের মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লাম নন্ত ছন্ত ভিল Nante centre ville এর দিকে। মিডিয়াটেক ট্রাম স্টেশনে নেমে আমরা সরাসরি চলে গেলাম  এপার্টমেন্ট ভাড়া প্রদানকারী কোম্পানির অফিসে। আমাদের ব্যাগগুলো এই অফিসের একজন কর্মরত তরুণীর নিকট রেখে বললাম দুপুর আড়াইটার দিকে আমরা ব্যাগগুলো নিতে আসবো। আমাদের আজ তেমন কোন তাড়া নেই,তাই এখান থেকে বেরিয়ে  খুব ধীরস্থির পায়ে রাস্তার দুই ধারের পুরনো স্থাপত্য নিদর্শনগুলো দেখতে দেখতে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে এগুতে লাগলাম। আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম নন্ত শহরের  অন্যতম এক পর্যটন স্থান পাছাজ পম্মেেরেতে  « Passage Pommeraye »  


পাছাজ পম্মেেরে মূলত নন্ত শহরের একটি অভিজাত বিক্রয় কেন্দ্র। বিভিন্ন বিলাসজাত পণ্যের প্রায় ষাটটি দোকান রয়েছে এখানে।চারদিক সিঁড়ি দিয়ে ঘেরা তিনতলা বিশিষ্ট গ্যালারী আকৃতির বিক্রয়কেন্দ্রটির প্রতিটি দেয়াল ও স্তম্ভের কানায় কানায়  শিল্পকর্ম খচিত,সেই সাথে প্রতিটি তলায় বসানো রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য ।   যা এই বিক্রয়কেন্দ্রটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য।নিজ তলায় একটি গলি রাস্তার মত প্রশস্ত জায়গা রয়েছে, দুইপাশের উন্মুক্ত প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষ এই জায়গা দিয়ে পারাপার হয়। যার দরুন এটিকে পাছাজ বলা হয়। পাছাজ পম্মেেরে মূলত লুই পম্মেেরে নামক একজন তরুণ নোটারী ক্লার্কের নামে নামকরন করা হয়েছে।যিনি ঐ সময়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ও অবহেলিত এই অঞ্চলে একটি বিলাসবহুল বিক্রয়কেন্দ্রের পাছেজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন।এই স্থাপনাটি নির্মাণ কালে তাকে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়।অবশেষে টানা তিন বছরের নির্মাণযজ্ঞের ভেতর দিয়ে ১৮৪৩ সালে রাজা লুই ফিলিপের শাসন আমলে পাছাজটি উদ্বোধন মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। আমরা প্রতিটি তলা বিমগ্ন হয়ে ঘুরে দেখলাম। এটি একটি বিক্রয়কেন্দ্র হলেও মনে হচ্ছিলো আমরা কোন বিখ্যাত কোন মিউজিয়াম পরিদর্শন করছি।এখানে সুন্দর কিছু মুহূর্ত পার করে বাইরে এলাম। 


ফরাসিরা বই পড়া জাতি রাস্তাঘাটে বেরুলেই তার বাস্তব প্রমাণ মেলে। পাছাজ পম্মেেরে থেকে বেরিয়ে প্লাস রয়্যালের দিকে একটু এগুতেই কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াতে হল আমাদের, একটি দোকানের প্রথম তলার বারান্দার গ্রিলের উপর বসে একজন কালো রঙয়ের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত পাঠক গভীর মননিবেশে বই পড়ছে, তার মাথা, ঘাড় ও বইয়ের উপর তিনটি সোনালী রঙের পাখি বসে আছে।ব্যক্তিটি মূলত জীবন্ত মানব নয়,এটি শিল্পী স্তেফান ফিলিপপো’র একটি ভাস্কর্য।ভাস্কর্যটির নাম লো লিসর ওউ ক্যানারি (Le Liseur aux canaris)। নন্ত শহরের আর একটি গর্বের নাম লা লিবেরি কোয়াফার (La librairie Coiffard)। আছিল কোয়াফার Achille Coiffard নামক একুশ বছর বয়সী একজন পেস্ট্রিকেক বানানোর কারিগর  ১৯১৯ সালে একটি বইয়ের দোকান খোলেন। যেটি বর্তমানে লা লিবেরি কোয়াফার নামে বিখ্যাত।লাইব্রেরিটি তার গৌরবের একশত বছর পার করছে।শত বছর উদযাপনকে উপলক্ষ করে ২০১৯ সালের  ৬ জুলাই এই ঐতিহ্যবাহী বইয়ের দোকানের প্রথম তলার বারান্দার বসানো হয় ভাস্কর্য « লো লিসর ওউ ক্যানারি » । চলার পথে লা লিবেরি কোয়াফার এর সঙ্গে পরিচয় হওয়ায় আমাদের পেই দো লা লোয়ার ভ্রমণ আরও সমৃদ্ধ হল। 

আমাদের আজকের মূল পরিকল্পনায় রয়েছে নন্ত শহরে অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ সাতো দে দুক দো ব্রুতান  « Château des ducs de Bretagne » অর্থাৎ ব্রিটানির ডিউকদের দুর্গ পরিদর্শন। আমরা সাব-অয়ে নামক একটি নামকরা স্যান্ডুইচের রেস্তোরা থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে প্রায় পনেরো মিনিটের পথ হেঁটে চলে এলাম সাতো দে দুক দো ব্রুতানের প্রবেশ দ্বারের সামনে। বিশাল দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল আমরা সেই প্রাচীন রাজা বাদশাদের শাসন আমলে ফিরে গেছি। ধূসর রঙের সুউচ্চ দেয়ালে চতুর দিক পরিবেষ্টিত দুর্গ। ঐতিহাসিক ভাবে দুর্গটি তের শতকে নির্মাণ কাজ শুরু হয়, পনেরো শতকে ব্রুতানের সর্বশেষ ডুক ফসয়া দুই এবং তার কন্যা আন এর রাজত্ব কালে দুর্গটির মূল কাজ শেষ হয়, তবে দুর্গটির পরিপূরণ ভাবে নির্মাণকাজ শেষ হয় আঠার শতকে। রাজা ফসয়া তার রাজ শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সামরিক ঘাটি ও রাজকার্য পরিচালনার মূল কেন্দ্র হিসেবে দুর্গটি ব্যাবহার করেন। ১৫৩২ সালে ব্রিটানি ফ্রান্সের অংশ হওয়ার পর ব্রিটানির  ডিউকদের দুর্গে পরিণত হয়। সতের শতকে ফ্রান্সের রাজাদের আবাস্থল, পরবর্তীতে সামরিক ব্যারাক, অস্ত্রাগার,কারাগার হিসেবে দুর্গটি ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় জার্মান দখলদার বাহিনী দুর্গটির উঠানে একটি বাঙ্কার নির্মাণ করে। 











এটি ছয় শতকের একটি অভিজাত দুর্গ।বর্তমানে দুর্গটি ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, রেনেসাঁ শৈলী ও মধ্যযুগের একটি স্মৃতিচিহৃ হয়ে নন্ত শহরের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। 

নিচ তলার দুর্গের কাউন্টারর থেকে আমরা তিনটা টিকেট ও দুর্গের ইতিহাস এবং নক্সা সম্বলিত একটি ব্রুসিওর সংগ্রহ করে ভেতরে প্রবেশ করলাম।পরে  অন্যান্য দর্শনার্থীদের সঙ্গে অমসৃণ দেয়ালের সিঁড়ির সরু পথ বেয়ে ধীরে ধীরে উঠে এলাম উপরে।ভেতরের প্রথম কক্ষের দেয়ালের গায়ে সারি সারি ভাবে টাঙ্গানো রয়েছে রাজপরিবারের ঐতিহাসিক নানা ব্যক্তিবর্গের ছবি সঙ্গে তাদের জীবন বৃত্তান্ত ও কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। আমরা পড়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম।নিরাপত্তা বলয়ে পরিবেষ্টিত চতুর্ভুজ দুর্গটির মাঝে বিশাল আয়তনের উঠান। ছাদের উপড়ে গলির রাস্তার মত চলাচলের সরু পথ।এই পথ ধরে দুর্গটির চতুর পাশে পরিভ্রমণ  করা যায়। ছাদের এই চলাচলের উন্মুক্ত স্থানের নিরাপত্তা দেয়াল এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে সৈনিকেরা সশস্ত্র অবস্থায় সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান করতে পারে । ছাদের এই চলাচলের জায়গা তেমন নক্সায় তৈরি করা হয়েছে। আমরা এই পথ অনুসরণ করে দুর্গটির চতুরদিক ঘুরে শেষ করলাম।দুর্গের অনন্যা তলার বিভিন্ন কক্ষ জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।যেখানে রাজপরিবারের নানা ব্যবহার্য বিলাসজাত পণ্য, চিত্রকর্ম সাজিয়ে রাখা হয়েছে।আমরা সময় স্বল্পতার কারণে অনেক কিছু পরিদর্শন বাদ রেখেই দুর্গের নিচে নেমে এলাম। কিছু সময় প্রশস্ত উঠানে হাঁটাহাঁটি করে বেরিয়ে এলাম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাতো দে দুক দো ব্রুতান থেকে। 




দুর্গের বাইরে চারপাশ শহরের মূল ভূমি থেকে পানিবিহীন দীঘির মত সুগভীর ঘাদ।হয়তো দুর্গ থেকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রাথমিক বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে দুর্গের চারপাশে এভাবে পরিকল্পিত ভাবে খনন করা হয়েছে।এই দীঘিটি সেই সময় হয়তো পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকলেও এখন শুধুই একটি সাজানো গোছানো খাল।খালের নিচ থেকে উপড়ে ওঠার জন্য বেশ কয়েকটি সিঁড়ি রয়েছে। অনেক স্থানীয় ও পর্যটকের দল এই খাদের সুবুজ উপর বসে আড্ডা দিচ্ছে। মিশেল ও সুমিকে কিছু সময়ের জন্য এখানে রেখে আমি চলে গেলাম কে দে প্লন্ত  Quai des plantes অর্থাৎ গাছপালার ঘাট বা প্লাটফর্ম পরিদর্শন করতে।বাগানটির নক্সা করা হয়েছে ট্রেন স্টেশনের প্লাটফর্মের মত করে।যার দরুন এমন নামকরণ করা হয়েছে। সাতো দে দুক দো ব্রুতান থেকে ট্রামে উঠলে তিন স্টেশন পরেই কে দে প্লন্ত। কে দে প্লন্ত হল নন্ত সিটি কর্পোরেশনের কর্তৃক লোয়ার নদীর ধারে বানানো একটি ছোট বাগান।বাগানটি আন দো  ব্রেতান ব্রিজ থেকে লা গার মারিতিম পর্যন্ত লম্বা। ৬০০  মিটার লম্বা এই বাগানটিতে ২০০ প্রজাতির  ১৫০০ গাছ রোপিত রয়েছে। গাছগুলো বড় ড্রাম আকৃতির টবের মধ্যে রোপণ করা। লম্বা বাগানটির মাঝখান দিয়ে  হাঁটার পথ, মাঝে মাঝে বসার বেঞ্চ বসানো।নগর জীবনের ব্যস্ততার ক্লান্তি দূর করতে বৃক্ষ প্রেমীরা সবুজের স্পর্শ নিতে ছুটে আসে এই লোয়ার পারের বাগানে।





ফরাসিদের একটা জিনিস আমার খুব পছন্দ।তাহলো, প্রতিটি আবাসিক এলাকায় শিশুদের খেলাধুলার জায়গা সংরক্ষণ করা এবং জনসাধারণের দেহমন সজীব রাখার জন্য সবুজ গাছপালা সমৃদ্ধ হাটার স্থান বাধ্যতামূলক ভাবে গড়ে তোলা।স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন এই কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করে থাকে। যে আজকে শিশু সে  রাষ্ট্রের আগামী নেতৃত্ব। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যদি পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ নিয়ে গড়ে না ওঠে তবে জাতি অদূর ভবিষ্যতে বিপদের সম্মুখীন হবে অবধারিত, এই ধারনা থেকে ফরাসিরা শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা, বই পড়া,ছবি আঁকা,ভ্রমণ, শিল্প সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি কল্পে শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে তুলেছে খেলার মাঠ সহ নানা বিনোদন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।  

একটি জাতির শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের উপর নির্ভর উন্নয়নের অগ্রযাত্রা।অসুস্থ জাতিগোষ্ঠী নিয়ে কখনো সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা করা যায়না। এই বিষয়টি ফরাসিরা গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করে। তাই ফ্রাসের প্রতিটি শহরে পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলেছে,বৃক্ষরাজি ঘেরা পার্ক, লেক, হাটার জায়গা।প্রতিটি রাস্তার পাশ দিয়ে রয়েছে সাইকেল চালানোর নির্ধারিত স্থান। শহরতলির আশেপাশের প্রাকৃতিক বনভূমি ও জলাভূমিগুলোতে জনসাধারনের নিরাপদ ভ্রমণের  জন্য করে রেখেছে নানা আয়োজন।যার দরুন ফ্রাসের শহরের মানুষদের সবুজের সংস্পর্শে বুক ভরে মুক্ত বাতাস গ্রহণের জন্য ছটফট করতে হয় না।

যখন কে দে প্লন্ত পরিদর্শন শেষে সাতো দে দুক দো ব্রুতানের দিকে ফিরছিলাম তখন মনে হল চারদিন ধরে  পেই দো লা লোয়ার অঞ্চলের তিনটি শহরে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এ কদিনে কোথাও একজন বাঙালির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি।আমরা প্যারিসে অনেকটা বাংলাদেশের মতই জীবন যাপন করি।প্রবাসের নিঃসঙ্গতার কষ্ট খুব একটা স্পর্শ করেনা আমাদের।

 বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই উচ্চশিক্ষারাজনৈতিক আশ্রয়বিভিন্ন বৃত্তিসহ নানা ভাবে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মানুষের শিল্প সংস্কৃতির তীর্থভূমি ফ্রান্সে আগমন ঘটে। শুরুতে এ সংখ্যা নেহায়েত হাতে গোনা হলেও বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় সত্তর হাজারের কোঠায়।এই সংখ্যার অধিকাংশই রাজধানী প্যারিসে বসবাস করে। এছাড়া তুলুজতুলোনবেস্টমারছেইসহ ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও বেশ কিছু সংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস রয়েছে। এখানকার প্রত্যেক বাঙালি জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসবাস করলেও সবার বুকের এক কোণে রয়েছে ছোট্ট একখন্ড বাংলাদেশ প্রতিচ্ছবি।তাই স্ব স্ব পেশার পাশাপাশি শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজস্ব শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতি ও রাজনীতি চর্চা ইত্যাদিতেও রয়েছে তাদের সরব উপস্থিতি। বাংলাদেশের মতো এখানেও বাঙালির চিরাচরিত অনুষ্ঠানশহীদ দিবসস্বাধীনতা ও বিজয় দিবসপহেলা বৈশাখঈদপূজা এবং অন্যান্য উৎসবগুলোর আনন্দ প্রবাসীরা মিলেমিশে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যথেষ্ট উৎসাহ ও উদ্দীপনায় উদযাপন করে থাকে ২১ ফেব্রুয়ারি২৬ মার্চ১৬ ডিসেম্বরের মতো জাতীয় দিবসগুলো। এছাড়া রবীন্দ্র-নজরুল ও অন্যান্য কবি সাহিত্যিকদের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন যেন এক দেশীয় আমেজের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র লাল টিপ ফ্রান্স প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাজী এনায়েত উল্লাহর প্রযোজনা ও প্রবাসী স্বপন আহমদের পরিচলনায় প্যারিসেই নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বসবাস এই ফ্রান্সের প্যারিস এবং প্যারিসের আশেপাশের শহরে।যাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মুকাভিনেতা পার্থ প্রতীম মজুদারএকুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ উল্লেখযোগ্য, এছাড়া প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও ‌সনামধন্য আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনও এই প্যারিস শহরেই বসবাস করতেন। 

সাহিত্যপিপাসু প্রবাসীদের উদ্যেগে মাঝে মাঝেই প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয় গল্পকবিতা ও ছড়া সংকলন। এছাড়া নিয়মিতভাবে বাংলা পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাও বের করা হয় । 

নতুন প্রজন্মেকে তার শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করে দেবার উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছে বাংলা শিক্ষার স্কুল।এছাড়া 

কমিউনিটির বিপদগ্রস্ত মানুষদের  প্রশাসনিক ও তথ্য সংক্রান্ত সেবা প্রদানদের উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি সহায়তা কেন্দ্র।  

দেশের যে কোনো রাজনৈতিক সংকট ও অন্যান্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো এখানেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এখানে শাখা রয়েছে। প্রত্যেকেই যার যার দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে থাকে। আবার অনেকেই স্বপ্ন দেখেন দেশের প্রচলিত রাজনীতির ধারা ভেঙ্গে নতুন আঙ্গিকে একটি বাংলাদেশ গড়ার। এর পরিপেক্ষিতে এখানকার প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রবাসীদের দেখা যায় দেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ডদুর্নীতিঅনিয়মসন্ত্রাস ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ব্যানার ফেস্টুন হাতে প্রতিবাদ জানাতে।

আড্ডা দিয়ে ও খোশ গল্প করে সময় কাটানোয় বাঙালিদের বিশেষ জুড়ি রয়েছেএখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। প্যারিসের গারদো নর্থলাশাপেলক্যাথসমা প্রভৃতি এলাকার রেষ্টুরেন্টক্যাফে বার ও রাস্তার পাশগুলো প্রতিদিন জেগে ওঠে বাঙালিদের রাজনৈতিকসাংগঠনিক আলোচনা ও হাসিঠাট্টায়। 

বাংলাদেশী পণ্য সামগ্রীর দোকানপাট,রেস্তোরাঁ প্যারিসের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে দেখা মেলে। তাই প্যারিস ও প্যারিসের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষের বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে নিজস্ব গোত্রের মধ্যে উৎসব আনন্দ ও ভাবের আদান প্রদান লেগেই থাকে।

আমাদের একটি কবিতা পাঠের সংগঠন রয়েছে, নাম অক্ষর। আমরা নানা উপলক্ষে কবিতা পাঠের আয়োজন করি। আমাদের এই কবিতা পাঠের আসরের নিয়মিত বন্ধুরা একে অপরের আত্মীয়র মত।কবিতা পাঠের আসরে শিল্প সাহিত্য নিয়ে আড্ডা, সঙ্গে বাঙালি খাবারের স্বাদ যেন প্রবাসের বুকে প্রাণের আনন্দ সঞ্চার করে।আমাদেরকে ভুলিয়ে দেয় স্বজনহীন সাত হাজার কিলোমিটারের দূরত্বের কষ্ট।

পেই দো লা লোয়ার অঞ্চলের কোথাও না কোথাও অবশ্যই বাঙালি পরিবারের বসবাস আছে, আমাদের চোখে পড়েনি। কিন্তু এই চার দিনে কাউকে ডেকে বলতে পারিনি ভাই আপনি কি বাঙালি, কেমন আছেন? দূর পরবাসে নিজস্ব ভাষার একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া মানে একজন পরম আত্মীয়ের সন্ধান লাভ করা।  নন্ত একটি সাজানো গোছানো চকচকে তকতকে শহর।দূর থেকে এমন একটি সুন্দর শহরে বসবাস করার ইচ্ছে যে কারো জাগবে। কিন্তু আমার মধ্যে এই চারদিনের ভ্রমণ শেষে একটি পরম উপলব্ধি হয়েছে, যা পূর্বে কখনো এভাবে অনুভব হয়নি। মানুষের যদি নিজস্ব ভাষায় ভাবের আদান প্রদানের সুযোগ না থাকে তাহলে এমন জীবন অনেকটাই সোনার খাঁচায় বন্দী পাখীর মত। আমি মনে মনে কল্পনা করেছি,নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছি,  যদি এই শহরে আমার ভালো বেতনের একটি চাকুরী হয়, চাকুরীদাতা ভালো একটি এপার্টমেন্ট দেয় তাহলে এখানকার আমার জীবনের আনন্দ কেমন হবে? সারাদিন সহকর্মীদের সঙ্গে সারাদিন ফরাসি ভাষায় কথা বলতে হবে। রাস্তাঘাট, বাজার, ট্রামে চেনা মানুষের দেখা মিলবে না। ফরাসি বা অন্য জাতিগোষ্ঠীর কোন সহকর্মী অথবা প্রতিবেশীর আমন্ত্রণে গিয়ে শ্যাম্পেন, কেক,শামুক অথবা স্যামন মাছ খেতে হবে। এমন জীবনধারায় দেহের মধ্যে প্রাণ থাকবে,বাহ্যিক চলাফেরায় পরিপারি দেখাবে ঠিকই কিন্তু মনটা শুকনো মরমরে পাতার মত একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। ফরাসিতে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে, প্রিছন দর « Prison dor » অর্থাৎ সোনার জেলখানা। কথাটির মর্মার্থ হল, কোন মানুষকে যদি চাকচিক্য কোন পরিবেশে থাকতে দেয়া হল, বা কাজ করার সুযোগ দেয়া হল কিন্তু এমন সুন্দর পরিবেশের মধ্যে যদি পারিপার্শ্বিক কারণে  ঐ ব্যক্তি নিজেকে অসুখী অনুভব করে তবে এমন পরিবেশকে প্রিছন দর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সুতরাং যে পরিবেশে মানুষ নিজেকে সুখী অনুভব করতে পারে না সেই পরিবেশ বাইরে থেকে দেখতে সোনার মত চকচকে হলেও তাকে জেলখানা ছাড়া অন্যকিছু বলা যায়না।কোন মানুষ যদি বস্তি এলাকায় বসবাস করে মানসিক প্রশান্তি অনুভব করে তবে ঐ চাকচিক্য পরিবেশর জীবন থেকে তার বস্তি জীবনই যেন স্বর্গবাস। নিজের দেশ ও দেশের মানুষকে আমরা যত সমালোচনা করি না কেন, নিজ জাতিগোষ্ঠী যত পশ্চাৎপদই হোক না কেন, আত্মার শান্তির প্রকৃত উৎস নিজের মায়ের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি, নিজ গোত্র বর্ণের মানুষ মধ্যেই অন্তর্নিহিত থাকে।এক কথা মনে হয়ে কারো অস্বীকার করার উপায় নেই।      

আমি নতুন কোন অঞ্চলে গেলে সেই অঞ্চলের নিয়মকানুনগুলো লক্ষ্য করি।এবার নন্ত শহরে ঘোরাঘুরির মধ্যে একটা ব্যাপার আমার কাছে একটি বাতিক্রম লেগেছে। তাহলো, এই শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা।ট্রাফিক নিয়ম কানুন প্যারিসের মত হলেও গাড়ি চালকদের আচরণ ভিন্ন।ফ্রান্সে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ হয় ডিজিটাল পদ্ধুতিতে কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে। অর্থাৎ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে কোন ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকেনা।গাড়ি চালক ও পথচারী উভয়ই সিগন্যালের লাল বাতি ও সবুজ বাতি অনুসরণ করে রাস্তা পারাপার হয়। উভয় পক্ষই ট্রাফিক আইনকে সর্বদা শ্রদ্ধা করে। ফলে ফ্রান্সে সড়ক দুর্ঘটনা হার উল্লেখ করার মত নয়। 

নন্ত শহরে যতবার আমরা ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে রাস্তা পারাপারের জন্য সবুজ বাতির অপেক্ষা করেছি, ততবারই অবাক হয়েছি। সাধারণত সিগন্যালে লালবাতি থাকলে গাড়ি পার হবে আর পথচারী সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকবে সবুজ বাতির অপেক্ষায় কিন্তু আমরা যতবারই সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকেছি ততবারই গাড়ি চালক রাস্তার মধ্যে গাড়ি থামিয়ে আমাদেরকে হাতের ইশারায় রাস্তা পারাপারের সুযোগ করে দিয়েছে।যেটা তাদের করার কথা নয়। এমনটা আমি অন্য কোন শহরে লক্ষ্য করিনি। প্যারিস ব্যস্ত শহর, তাই কেউ নিয়মের ব্যতিক্রম কিছু সাধারণতই করেনা। নন্ত শহরে মানুষের হুড়োহুড়ি অন্য শহরের মত নয়। তাই হয়তো এই শহরের গাড়ি চালকেরা নিজের অধিকার ছাড় দিয়ে পথচারীর অপেক্ষার কষ্টকে লাঘবের জন্য এমন উদারতা দেখাতে পারে।  

আমাদের দেশে শুধু অনিয়মতান্ত্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থা ও জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইনের না মানার প্রবণতার কারণে প্রতি বছর অনেক মানুষ রাস্তায় অকালে প্রাণ হারায়।  

ঢাকায় ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত হয় ও ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঘটনার দিন থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার রাজপথ সহ সারাদেশে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যালগুলোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছাত্ররা নিজের হাতে তুলে নেয়। বিক্ষোভের মুখে নিয়ন্ত্রণ হারানো দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদেরদের পরিচালিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ চেয়ে দেখা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। এই আন্দোলনের মাধ্যমে একটা ব্যাপার দারুণ ভাবে প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে আরম্ভ করে দেশের নীতিনির্ধারণী স্তর পর্যন্ত কেউই ট্রাফিক আইন মেনে চলে না।রাস্তায় মোটরযান চালানোর সময় সাধারণ মানুষ যেমন গাড়ির বৈধ কাগজপত্র সঙ্গে রাখে না তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মীরাও সরকারী দায়িত্ব পালনকালে গাড়িতে আইনানুগ কাগজপত্র সঙ্গে রাখে না।যা ক্ষুদে বিক্ষোভকারীরা আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আন্দোলনটি সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন লাভ করায় গণবিক্ষোভে রূপ লাভ করে। প্রবাস থেকেও এই আন্দোলনের সমর্থনে নানা কর্মসূচী পালিত হয়। আমি নিজেও অনেক সময় দেশের এমন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা  নিয়ে আবেগঘন অনেক কথা ফেচবুকের পাতায় লিখেছি। মনে হতো, সরকারের দায়িত্বশীলদের অযোগ্যতা ও দেশের মানুষের নিরাপত্তার প্রতি তাদের উদাসীনতার কারণে মানুষকে প্রতিদিন রাস্তাঘাটে অঘটনের শিকার হতে হয়।কিন্তু, দীর্ঘ আট বছর পর যখন ২০১৯ সালে দেশে গেলাম তখন আমার একতরফা ধারণা সম্পূর্ণটাই বদলে গেলো।বুঝতে  পারলাম আমাদের ঢাকা শহরের অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থার মূল কারণ এবং এই সমস্যার উত্তরণের পথ।

আমাদের দেশে এখনো ট্রাফিক বাতি এবং পুলিশের মাধ্যমে রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়।ঢাকা শহর যে পরিমাণ মানুষের বসবাস এবং রাস্তায় তাদের যে ধরণের কর্মব্যস্ততার ছোটাছুটি তাতে মানুষকে ট্রাফিক আইন শিখিয়ে এবং পৃথিবীর যত প্রকার উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রচলন আছে তা ঢাকা শহরে প্রয়োগ করলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সমস্যার পূর্ণ সামাধান সম্ভব নয়। আমাদের দেশের সরকারের দায়িত্বরশীলরা জনগণ বান্ধব নয়  তা আমরা সবাই জানি। সরকার পরিবর্তন হয়ে অন্য যে কেউ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসলেও তার পক্ষে ঢাকা শহরের এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ অপকর্ম যা করার আমরা সেটা আগেই করে ফেলেছি। অপিকল্পিত নগরায়নের কারণে আমাদের আজকের এই কুফল ভোগ করতে হচ্ছে।ব্যক্তিগত লোভ লালসাকে চরিতার্থ করতে ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালীরা মিলে ঢাকা শহরটাকে একটি আধুনিক ঘিঞ্চি বস্তি শহরে রূপান্তর করছে।তার উপর জনসাধারণের অসচেতনতা,আইন না মানার দীর্ঘদিনের প্রবণতা ইত্যাদি ট্রাফিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।এই শহরে গাড়ি চালকরা যেমন বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালায় তেমনি পথচারীরাও ট্রাফিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করে রাস্তা পারাপার হয়। এটি এই শহরের প্রতিদিনের চিত্র।এই সমস্যা সৃষ্টির পেছনে সরকার,গাড়ি চালক এবং পথচারী সব পক্ষই দায়ী থাকলেও  সরকারের অব্যবস্থাপনাই এর প্রধান কারণ।    

ঢাকা শহরের এই সমস্যা সমাধানের এক মাত্র পথ হল, মানুষ যে সমস্ত কারণে ঢাকামুখী হয়ে জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি করে সেই কারণগুলো খুঁজে বের করা। যেমন,চাকুরী, শিক্ষা,উন্নত চিকিৎসা, ব্যবসা বাণিজ্য, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি।সরকার যদি এসব নাগরিক সুবিধার যাবতীয় উপকরণগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের করতে থাকে তবে ঢাকার উপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমতে থাকবে। এতে ট্রাফিক সমস্যা সহ নানাবিধ সামাজিক সমস্যার নিয়ন্ত্রণ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য সহজ হবে।ঢাকা পরিণত হবে শৃঙ্খলিত ও স্বাস্থ্যসম্মত একটি আধুনিক নগরে। ফলে রাস্তায় দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন কমে যাবে তেমনি মানুষের জীবন যাপনও সহজ হয়ে উঠবে।অর্থাৎ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দিকে নজর দেয়া ছাড়া এই নগর জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের হাতে বিকল্প আর কোন পথ খোলা আছে বলে আমার মনে হয় না। ঢাকা হয়তো কখনোই নন্ত বা প্যারিসের মত নগরী হয়ে উঠবে না, তবে এই উন্নত শহরগুলোর মত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব।

এই কথাগুলো নন্ত শহরে দাঁড়িয়ে  দারুণ ভাবে উপলব্ধি হচ্ছিলো।  









আমাদের বাস ছাড়ার সময় প্রায় ঘনিয়ে এলো। কে দে প্লন্ত থেকে সাতো দে দুক দো ব্রুতানে ফিরে এসে সুমি ও মিশেলকে সঙ্গে করে চলে এলাম আমাদের ব্যাগগুলো নেয়ার জন্য এপার্টমেন্ট ভাড়া প্রদানকারী কোম্পানির অফিসে। আমাদের বাস ছাড়বে নন্ত শহর থেকে বেশ দূরের একটি ট্রাম স্টেশনের কাছ থেকে। আমরা একটু অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে ফেলেছি শহরের মধ্যে। আমাদের বাস ছাড়ার স্থান খুঁজে বের করতে হবে, তাই বেশ তাড়াহুড়ো করে আমরা দ্রুত পায়ে হেঁটে কমার্স ট্রাম স্টেশন এসে ট্রামে উঠলাম। আমাদের বাস ছাড়ার দশ মিনিট পূর্বেই চলে এলাম আমাদের গন্তব্যের স্টেশনে। ট্রাম থেকে নেমে স্থানীয় পথচারীদের কাছে জিজ্ঞেস করে দ্রুত বাস স্টেশনের দিকে চলে এলাম।আমাদের বাস খুঁজে পেতে কোন বেগ পোহাতে হলো না।তবে কোন কারণে কয়েক মিনিট দেরী করলেই বাস মিস করতে হতো। আমাদেরকে আরও সতর্কতার সঙ্গে ন্যূনতম আর ত্রিশ মিনিট আগে নন্ত ভিল থেকে ট্রাম ধরা উচিত ছিল। কারণ,দুর্ঘটনা এড়াতে অচেনা জায়গা খুঁজে বের করার জন্য সর্বদা সময় হাতে রাখা উচিত।  

আমাদের বাস নির্ধারিত সময়ে  পেই দো লা লোয়ার ছেড়ে প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ইট পাথরের শহর পেরিয়ে প্রবেশ করলো প্রকৃতি মাঝে।কখনো ধুধু প্রান্তর, কখনো প্রাকৃতিক বনভূমি মধ্য দিয়ে বাস এগিয়ে যেতে লাগলো।বাসের সব আসন পরিপূর্ণ না থাকায় আমি আর মিশেল মাঝে মাঝে আসন পরিবর্তন করে  জানালা দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের করতে লাগলাম।মিশেল দীর্ঘক্ষণ ধরে জানালা দিয়ে বুনো খরগোস দেখার জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু ওর চোখে ধরা পড়ছে না। ও বিরক্ত হয়ে ওর মায়ের কাছে চলে যেতেই আমার চোখে ধরা দিলো রাস্তার ধারের জঙ্গলের মধ্যে একটি বুনো খরগোসের ছোটাছুটির দৃশ্য।বিষয়টি  মিশেলকে বলতেই ও আবার আমার কাছে এসে বসলো। আমরা দুজন আবার অপেক্ষা করতে লাগলাম। বিস্তীর্ণ ফসলী মাঠ, চোখের দৃষ্টির সীমানায় কোন মানুষ, বাড়িঘর নেই এমন বিরান পথের মধ্য দিয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চলছে।শেষ বিকেলের শান্ত শীতল বাতাস জানালা ভেদ করে এসে মুখে লাগছে।হঠাৎ চোখে ধরা দিলো হৃদয় ছোঁয়া একটি মনোরম দৃশ্য। মহাসড়ক থেকে কিছুটা দূরে মরা বুনো ঘাস ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা ছোট্ট পুকুরের মত একটি পাকা পানির হাউজ, হাউজের এক পাড়ে সামনের দু পা কিছুটা ভেঙ্গে একটি বন্য হরিণের বাচ্চা পানি পান করছে।দৃশ্যটি মুহূর্তেই আমার হৃদয়কে ভাষাহীন ভালোলাগায় আন্দোলিত করলো। কারণ, জীবনে এই প্রথম আমার বন্য হরিণ দেখা।মিশেলকে হাতের ইশারায় দৃশ্যটি দেখাতে চেষ্টা করলাম , কিন্তু ও আমাকে বার বার, কোথায় হরিণ বাবা?  জিজ্ঞেস করতে করতেই বাসের চলমান গতি দৃশ্যটিকে আড়াল করে দিলো। ফ্রান্সে প্রায় প্রতিটি মহাসড়কের দু পাশ দিয়ে প্রচুর প্রাকৃতিক বনভূমির দেখা মেলে। এই বনগুলোতে প্রচুর বন্য হরিণের বিচরণ রয়েছে।এই সব বন্যপ্রাণী শিকার করা ফ্রান্সে কঠোর ভাবে নিষেধ।মহাসড়কের যেসব এলাকায় বনভূমি রয়েছে সেসব এলাকায় মটর যানের গতিসীমা বেঁধে দেয়া রয়েছে এবং বিশেষত যেসব জায়গা দিয়ে হরিণ রাস্তা পারাপার হয় সেই জায়গাগুলোতে হরিণের চিহ্ন সম্বলিত সতর্কতা সংকেত বসানো রয়েছে। যাতে বন্যহরিণগুলো যেন কোন প্রকার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ না হারায়।   

আমাদের বাস যে বিরান এলাকার মধ্যদিয়ে যাচ্ছিল সেখান থেকে অনেক দূরে দূরে কিছু বন বাদাড় দেখা যাচ্ছিল, ঐ সব বন বাদাড়ে মূলত বন্য হরিণের আবাস।কোন মাংসাশী প্রাণী বা মাংস লোভী মানুষের দ্বারা শিকার হওয়ার ভয় না থাকায় এরা দিনের বেলায় খাস পাতা খাওয়ার জন্য জঙ্গল থেকে বিরান এলাকায় ছুটে আসে এবং নির্ভয়ে বিচরণ করে।এই বিরান মাঠে  বিচরণ করা হরিণ, খরগোস,ব্যাঙ, সাপ পোকামাকড়ের পানির তৃষ্ণা মেটানোর সুবিধার্থে স্থানীয় প্রশাসন পাকা করে ছোট ছোট হাউজ বানিয়ে রেখেছে।

ফ্রান্সের প্রশাসন মানুষের নিরাপত্তা বা সুবিধার জন্য যেমন বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেন তেমনি বন্যপ্রাণী,পাখিদের সুবিধা ও নিরাপত্তার জন্যও নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনার করে থাকে।যেমন, প্রত্যেকটা সিটি কর্পোরেশন বুনো কবুতর ও অন্যান্য পাখিদের আহারের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিদিন চাল,গম ছিটিয়ে দেয়। পাখীগুলো ক্ষুধা নিবারণের পর মনের আনন্দে আকাশ পানে ডানা মেলে। তাছাড়া ফরাসি জনগণ পশু পাখির প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল, যার দরুন কেউ শস্য দানা হাতে করে এখানকার বুনো কবুতর, চড়ুই পাখির সামনে দাঁড়ালে পাখিগুলো অচেনা অজানা মানুষটির হাতে বসে খাবার খায়। বিন্দুমাত্র ভয় পায় না।আবার পোষা কুকুর বেড়ালকে ফরাসিরা নিজ সন্তানের আদর স্নেহে লালন পালন করে থাকে।ফ্রান্সে বছরে একবার জুলাই আগস্টের দিকে এক সপ্তাহের মত প্রচণ্ড তাপদাহ বিরাজ করে।পীচ ঢালা রাস্তা সূর্যের তাপে নরম হয়ে যায়।এই সময় দেখেছি অনেক ফরাসি পার্কের পোকা মাকড় ও পাখীদের কথা চিন্তা করে ছোট্ট পাত্রে পানি ভরে গাছের নিচে রেখে আসে। ফরাসিদের অন্য প্রাণী ও পাখির প্রতি এমন মমত্ববোধ আমাকে দারুণ ভাবে অভিভূত করে। 


প্রতিবছর ২৫ ডিসেম্বর খ্রিস্টধর্মীয় বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে লক্ষ লক্ষ ইউরোর ক্রিসমাস ট্রি বিক্রি হয়। এই গাছকে ফরাসিরা বলে ছাপা দো নোয়েল Sapin de Noël।বিভিন্ন দামে ছোট বড় এই ছাপা দো নোয়েল বিক্রি হয় ফুলের দোকান সহ বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে শুধু খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসী মানুষইরাই এই গাছ কেনে না, উদার চিন্তা ধারার অন্য ধর্ম বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মানুষজনও ছাপা দো নোয়েল কিনে গাছটিকে শৈল্পিক ভাবে অঙ্গ সজ্জা করে ঘরের এক কোণে রেখে দেয়।এর কারণ, ইউরোপে বড় দিনের উৎসবটি মূলত শুধু ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে।এখানকার ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীরা সারা বছর গির্জায় না গেলোও এই উৎসবটি ধুমধাম করে পালন করে থাকে। বড় দিনের সঙ্গে  ছাপা দো নোয়েলের সম্পর্ক যেন অঙ্গাঙ্গি।আমার ধারনা ছিল, এই বিশেষ গাছটি হয়তো বড়দিন উপলক্ষে বিভিন্ন বন থেকে কেটে এনে বিক্রি করা হয়। কিন্তু, বাসের জানালা দিয়ে যখন দেখছিলাম মাঠের পর মাঠ পরিকল্পিত ছাপা গাছের মাঠ, কোথাও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে রোপিত হওয়া ছোট ছোট ছাপা গাছের চারা তখন আমার ধারনা বদলে গেলো। এই গাছটির পুরো ইউরোপ জুড়ে ব্যাপক চাহিদা থাকায় অনন্যা ফসলের মতই বাণিজ্যিক ভাবে মাঠে চাষ করা হয় এবং বিক্রয় উপযুক্ত হলে নয়েল উপলক্ষে কেটে বাজারজাত করা হয় । 

বনবাদার, খোলা প্রান্তন মাড়িয়ে আমাদের বাস এসে থামল প্যারিসে। মনে হল, অনেক দিন যেন চেনা শহর থেকে দূরে ছিলাম। এই কয়েক দিনের বিরতিহীন ভ্রমণ আনন্দে ভুলে গিয়েছিলাম আমার বারান্দা বাগানের ফুল গাছগুলোর কথা।টানা চারদিন অনাহারে জীবন কেটেছে গাছগুলোর। বারান্দার কার্নিশে আমার প্রিয় মেরীগোল্ড ফুলের শত শত গাছগুলো কি বেঁচে আছে? যাদের শরীরে দিনে দুবেলা পানি ছিটিয়ে না দিলে নেতিয়ে পড়ে। বাস থেকে নেমে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় মনের মধ্যে এমন শঙ্কা জেগে বসলো ।বাসায় পৌঁছেই প্রথমেই ছুটে গেলাম বারান্দা বাগানে। বড় পাত্রে পানি ঢেলে যে গাছগুলো ডুবিয়ে রেখে গিয়েছিলাম সেই গাছগুলো আরও বড় হয়েছে। কার্নিশের গাছগুলোর পাতা শুকিয়ে ডাটা দাঁড়িয়ে আছে। টবের অনেক গাছের জীবন যায় যায় অবস্থা।আমি এক মুহূর্ত দেরী না করে গাছে পানি দেওয়ার ঝাঁঝরিতে দ্রুত জল ভরে বাগানের প্রতিটি গাছ ভিজিয়ে দিলাম।মনে হল,আমি যেন ধু ধু মরু পথ পেরিয়ে আসা একদল তৃষ্ণার্ত পথিকের পাশে শীতল জলের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করালাম। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বারান্দার টবের গাছগুলো আবার জেগে উঠেছে। নেতিয়ে পড়া পাতাগুলো আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সবুজের দ্যুতি ছড়াচ্ছে ……।।     

পেই দো লা লোয়ার'য়ে চারদিন। পর্ব - ৪ ( পর্ণিক)

পেই দো লা লোয়ার'য়ে চারদিন। পর্ব - ৩ ( ছা-নাজায়ার)  

পেই দো লা লোয়ার'য়ে চারদিন। পর্ব - ২  

পেই দো লা লোয়ার'য়ে চারদিন। পর্ব - ১    

সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২২

অভিজ্ঞতায় ফরাসি নির্বাচনের ভোট গণনা পদ্ধতি

বেশ কয়েকবার ফ্রান্সের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট প্রদান করায় ফরাসি ভোট গ্রহণ পদ্ধতি সম্পর্কে আমার ধারণা রয়েছে।এখানে সর্বাত্মক সতর্কতা ও সততার সঙ্গে প্রতিটি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়।এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তবে ভোট গ্রহণ শেষে কি পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হয় এ ব্যাপারে আমার মধ্যে দীর্ঘদিনের অজানা কৌতূহল ভর করে ছিল। আজকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট প্রদানের জন্য ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার পর যখন ব্যালট সংগ্রহ করতে গেলাম তখন কেন্দ্রের একজন দায়িত্বশীল আমাকে প্রশ্ন করলো, মসীয় আপনি কি সন্ধ্যা আটটার সময় ফ্রি আছেন? আমি উত্তরে বললাম হ্যাঁ ঐ সময় ফ্রি থাকবো, তবে কেন।পরে সে আমাকে বলল ভোট গণনায় সাহায্য করার জন্য। আমি মুহূর্তেই তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলাম। আমার ভোট সম্পন্ন হওয়ার পর একজন কর্মকর্তা আমার  কার্ত এলেকতোরাল carte électorale রেখে দিলেন।বললেন, ভোট গণনার পর আপনার কারত ফেরত দেওয়া হবে।


আমি যথাসময়ে পুনরায় ভোট কেন্দ্রে  উপস্থিত হলাম।আমার মত আরও অনেকেই এসেছেন ভোট গণনায় সহায়তা করার জন্য । সন্ধ্যা আটটা  বাজার সঙ্গে সঙ্গে ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হল।আমরা যারা ভোট গণনার জন্য গিয়েছি, তাদের মধ্য থেকে চার জনের  এক একটি গ্রুপ তৈরি করে এক একটি টেবিলে বসিয়ে দেয়া হল। পরে কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ব্যালট বাক্স খুলে একশটির এক একটি ব্যালটের খাম সম্বলিত অনেকগুলো প্যাকেট তৈরি  করলো।এক জন দায়িত্বশীল প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবক টিমকে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে ভোট গণনা করতে হবে। পরে, প্রত্যেক গণনাকারী সেচ্ছাসেবী টিমের টেবিলে একটি করে ব্যালটের প্যাকেট ও দুইটি করে ভোট গণনার ফর্ম দেয়া হল। আমাদের টেবিলে খামে আটা ব্যালটের একটি প্যাকেট দেয়া হল। আমরা প্রথমেই প্যাকেটটি খুলে ব্যালটের একশটি ব্যালটের খাম আছে কিনা চারজন গুনে নিশ্চিত হলাম। এরপর আমাদের মধ্যে একজন দায়িত্ব নিলেন ব্যালটের খাম খোলার, দুইজন দায়িত্ব নিলেন ভোট গণনার ফর্ম পূরণের, অন্য একজনের দায়িত্ব  হল যখন ব্যালটের খাম খুলে প্রকাশ হবে ভোট প্রাপ্ত প্রার্থীর নাম তখন ঐ উন্মুক্ত ব্যালটটি সংগ্রহ করে দুই প্রার্থীর দুইটি পৃথক ভাগে ব্যালটগুলো সাজিয়ে রাখা। আমরা চারজন এই প্রক্রিয়ায় একশ ভোট গণনা সম্পন্ন করলাম।পরে আরও পঁচাত্তর ব্যালটের একটি প্যাকেট দেয়া হল। 

আমাদের চারজনের সেচ্ছাসেবী টিম মোট একশত পঁচাত্তর ভোট গণনার কাজ সম্পন্ন করার পর দুইজন ফর্ম পূরণকারী মিলিয়ে দেখলেন দুই প্রার্থীর ভোট এবং বাতিল ভোট মিলে একশত পঁচাত্তর সংখ্যা পূরণ হয়েছে কিনা।

সর্বশেষ গণনা ফর্মে প্রার্থীদের ভোটের সংখ্যা ও আনুষঙ্গিক ঘর পূরণ করার পর ফর্মের নিচে প্রত্যেকেই নামসহ সাক্ষর প্রদান করে ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের নিকট হস্তান্তর করলাম।আমারদের কার্ত এলেকতোরাল carte électorale ফেরত দেয়া হল। এরপর গণনা সম্পন্ন হওয়া ব্যালটগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আমরা কেন্দ্র থেকে যার যার মত বাইরে চলে এলাম। 


উল্লেখ্য,প্রত্যেকটা ভোটের ব্যালট খামের মধ্যে থাকার কারণে ভোট চলাকালীন সময়ে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের  মধ্যে জমাপরা ভোট দেখে অনুমান করা যায়না কোন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে এগিয়ে আছে । 


নির্বাচনের আরও  স্বচ্ছতার জন্য  ভোট গণনার পদ্ধতিও অভিনব।সকালে ভোট  শুরুর আগে কেন্দ্রের নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আমরা যারা ভোট গণনার কাজ সম্পন্ন করলাম তারা কেউই জানতাম না দিন শেষে কারা  ভোট গণনা কাজ করবে ।ভোট চলাকালীন সময়ে আমাকে যে ভাবে ভোট গণনার কাজে সহায়তা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে,ঠিক সেভাবেই অন্যান্য সেচ্ছাসেবীদেরকেও ভোট গণনার কাজে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আমরা সেচ্ছাসেবীরা যখন ভোট গণনার কাজে ব্যস্ত ছিলাম তখন সবাই ছিলাম সম্পন্ন প্রভাবমুক্ত।    


 বর্তমান ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ প্রার্থী হয়ে তার অধীনেই এই নির্বাচন সম্পন্ন হল। এই জয় পরাজয়ে রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হতে পারে কিন্তু ভোট গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ নিয়ে সন্দেহ পোষণের কোন সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন,এখানে ভোট চলাকালীন সময়ে প্রশাসন, কোন রাজনৈতিক দল বা বাইরের কোন শক্তির প্রভাব খাটানোর বিন্দু পরিমাণ সুযোগ নেই।  


আমরা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ  উন্নয়ন বলতে শুধু ইট কাঠ পাথরের দালান কোঠা,ব্রিজ  কালভার্ট, পাকা রাস্তা বুঝি, অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের মানুষ অবকাঠামো  উন্নয়নের সঙ্গে উন্নয়ন বলতে ব্যক্তি ও জাতিগত সততা, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা, সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধের মানের স্তরকেও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে থাকে।যার  প্রতিচ্ছবি তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সহ প্রতিক্ষেত্রে ফুটে ওঠে।যা সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।  


স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত দেখার সুযোগ পেয়ে খুব ভালো লাগলো।ফরাসিরা কিভাবে গণতন্ত্রকে  শ্রদ্ধা করে এমন ভোট গ্রহণ পদ্ধতি যেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।একটি ভোটের সঙ্গে থাকে জড়িয়ে থাকে একটি জাতির ভবিষ্যৎ।গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে  ফরাসিরা সেই ভবিষ্যতের দিন নির্ধারণ করলো আজকের ভোটের মাধ্যমে।গণতন্ত্র মানে যে ভোট চুরি করে ক্ষমতায় গিয়ে ব্যক্তির ভূরি মোটা করা নয়, তা ইউরোপের দেশগুলোর ভোট ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ না করলে কখনোই বোঝা সম্ভব নয়।


সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের জয় হোক,প্রতিটি মানুষের মত মর্যাদা লাভ করুক সেই প্রত্যাশা রইলো ......

শুক্রবার, ১১ মার্চ, ২০২২

মানুষের প্রকৃত শ্রেণী এবং প্রসঙ্গ সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত

আমাদের মধ্য অনেকেই নিজেকে একজন সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে।বাংলাদেশে সাধারণত হিন্দু,বৌদ্ধ ,খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী  ও উপজাতীয়রা নিজেদের সংখ্যালঘু দাবী করে থাকেন এবং রাষ্ট্রীয় ভাবেও এই সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত হয়।

ভারতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ ব্যতীত অনন্যা ধর্মাবলম্বী ও উপজাতীয়রা নিজেদেরকে সংখ্যালঘু দাবী করে থাকেন। 

সংখ্যালঘু শব্দটির সাথে দুর্বলতা, দয়া,করুণা,অনুগ্রহ মিশ্রিত ভাব মাখানো। অর্থাৎ, কোন মানুষ যখন নিজে থেকেই বলে আমি একজন সংখ্যালঘু ,তখন তাকে খুব দুর্বল মনে হয়,তার প্রতি এক ধরনের করুণার ভাব জেগে ওঠে।কারণ তিনি সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের দলের মানুষ নয়।শক্তিশালী সংখ্যা গরিষ্ঠরা  তাকে যে কোন সময় ছোবল দিয়ে গ্রাস করতে পারে। 


মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু শ্রেণী নির্ধারণের পূর্বে প্রথমেই ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে একটু আলোচনা দরকার। প্রতিটি ধর্মের অনুসারী অদৃশ্য শক্তি বিশ্বাস করে, মৃত্যু পরবর্তী জীবন বিশ্বাস করে,পাপ পুণ্যের ফলাফল বিশ্বাস করে, নিজের ধর্মীয় আদর্শকে শ্রেষ্ঠ আদর্শ দাবী করে সেই আদর্শের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর বুকে মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।সেই বিবেচনায় পৃথিবীর এমন বিশ্বাসের মানুষদের এক গোত্রের মানুষ বলা যায়।পৃথিবীতে আর এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে যারা অদৃশ্য শক্তি বা কোন বিশেষ ধর্মে বিশ্বাসী নয়। যাদেরকে বলা হয় নাস্তিক অথবা অজ্ঞেয়বাদী। যাদের সংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ষোল শতাংশ। অর্থাৎ,মানুষকে বিশ্বাসী অবিশ্বাসীদের দলে বিভক্ত করলে পৃথিবীতে ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অবিশ্বাসী মানুষ সংখ্যালঘু। ধর্মীয় বিশ্বাসী মানুষ নিজেদেরকে মানবতাবাদী ও সেরা আদর্শের মানুষ দাবী করলেও আচরণ ও কর্মের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ মেলে একটা অংশের।আরেকটা অংশ বিভাজনে বিশ্বাসী, অর্থাৎ নিজের রাস্তাকে সঠিক দাবী করে অন্যের পথকে ভুল প্রমাণের জন্য দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত হতে সবসময় অগ্রভাগে অবস্থান করে  থাকে এবং নির্মম ঘটনা ঘটিয়ে থাকে।এদের দ্বন্দ্বের মূল কারণ তাদের কট্টর ভাবনা।অর্থাৎ,এক ধর্মে যাহা পূর্ণ,স্বর্গে যাওয়ার পথ, অন্য ধর্মে তাহা পাপ,নড়গের রাস্তা। আল্লা বা ঈশ্বরের প্রেমে মগ্ন আরাধনাকারী কিংবা কোন দেবতার পূজারী যখন ঐ পরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে মগ্ন থাকে সেই প্রতিটি ধ্যান মগ্নতার মধ্যে থাকে চরম পবিত্রতা ,সৌন্দর্য ও পরম প্রাপ্তির প্রশান্তি।এটা যার যার অবস্থান থেকে মেনে নিতে পারে না বলেই এক ধর্মের ধার্মিকের সাথে অন্য ধর্মের ধার্মিকের দ্বন্দ্ব আজকের পৃথিবীতে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। 


অনেকেই আছেন, এই বিশ্বাস অবিশ্বাসের দ্বন্দে না জরিয়ে মানবতার কেতন উড়িয়ে পার্থিব পৃথিবীকেই স্বর্গময় বানানোর প্রেমে মগ্ন, আধ্যাত্মিকতা লালন করলেও বিশেষ কোন ধর্মের প্রতি প্রীতি নেই তাদের।

ধর্মীয় বিভাজন পরিত্যাগকারী নাস্তিক বা অবিশ্বাসী মানুষও নিজেদের মানবতাবাদী ও সেরা মানুষ হিসেবে দাবী করে থাকে। অনেকের আচরণ ও কর্মে তার দাবীর যৌক্তিকতাও ধরা মেলে।অনেকর আচরণের মধ্যে প্রকাশ পায় ধর্মবিশ্বাসী মানুষের প্রতি অশ্রদ্ধা, বিদ্বেষ, হিংসা,জিঘাংসা। অর্থাৎ মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মানুষদের মধ্য থেকে বৃহৎ একটি অংশ এক পথে সহবস্থানে হাঁটছে। তাদের মধ্যে প্রত্যেকের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে। মানবতা ও শান্তির পক্ষে তারা এক শক্তি।তাদের প্রতিপক্ষ, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য বিশ্বাসের মানুষের রক্ত দেখে বন্য আনন্দের  উল্লাস করে। এই শ্রেণী অনেকটা শুকনো বারুদের মত, ম্যাচের কাঠির ঘষা লাগলেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চায়।দেখা যাচ্ছে,পৃথিবীতে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে যারা  মানবতা ও শান্তির পক্ষে তারা একটি পক্ষ।অন্যদিকে, ধর্ম বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে অজ্ঞ,অশিক্ষিত ও বিশৃঙ্খল মানুষেরা অন্য একটি পক্ষ।এভাবে চিন্তা করলে, হিন্দু মুসলিমের প্রতিপক্ষ নয়, নাস্তিক আস্তিকের প্রতিপক্ষ নয়,খ্রিস্টান ইহুদীর প্রতিপক্ষ নয়, বৌদ্ধ জৈনের প্রতিপক্ষ নয়।পক্ষ দুটি,  এক মানবতাবাদী, দুই মানবতাবিরোধী। আমি যে বিশ্বাসের মানুষই হই না কেন,উল্লেখিত বিশ্লেষণের আলোকে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে আমি মূলত  কোন পক্ষের?  

  

বাংলাদেশে যখন কোন ব্যক্তি বা পরিবার অমানবিক ঘটনার স্বীকার হন তখন এক শ্রেণীর ক্ষুদ্র পরিসরের চিন্তা ধারার মানুষ ঐ নিগৃত ব্যক্তি বা পরিবারের  ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে পরিস্থিতি  ঘোলা করার কাজে নিপ্ত হন।ঐ নিগৃহীত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় যদি মুসলিম না হয়ে থাকে। ভারতের ক্ষেত্রে যদি হিন্দু না হয়ে থাকে। 


প্রথমত রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি মানুষের মূল্যায়ন একজন নাগরিকের হিসেবে।ধর্মীয় পরিচয় মূল্যায়নের মানদন্ড নয়।ধর্মীয় পরিচয়ে অন্যের উপর প্রভাব খাটানো ও করুণা ভিক্ষা দুটোই অন্যায়।   রাষ্ট্রের কাছ থেকে  অধিকার ও দাবি আদায়ের জন্য আমার নাগরিকত্বের পরিচয়ই সবচেয়ে বড় ভিত্তি ও সম্মানের। যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে নাগরিকের জাতীয়তা বা নাগরিকত্বের  পরিচয়কে মূল ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকে সেই রাষ্ট্রকে আমরা আদর্শ রাষ্ট্র বলতে পারি। 


আমি বিশ্বাস করি,মানুষের দ্বারা সংগঠিত সমাজের চলমান অন্যায়,অবিচার, অত্যাচার মানুষের ধর্ম চর্চার ফসল নয়, বরং ধর্মীয় জ্ঞানহীনতার ফসল। কিন্তু আমরা যখন কোন অপকর্ম সংগঠিত হতে দেখি তখন সেটাকে অপকর্মকারীর ধর্ম পরিচয়কে সামনে এনে ঘটনার দায়কে ব্যক্তির উপর না চাপিয়ে ধর্মের উপর চাপিয়ে অন্যায়কারীকে বাঁচিয়ে দেবার চেষ্টা করি। এই প্রবণতা আমাদের উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের অস্থি মজ্জাগত।  


২০১৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশে ১১ বছরের এক হিন্দু শিশুকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে ৫৫ দিন জোরপূর্বক ধর্ষণের এক নির্মম ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।

চকরিয়া ও মহেশখালী উপজেলার ছয় মাদক ব্যবসায়ীর একটি চক্র গাজীপুর থেকে শিশুটিকে স্কুল থেকে ফেরার পথে অপহরণ করে, পরবর্তীতে ঐ গ্রুপের মানিক নামের এক সদস্য শিশুটিকে ধর্মান্তরিত করে কথিত বিয়ের নামে ধর্ষণ করতে থাকে।

কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে পুলিশের চেষ্টায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। এরপর এই অমানবিক ঘটনার জন্য যতটা না পশু মনোবৃত্তির অপকর্মকারীকে দোষারোপ করা হয়েছে তার চেয়ে বেশী একশ্রেণীর মানুষ ঐ দোষীর ধর্মীয় পরিচয়কে কাঠগড়ায় তোলার প্রাণপণ চেষ্টায় মেতে উঠেছে। প্রশ্ন, এই জঘন্য অপরাধী কি ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ছিল এবং তার দ্বারা সংগঠিত এই অপরাধ কি তার ধর্ম চর্চার ফসল? কিংবা সমাজের সংগঠিত ধার্মিকদের সহযোগিতায় কি এমন অপকর্ম সংগঠিত হয়েছে? যদি না হয়, তবে কেন এই অপরাধের সঙ্গে  ইসলাম শব্দটি যোগ করে জল ঘোলা করার চেষ্টা ? এতে বরং অপরাধীর বিচারকার্যকে বাধা সৃষ্টি করে ধর্মীয় সহিংসতাকে উস্কে দেওয়া হয়েছে। 

আসলে জন্মগত ভাবে কোন ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় যথার্থ নয়, ধর্মীয় দর্শন চর্চা ও পালনের মধ্যেই ধার্মিকের পরিচয়। 


মন্টু শীল, পেশায় একজন নরসুন্দর। রাজবাড়ী জেলা শহরের পান বাজারে অবস্থিত নিজস্ব মালিকানাধীন সুন্দর সাজসজ্জার পরিপাটি হেয়ার ড্রেসারে কাজ করেন।তার মিষ্টভাষী এবং বন্ধুত্বসুলভ আচরণের কারণে সমাজের শিক্ষিত,অশিক্ষিত,ধনী দরিদ্র সব শ্রেণীর মানুষ তার কাছে চুল দাড়ি কাটতে যায়।কাজ চলাকালীন সময়ে সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে সদালাপী মন্টু শীলের পারিবারিক,সামাজিক,রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে গল্পগুজব চলে।এই গল্পের মধ্য দিয়ে তার সঙ্গে সেবা গ্রহীতাদের বন্ধুত্ব তৈরি হয়।সেই বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে পারিবারিক বন্ধুত্বে রূপ নেয়। তার দোকানের আশেপাশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও খুবই সুসম্পর্ক বিদ্যমান।কারণ, কোন প্রয়োজনে কারো কাছ থেকে তিনি টাকা ধার করলে তা যথাসময়ের পূর্বেই পরিশোধের চেষ্টা করেন। তিনিও পরিচিত কারো প্রয়োজনে তার সাধ্য অনুযায়ী সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।ইত্যাদি কারণে মন্টু শীল শুধু নরসুন্দর হিসেবেই নয়, একজন বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে সব শ্রেণীর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং পরিচিতি লাভ করেন।

রাজবাড়ী শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্ত পদ্মা।পদ্মার ওপারে বিশাল চরাঞ্চল।এই চরাঞ্চলের মানুষের জীবন কৃষি নির্ভর।রাজবাড়ী বাজারের সাপ্তাহিক হাটের দিন এই অঞ্চলের মানুষ তাদের উৎপাদিত ফসল, গবাদি পশু নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য।এই চরাঞ্চলের অনেকের সঙ্গে কাজের সুবাদে মন্টু শীলের বন্ধুত্বের সম্পর্ক।অনেকই তাদের ফসল ও গবাদি পশু বিক্রির অর্থ দিনশেষে নদী পাড়ি দিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে ভয় পেতেন ছিনতাই হওয়ার ভয়ে। যার দরুন বিক্রিত অর্থ, স্বর্ণালংকার মন্টু শীলের কাছে আমানত রেখে নিশ্চিন্তে বাড়ী ফিরে যেতেন। মন্টু শীলও আমানতের খেয়ানত করতেন না।এমন বিশ্বস্ততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করার কারণে মন্টু শীল এক প্রকার অবাণিজ্যিক ব্যাংকে পরিণত হয়ে ওঠেন। প্রয়োজনে বড় অঙ্কের টাকা মন্টু শীল অন্যের কাছ থেকে ধার নেন এবং অন্যেকে প্রয়োজনে দেন।এভাবে চলে বছরের পর বছর। 


মন্টু শীলের হেয়ার ড্রেসার বন্ধ থাকে না কখনো। কখনো সে না থাকলেও তার কর্মচারীরা কাজ করে। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন সকাল থেকে রাত অবধি মন্টু শীলের হেয়ার ড্রেসার বন্ধ।কেউ চুল কাটাতে এসে, কেউ আমানতের টাকা তুলতে এসে, কেউ ধার নিতে এসে ফিরে গেলেন। ভাবলেন হয়তো আগামীকাল দোকান খুলবে। পরের দিনও লোকজন সকাল থেকে রাত অবধি দোকানের ঝাপ বন্ধ পেলেন। এভাবে প্রায় চার পাঁচ দিন পার হয়ে গেলো।সবাই ভাবলেন, মন্টু শীল কোন বিপদে পড়েছেন কিনা ।কারণ তার আশে পাশের ব্যবসায়ীরাও তার খোঁজ খবর জানে না। তার হিতাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু এবং যাদের মন্টু শীলের কাছ থেকে জরুরী প্রয়োজনে অর্থ বা স্বর্ণালংকার ফেরত নেবার প্রয়োজন তারা তার ভবদিয়া গ্রামের পালপাড়ার বাড়ীতে খোঁজ নিতে গেলেন। তারা গিয়ে দেখলেন মন্টু শীলের ভিটেবাড়ী পড়ে আছে কিন্তু কোন মানুষের আনাগোনা নেই। প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো চার পাঁচ দিন যাবত এই বাড়ীতে কোন মানুষ নেই এবং তারা জানে না এই বাড়ীর লোকজন কোথায় গেছে। যাদের অর্থ,স্বর্ণালংকার গচ্ছিত রয়েছে মন্টু শীলের কাছে তাদের মধ্যে সন্দেহ ঘনীভূত হতে লাগলো।চিন্তা করলো, জলজ্যান্ত একটা মানুষ এবং তার পরিবার কোথায় উধাও হয়ে গেলো ব্যবসা বাণিজ্য ও ভিটে মাটি ফেলে।তদন্ত শুরু হল,একে একে বেরিয়ে আসতে লাগলো সব অবিশ্বাস্য তথ্য। প্রথমে জানা গেলো, মন্টু শীলের বশত বাড়ী বিক্রি হয়েছে প্রতিবেশী ডাঃ সুনীল শিকদারের কাছে এবং  হেয়ার ড্রেসারের দলিল ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে কয়েক লক্ষ টাকা ঋণ তোলা হয়েছে। আর এসবের পূর্বে যা হয়েছে তাহলো, পরিবারের সকল সদস্যের নামে এলাকার বিভিন্ন এনজিও থেকে তোলা হয়েছে ঋন।ছোট ভাই ঝন্টু শীল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহারাইন থাকে, কয়েকজনকে সেই দেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পঞ্চাশ হাজার করে টাকা তোলা হয়েছে, বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ধার নিয়েছে মন্টু শীল, সেই সাথে পাঁচ দশ হাজারের ছোট খাটো ধার নিয়েছে অনেকের কাছ থেকে। কিছু দিন ধরে বাড়ীর দামী আসবাস পত্র সরানো হচ্ছিলো, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতো শ্বশুর বাড়ীতে পাঠানো হচ্ছে। মানুষের আমানত,ধার ও ঋণকৃত অর্থ মিলে প্রায় পঁচিশ লক্ষ টাকার আমানত ছিল মন্টু শীলের কাছে।সময়টা ১৯৯৯ সাল,তখনকার দিনের পঁচিশ লক্ষ টাকা বর্তমান অংকে প্রায় এক কোটি টাকা।সবকিছু অতি গোপনে ও চতুরতার সঙ্গে গোছগাছ করে মানুষের বিশ্বাসের এই আমানত এবং বাবা মা ও ভাইদের পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে মন্টু শীল এক রাতে পারি জমায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে।ব্যাপারটি যখন নিশ্চিত ভাবে জনসম্মুখে চলে আসে তখন রাজবাড়ীর মুখরোচক আলোচনার বিষয় ওঠে। মন্টু শীল যাদের অর্থ আত্মসাৎ করে তাদের মধ্যে দুই একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যতীত সবাই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের। 


এই বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য ঐ সময় মানুষ যতটানা মন্টু শীলকে দায়ী করে তার চেয়ে তার ধর্মেকেই মানুষ বেশী দোষারোপ করতে থাকে।অনেকে গালি দিয়ে বলে, শালার মালায়নের জাতটাই খারাপ,এই দেশের খায় আর দেশের মানুষের সাথেই গাদ্দারি করে ওপারে পাড়ি জমায়।

প্রশ্ন, মন্টু শীলের এই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ কি গীতা বা মহাভারত ধর্ম চর্চার ফল? আমি মনে করি,মন্টু শীল এবং তার পরিবার যদি সত্যি হিন্দু ধর্মের বিধিবিধান মোতাবেক জীবন যাপন করতো এবং ধার্মিক হতো, তবে অবশ্যই এই অপকর্মের সীমানার কাছেও পা বাড়াতো না।আমার হিন্দু ধর্মের জ্ঞান একেবারেই নগণ্য,তবে এটুকু হলপ করে বলতে পারি, গীতা বা মহাভারতে অবশ্যই হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের অন্যের আমানতকে খেয়ানত করার নির্দেশ দেয়া হয়নি 

তাহলে কেন মন্টু শীলের মত বিশ্বাসঘাতক এবং মানিকের মত পশু মনোবৃত্তির মানুষদের অপরাধের সঙ্গে ধর্মের সংযোগ খুঁজে তাদের অপরাধকে সবসময় মাটি চাপা দেয়ার চেষ্টা করি ?   

(মন্টু শীলের ঘটনার তথ্য সূত্রঃ সাপ্তাহিক রাজবাড়ী কণ্ঠ,প্রকাশ ২ জুন ১৯৯৯) 



যখন কোন নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে তার ধর্মীয় পরিচয় সামনে এনে নিজের অধিকার আদায়ের চেষ্টা বা দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে তখন সেই নাগরিক নিজেই নিজের নাগরিকত্বের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে ।এক্ষেত্রে নাগরিকত্ব অধিকারের শক্তি স্বাভাবিকভাবেই খর্ব হয়ে যায়।একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী ও বিচিত্র চিন্তা ধারার মানুষের বসবাস থাকবে।প্রতিটি চিন্তাধারার মানুষ বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের মধ্যে এক একটি স্বাতন্ত্র্য চরিত্র।প্রতিটি চরিত্রের সমন্বয়ে সাধনের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্রের সুন্দর স্বরূপ ফুটে ওঠে। রাষ্ট্রের মূল কাজ প্রতিটি মানুষের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তার সাংবিধানিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। তবে কোন  কট্টর বিশ্বাস বা আদর্শের  প্রভাব যদি কোন  ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর  সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অন্যের অধিকার হরণে উদ্বুদ্ধ করে তবে তা কঠোর হস্তে দমন ও নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সজাক থাকা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। 


আমাদের দেশে যখন কোন হিন্দু,বৌদ্ধ, খৃষ্টান বা কোন উপজাতীয় পরিবার দুর্বৃত্তদের দ্বারা নির্যাতনের স্বীকার হয় তখন নিজ নিজ ধর্মের মানুষ ও সংগঠন সরব হয়ে প্রথমেই বলে মুসলিমদের দ্বারা হিন্দু পরিবার নির্যাতনের স্বীকারের হয়েছে বা বৌদ্ধ, খৃষ্টান বা উপজাতি পরিবার নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে। বলা হয় না, ঐ অঞ্চলের একটি পরিবার দুর্বৃত্তদের দ্বারা নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে।এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রথমেই কারো মনে হবে যে দেশের একটি শক্তিশালী ধর্মীয় গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষের উপর আক্রমণ চালিয়েছে তাদের উৎখাতের জন্য এবং দেশে নিজ ধর্মের আধিপত্য আরও সুদৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য।কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। আমাদের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল  বিশেষত ভারত,বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ধর্মের নামে মানুষের উপর যে সহিংসতা, নির্যাতন ও নিপীড়ন চলে তা সুবিধাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়, কিন্তু আমরা যখন বাস্তবতার নিরিখে প্রতিবাদ মুখর না হয়ে বরং তাদের পুতে রাখা ফাঁদে পা দিয়ে তাদেরই সুরে সুর মেলাই তখন জয়টা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকে যায়, পরাজয় হয় সাধারণ মানুষের।

সবল কর্তৃক দুর্বল আগ্রাসনের স্বীকার, কথাগুলো অতি পরিচিত, পুরাতন, ধ্রুব সত্য এবং বাস্তব। যা আমি নিজেও মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আমার বাস্তব জীবনের পর্যবেক্ষণের থেকে।এই সবল ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের সবল নয়,কোন মতাদর্শের সংখ্যাগরিষ্ঠ সবল নয়, এই সবল হচ্ছে অর্থবিত্ত, দেশের সংঘবদ্ধ স্বার্থবাদী এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পদমর্যাদার সবল।পৃথিবীতে দল দুটো, সবল এবং দুর্বল। বাদবাকী যত দল তা সবলদের স্বার্থে সবলদের দ্বারা সৃষ্ট।আমরা বোকারা বুঝে না বুঝে সেইসব দল উপদলে বিভক্ত হয়ে তাদেরই স্বার্থ রক্ষা করে চলছি মাত্র।    


আমার ছেলেবেলার একটি পারিবারিক গল্প দিয়েই শুরু করি, আমি একজন মুসলিম পরিবারের মানুষ। আমার পরিবারও মনে প্রাণে ধর্ম বিশ্বাস করে এবং যথাসাধ্য ভাবে পালনের চেষ্টা করে থাকে।আমাদের এলাকার অধিকাংশ মানুষ মুসলিম ধর্মাবলম্বী।হাতে গোনা কয়েক ঘর হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস। আমার বাবার কোন আপন ভাই নেই।তিনি নিজ পরিবার আর চাকুরী নিয়ে নিরিবিলি ছিমছাম জীবন যাপনে অভ্যস্ত। আত্মীয় স্বজন যারা আছে তারাও নিরীহ প্রকৃতির অতিশয় ভদ্র ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ।কিন্তু নিজে শান্ত থাকলেই কি আমাদের সমাজে নিরিবিলি জীবন যাপন করা সম্ভব?  


আমাদের বাড়ীর একপাশের সীমানার সঙ্গে যে প্রতিবেশীদের সীমানা তারা এলাকার মধ্যে লাঠিয়াল প্রকৃতির দাঙ্গাবাজ মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ।ধর্মীয় পরিচয়ে তারাও মুসলিম।তাদের আপন ও চাচাতো শরীকদের বাড়ী পাশাপাশি।ন্যায় ভাবে হোক আর অন্যায় ভাবেই হোক তাদের যে কোন শরীক সদস্য কারো সাথে সংঘাতে জরালে তাদের সকল শরীক এক হয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে বদলা নেয়। এই হিংস্র স্বভাবের কারণে এলাকার মানুষ তাদের গোষ্ঠীর মানুষদেরকে ভয়ে সমীহ করে চলে। এমনি এক পরিবারের সঙ্গে আমাদের বাড়ীর সীমানা।আমি খুবই ছোট্ট, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি।তখন ঐ প্রতিবেশীদের দাবী উঠলো, আমাদের বাড়ীর সীমানার ভেতরে প্রায় দুই হাত জমি তাদের রয়েছে যা আমরা ভোগ করছি।তাদের দাবীকৃত জমি মধ্যে যে সব বড় গাছপালা রয়েছে সেগুলো সহ জমি ছেড়ে দিয়ে আমাদের সীমানা বেড়া সরিয়ে নিতে চাপ দিতে লাগলো আমার বাবাকে। কিন্তু আমার বাবা দীর্ঘ দিনের ভোগ দখল করা আইন সম্মত জমি ও নিজ হাতে বড় করে তোলা গাছপালা ফেলে তাদের কথা মত সীমানা বেড়া সরাতে রাজী হলেন না। তার দাবী, জমি মেপে না বোঝা পর্যন্ত তিনি তার সীমানা ছেড়ে ভেতরে আসবেন না।কিন্তু, তাদের দাবী এখনি সরে যেতে হবে।বাবা প্রতিদিন অফিস করে বিকেলে বাসায় আসলেই চলে তাদের হুমকি ধমকি। বাবাও তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এমন আবদার মানতে না পেরে।কয়েক দিন এমন উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পর একদিন আমার বাবার সামনে তারা জোর ঘাঁটিয়ে আমাদের সীমানা বেড়া ভেঙ্গে ফেলল। আমার বাবা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল কিন্তু কোন প্রতিবাদ করতে পারলনা, কারণ তিনি একা আর তারা সংবদ্ধ। তিনি জোর খাটাতে গেলে হয়তো তারা শারীরিক আঘাত করবে সেই ভয়ে নিশ্চুপ হয়ে দেখছেন জোরপূর্বক নিজের বসত বাড়ীর বেড়া ভাঙ্গার দৃশ্য।প্রশাসনের সাহায্য নেবার কথা চিন্তাও করতেন না বাবা।থানায় অভিযোগ করা মানে দুই দিকের ঝামেলা আরও বাড়ানো। এক প্রশাসনিক সহায়তার বদলে বরং পুলিশকে ঘুষ দেয়া এবং থানায় হাজিরা দেয়ার জটিলতা বাড়বে অন্যদিকে প্রতিপক্ষের হিংসাত্মক আচরণ আরও বৃদ্ধি পাবে। পরবর্তীতে সেই সমস্যা একটা সমাধান হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমঝোতার মধ্যদিয়ে। সমঝোতার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের পরিবারের সময় কাটত এক আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। তাদের লোভ ছিল মূলত আমাদের জমির সীমানারবর্তী বেশ কিছু পুরনো গাছের দিকে। সেই সময়ে গাছগুলোর আর্থিক মূল্য ছিল অনেক। যদি জোর জবরদস্তী করে আমাদের সীমানা বেড়া সরাতে পারতো তাহলে তাৎক্ষনিক তাদের গাছগুলো দখলের ইচ্ছে পূরণ হতো। 

এ সমস্যার সমাধানের দীর্ঘদিন পর আবার তাদের দাবী উঠলো,আমাদের সীমানার পাশের গলির রাস্তা দিয়ে তাদের রিক্সা নিয়ে যেতে সমস্যা হয় তাই এখানে চওড়া রাস্তা বানানো দরকার।এবার পৌরসভার আইন দেখিয়ে আমাদের জমি থেকে আরও একহাত জমি দখল করে রাস্তা চওড়া করার স্বপ্ন দেখতে লাগলো তারা। আমার বাবাকে সরাসরি না বলে আমাদের ঘরের পাশে তাদের কয়েকজন জড়ো হয়ে আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে এই বিষয়ে পরামর্শ করে।গভীর রাতে তাদের গোত্রের একজন মদ্যপ অবস্থায় আমাদের বাড়ীর সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার বাবার নাম ধরে গালাগাল করে। আমরা নীরবে এমন গালাগাল শুনে বড় হয়েছি। অথচ তাদের সঙ্গে আমরা কখনো কোন বিষয়ে কোন দিন আগ বাড়িয়ে কোন দ্বন্দ্বের কারণ হয়েছি বলে কখনো মনে পড়েনা।কিন্তু নীরবে তাদের এমন অত্যাচার সহ্য করে সেই একই বশত ভিটায় বশত করেছি।এদের মত মানুষদের প্রতিবাদ করতে গেলে রক্তপাত করার মত  শক্তি ও সাহস দরকার, সেই সাথে দরকার তাদের মতো করে গালাগালের নোংরা ভাষায় কথার উত্তর দেবার মানুসিকতা।যা আমাদের ছিলোনা বলেই তারা এমন অত্যাচার চালিয়েছে ধারাবাহিক ভাবে। 


মনে করেছিলাম সময়ের ব্যবধানে তাদের মানুসিকতার পরিবর্তন হয়েছে, কারণ ঐ বর্বর গোষ্ঠীর মধ্যে কেউ কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করেছে,কেউ ন্যায় অন্যায় পথে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছে,ফলে সমাজের সভ্য মানুষদের সাথে ঐ গোষ্ঠীর কেউ কেউ উঠা বসা করে।সময়ের ব্যবধানে আমাদের মনের পুরনো ক্ষত কিছুটা আরোগ্য হয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে।ফলে শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপনও করছি দীর্ঘদিন ধরে।  


দাদা দাদীর কবর এই পৈতিক ভিটায়।অনেকবার এই ভিটা ছেড়ে অন্যত্র বসবাসের উদ্যোগ নেয়া হলেও স্থানীয় মানুষ ও কবরের মায়ায় আর যাওয়া হয়নি। আমি দেশের বাইরে পরিবার নিয়ে স্থায়ী ভাবে থিতু, দেশে গেলে সর্বোচ্চ এক মাস থাকা হয়, বোনদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে।শুধু বাবা মার এই বশত ভিটায় দিনাতিপাত।সারাজীবনের মায়া মমতায় ঘেরা বাড়ীটি ছেড়ে আমারও কোথাও বাড়ী করার ইচ্ছে ভেতরে কাজ করেনা। যেখানেই থাকি, দাদা দাদীর কবরের এই ভিটেকে শেষ আশ্রয়স্থল মনে হয়।আমার সন্তান যদি বড় হয়ে একদিন তার বংশের ঠিকানা খুঁজে তাহলে কোথায় যাবে?এছাড়া,বাবা মা জীবনের শেষ দিনগুলো যাতে  সুন্দরভাবে কাটাতে পারে,ইত্যাদি ভেবে এই ভিটে মাটিতে ছোট্ট এক একতলার একটি পাকা ঘর করা হয়েছে একজন স্থপতির নক্সায়।

করোনার কারণে প্রায় দুই বছর দেশে যাওয়া হয়না। দুই মাসের কাছাকাছি সময় হাতে নিয়ে এবার এই সংক্রমণের মধ্যেই অনেক নিয়মকানুনের বেড়াজাল অতিক্রম করে দেশে যাই পরিবারের সঙ্গে একান্ত সময় কাটাতে।লক ডাউনের কারণে এলাকা বন্দী হওয়ায় নিজের মতো করে বাড়ীঘর সাজানোর কাজে মনোনিবেশ করি।ঘরের সামনে ফুলের বাগান, বাড়ীর প্রবেশদ্বার থেকে ঘরের প্রবেশমুখ পর্যন্ত লাল টালির রাস্তা, রাস্তার দুই ধার দিয়ে নানা রকমের পাতাবাহারের গাছ রোপণ, ইত্যাদি কাজ বাবা ও ভাগ্নেকে সঙ্গে করে করেছেি।মনে হল,বাবা মার বয়স হয়েছে, তার উপর বাড়ীতে আমাদের ভাইবোন কেউ থাকে না।চারপাশে পরিপূর্ণ ইটের প্রাচীর দিয়ে দিলে বাড়ীর নিরাপত্তা বাড়বে এবং তাদের জীবনযাপন আরও নিরাপদ হবে।

আমার এক চাচা কনস্ট্রাকশন কাজের ঠিকাদারি করেন। আব্বাকে দিয়ে ওনাকে বাড়ীতে ডেকে আনলাম প্রাচীর নির্মাণের পরামর্শের জন্য। কিভাবে প্রাচীর নির্মাণ হবে এবং কত টাকা খরচ হবে এই কাজ শেষ করতে, চাচা বিস্তারিত জানালো। আলোচনা শেষে কাজের দায়িত্ব চাচার উপর অর্পণ করা হল।চাচা তার গ্রুপ নিয়ে কাজ শুরু করলেন। বাড়ীর সামনের প্রাচীর শেষ করে যেদিন আমাদের পূর্বের শত্রু সীমানায় কাজ শুরু করতে গেলেন, সে দিন বাধল যত বিপত্তি। যা আমাদের ধারণা ছিলোনা। আমার জমিনে আমি প্রাচীর নির্মাণ করবো তাতে চিন্তা ভাবনার কি আছে।যে সীমানার উপর দিয়ে টিনের বেড়া রয়েছে শুধু তা সরিয়ে ঐ একই সীমানায় উপর ইটের প্রাচীর নির্মাণ হবে। তাছাড়া সীমানা সমস্যার সমাধান হয়েছে সেই ত্রিশ বছর পূর্বে। তাই সরল মনেই কাজ করতে গিয়েছি আমরা।ভাবনার ত্রিশ বছর যে আমরা ভ্রান্তির উপর কাটিয়েছি, তা কখনো বুঝতে পারিনি। আমার চাচা সরল ভাবনায় তার দল নিয়ে কাজ শুরু করতে গেলেন।টিনের বেড়া সরিয়ে সীমানা পিলার ধরে রশি টেনে যখন তার কার্যক্রম শুরু করতে গেলেন তখন আমাদের দীর্ঘদিন ধরে গালাগাল করা সেই মদ্যপ তার গোত্রের লোকজন নিয়ে এসে হাজির হলেন এবং দাবী তুললেন, যেহেতু এখানে স্থায়ী প্রাচীর নির্মাণ হবে সেহেতু মূল সীমানা থেকে দুই হাত জমি ছেড়ে দিয়ে প্রাচীর করতে হবে।কারণ, এখান দিয়ে অদূর ভবিষ্যতে পৌরসভার রাস্তা নির্মাণ হবে।এই অযৌক্তিক দাবীর কারণে উভয় পক্ষের তর্কাতর্কিতে এলাকার লোকজন ও স্থানীয় পৌর কমিশনার এসে হাজির হলেন।তাদের মধ্যস্থতায় প্রাচীর নির্মাণ কাজ স্থগিত রাখা হল। এর মধ্যে তাদের এই অনৈতিক দাবী প্রতিষ্ঠার জন্য চলতে লাগলো তাদের গোত্রের ঐক্যবদ্ধ যাবতীয় কূটকৌশল।এলাকার মানুষের মধ্যে আমাদের সম্পর্কে বানোয়াট নানা নেতিবাচক কথাবার্তা বলে তাদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে লাগলো।এলাকার মানুষ আমাদেরকে ভালো জানলেও আমাদের পক্ষে এসে কথা বলতে ভয় পায়।যদি এই আদিম অসভ্য গোত্র দ্বারা তারা পরবর্তীতে কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তারা ওদেরকে পেছন থেকে গালি দেয়,ঘৃণা প্রকাশ করে কিন্তু সামনে এসে কখনো ওদের অন্যায়ের কোন প্রকার প্রকাশ্য প্রতিবাদ করে না ওদের বর্বরতার ভয়ে। 


 এই সীমানা প্রাচীর নির্মাণ দ্বন্দ্বের ঘটনা চলে গেলো আমাদের স্থানীয় পৌরসভার চেয়ারম্যান পর্যন্ত।পরবর্তীতে রূপ নিলো রাজনীতিতে,ঐ গোত্রের লোকজন জেলার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে এলাকার কূটরাজনীতি পরিচালনা করে থাকে।আমার পরিবারের আমি ছাড়া কেউ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে কখনো জড়িত ছিলনা এবং এখনো নেই।আমার সেই ছাত্রজীবনে বাম ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলও এখন বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক সংগঠন সঙ্গে কোন প্রকার সংযোগ নেই।আমার বাবার দাঁড়ি টুপি এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াকে ইস্যু বানিয়ে সেই মদ্যপ প্রচার করতে লাগলো আমার বাবা জামাত ইসলামের রাজনীতি করে।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য বেশ কয়েকবার লোকজন নিয়ে বসা হল।পরিশেষে পৌরসভার ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য লোকের উপস্থিতিতে আমাদের প্রায় দেড় হাত জমি ছেড়ে দিয়ে প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্ত দেয়া হল। অথচ এখান দিয়ে যে রাস্তা নির্মাণ হবে তার কোন সিদ্ধান্ত দূরে থাক আলোচনাই হয়নি পৌরসভায়। অন্যদিকে, আমার আইনগত বৈধ জায়গা আমি না ছেড়ে দিলে পৌরসভার কোন বিশেষ আইন নেই জোর করে নেবার। কিন্তু আমরা যদি এই সিদ্ধান্ত না মেনে আইনের আশ্রয় নিয়ে আমাদের জায়গায় প্রাচীর নির্মাণ করতে যাই তাহলে পরবর্তীতে হানাহানির সৃষ্টি হবে। আমি দেশের বাইরে থাকি,ফলে আমার অনুপস্থিতিতে আমার বাবা মাকে ঐ আদিম অসভ্য গোত্রের লোকজন ভয়ভীতির মধ্যে রাখবে।অনেক অজানা আশঙ্কার কথা চিন্তা করে নিজের আইনগত অধিকারের জায়গা ছেড়ে দিয়ে প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেই। 


যদি আমরা অন্যের মাথায় আঘাত করা এবং অন্যকে অসভ্য ভাষায় গালি দেবার মানসিকতা লালন ও  শক্তি ধারণ করতাম তবে এই অনৈতিক দাবী উত্থাপিত হতো না কখনো এবং এমন সিদ্ধান্তের কাছে মাথা নত করতামনা।অথবা,আমার বাবা যদি সেই ত্রিশ বছর পূর্বে ওদেরকে সভ্য মানুষ না ভেবে সমাধান হওয়া বিতর্কিত সীমানায় ইটের প্রাচীর নির্মাণ করে দিতো তাহলে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হতোনা।


এমতাবস্থায়, আমরা যদি এই এলাকার হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ হতাম তাহলে হয়তো বশত ভিটা বিক্রি করে ভারতে চলে যেতাম।কিংবা সংখ্যালঘু অত্যাচারের অভিযোগ এনে কোন মানবাধিকার সংস্থার সহায়তা চাইতাম।সাধারণত আমাদের দেশে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষ যা করে থাকে। কিন্তু এসবের কোন সুযোগ ছিলোনা, কারণ ধর্মীয় পরিচয়ে আমরা উভয় পক্ষই ছিলাম মুসলিম ধর্মাবলম্বী। আমরা মুসলিম হলেও তারা ধর্মীয় সমগোত্রীয় ভেবে কখন আমাদের পরিবারকে অত্যাচার ও অসম্মান করতে এতোটুকু ছাড় দেয়নি। কারণ এখানে ধর্মের চাইতে বড় ছিল ব্যক্তি স্বার্থ এবং পেশী শক্তির ব্যবধান।এখানে ধর্মীয় গোত্র পরিচয় পারস্পরিক শান্তির সহবস্থানে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি।দেশে অন্য ধর্মের নির্যাতিত মানুষ তাদের অভিযোগ বিভিন্ন সংগঠনের নিকট তুলে ধরতে পারে,কিন্তু  আমরা মুসলিম হওয়ায় আমাদের অসহায়ত্ব কোথায়ও তুলে ধরতে পারিনি।  


আরও পরিষ্কার করার জন্য জীবনের বাস্তব আরও একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই, আমার শিক্ষা জীবনের বড় একটা সময় পার হয়েছে রাজবাড়ী সরকারি কলেজে।সারা দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে যখন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল,আওয়ামী ছাত্রলীগ ও ইসলামি ছাত্র শিবিরের আধিপত্য তখন আমাদের ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর।এই আধিপত্যের মূলে ছিল,জেলার বাম রাজনৈতিক আন্দোলনের শক্তিশালী অবস্থান এবং ওয়ার্কার্স পার্টি মনোনীত প্রার্থীর দীর্ঘ পনেরো বছরের রাজবাড়ী পৌরসভার চেয়ারম্যানের ক্ষমতা।জেলার দুই সংসদীয় আসন থেকে অনন্যা দলের এম পি নির্বাচিত হলেও জেলার হৃদপিণ্ড পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতো বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে।দেশের ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক না কেন জেলা শহরের নিয়ন্ত্রণ ছিল বামদের হাতে।শক্তিশালী কর্মীবাহিনীর কারণে এই ছোট্ট শহরের মধ্যে অন্য দলের জনপ্রতিনিধিদের তোয়াক্কা করার মত সময় বাম নেতাদের হাতে ছিল না।বামদের কর্তৃত্বের কারণে শহরের শান্তি শৃঙ্খলা ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।কিন্তু শক্তি ও ক্ষমতা হাতে থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ যেমন হয়ে থাকে রাজবাড়ীর স্থানীয় ওয়ার্কার্স পার্টি ও ছাত্র মৈত্রীর নেতাদের আচরণ শতভাগ অন্যদের মত না হলেও অন্যের উপর কর্তৃত্ব ও প্রভার বিস্তারের ক্ষেত্রটা ছিল শতভাগ।রাজবাড়ী সরকারী কলেজের ছাত্র সংসদ আশি ও নব্বই দশক ছিল ছাত্র মৈত্রীর দখলে।স্বভাবতই কলেজ ক্যাম্পাসে অনন্যাও ছাত্র সংগঠনের অবস্থান ছিল বিলের ছোট মাছের মত। সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের ক্যাম্পাসে ছাত্র মৈত্রীর নেতাদেরকে একটু সমীহ করেই চলতে হতো। বিশেষ করে অন্য জেলা থেকে আসা শহরের মেস ও কলেজ ছাত্রাবাসে থাকা ছাত্রদের।আমাদের সময়,২০০০ সালের দিকে জেলা ছাত্র মৈত্রীর নেতৃত্ব যার হাতে ছিল তিনি ধর্মীয় পরিচয়ে ছিল হিন্দু ধর্মাম্বলি।দলের আর একজনের হাতে দলের নেতৃত্বর গুরুত্বপূর্ণ পদ না থাকলেও রাজনৈতিক সংঘর্ষে অগ্রভাগে থাকার কারণে দলীয় নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন। ফলে কলেজ ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের আসে পাশের এলাকার ছাত্ররা তাকে সমীহ করে চলতো। এই ছাত্র নেতাও ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। ক্যাম্পাসে কি হবে এই দুই ছাত্রনেতা যে সিদ্ধান্ত নিতো তাই হতো। যদি কোন ছাত্রকে এদের কেউ বলতো তোমাকে আজ ছাত্র মৈত্রীর মিছিল করতে হবে সেই ছাত্রকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিছিল করতে হতো। কখনো ক্যাম্পাসে ছাত্র মৈত্রীর মিছিল বড় করার জন্য কলেজ হোস্টেল থেকে ছাত্রদের ডেকে আনা হতো, যদি কেউ আসতে রাজী না হতো তখন যদি ঐ দুই ছাত্র নেতার নাম উল্লেখ করে বলা হতো  দাদা যেতে বলেছে, তখন অনেক দাড়ি টুপিওয়ালা ছাত্রও ভয়ে পড়ার টেবিল ছেড়ে এসে ছাত্র মৈত্রীর মিছিলে যোগ দিতো। ঐ দাঁড়ি টুপিওয়ালা ছাত্র কখনো বলতো না, আমি মুসলমান, হিন্দু ছাত্রনেতার ডাকে মিছিলে যোগ দিতে বাধ্য নই।ঐ সময় এমন কথা বলে কারো ক্যাম্পাসে অবস্থান করা সম্ভব ছিল কারণ তাদের কথার অবাধ্য হলে তাকে সমস্যায় পরার সম্ভাবনা ছিল।এই প্রভাবশালী দুই ছাত্র নেতার কর্তৃত্বে তাদের ধর্মীয় পরিচয় কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাদের এই প্রভাবের মূলে ছিল তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা কখনো অন্যের উপর প্রভাব সৃষ্টিতে ভীত ছিলেন না।বরং,তাদের শত শত অনুসারী ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম ছিলেন, যারা তাদের নেতৃত্বে অন্য সংগঠনের মুসলিম ছাত্রদের ক্যাম্পাসে দমিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে। এখানে নেতার ধর্মীয় পরিচয় কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।    


অন্যের উপর শক্তি প্রদর্শন বা প্রভাব বিস্তার যদি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর নির্ভর করতো তবে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে সুব্রত বাইন,বিকাশের মত শীর্ষ সন্ত্রাসী সৃষ্টি হতো না, আর ভারতের মত বিশাল হিন্দু জনবহুল দেশের মধ্য থেকে সৃষ্টি হতোনা দাউদ ইব্রাহিম মত অপরাধ জগতের শিরোমণির। 

 


আমাদের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সৃষ্টির  মূলে থাকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি।একমাত্র ধর্মকে ব্যবহার করেই অপরাজনীতির মূল উদ্দেশ্য সবসময় শতভাগ সফল হয়েছে।   


বাংলাদেশে হিন্দু,বৌদ্ধ,,খ্রিষ্টান সহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর উপর জুলুম নির্যাতনের ঘটনা ধারাবাহিক।হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপর সহিংসতা উদ্বেগজনক ছিল ২০২১ সালে। একই বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২০৪টি প্রতিমা, পূজামণ্ডপ, মন্দির ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৮৪টি বাড়িঘর ও ৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই হামলার ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৩০০ জন আহত হয়। এছাড়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। 


একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যের দরং জেলায় একটি সুবিশাল শিবমন্দির নির্মাণের লক্ষ্যে হাজার হাজার বাঙালি মুসলিমকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।আশ্রয়চ্যুতরা প্রতিবাদ স্বরূপ বিক্ষোভ করলে সেই বিক্ষোভ মিছিলে চলে পুলিশ গুলি।এতে দুই ব্যক্তির মৃত্যু সহ কয়েকজন আহত হয়।  


 এই ঘটনাগুলোর ভিডিও চিত্র যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা দেখেছি তখন প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের হৃদয় শিউরে উঠেছে।আমরা দেখেছি এই ভয়াবহ নৃশংসতার যারা স্বীকার হয়েছে তারা সবাই সমাজের নিরন্ন শ্রেণীর মানুষ। যাদের একটি ধর্মীয় পরিচয় থাকলেও তাদের জীবনের মূল যুদ্ধটা জীবন ও জীবীকার সঙ্গে।বংশপরম্পরায় ধর্মীয় পরিচয় বহন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করে আসলেও এরা কেউ ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন বোদ্ধা শ্রেণী বা ধর্মীয় নেতৃত্ব শ্রেণীর মানুষ নয়।কোন ধর্মীয় গোত্রের মানুষের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করার মত আর্থিক ও রাজনৈতিক ভাবে শক্তি সামর্থ্যযোগ্য মানুষও তারা নয়। এরা সরল ধর্ম বিশ্বাসের আবেগি মানুষ।অথচ,কখন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে,কখনো ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই নিরন্ন শ্রেণীর ধর্ম বিশ্বাসী মানুষেরদেরকেই প্রতিশোধ বা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। এক শ্রেণীর উগ্র ধর্মান্ধদের উস্কে দিয়ে এই নিরন্ন মানুষদের উপর চালনা হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা।মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া হয় তিলে তিলে গড়া ঘরবাড়ী,বিশ্বাস ও ভালোবাসার উপাসনালয়, নির্যাতন চালানো হয় শিশু ও নারীদের উপর, লুট করা হয় ঘরে রাখা কষ্টার্জিত সঞ্চয়। 


এই বর্বর হামলাগুলোর যারা ধারাবাহিক ভুক্তভোগী তাদের অধিকাংশই দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ,যাদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালো তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে নিরীহ প্রকৃতির।প্রতিটি সহিংসতা সৃষ্টির পূর্বে খুব ঠাণ্ডা মাথায় কুচক্রীরা এই শ্রেণীর মানুষদেরকেই বেছে নেয়া হয় বলির পাঠা হিসেবে, কারণ এই নিরন্ন শ্রেণীর মানুষদের ঘটনা পরবর্তীকালে কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও মাথায় হাত বুলিয়ে  সান্ত্বনার বানী শুনিয়ে দিলেই এরা সহজেই ভুলে যায় নিজের উপর হওয়া সকল অবিচার।জীবন ও জীবীকার সঙ্গে যাদের নিত্য যুদ্ধ তাদের হায়েনাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করার শক্তি,সাহস ও অর্থ আসবে কোথা থেকে। তাইতো যুগের পর যুগ এই অন্যায়ের সাথে বার বার আপোষ করে এদের মাতৃভূমির বুকে বসবাস। নিজ ভূমিতে  অবস্থান করেও বাস্তুহারা মানুষের মতই জীবনের অনুভূতি।  


প্রশ্ন জাগে, ধর্মই যদি সহিংসতার মূল কারণ বা ধর্মীয় পরিচয় যদি আক্রমণের লক্ষবস্তু হয় তবে ধর্মের মান রক্ষার নামে শুধু এই নিরন্ন শ্রেণীর মানুষদেরকেই কেন বেছে নেয়া হয় জুলুম করার জন্য,সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষদের কেন বেছে নেয়া হয়না। আমরা কখনো দেখিনা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নামে বাংলাদেশের কোন হিন্দু সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা বা আমলার বাড়ীতে হামলা হয়েছে, অথবা কোন হিন্দু,বৌদ্ধ,খ্রিষ্টান বা উপজাতীয় ধনী ব্যবসায়ীর বাড়ীতে হামলা হয়েছে, ধর্মীয় সংগঠনের কোন নেতার বাড়ীতে হামলা হয়েছে।

অপরদিকে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যখন  সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নামে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন চলে তখন দেখা যায় না কোন উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী চিত্রনায়ক শাহরুখ খান,সালমান খান বা আমীর খানের বাড়ীতে ধর্ম অবমাননার প্রতিশোধ নিতে আক্রমণ করেছে।এদের উপর আক্রমণের না হওয়ার কারণ, এই শ্রেণীর মানুষের ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, এদেরকে নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রশক্তি সরাসরি এদের পাশে থাকে ,সেই সাথে ক্ষমতা বা অর্থের প্রভাবের কারণে এদের মিত্রতা গড়ে সমাজের অন্য প্রভাবশালী মানুষদের সঙ্গে।সুতরাং এদের আঘাত করতে গেলে উল্টো আঘাতের শিকার হতে হবে।যেহেতু ধর্মকে মাধ্যম করে রাজনীতি তাই শক্তিশালী মানুষের উপর আঘাত করে মূল উদ্দেশ্য ব্যহত করা তাদের কৌশলেরই অংশ নয়।       


দেশে যখন এমন সহিংসতা শুরু হয় তখন দেখা যায় দুই একটি ঘটনার পর পরই দেশের সরকারি দল,বিরোধী,রাষ্ট্রীয় প্রশাসন মিডিয়া বিবৃতির মাধ্যমে এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।দেশের সর্বোচ্চ তিন শক্তি একত্রিত হওয়ার পরও এই তাণ্ডব লীলা চলতেই থাকে।আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণত রাষ্ট্রীয় কোন ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের ঐক্যসুরে প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যায় না।প্রশ্ন জাগে,জনগণের স্বার্থে সার্বক্ষণিক মাঠে থাকা দেশের সর্বোচ্চ তিন শক্তি সামনে কিভাবে এই বর্বরতা ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকে। (যারা জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতি করেন,যারা জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে বেতন গ্রহণ করেন)। তাহলে দেশের এই তিন শক্তির চেয়েও কি সন্ত্রাসীরা বেশী শক্তিশালী? এদের সবার অবস্থান যদি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হয়, তবে কেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সময় স্থানীয় সরকারী ও বিরোধীদলের কর্মীরা একত্রিত হয়ে নির্যাতিত মানুষদের জানমাল রক্ষা করতে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে না? শুধু বক্তৃতা করে একে অপরকে দোষারোপ করে। যাদের ওয়ার্ড পর্যায়ের কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সময় মুহূর্তেই শত শত কর্মী জড়ো হয়ে যায়।অথচ, চোখের সামনে এমন হিংস্র কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় কোন প্রতিরোধ ছাড়াই !যে দেশে কারো কথায় বা লেখায় কোন বিশেষ মানুষের বিন্দু পরিমাণ মান ক্ষুণ্ণ হলে প্রশাসন মুহূর্তের মধ্যেই ঐ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার জেলে পুরে দেয়, সেই প্রশাসনের সামনে কি করে একের পর এক  নিরন্ন মানুষের বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ হয়, লুণ্ঠন হয়?  

তাহলে এই শক্তিশালী সন্ত্রাসীদের আসল পরিচয় কি? কারা এদের পৃষ্ঠপোষক?


রাজনীতি একটি দেশের মানুষের শান্তি শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সব চেয়ে বড় ভূমিকা পালন  করে। অপরদিকে সমাজের অস্থিতিশীলতার জন্য অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অপরাজনীতি।যা আমাদের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে বেশী চর্চা হয়। যার ভুক্তভোগী সবচেয়ে সমাজের নিরন্ন শ্রেণীর মানুষ। এই শ্রেণীর মানুষকে অত্যাচার যেমন অপরাজনীতির একটা অংশ, আবার এদের পাশে দাঁড়িয়ে যে সেবা শুশ্রূষা দেবার দৃশ্য দেখি সেটাও অপরাজনীতিরই  অংশ। এই দুটি কাজই করা হয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থে। 

এই ক্ষেত্রে নিজের দেখা এক বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরে স্পষ্ট করি, আমাদের সময়ে আমার কলেজ ক্যাম্পাসে তিনটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ড সক্রিয় ছিল।এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল একটি বাম ছাত্র সংগঠন।এরাই ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করতো। অপর দুটি দেশের সরকারি ও প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন।আমি নিজেও বাম ছাত্র সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলাম।একদিন আমার দলের একজন বড় ছাত্রনেতা একান্তে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের দুই ক্যাডারকে ডেকে তখনকার দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের এক ছাত্র নেতার বিরুদ্ধে কিছু কথা বলে খেপিয়ে তুললেন।এর পাঁচ মিনিট পর ঐ দুই ক্যাডার ক্যাম্পাসের সকল ছাত্রছাত্রীদের সামনে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ঐ ছাত্রনেতাকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলেন।এই হামলার মাঝে গিয়ে হাজির হলেন ক্যাম্পাসের সম্মানিত ঐ বাম বড় ছাত্রনেতা,হামলা চলাকালে তিনি আহত ছাত্রনেতাটিকে বুকে আগলে ধরলেন।ঐ দুই ক্যাডারকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিলেন ঘটনাস্থল থেকে।পরে ঐ রক্তাক্ত ছাত্রনেতাকে তিনিই দ্রুত একটি রিক্সায় তুলে নিয়ে গেলেন জেলা সদর হসপিটালে। 

এই নিন্দনীয় ঘটনার জন্য সবাই দোষী সাব্যস্ত করলেন সরকারি দলের দুই ক্যাডারকে।সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের দৃশ্যমান মূল্যায়ন থেকে মহৎ মানুষ হিসেবে প্রশংসা ভাসিয়ে দেয়া হলো বাম ছাত্রনেতাটিকে তার এমন বীরত্ব দেখানোর জন্য। কিন্তু এই ঘটনামূলের আসল নায়ক যে এই মহৎ মানুষটি সে কথা আমরা হাতে গোনা দুই একজন ছাড়া কেউ জানেনা।

তাই দৃশ্যমান চোখ দিয়ে দেখে আমরা যা মূল্যায়ন করি তার প্রকৃত সত্যতা নিয়ে কজনইবা ভাবী।এখানে যে দুজন ক্যাডার এই নৃশংস ঘটনা ঘটালেন তারা মূলত শরীর সর্বস্ব জ্ঞানহীন মানুষ, মস্তিষ্ক সর্বস্ব মানবিক মানুষ নয় বিধায় কোন প্রকার ভাবনার সময় না নিয়েই অন্যের উস্কানিতে মুহূর্তের মধ্যে এমন একটি পাশবিক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললো।ওদের এই জ্ঞানহীনতার কারণেই অতি সহজে অন্যের স্বার্থে ওরা ব্যবহার হয়েছে। অন্যের ক্ষতি ও নিজের ক্ষতির চিন্তা মাথায় আনেনি। 

সরল মনে রাজনীতিতে এসে এই ঘটনার পর মনে হয়েছিলো ক্যাম্পাস রাজনীতি এমন, তাহলে আমাদের জাতীয় রাজনীতির অবস্থা কেমন? এরপর ভবিষ্যৎ সক্রিয় রাজনীতির উপর আর আগ্রহ তৈরি হয়নি। 


নিরন্ন মানুষের চোখের জলই আমাদের দেশের রাজনীতির মূলধন ,অনেকের রুটি রুজির অবলম্বন। 

অন্যের ক্ষতিসাধন করে নিজের উন্নতি সাধনের রাজনীতির ধারা আজ আমাদের রক্তগত। 


আমাদের অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ধার্মিক নয়, অধিকাংশ মানুষই আবেগী অন্ধ ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ। তাই এদের চিন্তাশক্তি ও ধৈর্য ধারণ ক্ষমতা কম। এদেরকে খেপিয়ে তোলা সহজ। ক্যাম্পাসের ঐ বাম ছাত্র নেতার মত আমাদের সমাজের চতুর ও টাঊট প্রকৃতির মানুষেরা ধর্মকে ইস্যু বানিয়ে সহজেই এদেরকে দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।আর এই নির্বুদ্ধিতার কারণে এক আবেগী অন্ধ ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ অন্য আবেগী অন্ধ ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ উপর আক্রমণ করে বসে।এদেরকে সঠিক পথ দেখানো দেশের রাজনীতিবিদের দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সমাজে হয় তার উল্টো। 


ধর্ম দ্বারা মানুষকে বিভাজনের মাধ্যমে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের চোখের জল দেখে নীরব থাকা একজন মনুষ্যহৃদয় বিবর্জিত মানুষের পরিচয়।  


বাংলাদেশে হিন্দু,বৌদ্ধ,খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। যাদের কাজ এই তিন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ যখন বাংলাদেশে কারো দ্বারা আক্রান্ত বা আঘাত প্রাপ্ত হবে তখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা,সরকারের নিকট প্রতিবাদলিপি পেশ করা,নানা দেশে সভা সমিতি করে অন্যদেশের নিকট এই তিন সম্প্রদায়ের মানুষকে অসহায় ও অত্যাচারিত হিসেবে উপস্থাপন মাধ্যমে নিজ দেশের সরকারকে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা। অর্থাৎ ,এই সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হল তিনটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা।এই সংগঠনের অনুকম্পা পেতে হলে অবশ্যই এই তিন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কেউ হতে হবে, তা নাহলে আপনি যতই অত্যাচারিত মানুষ হোন না কেন এই সংগঠন আপনার পক্ষে কোন কথা বলবে না। আপনার জন্য প্রতিবাদ করবে না। এখানে আপনার প্রথমত ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য।সেই সূত্র ধরে বলা যায় এটি একটি কট্টর ধর্ম ভিত্তিক সংগঠন বা মৌলবাদী সংগঠন।কারণ কোন নির্যাতিত মানুষের ধর্মীয় পরিচয় যদি হয় মুসলিম তাহলে সেই ব্যক্তির অসহায়ত্ব তাদের চিন্তার কোন বিষয় নয়।এই থেকে প্রমাণ হয় সংগঠনটি রাষ্ট্রের নিপীড়িত মানুষের পক্ষের সংগঠন নয়। সংগঠনটিকে সার্বজনীন ধর্মীয় সংগঠনও বলা যায় না কারণ সংগঠনটির সঙ্গে  দেশের সকল ধর্ম বিশ্বাসের মানুষের সম্পৃক্ততা নেই।বিশেষ তিনটি ধর্মের ঐক্যের সংগঠন।প্রশ্ন উঠতে পারে তাদের ঐক্য কাদের প্রতিপক্ষ করে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে, নাকি ধর্মের নামে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে।যেহেতু এদের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা নেই তাই ধরে নিতে হবে তাদের এই ঐক্য দেশের মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রতিপক্ষ করে সৃষ্ট।তাহলে যৌক্তিক ভাবে বলা যায়, এই ঐক্য দেশের ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টিতে ভূমিকার পরিবর্তে বরং ধর্মীয় এক সীমারেখা সৃষ্টিতে অবদান রেখে চলছে।ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের মানুষের শান্তিপূর্ণ সবস্থানের গুরুত্বের চেয়ে গোত্রের আধিপত্য রক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করা এই জাতীয় ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে মুখ্য।যা একটি সভ্য জাতি ও দেশ গঠনের অন্তরায়। 


তেমনি ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে দেশে যেসব ধর্মভিত্তিক ইসলামি সংগঠনগুলো রয়েছে তারাও এই সংকীর্ণতার অধীন। 

 

ধর্মীয় গোত্রের ঐক্যের দ্বারা একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে যদি সত্যি সমাজের নিপীড়িত মানুষকে রক্ষার অভিপ্রায় থাকে তবে সেই সংগঠনের প্রথম কাজ হল দেশের প্রতিটি ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

অথবা নির্যাতিত যে কোন ধর্মের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করা।  


আমাদের উপমহাদেশে যখন কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর হয় তখন যতটুকু প্রতিবাদ দেখা যায় তা আশাব্যঞ্জক নয়।দেশে আমরা যাদেরকে জাতির বিবেক বলে সম্মান করি, অনুসরণ করি, তাদেরও কোন জোরালো প্রতিবাদ বিশেষ ভাবে  চোখে পড়ে না,সরকারের স্বার্থ রক্ষার স্বার্থে।অনেক সাম্প্রদায়িক মানুষ রয়েছে যারা এমন সহিংসতায় অংশগ্রহণ না করলেও অন্য ধর্মের মানুষের উপর হামলা হয়েছে ভেবে নীরবে বন্য আনন্দে মেতে ওঠেন।একমাত্র নিজ ধর্মের মানুষের উপর হামলা হলে প্রতিবাদ মুখর হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।এই শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা একেবারে কম নয়।এদের উদ্দেশ্যে বলা যায়ঃ  

নিজ ধর্মের মানুষ হত্যায় 

প্রতিবাদে ফাটি। 

অন্য ধর্মের মানুষ হত্যায় 

মনে মনে হাসি। 

চুপচাপ আমিও যে 

ধর্মীয় সন্ত্রাসী, 

সে কথা কখনো কি একবারও ভাবি ?  


এমন ধর্মীয় সন্ত্রাসী মানসিকতা পোষণকারী মানুষগুলোও সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে হুমকি স্বরূপ।আমরা ৪৭, ৭১ পেরিয়ে এখন অনেক দূরে কিন্তু এখনো যদি মানসিকতায় সাম্প্রদায়িকতা লালন করি তাহলে আমাদের এত বছরের পরিবর্তনটা কোথায়? আমাদের সমাজের একশ্রেণীর নিম্নস্তরের এমন মানসিকতাসম্পন্ন  মানুষদের কারণেই সমাজ বিরোধী চক্র আমাদের মাঝে বিভাজনের আগুন জ্বালাতে সুবিধা পায়।যখন দেশে কোন মানবতা বিরোধী ঘটনা ঘটবে তখন একজন মানবিক মানুষ হিসেবে প্রথমে  অমানবিকতাকে অমানবিক হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে এবং নিজস্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরী।যদি ভাবি আক্রান্ত মানুষগুলোর ধর্ম পরিচয় কি?যদি আমার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ না হয় তবে কেন আমি প্রতিবাদ করবো, তবে আমি যত ধর্মকর্মই করি আর ব্যক্তি জীবনে যতই সৎ মানুষ হই না কেন, নিজেকে মানবিক মানুষ হিসেবে দাবি করতে পারি কি?শোষিতের চোখের জল যদি নিজের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি না করে তবে নিজেকে মানুষ দাবি করি কোন যুক্তিতে।


ধর্ম রক্ষা বা ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার নাম করে আমরা যখন অন্যের দিকে ছুরি হাতে তেরে যেতে উদ্যত হই তখন মনুষ্য হৃদয়ের দুয়ার একটু খুলে কি ভাবতে পারিনা, যার বুকে ছুরি চালিয়ে আমার স্রস্টাকে খুশী করে পরপারের সুখী জীবন পাওয়ার আশা করছি সেই মানুষটি কার সৃষ্টি।প্রত্যেক স্রস্টা বিশ্বাসকারী এক বাক্যে স্বীকার করবেন স্রস্টার সৃষ্টি।সেই লোক আপনার পথে স্রস্টার আরাধনা না করলেও তার আলো বাতাস যদি আপনার স্রস্টা বন্ধ না করে তবে কেন আপনার এতো তাড়া তার প্রাণবায়ু কেড়ে নেয়ার।যে মানুষ স্রস্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করে স্রস্টাকেই ব্যাঙ্গ বিদ্রূপ করে সেই মানুষটার বেঁচে থাকার জীবন উপকরণ থেকে আপনার স্রস্টা বঞ্চিত করেন না।আপনি যাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বশক্তিময় হিসেবে মানেন,সেই শক্তিময়ের যদি এতো ক্ষমা এবং ধৈর্য তবে তার ক্ষুদ্র সৃষ্টি হয়ে আপনার কেন এতো অধৈর্য। স্রস্টার সৃষ্টির ক্ষতিসাধন করে স্রস্টার আনুগত্যের আশা করা পৃথিবীর সর্বোচ্চ মূর্খ ধারনা নয় কি! 

আমাদের প্রত্যেকের নিজের কাছে নিজের বিশ্বাসের ধর্ম শ্রেষ্ঠ।সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে স্রস্টার সৃষ্টিকে  ভালোবেসে।ধর্ম রক্ষার নামে মানুষের রক্তে হাত রাঙ্গিয়ে নয়।   

যদি কোন বিশ্বাস বা আদর্শ অনুসরণের ফলে আপনার মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, হিংস্রতা এবং শ্রেণী বৈষম্য মানসিকতার উদয় ঘটায়, তাহলে বুঝতে হবে আপনি হয়তো আপনার ধারণকৃত বিশ্বাস বা আদর্শের বিধিবিধানের গভীরে যেতে পারেননি, নতুবা আপনি ভ্রান্ত আদর্শ বা বিশ্বাসের মায়াজালে অন্ধ হয়ে আছেন, যা বর্জন করাই শ্রেয়।

আমার ধর্ম আমার কাছে, আপনার ধর্ম আপনার কাছে শ্রেষ্ঠ হয়েই থাক,যার যার পরপারের সুখী জীবন পাওয়ার রাস্তা যার যার মত সঠিক হয়েই থাক, কিন্তু পার্থিব লোকারণ্যের পৃথিবীতে যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন মত পথের ঊর্ধ্বে গিয়ে যদি এক স্রস্টার সৃষ্টি ভেবে প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসার একটি ক্ষুদ্র স্থান  অন্তরের এককোণে সৃষ্টি করতে পারি তবেই এই পৃথিবীটা আমার আপনার দ্বারা পরিণত হবে এক শান্তির স্বর্গোদ্যানে।   


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল)

প্যারিস,ফ্রান্স 

শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

সেই সমাজ সুন্দর যে সমাজের মানুষ দম্ভকে দমিয়ে রেখে একে অপরকে সম্মান করে

শারীরিক সমস্যায় ফরাসি চিকিৎসকদের কাছে যতবার দ্বারস্থ হয়েছি ততবার নতুন ভাবে মুগ্ধ হয়েছি। হঠাৎ প্রচণ্ড কোমর ব্যথা অনুভব হওয়ার কারণে হসপিটালে যেতে হয়েছিলো গতকাল। নাম রেজিস্ট্রেশন করে অপেক্ষমাণ কক্ষে বসে আছি ডাক্তারের অপেক্ষায়। বিশ মিনিট পর এক তরুণী ডাক্তার এলেন আমাকে সঙ্গে করে তার চেম্বারে নিতে। আমার সঙ্গে একটি বড় কম্পিউটার ব্যাগ দেখে ডাক্তার নিজেই ব্যাগটি হাতে নিলেন। ভেবেছেন,যেহেতু আমার কোমর ব্যথা হয়তো ব্যাগটি বহন করতে আমার কষ্ট হবে । আমি বললাম মাদাম আমি নিতে পারবো ব্যাগটি আমাকে দিন। ডাক্তার বললেন, কোন ব্যাপার না, আপনি চলুন আমার সঙ্গে।চেম্বারে কিছু প্রশ্ন করার পর ব্যাথার ধরন পরীক্ষা করার জন্য আমাকে একটি বেডে শুইয়ে দিলেন এবং কোমরের নিচের অংশ (পা) বিভিন্ন ভাবে ভাজ করে পরীক্ষা করলেন। আমার পায়ে জুতা পরা ছিল, পরীক্ষার এক পর্যায়ে জুতা খোলার প্রয়োজন হল। ডাক্তার নিজেই জুতার ফিতা খুলে নিজে হাতে পা থেকে জুতা সরালেন।অথচ আমি এতো অসুস্থ নই যে জুতা খুলতে পারবো না। ডাক্তার আমাকে বললেই আমি জুতা খুলতে পারতাম। অথচ তিনি কিছু না বলে সরাসরি নিজে হাতে আমার জুতা খুললেন। 


ফরাসিরা ইগোকে জয় করে পেশাদারিত্বকে শিল্পে রূপ দিয়েছে অনেক আগেই। যে কেউ হোক না কেন সেবা গ্রহীতার গায়ের রঙ,ধর্ম,দেশ বা সামাজিক অবস্থান ও  মর্যাদা বিবেচনা না করে সেবা প্রদানকারী তার সেবার সঙ্গে সম্মানটুকু নিঙরে দেবার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। 


ধরুন, আপনি কোন মন্ত্রণালয়ে কোন মন্ত্রীর কাছে সেবা গ্রহণের জন্য গিয়েছেন। মন্ত্রী তার আসন ছেড়ে নিজে এসে আপনাকে তার কক্ষে নিয়ে যাবে, আবার আলোচনা বা কাজ শেষ হওয়ার পর মন্ত্রী তার সেবা গ্রহীতা বা অতিথিকে নিজে সঙ্গে করে বাহির দরজা পর্যন্ত সঙ্গ দিয়ে নিয়ে আসবেন এবং হাত মিলিয়ে হাসিমুখে বিদায় দেবেন।সেবাগ্রহীতার পেশা, শিক্ষা বিবেচনা করে এমন আতিথেয়তার ধরনের তারতম্য হয়না কখনো। ফরাসি যে কোন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যে কোন প্রকার সেবা গ্রহণের জন্য গেলে প্রত্যেক দায়িত্বশীল সেবাদাতার আচরণ এমন হয়ে থাকে। 


ধরুন, আপনি এই ফ্রান্সে নতুন এসেছেন,কোন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কোন সেবার জন্য গিয়েছেন। ডেস্কে বসা আপনার সেবা প্রদানকারী দায়িত্বশীল মানুষটি কোন সুন্দরি তরুণী বা মহিলা। সে আপনাকে কখন দেখেনি,আপনার সম্পকে সে কিছুই  জানে না কিন্তু আপনার সেবাটা এমন যত্ন ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রদান করবে যে আপনি সেবা প্রদানকারীকে ভুল বুঝতে পারেন। আপনার মনে হতে পারে সুন্দরি মহিলা হয়তো আপনার প্রেমে পড়ে এমন যত্নের সেবা প্রদান করেছেন। কারণ, আপনি ভাবতে পারেন এমন আন্তরিক হাসি ও ব্যবহার  আমার জীবনে আমার প্রেমিকার কাছ থেকেও কখনো পাইনি। এই হাসিমাখা সেবার সঙ্গে হয়তো প্রেম জড়িয়ে আছে।কিন্তু আসলে তা নয়।ফসাসিরা মূলত সেবাটাকেই প্রেমে রূপান্তর করেছে।   


ফরাসিরা অন্যকে সম্মানের ব্যাপারে সব সময় সর্বোচ্চ সচেষ্ট।সেটা দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত। ধরুন প্রচণ্ড ভিড়ের কোন মেট্রো ট্রেন বা পাবলিক বাসে উঠেছেন। আপনি অসাবধানতাবসত কোন ফরাসির পায়ে প্রচণ্ড বেগে পারা দিয়েছেন, ব্যথা পাওয়া মানুষটির কাছে আপনি ক্ষমা চাওয়ার জন্য দুঃখিত বলতে উদ্যত হলেন, দেখা যাবে আপনার আগেই উল্টো ব্যথা পাওয়া মানুষটিই আপনার কাছে অত্যন্ত দুঃখিত বলে  ক্ষমা চেয়ে বসেছে এই ভেবে যে, তার পা’টিই  হয়তো সঠিক জায়গায় ছিল না যার দরুন তিনি অন্যের দ্বারা পায়ে ব্যথা পেয়েছেন এবং তার এই ভুলের কারণে পায়ে পারা দেয়া ঐ লোকটি তার দ্বারা অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন।যেখানে ব্যথা পেয়ে অন্যকে দুটো কথা শোনানোর কথা সেখানে নিজেই চেয়ে বসলেন ক্ষমা,তাহলে আর বিবাদ তৈরি হবে কিভাবে।    


একবার স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইগর মাতোভিচ এক সরকারি সফরে আসলেন প্যারিসে। এক রাষ্ট্রীয় দপ্তরের খোলা প্রাঙ্গণে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। ভাষণ চলাকালীন সময়ে হঠাৎ গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হল। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ছাতা ধরে বসলেন ইগর মাতোভিচের মাথার উপর। অথচ ছাতাটা কোন সরকারি কর্মকর্তা ধরতে পারতেন, কিন্তু ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিজেই তার মাথার উপর ছাতা ধরে অন্যকে সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে ঔদার্যের এক অন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এতে শক্তিধর একটি দেশের প্রেসিডেন্ট মর্যাদায়  স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী চেয়ে ছোট হননি, বরং তার সম্মান আরও দিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইগর মাতোভিচের হৃদয়ে হয়তো প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জন্য সম্মানের আসন হয়েছে চিরস্থায়ী।   


আপনি হয়তো কোন আর্ট গ্যালারিতে গিয়েছেন কোন বিখ্যাত শিল্পীর চিত্র প্রদর্শনী  দেখতে। ঘুরেঘুরে ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখলেন আপনার সঙ্গে ছবি প্রদর্শনী দেখছে বিখ্যাত কোন তারকা ফরাসি চলচ্চিত্র শিল্পী বা কোন নোবেল পুরস্কার জয়ী ব্যক্তিত্ব, অথবা কোন ফরাসি প্রভাবশালী মন্ত্রী। আপনার পাশে এই মানুষগুলোর আচরণ বা অঙ্গভঙ্গি দেখে আপনার কখনোই মনে হবেনা যে তারা কর্ম দ্বারা আপনার থেকে আলাদা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশেষ মানুষ। বরং আপনি তার সঙ্গে খুবই সহজ ভাবে কথা বলতে পারবেন। চাইলে তার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারবেন।পরে ছবিটি দেখে মনে হবে আপনি হয়তো কোন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে ছবিটি তুলেছেন।    


আপনার যদি কখনো ফ্রান্সের কোন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করার সুযোগ হয় তখন ফরাসিদের সম্মান প্রদর্শনের আরও কিছু নজির চোখে পড়বে।আপনি যে কর্মকর্তার অধীনে চাকুরী করবেন, যার আদেশ বা নির্দেশ শোনা আপনার দায়িত্ব বা চাকুরী, সেই ব্যক্তি কখনই আপনাকে সরাসরি কোন কাজের আদেশ করবে না। অতি বিনয়ের সহিত আপনাকে বলবে, মসিয়/মাদাম আপনার কি এই কাজটি করার সময় হবে,অথবা আপনি কি এই কাজটি করতে পারবেন?অনেক প্রতিষ্ঠানে আপনার বসকে নাম ধরে সম্বোধন করতে পারবেন বরং অনেক ক্ষেত্রে তাকে স্যার বা মসিয় বললে সে অখুশি হতে পারেন। উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও অধীনস্থ কর্মচারীদের মধ্যে প্রভু ও ভৃত্য সম্পর্কের পরিবর্তে বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্যই একে অপরকে নাম ধরে সম্বোধন করে থাকে। যেখানে কাজের পরিবেশ ঊর্ধ্বতন ও অধনস্থদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কে বিরাজ করে সেখানে কাজের মান ও উৎপাদন বেশী হয়ে থাকে। 

যদি কখন কোন বড় উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের মালিকে মসিয় বা স্যার বলে সম্বোধন করতে হয়, তবে সেই কর্মকর্তা বা মালিক আপনাকে কখন নাম ধরে সম্বোধন করবে না।সেও আপনাকে স্যার বা মসিয় বলেই সম্বোধন করবে, আপনার পদবি যদি ঐ প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন অবস্থানেরও হয়ে থাকে। 

আপনি কোন কায়িক পরিশ্রমের কাজ করছেন,আপনার প্রতিষ্ঠানের মালিক বা কর্মকর্তা যদি দেখে আপনি কাজটি করতে পারছেন না, আপনার সাহায্য প্রয়োজন, তবে ঐ স্যুট কোর্ট পরা কর্মকর্তা বা মালিক চেয়ারে ফেলে চলে আসবে আপনাকে সাহায্য করার জন্য এবং নিজে হাতেই আপনার কাজটি করবে, হোক সেটা ডাস্টবিন পরিস্করার করার কাজ।কখনো আপনার কাছে কৈফিয়ত চেয়ে বলবে না কেন কাজটি করতে পারছেন না।যদি আপনি সত্যি কাজটি করতে অপারগ হন,তাহলে আপনাকে ভৎসনা না করে বরং আপনাকে ছুটিতে পাঠিয়ে বিকল্প পথ খুঁজবেন। 

যদি কখন প্রতিষ্ঠানে উৎসবের আয়োজন করা হয়,তখন প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার কর্মচারীদের প্লেটে নিজের হাতে খাবার তুলে দিয়ে সম্মানিত করার চেষ্টা করেন। তারা মনে করেন এই কর্মচারীরাই প্রতিষ্ঠানের চালিকা শক্তি। তারা ভালো থাকলে প্রতিষ্ঠান ভালো থাকবে। প্রতিষ্ঠান ভালো থাকলে মালিক ভালো থাকবে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আরামের চেয়ার ঠিক থাকবে।      


 


ফরাসি দেশে সম্মান প্রদর্শনের আর একটি বড় রীতি হচ্ছে সম্বোধনের সমতা। 

এখানে সম্বোধন সূচক শব্দ মানুষের শ্রেণী ব্যবধানে ভিন্ন ভিন্ন নয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে মসিও,মেয়েদের ক্ষেত্রে মাদাম বলে সবাই সবাইকে সম্বোধন করে থাকেন।সামাজিক স্তর,পেশা,শিক্ষা যার যেটাই হোকনা কেন সেটা বিবেচ্য নয়।অর্থাৎ এই দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হতে আরম্ভ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী পর্যন্ত সম্বোধনসূচক শব্দ এক।এ ক্ষেত্রে সম্মানসূচক সম্বোধনের বিন্দুমাত্র হেরফের হবে না।


মূলকথা হচ্ছে, জীবন তখনি সুন্দর যে জীবনে সম্মান রয়েছে। সমাজ তখনি সুন্দর হয়ে ওঠে যখন সমাজের মানুষ একে অপরকে সম্মান করে, দম্ভকে দমিয়ে রেখে একে  অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। যে গুণ বা চর্চা ফরাসি সমাজের মধ্যে খুঁজে পাই।