শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০

স্মৃতিতে শিল্পী মুহিত আহমেদ জ্যোতি

 


মুহিত আহমেদ জ্যোতি, ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙ্গালী কমিউনিটির সংস্কৃতি অঙ্গনের এক দ্যুতিময় নক্ষত্রের নাম।তিন বছর আগে এই অক্টোবর মাসে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অন্তর্ধান হন এই জ্যোতিময় নক্ষত্র। অদৃশ্যবাস হলেও এখনো প্রিয়জন বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্মৃতিতে জীবন্ত ও হাস্যোজ্জল হয়ে তার ঘুরেফিরে নিত্যদিন। প্রতিবছর অক্টোবর মাস আসলেই সেই বেদনাঘন দুঃখ ভরা দিনটির স্মৃতি দগদগে হয়ে ভেসে ওঠে অনেকের মনে।কবি শামসুর রহমানের কবিতার কয়েকটি পক্তিমালায় মতই এক অভিমান জেগে বসে হৃদয়ের কোনে...... 


তোমার কিসের তাড়া ছিল অত ? 

কেন তুমি সাত তাড়াতাড়ি এই গুলজার আড্ডা থেকে 

গুডবাই বলে চলে গেলে, কেন ? 

আমরা ক’জন আজো, তুমিহীন, বসি এখানেই- 

তক্কে-গপ্পে,গানে-পানে,জমে ওঠে কিছু সন্ধ্যেবেলা।           


৯ অক্টোবর ২০১৭, কাজ শেষ করে কর্মস্থল ত্যাগ করেই হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলাম। যাওয়ার সময় পথে সংগীতশিল্পী আরিফ রানা ভাইয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে একটু থমকে গেলাম।

তিনি লিখেছেনআজকে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পেরেছি বন্ধু মুহিতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ডাক্তারেরা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। একজন সেবিকা জানালেন তোমাদের যা কিছু করণীয় শুরু করতে পার...কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না...একটি অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় আছি... কেন এখনই চলে যাওয়ার তাড়া, অনেক কাজ আছে বাকি, শেষ করতে হবে অসমাপ্ত সব ছবি, ঝগড়া, অভিমান এখনো যে বাকি...।
স্ট্যাটাসটা পড়ে বুকের মধ্যে একটা কাঁপন অনুভব করলাম। মেট্রো থেকে নেমেই এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করে হাসপাতালের দিকে দ্রুত ছুটে গেলাম। হাসপাতালের নিজতলায় সংস্কৃতিকর্মী অলকা দিদিসহ প্যারিসের আরও কয়েকজন মুহিত ভাইকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। দ্বিতীয়তলায় কেবিনের সামনে বসা কয়েকজন সমমনা বন্ধুর বিমর্ষ মুখচ্ছবি বলে দিচ্ছে সত্যি কোনো খারাপ সময়ের অপেক্ষায় আছি। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মুহিত ভাইয়ের কেবিনের আমরা কয়েকজন এগোতে লাগলাম। কেবিনের বিছানায় নিথর পড়ে আছে দেহ, দুই চোখে প্রশান্তির ঘুম। মুখের সঙ্গে লাগানো যন্ত্রের সাহায্যে চলছে শ্বাসপ্রশ্বাস।
আমি কেবিনে দাঁড়িয়ে বুকের স্পন্দন দেখছি আর আশায় বুক বাঁধছিমুহিত ভাই জেগে উঠবেন, সৃষ্টিকর্তা দয়া করে আবার আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেবেন তাঁকে। কিছুক্ষণ পর করিডরে অবস্থান নিলাম। ২০ মিনিট পর ঘড়িতে রাত ৮টা ৪৫ মিনিট। অলকাদি কান্নাভেজা চোখে করিডরে এসে জানালেন, শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র খুলে ফেলা হয়েছে। বুঝতে দেরি হলো না, আশাভঙ্গ হয়েছে, মুহিত ভাই দেহত্যাগ করে ওপারে রওনা হয়েছেন। অর্থাৎ কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেছেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল যে মানুষটি আমাদের মাঝে ঘুরে বেড়াতেন, তিনি এভাবে অতীত হয়ে যাবেন ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল। আবার ভেতরে প্রবেশ করলাম, এবার যন্ত্রপাতি ছাড়া বিছানায় শুধুই মুহিত ভাইয়ের নিথর দেহ। তাঁর সাত-আট বছরের কন্যাসন্তানটি কিছুক্ষণ আগে আশপাশে স্বাভাবিকভাবে ঘুর ঘুর করছিল বাবার সুস্থতার অপেক্ষায়। তাকে এবার দেখলাম অপেক্ষমাণ কক্ষে বাবা হারানোর বেদনায় কান্নাভেজা চোখে। এমন দৃশ্য দেখা ছিল সত্যি কঠিন। 


মুহিত ভাই ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু আচরণে ছিলেন প্রতিভার অহংকারমুক্ত একজন সংস্কৃতি শ্রমিক। দূর পরবাসে বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশের জন্য যে মানুষগুলো নিঃস্বার্থ ও নিবেদিতপ্রাণ, মুহিত ভাই ছিলেন ইউরোপের বাংলা কমিউনিটির সংস্কৃতি অঙ্গনে তেমনি এক শিল্প ভাবনার এক সাধক মানুষ। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা বা আড্ডার সুযোগ আমার খুব কম হয়েছে। যতটুকু কথা, যোগাযোগ ও আন্তরিকতার সৃষ্টি হয়েছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে। তিনি মিডিয়ার ঘোষিত কোনো তারকা শিল্পী ছিলেন না,কিন্তু তার শিল্পকর্মের মধ্যে তারার জ্যোতি ছিল। শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে যে ধরনের আদর্শিক ও চারিত্রিক গুনের মানুষ হওয়া যায়, সেই গুণাবলি তাঁর চলনবলন, কথা ও মানুষের সঙ্গে মেশার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেত। প্যারিসের কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠান তাঁর রং-তুলির আঁচড় কিংবা তাঁর উপস্থাপনা ছাড়া যেন একটু অসম্পূর্ণ থেকে যেত। নিজে নানা গুনের অধিকারী হলেও, সামান্য গুনের মানুষকেও অন্যের কাছে বড় করে উপস্থাপন করতেন। বন্ধু মনে করে কখনো ঠাট্টার ছলে কাউকে কিছু বললে, তা কেউ গ্রহণ করতে না পারলে তা আবার ঠাট্টা মধ্য দিয়ে মুহূর্তেই পরিবেশ আনন্দঘন করার এক সম্মোহনী গুনের অধিকারী ছিলেন। 


প্যারিসে অক্ষর নামে কবিতাভিত্তিক একটি সংগঠনের সঙ্গে আমি জড়িত। ডিজিটাল যুগে সব অনুষ্ঠানে ডিজিটাল প্রিন্টিং ব্যানার ব্যবহার হলেও আমাদের কবিতার অনুষ্ঠানগুলোর ব্যানার হতো মোহিত ভাইয়ের শৈল্পিক হাতের রং তুলির তৈরি ব্যানার দিয়ে। শুধু ব্যানারের কারণেই অনুষ্ঠানের ষাট ভাগ সৌন্দর্য বেড়ে যেত। অনুষ্ঠানের দিন কখনো ব্যানারটি আমাদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন না। নিজের থেকেই মঞ্চসজ্জা থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত সার্বিক সহযোগিতায় পাশে থাকতেন। এত কিছু করার পর আবার মঞ্চে গিয়ে কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতে কোনো বিচ্যুতি ধরা পড়ত না।


একজন শিল্পীর শৈল্পিক সেবার পাশাপাশি যে সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে, সেই কর্তব্যের জায়গায় তিনি ছিলেন যথেষ্ট সচেতন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকটে প্রবাসের যে প্রতিবাদ, মানববন্ধন হয়, সেই সব জাতীয় ও আপামর মানুষের স্বার্থের কর্মসূচিগুলোতে মুহিত ভাইয়ের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত।
প্যারিসের বৃহৎ বাংলা কমিউনিটির মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির তারকা ব্যক্তিত্ব অনেকই রয়েছেন। কিন্তু মুহিত ভাইয়ের মতো সেবক বা শ্রমিকমনা সংস্কৃতি কর্মী আজও সৃষ্টি হয়নি।তাঁর  প্রস্থানে  কমিউনিটির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা আজও পূরণ হয়নি।


মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ

সংস্কৃতিকর্মী 

সদস্য,অক্ষর 

প্যারিস, ফ্রান্স ।

ইউরোপের এক বাঙালি সংস্কৃতিকর্মীকে স্মরণ

প্যারিসপ্রবাসী শিল্পী মুহিতের অকালপ্রয়াণ



শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ছাত্রলীগের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরা সময়ের দাবী ।

আওয়ামেলীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তাণ্ডব ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভীত সন্ত্রস্ত সারা দেশের মানুষ।রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী অনৈতিক কর্মকাণ্ডের এমন কোন কর্ম নেই যে তারা করছেনা। বল্গাহীন এই উচ্ছশৃঙ্খলতার লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের দাবী। 

 

ছাত্রজীবনে দুটি ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আমাকে ছাত্র রাজনীতির প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে ছিল।একটি আওয়ামী ছাত্রলীগ অন্যটি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।তখন এই দুটি ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের চিন্তা ভাবনায় প্রগতিশীল মনে হতো।আচার আচরণে মধ্যেও ছাত্রত্ব ভাব ফুটে উঠত। আমার ছাত্র জীবনের ছাত্র রাজনীতির অভিজ্ঞতা বড় কোন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নয়।রাজবাড়ী জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজবাড়ী সরকারী কলেজে অধ্যায়ন কালে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রী’র আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।জেলার সবচেয়ে পুরাতন কলেজ হওয়ায়,স্বাধীনতা পূর্ব থেকেই এখানে ছাত্র রাজনীতির ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত ছিল।বাংলাদেশের প্রতিটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো এই ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে তাদের আন্দোলন সংগ্রামে সরব ছিল।ছাত্র রাজনীতির আমাদের সময়ে এবং পূর্বে ছাত্রলীগকে দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসে সুসভ্য ও নিয়মতান্ত্রিক  ভূমিকায়। ছাত্রলীগকে কখনো ক্যাডার ভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা করতে দেখিনি।অবশ্য তাদের সাংগঠনিক কাঠামোও বেশ দুর্বল ছিল।বরং ক্যাম্পাসে ছাত্র মৈত্রী ও ছাত্র দলের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে মাঝে মাঝেই কলেজ ক্যাম্পাস সহ পুরো শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠত। আমাদের দেশের রাজনীতিতে সাধারণত দল ক্ষমতাসীন হলে ঐ দলের ছাত্র সংগঠন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডে দলের বড় বড় নেতাদের সমর্থন ও ইশারা থাকায় ছাত্র নেতারা অপকর্ম করে পার পেয়ে যায়।কিন্তু, ১৯৯৬ সালে আওয়ামেলীগ ক্ষমতায় আসার পর, আমার মনে পড়ে  না তৎকালীন আওয়ামী ছাত্র সংগঠন  ছাত্রলীগের নেতারা  রাজবাড়ীর বুকে ক্ষমতা অপব্যাবহার করে রাজবাড়ী শহরে উল্লেখ করার মত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, ধর্ষণের মত একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে।এই না ঘটার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, বর্তমানে যিনি রাজবাড়ী ১ আসনের সংসদ সদস্য, তিনি তখনও এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।মানুষ পরিবর্তনশীল, বর্তমানে তিনি কেমন সেটা আমার জানা নেই, তবে তখনকার সময় তিনি ছাত্র সংগঠনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিতেন না। যার ফলে, তৎকালীন রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগকে আওয়ামেলীগের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকালীন সময়েও কখনো দানবীয় চরিত্রে দেখা যায়নি। তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতাদেরকে এখনো আমরা ভদ্র মানুষ হিসেবেই জানি।তাদের নৈতিকতার অধঃপতন এখনো এতো নিম্নগামী নয়।গত বছর দেশে গিয়েছিলাম আমাদের সময়কার ছাত্রলীগের বড় ভাই ও ছোট ভাই যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছে তাদেরকে  দেখেছি কেউ ব্যবস্যা করছে,কেউ চাকুরী করছে, আবার কেউ রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় থাকলেও তাদের নামের পাশে এখনো নোংরা ইমেজের ছায়া যুক্ত হয়নি। রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের বর্তমানের কর্মকাণ্ড কেমন,সেটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আমাদের সময়ের রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগ একটি আদর্শ ছাত্র সংগঠন ছিল তা বুকে হাত দিয়ে বলা যায়।   


মূল রাজনৈতিক দল যদি ছাত্রলীগের কর্মীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আশ্রয় প্রশ্রয় না দেয় এবং তাদের তারুণ্যের শক্তিকে মাঠের রাজনীতিতে অপব্যাবহার না করে, তবে সারা দেশে ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনটি তৎকালীন রাজবাড়ী জেলা ছাত্রলীগের মত একটি আদর্শ ছাত্র সংগঠন হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পৃথিবীর নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশান্তি ও অশান্তি

পৃথিবীতে দুই ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যমান।নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র একটি যথাযত আইন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে জনগণের অধিকার সংরক্ষণ করে। অপরদিকে, অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বইয়ের পাতায় লিখিত সাংবিধানিক আইন ও প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।ফলে পদে পদে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুন এমন রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের অনাস্থা সৃষ্টি হয়।জনগণ যে কোন পন্থায় নিজের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব বাধ্য হয়ে নিজেই নিশ্চিতের চেষ্টা করে।ফলে সমাজ এক অনিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়ে। 


একটি মানবিক, জবাবদিহিতামূলক  ও নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ তার আর্থিক সামাজিক নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের আইন ও নীতির উপর আস্থা রেখে নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করে।এমন রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রাপ্তিটুকু রাষ্ট্র জনগণকে বুঝিয়ে দিতে সচেষ্ট থাকে, আবার জনগণের নিকট রাষ্ট্রের প্রাপ্যটুকু রাষ্ট্র নিয়মের মধ্যদিয়ে বুঝে নেয়। জনগণ ও রাষ্ট্র একে অপরের উপর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও আস্থাশীল।রাষ্ট্র ও জনগণ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমন সমাজের মানুষ সৎ কর্মকে জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখে।  


অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ তার জীবনের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য অর্থ ও ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল হয়। রাষ্ট্রের সংবিধানের উপর নয়।ফলে অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের নেশা এমন রাষ্ট্রের মানুষকে চরম দুর্নীতি পরায়ণ ও অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ করে ।নীতি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে পার্থক্যের  বিশেষ কোন ফারাক খুঁজে পাওয়া যায়না।উভয় শ্রেণীর মানুষ বিশ্বাস করে যত বেশী টাকা উপার্জন করা যাবে  জীবন ততো বেশী স্বাচ্ছন্দ্যময়, আরাম আয়েশে ভরা ও নিরাপদ হবে।অধিক অর্থ ক্ষমতার উৎস আর ক্ষমতা মানে মানুষের কুর্ণিশ আর দুঃসাধ্যকে সাধ্যে রূপান্তর। গভীর বিশ্বাস, তাদের বিপদে অর্থ ছাড়া মুক্তির আর কোন মাধ্যম খোলা নেই এবং কোন কিছু অর্জনের জন্য ক্ষমতা ছাড়া প্রাপ্তি নেই।তাই, অর্থ ও ক্ষমতাকে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে এমন রাষ্ট্রের মানুষ যাবতীয় কর্ম পরিকল্পনা সাজায়। কারণ তারা জানে, রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের জন্য প্রদত্ত কল্যাণের প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার বিজ্ঞাপন মাত্র।ফলে জনগণ তার রাষ্ট্রের সংবিধানকে বিশ্বাস করেনা,রাষ্ট্রও জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছা, আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মাথা ঘামায় না।এখানে জনগণ রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়, দুইটি বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা। 

এই সমাজের মানুষ ভাগ্য ও কুসংস্কারের উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। যা আধুনিক, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান মনস্ক ও প্রগতিশীল জাতি গঠনের চরম অন্তরায়।এছাড়া "পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি"এমন প্রবাদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিত্তিহীন। কারণ এমন সমাজে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যেহেতু কোন কিছু সম্পন্ন হয় না তাই গাধার মত পরিশ্রমের পরিবর্তে সুযোগ সন্ধানী হতে হয়।পরিশ্রম করে যোগ্যতা অর্জনের পর যোগ্য আসন মেলে না, কিন্তু অযোগ্য মানুষ তোষামোদি,ব্যক্তিপূজা ও ধূর্ত পথ অবলম্বন করে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বের আসন অলংকরণ করে। এমন নজীর এমন সমাজে ভূরি ভূরি।       

রাষ্ট্রের প্রতি এমন আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস এ সকল রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে আরম্ভ করে একজন শ্রমিক পর্যন্ত প্রতিটি মানুষকে প্রচণ্ড অর্থলিপ্সু,লোভী ও আত্মকেন্দ্রিক  করে গড়ে তোলে।জনগণ নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক উভয় উপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও জীবনের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়। প্রতিমুহূর্তের অবিশ্বাস ও অনিরাপত্তার ভীতি প্রতিটি মানুষকে  উৎকণ্ঠার মধ্যে রাখে।এমন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকেও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অন্যায়ের আশ্রয় নিতে হয় এবং চলমান অনিয়ময়ের ফল অদূরে ভোগের ভয়ে ভবিষ্যতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আরও অনিয়ম করার ছক বা কূটকৌশল আঁটতে হয়। রাষ্ট্রের প্রধান চেয়ার মানুষের কুর্ণিশ এনে দিলেও সেই কুর্ণিশ তাকে আত্মতৃপ্তির প্রশান্তি দেয় না। কারণ তিনি জানেন, এই কুর্ণিশ শ্রদ্ধার অর্জন নয়, এই কুর্ণিশ ভয়ের। রাষ্ট্রের চেয়ার সরে গেলেই কুর্ণিশের পরিবর্তে জনগণের ঘৃণার ঢিল নিশ্চিত ধেয়ে আসবে তার দিকে।


নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একজন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী  জীবনের যে স্বাদ উপভোগ করে জীবন পাড়ি দেয়, একটি অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক ও রাষ্ট্রপ্রধান সেই সেই সুখের কাছাকাছিও যেতে পারে না।  


একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ ব্যক্তিগত অর্থ বিত্তের মালিক না হলেও রাষ্ট্রের উপর ভরসা রেখে নিশ্চিন্ত জীবন যাবন করে। অনিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ টাকার পাহাড় ও ক্ষমতার চূড়ায় অবস্থান করেও  রাষ্ট্রের উপর আস্থাহীনতা অবিশ্বাস ও অনিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় একটি অনিরাপদ ও দুশ্চিন্তার জীবন অতিবাহিত করে। 


আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবন সুন্দর ভাবে পরিবাহিতের জন্য দরকার একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় ও ক্ষমতার চূড়া  নয়।প্রতিটি মানুষের মধ্যে এই বোধ সৃষ্টি হওয়া একান্ত অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে প্রত্যেকের ভূমিকা অত্যাবশ্যক । 

বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২০

পেই দো লা লোয়ার'য়ে চারদিন। পর্ব - ১


গ্রীষ্মের ছুটি মূলত ইউরোপিয়ানদের নিকট সারা বছরের এক উৎসব আনন্দের প্রতীক্ষা।ইউরোপ জুড়ে গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হয় জুলাই থেকে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রগুলোতে চলে কর্মীদের অবকাশে যাপনের উৎসব।সারা বছরের কর্ম ক্লান্তির বিষাদ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নতুন বছরের জন্য কর্মোদ্যমী হবার লক্ষ্যে বায়ু বদলের জন্য স্থান পরিবর্তনের হুলুর পরে যায় এই সময়।দিগুণ বেড়ে যায় দূরবর্তী বিমান, ট্রেন,বাসের টিকেটের  দাম ।হোটেলে রেস্তোরাগুলো অতিথিদের সেবায় ক্লান্তিহীন কর্ম ব্যস্ত সময় পার করে। 

গ্রীষ্মের ছুটিতে মিশেল ও জান্নাত বাসায় অবসর সময় পার করছে।ইচ্ছে ছিল ওদের নিয়ে এবার সক্রেটিস, প্লেটোর দেশ গ্রিসের রাজধানী এথেন্স ঘুরতে যাবো।প্রথমত এথেন্সের হোটেল ভাড়া ও রেস্তোরাঁর খাবার খরচ ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম এবং অনেক আগে বিমান টিকেট বুকিং করলে সাশ্রয়ী মূল্যে বিমানে যাতায়াত করা যায়।

আমার ছুটির সময় নিয়ে একটু দ্বিধান্বিত থাকায় বিমানের টিকেট দু মাস পূর্বে বুকিং করার পরিকল্পনা থাকলেও তা আর করা হলো না।যখন ছুটির সময় নিশ্চিত হলাম তখন তাৎক্ষণিক টিকেট কাটতে হবে।ইন্টারনেট ঘেঁটে প্যারিস এথেন্সের যাওয়া আসার বিমানের ভাড়া দেখে হতাশ হলাম। কারণ ভ্রমণ বাজেট শুধু বিমান ভাড়াতেই নিঃশেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম ফ্রান্সের মধ্যে কোন সমুদ্রের নিকটবর্তী শহরে এবারের গ্রীষ্মের ছুটি কাটাবার। ইন্টারনেটে ঘোরাঘুরি করে আমাদের ভ্রমণ গন্তব্য নির্ধারণ হলো ফ্রান্সের পেই দে লোয়া (Paye des loir) অঞ্চলের প্রধান শহর শহর নন্তে (Nantes)।ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী ৯ আগস্ট ২০১৯ আমাদের যাত্রা, এবং ফেরা ১৩ আগস্ট।   

বুকিং ডট কমের মাধ্যমে নন্ত শহরের তেরত এলাকায় চার দিনের জন্য একটি এপার্টমেন্ট ভাড়া করা হলো।

Oui sncf এর সাইটে গিয়ে ৯ আগস্টের প্যারিস থেকে নন্তের ভ্রমণ মূল্য তালিকা দেখে নিলাম। সকাল ৭,০০ টায় ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের টিকেটের মূল্য সুলভ হওয়ায় ভোরের ট্রেনে আমাদের যাত্রা নিশ্চিত করলাম।ইউরোপের যাত্রী পরিবহন ভাড়া গন্তব্য অনুযায়ী নির্ধারিত নয়, অনেকটা আমাদের দেশের শেয়ার বাজারের মত, একই গন্তব্যস্থলের ভাড়া একই দিনে শুধু সময়ের তারতম্যে দিগুণ হয়ে যায়,আবার অর্ধেকে নেমে আসে।তাই, ইন্টারনেটে ভালো ভাবে অনুসন্ধান করলে যে কোনো পরিবহণের টিকেট সাশ্রয়ী মূল্যে কেনা যায়।


এখানকার ট্রেনগুলো খুব দ্রুতগামী, তাই যাত্রা পথের বাইরের দৃশ্য ট্রেন থেকে ভালোভাবে দেখা যায়না। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমদের ফেরাটা হবে বাসে।  যদিও ট্রেনের থেকে দুই ঘণ্টা সময় বেশী ব্যয় করতে হবে বাসে ফেরার পথে। 


আমাদের মেয়ে মিশেল, কিছু দিনের জন্য অন্য কোথাও সময় কাটানো তার প্রিয় শখগুলোর মধ্যে একটি। নতুন জায়গায় তার নিজের  বিছানায় শোয়া ,নিজের রুমে ইচ্ছে মত সময় কাটানো খুব উপভোগ করে। ২০১৬ সালে আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম ফ্রান্সের Cean ক শহরে।ছিল দুই দিনের ছোট্ট ভ্রমণ।হোটেলের একটি কামরা ভাড়া করেছিলাম।সেই কামরায় তার জন্য আলাদা ছোট্ট একটি বিছানা ছিল।তার নিজস্ব বিছানা এই ভেবে যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলো, তা দেখে আমি অনেকটাই আশ্চর্য হয়েছিলাম। পাঁচ বছরের এক শিশু,তার নিজের মত কিছু পাওয়ার মধ্যে এতো আনন্দ দেখে আমি ভাবছিলাম, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই  নিজের মত করে চাওয়া থাকে, কারো প্রাপ্তি ঘটে, কারো ঘটে না। প্রাপ্তি যদি ধরা দেয় তাহলে উচ্ছ্বাসটা এমনি হয়।সেটা হোক কোন শিশু বা পূর্ণাঙ্গ কোনো মানুষের।  


এবার পুরো একটা আধুনিক এপার্টমেন্ট চার দিনের জন্য আমাদের।এপার্টমেন্টের সমস্ত স্পেসের ছবিগুলো বুকিং ডটকমের সাইটে রয়েছে।মিশেলের রুমটি ছবিতে বেশ ছিমছাম দেখাচ্ছে।এপার্টমেন্ট বুকিংয়ের পর থেকে সুযোগ পেলেই মিশেল আমাকে তার রুমের ছবি দেখাতে বলে, ছবি দেখার পর সে কি ভাবে দিন কাটাবে সেই পরিকল্পনা সাজায় আমার সাথে।

এর মধ্যে ট্রেনের টিকেটের শর্ত অনুযায়ী তিনটি নির্ধারিত মাপের আলাদা আলাদা লাগেজ কেনা হয়েছে।মিশেলের ব্যস্ততা শুরু হল তার প্রয়োজনীয় খেলনা  সামগ্রী ও কাপড় চোপড় গোছগাছ করতে। যাত্রার পূর্ব দিন পর্যন্ত চলল এই ব্যস্ততা। 

 

আমার চিন্তা বেল্কনি বাগানের ফুল গাছগুলোকে নিয়ে।গ্রীষ্মের সময় প্রতিদিন নিয়ম করে দু বেলা ওদের শরীর ভিজিয়ে না দিলে প্রাণ যায় যায় অবস্থা।এতদিনের যত্নে বেড়ে ওঠা প্রাণগুলো চারদিনের অনাহারে নিঃশেষ হবে, এই ভেবে ভ্রমণ আনন্দ উপর এক কালো ছায়া ছেয়ে আছে।প্যারিসে আমাদের বেশ কিছু পারিবারিক বন্ধু রয়েছে, যেকোনো বিপদে আপদে যখন ডাকি আত্মার টানে পাশে এসে দাঁড়ায়।কিন্তু এবার ফুল গাছগুলোর  জীবন রক্ষার্থে কোন বন্ধুর সাহায্য চাইতে দ্বিধান্বিত হলাম।এখানকার ব্যস্ততা একটু ভিন্ন রকম।কারো পেশাগত কাজের ব্যস্ততা, আবার পেশাগত কাজ না থাকলেও সরকারী প্রশাসনিক দৌড়াদৌড়ি লেগেই থাকে। তাছাড়া পরিবারের নিজস্ব কাজকর্ম এখানে নিজেদেরই করতে হয়।ঘড়ির কাঁটায় সময় মেপে আমাদের প্রবাস জীবন।তবুও এরমধ্যেই একে অন্যের প্রয়োজনে ছুটে যেতে হয়।এভাবেই গড়ে উঠেছে আমাদের প্রবাসী বাঙ্গালি সমাজ।আবার তিক্ত অভিজ্ঞতাও কম নয়।প্রবাসে প্রত্যেকেরই নতুন অবস্থায় জীবনেই চরম বাস্তবতা পাড়ি দিয়ে স্থিতি অর্জন করতে হয়।এই দুর্যোগকালীন সময়ে প্রত্যেকের জীবনেই কোন মহৎ হৃদয়ের মানুষের সংশ্রব ঘটে।যাদের পরামর্শ ও সহায়তায় দুঃসময় থেকে সুময়ের তীরে উঠতে সহজতর হয়। সুসময়ের তীরে ওঠার পর অনেকেই মনে রাখে ওই দুঃসময়ের দুঃসহ স্মৃতি।এমন মানুষেরা সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার বাস্তবতা অনুধাবন করে নতুন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায় হৃদয় দিয়ে।এর বিপরীত মানুসিকতার মানুষের সংখ্যা এই প্রবাসে কম নয়। যারা অন্যের হাত ধরে বিপদ সীমানা পাড়ি দেবার পর বেমালুম ভুলে যায়, তার সেই করুণ সময়ের মুহূর্তগুলো। প্রকাশ ভঙ্গী হয়ে যায়, কখনোই এই প্রবাসে তাকে বিপদ স্পর্শ করেনি।বিশেষ মর্যাদায় তিনি ফ্রান্স সরকারের অতিথি হয়েছেন।অনেকে নিজেদের অনেক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষও ভাবতে থাকেন।এরা নিজেরা খায়দায়, পয়সা জমায়, চার পাশে অন্যের ঝক্কি জামেলা থেকে নিজেদের মুক্ত রেখে নিরিবিলি জীবন যাপন করে।একমাত্র নিজের বিপদ ছাড়া অন্যের সংস্পর্শে যায়না।এদের জীবন ও জগতের একমাত্র সংগ্রাম শুধু নিজেদের ভালো রাখা।আমার নিজের প্রবাস জীবনে বেশকিছু এমন মানুষের সাথে চলার সুযোগ হয়েছে।এদের মূল চরিত্র বুঝতে না পেরে অনেক সময় সামান্য ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি।এমন আচরণে অপমান বোধ করেছি।কিন্তু এই প্রবাসে এদের জীবনে একটু হলেও আমার অবদান ছিল।সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমার নিজের মধ্যে ভিন্ন এক উপলব্ধি জন্ম নিয়েছে। »প্রবাসের প্রকৃত বন্ধু বলতে এখন বুঝি, প্রবাসে নিজের বসবাসের আইনগত অনুমোদিত কাগজ এবং জীবিকা নির্বাহের পেশাগত কাজ » ।এই দুটি জিনিসই হচ্ছে প্রবাসের বুকে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।যাইহোক, এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা কারণে এখন নিজের সমস্যাগুলো নীরবে নিজেই সমাধানের চেষ্টা করি।পরিক্ষিত আপন মানুষদের কাছেও সাহায্য চাইতে দ্বিধায় পড়ে যাই।অনেক সময় বিপদকালীন সময় পার করার পর পেছনের গল্প শেয়ার করি।অনেকে অভিমানও করে,কেন তাদেরকে জানানো হলনা।যাইহোক, ফুল গাছগুলোর জীবন রক্ষার জন্য কাছের দুই একজন বন্ধুকে অনুরোধ করতে চাইলাম, দুই দিন যেন  আমার বাসায় এসে গাছগুলোকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।কিন্তু  দারুণ দ্বিধা চেপে বসায় কাউকেই আর বলা হলনা।

আমাদের ট্রেন ভোরে ,তাই আগের দিন বাসার বড় বড় পাত্রের মধ্যে পানি ঢেলে যতগুলো সম্ভব ফুলের গাছ একত্রিত করে গোড়ার অংশগুলো ডুবিয়ে  দিলাম পানির মধ্যে।চার দিনের মধ্যে প্রিয় গাছগুলোর পরিণতি কি হবে তা না ভেবেই উপস্থিত বুদ্ধিতে এমনটাই করতে হল। 


আমাদের ট্রেন ছাড়বে  প্যারিসের মোঁপারনাস (Montparnasse) স্টেশন থেকে। ০৯ আগস্ট সকালে আমাদের ট্রেন ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়ের কয়েক মিনিট পূর্বে উপস্থিত হলাম প্লাটফর্মে।আমাদের নির্ধারিত ট্রেনের কামরা সহজেই খুঁজে পেলাম।ট্রেনের জানালার পাশের সিটে বসে মিশেল ব্যস্ত হয়ে পড়লো বাইরের দৃশ্য দেখতে।আমাদের গল্প গুজবে কেটে গেলো তিনঘণ্টা সময়।সকাল দশটায় নন্ত ট্রেন স্টেশনে পৌঁছেই বৃষ্টির অঝর ধারা আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল।চুক্তি অনুযায়ী আমাদের এপার্টমেন্টে ওঠার সময় বিকেল তিনটে।আমার হোটেলে চাকুরীর অভিজ্ঞতা রয়েছে।কোন কক্ষ যদি চুক্তি সময়ের পূর্বে প্রস্তুত থাকে তাহলে হোটেল কর্তৃপক্ষ আগত অতিথিকে আসার সঙ্গে সঙ্গে রুমের চাবি দিয়ে দেয়।সেই চিন্তা করে আমাদের এপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের দেয়া ফোন নম্বরে কল করে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কি এখন এপার্টমেন্টে উঠতে পারব কিনা? উত্তরে বলল, এখনো পূর্বের অতিথিগণ এপার্টমেন্টে অবস্থান করছে তাই নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ফ্লাটে চাবি দেয়া সম্ভব হবে না।মাঝে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগেজ নিয়ে ঘোরাঘুরি বিড়ম্বনার সৃষ্টি করবে ভেবে কর্তৃপক্ষকে আমাদের লাগেজগুলোকে কোথাও রাখার অনুরোধ করলাম। তারা একটি ঠিকানা এস এম এস করে পাঠাল। 

এর মধ্যে সবারি  পেটে টান অনুভব হচ্ছে।স্টেশন থেকে বের হবার মুখে একটি রুটির দোকান।ক্ষুধার্ত অপেক্ষমাণ ও আগত  যাত্রীদের উপচে পড়া ভীর।বসার জায়গা না পেয়ে মিশেল ও জান্নাতকে স্টেশনের বিশ্রাম কক্ষে বসিয়ে রেখে শহরের আশপাশ একটু ঘুরে দেখা এবং কিছু খাবার কেনার জন্য বাইরে বের হলাম।স্টেশন থেকে একটু দূরবর্তী এলাকা বেশ নির্জন।আশেপাশের রাস্তা ও অলিগলি হেঁটে একটাও বুলনজারী (রুটির দোকান)  পেলাম না।একটু হতাশ হলাম,পয়সা খরচ করে কোন ভূতুড়ে শহরে এসে পড়লাম কিনা?প্যারিসের বাইরে ফ্রান্সের অন্য শহরগুলোতে যে জনশূন্য ভাব পরিলক্ষিত হয়, সে পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে।রাস্তার মধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হল, তাই বেশী দূর আর না এগিয়ে আবার ট্রেনষ্টেশনের দিকে ফিরলাম।নন্ত রেলস্টেশনটি বেশ বড় এবং ব্যস্ত, এখান থেকে পেই দে লোয়া অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত ছোট শহর ও ফ্রান্সের অন্যান্য বড় শহরগুলোর উদ্দেশ্যে দ্রুতগামী ট্রেনগুলো ছেড়ে যায়।ফিরে এসে দেখি স্টেশনের রুটির দোকানের কয়েকটি চেয়ার টেবিল ফাঁকা পড়ে আছে।আমার স্ত্রী জান্নাতকে ফোন করে রুটির দোকানে  আসতে বললাম। বাইরে থেমে থেমে প্রবল বৃষ্টি।কিছু কেক ও কফি নিয়ে বৃষ্টি থামার প্রতীক্ষায় খাবার দোকানটির মধ্যে কাটিয়ে দিলাম প্রায় এক ঘণ্টা সময়।

স্টেশন থেকে বেড়িয়ে কয়েক পা দূরে বাস স্টেশন।এখান থেকে বড় বড় বাস পেই দে লোয়া অঞ্চলের বিভিন্ন পর্যটন স্থানের  দিকে আগত পর্যটকদের নিয়ে ছুটে যায়।পাশেই রেন্ট এ কারের কাউন্টার,এখানে মটর গাড়ি ভাড়া দেয়া হয়।যাদের ফ্রান্সের অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্সে রয়েছে তারা নির্ধারিত ভাড়া মূল্যে ইচ্ছে অনুযায়ী কয়েক দিনের জন্য এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে পারে।কাউন্টারে বসা এক তরুণীকে বোঁজু(bonjour শুভ সকাল)বলে আমাদের এপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের পাঠানো ঠিকানা দেখিয়ে বললাম,মাদাম কি ভাবে যেতে পারি এই ঠিকানায়, আমরা এই শহরে নতুন কিছুই জানি না। ।ফরাসিরা প্রতিটি ক্ষেত্রে ভদ্রতা সূচক সম্ভাষণ ব্যবহার করে থাকে।যদি সেটা কেউ না করে তাহলে অভদ্রতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।মেয়েটি খুব আন্তরিকতার সহিত আমাদেরকে মেট্রোপলিটন বাস স্টেশনের পথ দেখিয়ে দিলো।প্যারিসে হাতে একটি স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট থাকলে পুর শহরটাই যেন নিজের হাতে, কোথাও যাওয়ার জন্য কাউকে জিজ্ঞাসা না করলেও চলে। গুগল ম্যাপে শুধু গন্তব্যের ঠিকানা লিখে অনুসন্ধান করলেই, কিভাবে,কোন বাস,ট্রাম, কত নম্বর মেট্রো বা ট্রেন ধরতে হবে এবং কোন পথে কতটুকু পথ হাঁটতে হবে সব তথ্য মোবাইলের মনিটরে ভেসে ওঠে।প্যারিসের জীবন যাপনে এভাবেই অভ্যস্ত কিন্তু এখানে এসে একটু হোঁচট খেলাম।গুগল ম্যাপ শুধু দূরত্ব দেখায় কিন্তু কিভাবে যাবো সেই তথ্য দেখায় না।যাই হোক,একটু হেঁটে মেট্রোপলিটন বাস স্টেশন পেলাম, কিন্তু কত নম্বর বাস ধরতে হবে সেই বিড়ম্বনায় পড়তে হল আবার।স্টেশনে অপেক্ষমান এক বাস চালকে আমাদের ঠিকানাটা দেখিয়ে জেনে নিলাম কোন বাস ধরে যেতে হবে।বাসে করে মূল শহরের মধ্যে প্রবেশ করার পর নতুন শহর সম্পর্কে নতুন ধারণা সৃষ্টি হতে লাগলো।আধুনিক শহর কিন্তু জনমানবের তেমন হুড়োহুড়ি নেই। আমরা এই শহরে অচেনা,তাই বাসের ড্রাইভার খুব গুরুত্ব দিয়ে আমাদের ঠিকানা অনুযায়ী কমার্স এলাকার আশে পাশের একটি বাস স্টপেজে নামিয়ে দিলেন।এখান থেকে গুগল ম্যাপের সাহায্যে পায়ে হেঁটে দশ মিনিটের মধ্যে আমরা  গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।আমাদের লাগেজগুলো যেখানে রাখতে এসেছি সেটা মূলত বুকিং ডট কমের মাধ্যমে আমরা যাদের কাছ থেকে এপার্টমেন্ট ভাড়া করেছি সেই প্রতিষ্ঠানের অফিস।আমাদের পরিচয় দেবার পর কর্মরত এক তরুণী লাগেজগুলো রেখে দিলো।এরা মূলত একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে হোটেল ব্যবসা করে।একটি অফিসের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে অথবা মিডিয়া হয়ে কমিশনের ভিত্তিতে এপার্টমেন্ট মালিকদের বাসা ভাড়া দিয়ে থাকে। সুসজ্জিত এপার্টমেন্টগুলো পর্যটকরা ওঠার সময় একবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দেয়, এবং কোন সমস্যা বা প্রয়োজনে এদের অফিসে ফোন করে সমাধান করতে হয়।এখানে এসে ভিন্ন রকমের এক পর্যটন ব্যবসার সাথে পরিচিত হলাম।আমার ধারণা ছিল আমরা হয়তো কোন ব্যক্তির কাছ থেকে এপার্টমেন্ট ভাড়া করছি এবং এপার্টমেন্ট মালিকের কাছ থেকে চাবি বুঝে নেবো। সেই ধারণা এই অফিসে এসে পরিবর্তন হল।তিনতে বাজতে এখনো অনেক দেরী, দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজের সময় হয়ে গিয়েছে।এখান থেকে বেরিয়ে নতুন শহরটি একটু ঘুরে দেখতে লাগলাম আমরা তিনজন।রাস্তার পাশ দিয়ে শৃঙ্খলিত সারি সারি ইউরোপীয় ডিজাইনের ইমারত।রেস্তোরাগুলোতে চলছে ফরাসিদের মধ্যাহ্ন ভোজের আড্ডা। আমাদের পছন্দের রেস্তোরা খুঁজে বের করতে চোখ রাখছি রাস্তার দুই ধারে।ফরাসি রেস্তোরাঁ প্রতিটি শহরেই সহজলভ্য কিন্তু ফরাসি খাবার মেন্যু স্বাস্থ্য সম্মত হলেও আমাদের বাঙালী জিহ্বার পরিপূর্ণ তৃপ্তি মেটাতে অক্ষম এবং দামও বেশী।ইউরোপের কোথাও গেলে আমি প্রথমত খুঁজি তুর্কী গ্রেক স্যান্ডউইচের রেস্তোরা। পোড়ান মাংস,সালাদ এবং বিভিন্ন স্বাদের সস রুটির মধ্যে মুরিয়ে এই স্যান্ডউইচ বানানো হয়।এটি মূলত তুর্কীর খাবার হলেও এই খাবারটির মধ্যে আমি দেশী স্বাদের পরিতৃপ্তি পাই।তা নাহলে, খুঁজি মাকডোণাল্ড, কেএফসি ও অথবা সাবওয়ে চেইন রেস্তোরাঁ। 


অচেনা শহরে বুকে এলোমেলো কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে চোখে ধরা দিলো একটি মাকডোণাল্ড রেস্টুরেন্ট।পাশেই দুটি তার্কিশ কাবাবের রেস্তোরা।মিশেলের একটা ব্যবস্থা হল ভেবে স্বস্তি অনুভব করলাম।কারণ মাকডোণাল্ডের বাচ্চাদের মেন্যুর সাথে একটি খেলনা উপহার থাকে,সেই লোভে মাকডোণাল্ডেরের প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক।

মিশেল মাকডোণাল্ডের মেন্যু আর আমরা দুজন আলজেরি সসের স্বাদে তার্কিশ গ্রেক স্যান্ডউইচ দিয়ে দুপরের খাওয়ার পর্ব শেষ করলাম।খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে রেস্তোরা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে এগুতেই চোখে পড়লো বিশাল এক চত্বর। চত্বরটির মাঝে স্থাপিত  বৃহৎ আকারের একটি ভাস্কর্য।ভাস্কর্যের চারিধার দিয়ে উছলে পড়ছে পানির ধারা।ঝর্ণাধারার ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে পুরো চত্বরে জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত ছোট বড় ভাস্কর্য। যেগুলো মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত ভাস্কর্যের কপি।যেমন আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। এমন সব ভাস্কর্যের সাথে এই চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে  পৌরাণিক গ্রিক দেব দেবতা ও রূপকথার নানা কাল্পনিক চরিত্রের মূর্তি।মনে হল,চত্বরটিতে পৃথিবীর সকল বিখ্যাত ভাস্কর্যদের মিলনমেলা চলছে। এই সম্মিলনে অংশগ্রহণ করতে বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলো ছুটে এসেছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।


এই স্থানটির নাম প্লাস রয়্যাল, নন্ত শহরের কেন্দ্রস্থল বলা হয়।এই বিশাল চত্বরের মাঝে বৃহৎ গোলাকার একটি ঝরনা স্থাপিত এবং ঝরনার চারপাশ দিয়ে কয়েকটি মূর্তি বসানো। নন্তের স্থপতি মাথুরিন ক্রুসি ১৭৮৬ সালে এটির নকশা করেন এবং ১৭৯০ সালে নির্মিত হয়। এই চত্বরে ফ্রান্সের অনন্যা স্থানের মত বিশেষ কোন রাজার মূর্তি রাখা হয়নি কিন্তু স্থানটির আলাদা এক প্রতীকী মূল্য রয়েছে। স্থানটি এই শহরের উৎসব আনন্দ, আড্ডা, রাজনৈতিক সমাবেশ জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। 

আমরা চত্বরের মূল ভাস্কর্য বা ঝরনার চারপাশে সুজজ্জিত ভাবে সাজানো শত শত যে ভাস্কর্যগুলো দেখলাম এগুলো মূলত স্মৃতিসৌধ নির্মাণ শিল্পী স্তেফান ভাগনি  সৃষ্টি ভাস্কর্য।এগুলো মূলত ২০১৯ সালে পর্যটকদের জন্য প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের জন্য এই ঐতিহ্যবাহী চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে।   

কিছু কিছু মূর্তির গায়ে লাগান রয়েছে ছোট ছোট কিছু পোস্টার। একটি পোস্টারের লেখা দেখে ভাবনার জন্ম দিলো। পোস্টারে ফরাসি ভাষায় লেখা «. est la justice» অর্থাৎ বিচার কোথায়।ফ্রান্স নারী পুরুষের সমঅধিকারের দেশ। ঐতিহ্যকে  ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিটি মানুষের রাষ্ট্রীয় ভাবে অধিকার সংরক্ষণ করা হয়।

দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পথ পেরিয়ে ফরাসি জাতি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে।ফরাসি বিপ্লব ফরাসিদের এক অনুপ্রেরণা ও ঐতিহ্য।সেই ইতিহাস অনুসরণ করে কোন ফরাসি জনগণ যদি ভাবে রাষ্ট্রের তরফ থেকে তারা বৈষম্য মূলক আচরণের স্বীকার হচ্ছে, তবে তারা অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠে, রাজপথে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরাও মানুষের চাওয়াকে গুরুত্বের সহিত নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে, মানুষের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।মূর্তির গায়ে লাগান পোস্টারগুলো সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দিলো।এই চত্বরটি যে আন্দোলন সংগ্রাম ও প্রতিবাদ প্রকাশের জায়গা তারই প্রমাণ মিলল সংগ্রামী মানুষদের লাগান পোস্টারে। 


এই চত্বরের মূর্তিগুলির সাথে আমাদের ভালো একটা সময় কাটল। ঘড়ির কাঁটায় বেলা দুটো বাজতেই আমরা ছুটে গেলাম আমাদের লাগেজগুলো সংগ্রহ করতে।এপার্টমেন্ট ভাড়া প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের অফিসের কর্মরত তরুণী আমাদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন, কিভাবে আমাদের এপার্টমেন্টে পৌঁছুতে হবে।এই শহরে মেট্রো- রেল নেই।।পাবলিক ট্রান্সপোর্ট মধ্যে ট্রাম ও বাস সার্ভিস রয়েছে।তিনটি ট্রাম লাইনের মাধ্যমে শহর ও শহরতলিতে সহজে যাতায়াত করা যায়। জটিলতায় না জরিয়ে আমরা হেঁটে মিডিয়াটেক ট্রামষ্টেশনে এলাম।আমাদের যেতে হবে তেরত নামক স্থানে।স্টেশনে ম্যাপ দেখে ট্রামের আমাদের সঠিক দিক নির্ধারণ করে ট্রামে উঠে পরলাম।আমার ধারনা ছিল, নন্ত শহরের আশে পাশে হবে আমাদের এপার্টমেন্ট। কিন্তু ট্রাম একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল।ট্রামের জানালা দিয়ে দেখছি নতুন শহরের চারিধার।গ্রীষ্মের আলোঝলমল দুপুর,সূর্যের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে,রাস্তার ধার ও বাড়ীর আঙ্গিনায়গুলোতে ফুলের সমাহার।সুপরিকল্পিত শহর কিন্তু জনমানবের আনাগোনা খুব কম। যতগুলো বিল্ডিং দাঁড়িয়েছে ততগুলো মানুষ চোখে পড়লনা। মনে হচ্ছে একটি ফুল বাগানের মধ্যদিয়ে আমাদের ট্রাম এগিয়ে যাচ্ছে। এতটাই সুপরিকল্পিত শহর।প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে চলে এলাম আমাদের গন্তব্যের তেরত স্টেশনে।এক পথচারীকে আমাদের ঠিকানা দেখিয়ে জানতে চাইলাম কিভাবে যেতে হবে।ট্রাম স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ।তাই বাসা খুঁজে পেতে খুব বেশী বেগ পেতে হলনা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এলাকা। আমাদের বাসার বিল্ডিংটিও আধুনির নকসায় গড়া।চুক্তি পত্রে উল্লেখিত বাসায় প্রবেশের কোড ও নির্দেশাবলী অনুসরণ করে বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করলাম কিন্তু আমাদের নির্ধারিত ফ্লাট নম্বরের পাশে এসে একটু বিড়ম্বনায় পরতে হল। ধারনা ছিল কেউ একজন এপার্টমেন্টের চাবি এখানে এসে বুঝিয়ে দেবে।কাউকে না পেয়ে একটু হতাশ হলাম।ফ্লোরের অন্যান্য ফ্লাটে উঁকিঝুঁকি দিয়ে কারও দেখা মিলল না।ঠিকানা মত চলে এসে এখন বন্ধ দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে তার উপর এতোবেলা বাইরে এলোমেলো ঘোরাঘুরির ধকলে সবার মধ্যে ক্লান্তি চলে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ এলোমেলো চেষ্টা করে বাধ্য হয়েই এপার্টমেন্ট ভাড়া প্রদানকারী অফিসে ফোন দিলাম। সমস্যা খুলে বলার পর, ফোনের অপর প্রান্তের দায়িত্বরত ব্যক্তি বললেন, আপনার এপার্টমেন্টের প্রবেশ দরজার ডানপাশের নিচে ছোট্ট একটি বাক্স লাগানো রয়েছে, বাক্সটি আপনার চুক্তিপত্রে উল্লেখিত কোড নম্বর দিয়ে খুলতে হবে, ওই বাক্সটির মধ্যে চাবি রয়েছে।ভদ্রমহিলার কথা মত নিচের দিকে তাকাতেই দেখা মিলল দরজার এক কোণে কোড নম্বর সম্বলিত চিকন ম্যাচ বাক্স আকৃতির ছোট্ট কিছু।উল্লেখিত কোড নম্বর সঠিক ভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেলাতেই ছোট্ট বাক্সের দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রবেশ দরজার চাবি।এমন ব্যতিক্রম পদ্ধতির সাথে জীবনে এই প্রথম সাক্ষাত ঘটলো আমাদের। কোন মানুষ ছাড়াই শুধু পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ব্যবস্যা পরিচালনা।বেশ ভালো লাগলো। 

ঘরে প্রবেশ করে দারুণ ভাবে হোঁচট খেতে হল।আমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা পুর এপার্টমেন্ট নোংরা করে রেখেগিয়েছে।সাধারণ ভাবে চুক্তি অনুযায়ী আমাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি এপার্টমেন্ট পাওয়ার কথা।পরিষ্কার বিছানার চাদর ও লেপের কাভার বাইরে প্রবেশ দরজার পাশের তাকে রাখা হয়েছে। ভাবলাম নিজেই রুমগুলো পরিষ্কার করে নেই।কিন্তু বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত মনে করে ফোন দিলাম। কারণ ভাড়া চুক্তির টাকাতো আমাকে সম্পন্নই পরিশোধ করতে হয়েছে। তাহলে তাদের সার্ভিসটাও পরিপূর্ণ দেয়া উচিত।সবকিছু খুলে বলার পর তারা দুঃখ প্রকাশ করলো, বলল দ্রুত একজন Femme de chmbre অর্থাৎ রুম পরিষ্কার কর্মীকে পাঠিয়ে দিচ্ছি  , সে রুমগুলো পরিষ্কার করে দেবে। পনেরো মিনিটের মধ্যে একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণী এলো এপার্টমেন্টে।চারদিন থাকতে হবে, বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি তবুও অনেক কিছু কিনতে হবে। পরিচ্ছন্নকারী তরুণীকে জিজ্ঞেস করলাম আশেপাশে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কারফো বা লিদল আছে কিনা। মেয়েটি বলল, এখান থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথে বড় কারফো স্টোর পাবেন। মেয়েটিকে বললাম, আপনি নিজের মত করে কাজ করুন, আমরা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে এক ঘণ্টা পর ফিরছি। 


রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেল, জনমানবের কোলাহল মুক্ত এলাকা। রাস্তার পাশে একটি গ্রেক স্যান্ডুইচের দোকানে কিছু আরবি তরুণ আড্ডা দিচ্ছে। ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কারফো সুপার স্টোরে কিভাবে যাবো। খুব সহজ করে রাস্তা দেখিয়ে দিলো। নতুন এলাকা আমরা হেঁটে হেঁটে এগুচ্ছি। খুব ভালো লাগছে। আসলে প্রতিটি নতুনের এক আলাদা ভালোলাগা রয়েছে। সে জন্যই হয়তো নতুন এলাকা দেখে মুগ্ধ হচ্ছি।সুবিশাল মার্কেট, প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দোকান রয়েছে।আমরা কারফো সুপার স্টোরে ঘুরে ঘুরে চাল, ডাল, সকালের নাস্তার কিছু ফল ও মিশেলের প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রী কিনলাম।ফিরে এসে দেখি আমাদের এপার্টমেন্টটি চকচকে তকতকে করে মেয়েটি চলে গিয়েছে। মিশেল তার নিজস্ব রুম পেয়ে খুব খুশি। তার লাগেজ রুমে নিয়ে গেল।নিজস্ব কাপড় চোপরগুলো তার আলামারির মধ্যে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখল। মিশেলর রুমে বিশাল বড় জানালা। জানালর ওপাশের প্রশস্ত আঙ্গিনা। রুমের ভেতর থেকে সুবিশাল আকাশ দেখা যায়।সে অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এলাকার আশপাশ দেখতে লাগলো। আমাকে তার রুম থেকে বের করে দিলো।রুমের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত করলো নিজের মত করে।  


আজকে আমরা বাইরে বের হওয়ার কোন কর্মসূচী হাতে রাখলাম না।সবাই গোছল করে ফ্রেস হয়ে নিলাম।নিজেদের কাপড় চোপর গুলো লাগেজ থেকে বের করে আলমারিতে সাজিয়ে রাখলাম। এপার্টমেন্টটি এমনভাবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যে কেউ হঠাৎ করে এসেই থাকতে পারবে। কিচেন, বাথরুম, ড্রয়িংরুম, বেলকনিতে যা কিছু প্রয়োজনীয় সব সাজিয়েগুছিয়ে রাখা হয়েছে।তবে একটা সমস্যায় পড়তে হল। মিশেল কাটুন দেখার জন্য টিভি চালু করলো কিন্তু কোন চ্যানেল দেখা গেলো না। আমাদেরকে ইন্টারনেটের যে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড দেয়া হয়েছে সেটা দিয়ে ইন্টারনেটও চালু করতে পারলাম না। কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলাম, ওরা কিছু নির্দেশনা দিলো কিন্তু সেভাবে চেষ্টা করেও টিভি ও ইন্টারনেট চালু করা গেলনা। মিশেল নতুন বাসা পেয়ে খুব খুশি কিন্তু টিভি দেখতে না পেরে খুবই হতাশ। কিভাবে তার সময় কাটবে। এ বিষয়ে আর সময় ক্ষেপণ  না করে আমি চলে গেলাম রান্নার দিকে। রাতের খাবার তৈরি করতে হবে। আমরা আসার সময় রেডিমেড তেহারি মসলা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। কারফো মার্কেট থেকে কিনে আনা আসিদ্ধ চাল আর গরুর মাংস দিয়ে তেহারি রান্না করে ফেললাম।সারাদিনের ধকলের পর নিজেদের রান্না করা বাঙ্গালি খাবার দারুণ এক পরিতৃপ্তি দিলো। খাবার পর আবার টিভির প্রয়োজনীয়তা অনুভব হল। কিন্তু কোন উপায় নেই


আমরা তিনজন বারান্দায় গিয়ে বসলাম। রাত দশটা বাজলেও সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে।চারদিকে বিজলি বাতি জ্বলে উঠলেও প্রকৃতিতে রাতের আবহ এখনো নামেনি। দিনের আলো কিছুটা রয়ে গিয়েছে।বারান্দার সামনে কোন বড় বিল্ডিং নেই। ছোট ছোট পাভিয় বাড়ী। তাই সন্ধ্যার ফুরফুরে বাতাস হু হু করে ছুটে এসে গায়ে লাগছে।আমাদের এপার্টমেন্টটি দ্বিতীয় তলায়। বিল্ডিঙয়ের নিচে গাড়ি পারকিংয়ের প্রশস্ত জায়গা।পারকিংয়ের পাশের একটি বাড়ীর আঙ্গিনায় চলছে উৎসব আনন্দ।হালকা গানের সাথে অনেকে নাচছে, কেউ পান করছে।বারান্দায় গল্প করতে করতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে এলো। আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় রয়েছে প্রথম দিন নন্ত শহর ঘুরে দেখা।তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার তাড়ায় মধ্যরাতের আড্ডা ভেঙে আমরা চলে গেলাম যার যার রুমে।


পেই দে লোয়া’য় চারদিন। পর্ব - ২


বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০

মধ্যরাতের আতঙ্ক।

১৪ জুলাই রাতে ড্রয়িং রুমে ঘুমিয়েছি। রাত দুটো বাজে, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।জাগতিক পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন প্রায়। চারপাশে কি হচ্ছে কিছুই আমার ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ছে না।পাশের রুম থেকে আমার স্ত্রীর মৃদু কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। ওঠো ওঠো  ……
হঠাৎ তার হাতের ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসলাম।
বললাম, কি হয়েছে ?
বাইরে থেকে কেউ কলিং বেল টিপছে শুনতে পাচ্ছনা?
উত্তরে বললাম শুনিনিতো ।
এবার ঘন ঘন কয়েকবার কলিংবেলয়ের আওয়াজ হলো।
সে বলল, দরজায় গিয়ে দেখ কে সুইচ টিপছে?
এত রাতে কলিংবেল, একটু ভয় কাজ করছে ভেতরে। কে টিপছে কলিংবেল এবং কেন টিপছে?
চোখ মুছতে মুছতে দরজার কাছে দাঁড়াতে আবারও কলিং বেল বেজে উঠল। দ্বিধা সঙ্কোচ ও ভয় নিয়ে দরজা খুলতেই দেখি চেনা মুখের এক তরুণ, উদ্ভ্রান্তের মত বলছে ফু ফু, ছোরতে দো ভোতর আপারতোম, অর্থাৎ আগুন আগুন আপনার এপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে যান। আগুনে পোড়া গন্ধ নাকে ভেসে আসছে। ছেলেটি অন্য একটি এপার্টমেন্টে গিয়ে কলিং বেলের সুইচ টিপতে লাগলো। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। আমার স্ত্রীকে বললাম বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে। আমি ঘুমের পোশাক পরেই শুধু মুঠোফোন এবং এপার্টমেন্টের চাবি পকেটে নিয়ে বের হতে উদ্যত হলাম। মেয়েকে ঘুম থেকে দ্রুত জাগানা হল।আমার স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যাগ সঙ্গে নিয়েই বের হল কিন্তু আমার প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র নেবার কথা মাথায় এলোনা। সম্পদের চেয়ে সময় ও জীবনের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত দরজায় তালা মেরে ওদেরকে নিয়ে বিল্ডিঙয়ের সিঁড়ির দরজার কাছে চলে গেলাম। আমাদের ফ্লোরের অন্যান্য প্রতিবেশীরাও বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে। প্রতিটি তলায় পুলিশ ও দুই আফ্রিকান বংশোদ্ভূত যুবক দরজায় দরজায় গিয়ে মানুষের ঘুম ভাঙ্গিয়ে বাহিরে বের করে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন সিঁড়ি বেয়ে নামছি তখন অন্যান্য এপার্টমেন্টের পরিবারগুলো তাদের শিশু বাচ্চাদের বিছানার কম্বল জড়িয়ে তড়িঘড়ি করে নামার চেষ্টা করছে। পোড়া গন্ধ আরও প্রকট হয়ে নাকে লাগায় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সিঁড়ির দরজায় পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের মধ্যদিয়ে আমরা বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। ১৩ জুলাই বিকেল থেকে আমাদের এলাকায় অসংখ্য পুলিশ সশস্ত্র অবস্থায় প্রহরারত রয়েছে। ১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস, এই দিন রাতে সাধারণত এলাকার তরুণেরা ককটেল ফাটিয়ে আনন্দ উল্লাস করে থাকে। এই উন্মাদনার কারণে অনেক সময় নানা অঘটন ঘটে থাকে।তাই পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন এলাকা অতিরিক্ত নজরদারির মধ্যে রাখে।
রাস্তায় এই গভীর রাতে অসংখ্য মানুষের ভিড় জমে গেছে। পুলিশ বিক্ষিপ্ত লোকজনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিল্ডিঙয়ের দ্বিতীয় তলায় রাস্তার ধারের এপার্টমেন্টে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমেই বেড়ে চলছে। তখন ফায়ার ব্রিগেড এসে পৌঁছেনি। এপার্টমেন্টটিতে একটি পরিবারের বসবাস। এপার্টমেন্টের কলিং বেল টিপে ভেতরে অবস্থানরত মানুষদের জাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু কোন সারা পাওয়া যায়নি। তাই, আফ্রিকান এক যুবক বিল্ডিংয়ের কার্নিশ বেয়ে চলে গেলো এপার্টমেন্টটের রারান্দায়।তার সন্নিকটে জ্বলছে আগুন কিন্তু সে সাহসিকতার সঙ্গে একটি লোহার রড দিয়ে দেয়ালের কাঁচ ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলো।বাহির থেকে ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে সন্ধান করলো ভেতরে কেউ আছে কিনা। কিন্তু কারো সারা না মেলায় ছেলেটি নিচে নেমে এলো। আমরা যখন নিজের জীবন রক্ষায় ব্যস্ত তখন ওই যুবকটি অন্যের জীবন রক্ষার চিন্তায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে ভাবে আগুনের সামনে এগিয়ে গেলো তখন মনে হল পৃথিবীতে মানুষ কত মহান ও মানবিক হতে পারে। সৃষ্টিকর্তা মনে হয় কিছু মানুষকে বিশেষ অনুভূতি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠায়। যারা অন্যের বিপদ দেখলে নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এগিয়ে যায়
পাঁচ মিনিট পর ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি চলে এলো।ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা দ্রুত আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। হালকা পোশাক পরে বাহিরে চলে এসেছি, ঠাণ্ডায় শরীর কাঁপছে। বিল্ডিংয়ের সকল লোকজন রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। সবাই আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রতীক্ষায় উৎকণ্ঠিত সময় পার করছে। দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগায় ফায়ার ব্রিগেড টিমের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে খুব বেশী কসরত করতে হল না। পনেরো মিনিটের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসল।কিন্তু অন্যতলায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য আমাদের কাছ থেকে চাবি সংগ্রহ করে ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা বিভিন্ন তলায় চলে গেলো।সেই সাথে পরিপূর্ণ ভাবে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চলতে লাগলো। সম্পূর্ণ ভাবে নেভানোর কাজ শেষ হতে প্রায় ভোর চারটা বেজে গেলো।কিন্তু কারো বিল্ডিংয়ের ভেতর প্রবেশের অনুমোদন মিলছে না। ফায়ার ব্রিগেডের যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ভোর পাঁচটায় আমরা পুনরায় বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করলাম।
একটি আতঙ্কের রাত পাড়ি দিতে হল।টিভি পর্দায় শুধু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার দৃশ্য দেখেছি কিন্তু ঐ রাতে বাস্তবতার সম্মুখীন হলাম। যে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণকে রাস্তার মোড়ে আরব বখাটে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখি, সেই তরুণই আমাদের মধ্যরাতের ঘুম ভেঙ্গে জাগিয়ে তুলেছিল । অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই তোমাকে ……………
ধারনা করা হচ্ছে রাস্তা থেকে উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের ছোড়া ককটেল ফুটে এই আগুনের সূত্রপাত। যে এপার্টমেন্টটি পুড়ে ছাই হয়েছে, ঐ ফ্লাটের পরিবার গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনে বাইরে রয়েছে। একটি বাসায় একটি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, আসবাস ও দীর্ঘদিনের সংগৃহীত সৌখিন জিনিসপত্র থাকে। নিজেদের রুচি অনুযায়ী সাজানো হয় নিজ বাসস্থল।যদিও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ক্ষতিপূরণ পাবে কিন্তু তাদের শখের সাজানো বাসাটি আগের মত করে পাবে না। দেয়ালে টাঙ্গান শখের পেইন্টিং ও সংগৃহীত সুভেনিরগুলো পাবে না । যখন পরিবারটি ফিরে এসে দেখবে রেখে যাওয়া সাজানো গোছানো নীড়টি ছাই হয়ে বাতাসে উড়াউড়ি করছে তখন কি কষ্টটাই বুকের মধ্যে জমাট বাঁধবে ............।

আতঙ্কের এক রাত  প্রথম আলো 

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

আজ ফ্রান্সে পালিত হল ভিন্ন এক জাতীয় দিবস।

অস্ত্র হাতে ও সমর পোশাকে একটি দেশকে রক্ষার দায়িত্ব শুধু সামরিক বাহিনীর উপরই ন্যস্ত থাকেনা ।একটি দেশের অভ্যন্তরে প্রতিটি পেশাজীবীও দেশকে রক্ষার ভূমিকায় সমান্তরালে অবদান রেখে থাকে ।  ডাক্তার নার্সদের ভূমিকাও যে সৈনিকের মত হতে পারে তা পূর্বে আমরা এতটা গভীর ভাবে ভেবে দেখিনি।কিন্তু করোনাকালে আমরা সেভাবে দেখছি । ফ্রান্সের অর্থনীতির অন্যতম খাত পর্যটন।এর সাথে জড়িত হোটেল, রেস্টুরেন্ট সহ নানাবিধ প্রতিষ্ঠান।এসব খাতে কর্মরত কর্মীগণ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ঘাম ঝরান সৈনিক। এদের শ্রমে ঘামের উপার্জন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ হয়। দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য সৈনিকের অস্ত্র ও পোশাক ঐসব ঘাম ঝরানো কর্মীদের ঘামের মূল্যে কেনা হয়। আমরা সাধারণত কাঁধের উপর রাঙ্কব্যাচ পরিহিত জেনারেলদেরকে বিশেষ ভাবে মূল্যায়ন করে থাকি । রাষ্ট্রের সম্মানের উপর নির্ভর করে একজন জেনারেলের আন্তর্জাতিক মর্যাদ।আর রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মর্যাদা নির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর। সেই ভিত্তিটাই মজবুদ করতে দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির নানা খাতে কর্মরত কর্মীগণ।

আজ ফ্রান্সের জাতীয় দিবস। প্রতি বছর এই দিনে প্যারিসের শনজেলিজে এভিনিউ থেকে প্লাস দ্যো লা কনকর্ড পর্যন্ত থাকে দেশের সামরিক, আধা সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও সামরিক মহড়ার নানা আয়োজন।উপস্থিত থাকে দেশ বিদেশের সম্মানিত অতিথিবৃন্দ ।
এই আয়োজনে প্রধানত গুরুত্ব পেয়ে থাকে দেশের সামরিক বাহিনী। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার জন্যই এই আয়োজন।সাধারণত কুচকাওয়াজ শেষে প্লাস দ্যো লা কনকর্ড অতিথি মঞ্চের সামনে দেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দাঁড়িয়ে মার্চপাস্ট প্রতিবেদনের ক্ষণিক সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করেন তিন বাহিনীর প্রধান। এভাবেই প্রতিবছর দেখি। কিন্তু এবার টিভি পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য সম্পন্ন ব্যতিক্রম মনে হল। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাখোঁ’র মঞ্চের সামনে তার সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছেন তিন বাহিনীর প্রধান, তাদের সঙ্গে আরও দাঁড়িয়ে রয়েছেন কয়েকজন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ।তারা হচ্ছে, ডাক্তার, নার্স, রেস্টুরেন্ট, হোটেল এবং অন্যান্য পেশার পোশাক পরিহিত কয়েকজন বেসামরিক মানুষ। দেখে সত্যি অভিভূত হলাম। দেশের জনগণ দেশের জন্য কাজ করবে আর দেশের সরকার জনগণকে প্রকৃত মূল্যায়ন ও সম্মান প্রদর্শন করবে।এটাই নিয়ম। সেই মূল্যায়ন ও সম্মান এতটা উঁচু পর্যায়ের তাই ভেবেই মনে হয় দুই একজন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দকে অশ্রু ভেজা চোখে দেখা যাচ্ছিলো ।

করোনা শুধু কেরেই নেইনি , উপলব্ধির উন্মেষও ঘটিয়েছে। করোনাকালের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো অন্যান্য পেশার গুরুত্ব নতুন ভাবে উপলব্ধি করছে। তারই চিত্র মিলল আজকের বাস্তিল দিবসের অনুষ্ঠানে।
Vive la France et vive la république

                                   ( লেখা কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়া মানে নিজের মস্তিষ্ককে নিজেই অপমান করা)

শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

বাংলার বর্ষা, প্রবাসী মন ও করোনা কাল।

বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যে বর্ষার আসে এক অনন্য সাজ সজ্জায়। বর্ষার সাথে বাঙালী মনের এক দারুণ সংযোগ।বর্ষা মানে রিমঝিম বৃষ্টির শব্দে হৃদয়ে শিহরণ জাগা।বর্ষা শব্দটি শুনলে, চোখে ভেসে ওঠে থোকা থোকা  ফোটা কদম ফুলের শুভ্র প্রকৃতি,যৌবন ফিরে পাওয়া নদীর বুকে ঢেউয়ের খেলা, জলে টৈটুম্বর খাল বিল, বাদল ঝরা দিনের অলস সময়ে বন্ধুদের তাসের আড্ডা অথবা অজপাড়া গায়ের বৃষ্টি ভেজা মাঠে দুরন্ত ছেলেদের ফুটবল খেলার দৃশ্য।আষাঢ়ের ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি দেখলেই মন চায় ভাপ ওঠা সর্ষে ইলিশের গন্ধে প্রাণ জুড়িয়ে জিহ্বার তৃপ্তি মেটাতে।   
বাংলার বর্ষা মানেই একাকী নির্জনে রবীন্দ্র সুরে বুঁদ হয়ে প্রথম প্রেমে পড়া প্রিয় মানুষের স্মৃতি রোমন্থন অথবা দূরে চলে যাওয়া মনের মানুষের বিরহ ব্যথায় কাতর হওয়া।আবার, হাসনাহেনা, গন্ধরাজের সুবাসিত সন্ধ্যায় দেহ মন সজীব হয়ে ওঠা। আষাঢ় শুধু নিজেই বারি ঝরিয়ে শুষ্ক প্রকৃতির প্রাণ ফিরিয়ে আনে না,বাংলার প্রেমিক প্রেমিকার হৃদয়কেও রসসিক্ত করে তোলে,প্রেমের অনুভূতিগুলো নতুন রূপে ডালপালা মেলে দেয়।হৃদয় হয়ে ওঠে কাব্যময়। তাইতো বর্ষা, বৃষ্টি ও  শ্রাবণ নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র কবিতা গান,যা সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যকে।বর্ষা যেন বাংলার প্রকৃতিতে ঈশ্বরের বিশেষ উপহার।  
বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যে প্রতিটি ঋতু সুশৃঙ্খলিত। বিশেষ রঙ, রস, রূপ,গন্ধে প্রত্যেক ঋতু প্রতিটির থেকে আলাদা এবং স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। যেমন, চারিদিকে যখন প্রচণ্ড তাপদাহ,মাটি ফেটে চৌচির,মানুষ একটু শীতলতার খোঁজে গাছের ছায়া খুঁজে ফেরে,ঘাম ঝরা প্রকৃতিকে শান্ত করতে আকাশে মেঘের গুরুগর্জন ডাক ছেড়ে আষাঢ়ের আগমন ঘটে,ঝুম ঝুম বারি ঝরিয়ে প্রশান্তির পরশ এনে দেয় চারিধারে।অঙ্কুরিত হওয়ার উন্মুখ প্রতীক্ষায় থাকা উদ্ভিদ বীজ মাটি ফুঁড়ে পাতা ছড়িয়ে বেড়িয়ে আসে।খাল বিলে বয়ে যায় মাছের দলের আনন্দধারা।  
প্রবাস জীবনে বাংলার বাদল ঝরা  প্রকৃত বর্ষার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হয়।ফরাসি ঋতু পরিক্রমায় বর্ষা নামে কোন ঋতু নেই।কিন্তু এখানেও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ঝরে, কখনো আচমকা প্রবল বৃষ্টির ধারা এসে ধুয়ে দিয়ে যায় চারিপাশ। কিন্তু এই বৃষ্টি নিয়ে কোন উচ্ছ্বাস নেই ফরাসিদের মধ্যে, বরং বৃষ্টি জেনো ফরাসি জনগোষ্ঠীর মনে গভীর বিষণ্ণতা বয়ে আনে, বিরক্তির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে প্রত্যেকের মুখে। ফরাসি সাহিত্যেও  মর্যাদা পায়নি বৃষ্টি বাদল। এখানকার জীবনধারার  অধিকাংশ সময় কাটে মেঘঢাকা হিমশীতল প্রকৃতির মাঝে।শৃঙ্খলহীন গোমড়ামুখো আকাশ যখন তখন এই ঠাণ্ডা প্রকৃতির মাঝে ঝিরি বৃষ্টি ঝরিয়ে বিষণ্ণ মনের নিরানন্দ আরও বাড়িয়ে তোলে।ফলে বর্ষা বাদল মুক্ত একটি আলো ঝলমল রোদেলা দিনের অপেক্ষা থাকে প্রতিটি ফরাসির মন।তাই, বৃষ্টির সৌন্দর্য ফরাসি হৃদয়ে তেমন আঁচড় কাটতে পারেনা। কিন্তু আমাদের প্রবাসী বাঙ্গালী চোখ  কখন এক পশলা বৃষ্টি ঝরার দৃশ্য দেখলে বাংলার আষাঢ় শ্রাবণ ভেবে আনন্দে শিহরিত হয়। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনলে স্মৃতিকাতর হয়ে কল্পনার  ডানায় পাখা মেলে মন  চলে যায় গ্রামের কোন টিনের চালা ঘরে।    
বাংলার ঋতু পরিক্রমায় এখন চলছে বর্ষা কাল।ঝরছে আষাঢ়ের বাদল। প্রকৃতি জেগে উঠেছে বর্ষার সৌন্দর্যে কিন্তু প্রাণের উচ্ছ্বাস থামিয়ে দিয়েছে করোনা মহামারী।যে প্রাণ বৃষ্টির ছন্দে নেচে উঠবে, সেই প্রাণে আজ মৃত্যু ভয়।ইতোমধ্যে সারা বাংলাদেশে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় আঠারোশ মানুষ। প্রত্যাশা, বর্ষার জলের ধারা যেমন ময়লা আবর্জনা ধুয়ে মুছে প্রকৃতিকে উপহার দেয় নতুন এক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চারিধার , তেমনি আমাদের একে ওপরের চেষ্টা ও সহযোগিতায় অতিশিগ্রই  করোনামুক্ত হয়ে আবার জেগে উঠবে নতুন এক উদ্যমী বাংলাদেশ।আবার বৃষ্টি বাদলের ছন্দ ঢেউ জাগাবে প্রতিটি বাঙ্গালী প্রাণে। 
বাংলার বর্ষা, প্রবাসী মন ও করোনাকাল / প্রথম আলো

সোমবার, ৮ জুন, ২০২০

যাদের বসবাস অন্ধকারে তারা আলোর ভালো বুঝবে কি করে ....

আপনি বিদেশে থাকেন। ধরুন, আপনার এক কোটি টাকা আছে।ভাবলেন দেশে গিয়ে মানুষের কল্যাণের জন্য নিজ অর্থে একটি প্রজেক্ট করবেন। দেশে গেলেন, কিছু করতে শুরু করলেন, তখন একটা শ্রেণী বলতে শুরু করবে, আপনি বিদেশী কোন দাতা সংস্থার অর্থ এনে কিছু মানুষকে দিচ্ছেন আর বাকীটা মেরে খাচ্ছেন। আর এক গ্রুপ এসে বলবে, এসব করতে হলে আমাদের চাঁদা দিতে হবে। 


দুই চারটা বই লিখেছেন। কিন্তু আপনার বই বিক্রি হয় না। পাঠক সমাজে আপনার কোন পরিচিতি নেই। আপনার বই পয়সা দিয়ে কেউ কেনে না। অথচ নিজেকে অনেক জ্ঞানী লেখক ভাবেন। কারণ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি পড়াশুনা করেছেন।ভালো কোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন। এটাই আপনার অহংকার। বাংলাদেশী লেখক কাশেম বিন আবুবাকার মেট্রিক পাশ  করা লেখক। লিখেছেন ৭২ টি উপন্যাস। উপন্যাসগুলো পাঠক সমাদৃত ও ব্যবসা সফল। বাংলাদেশের এক শ্রেণীর পাঠক সমাজে তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি তাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যেমন যুক্তরাজ্যের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইয়াহু নিউজ, মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিউজ, মালয়েশিয়ার দ্য স্টার ও মালয়মেইল, পাকিস্তানের দ্য ডন, ফ্রান্সের ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর ও রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল, হাঙ্গেরির হাঙ্গেরি টুডেসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উক্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোও তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।এতেই আপনারা শিক্ষিত লেখকরা তার পিছু লেগে গেলেন। মাস খানেক ধরে ফেচবুকে তার পিণ্ডি চটকালেন। বললেন, সে চটি লেখক, সে জামাতের লেখক, তার নামের সাথে ঔপন্যাসিক উপাধি যায়না। আরও অনেক কিছু বলে তাকে হেয় করার চেষ্টা করলেন। বোঝার চেষ্টা করুণ, সেতো ঘুষ দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করাননি ।আপনার তাকে ভালো না লাগলে চুপ থাকতে পারতেন। তার নামটি যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে সাথে বাংলাদেশের নামটিও প্রচার হয়েছে। আপনি অনেক শিক্ষিত লেখক কিন্তু আপনার জীবনে এমনটি হয়নি, হয়তো কোনোদিন হবেও না। সেই ঈর্ষার জায়গা থেকে ভদ্রলোককে ছোট করে বন্য আনন্দ নিয়েছেন।ভেবেছেন, অশিক্ষিত মানুষটা যদি কোন পুরষ্কার পেয়ে যায়। যেটার জন্য বছর জুড়ে আপনারা শাসকদের পায়ে তৈল মালিশ করেন।  


আমাদের দেশের মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন নয়। এই স্বাস্থ্য জ্ঞানহীনতার কারণে  তারা নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। ডাঃ জাহাঙ্গীর কবির নামে এক  তরুণ ডাক্তার  এক সময় স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলক ভিডিও বানিয়ে ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পোষ্ট করতে লাগলেন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হতে লাগলো। তার জনপ্রিয়তা দেশ বিদেশে ছড়িয়ে যেতে লাগলো। চেম্বারে রুগীর সংখ্যা বাড়তে লাগলো। এতেই এক শ্রেণীর ডাক্তারদের এলার্জি শুরু হয়ে গেলো। তারা ভাবল, সারা জীবন ডাক্তারি  করেছি, বাড়ী বানিয়েছি, গাড়ি কিনেছি কিন্তু কেউ আমাকে চেনে না। কোথায়ও বক্তৃতা দিতে ডাকে না। এই হিংসার জায়গা থেকে ভদ্রলোককে বললেন, সে একজন ক্যানভাচার। রোগী পাওয়ার জন্য রাস্তার কবিরাজদের মত আধুনিক পদ্ধতিতে পাবলিসিটি করছে। বোঝার চেষ্টা করুণ, ডাক্তার কবির তার কর্মব্যস্ততার মধ্য থেকে পরিশ্রম করে সচেতনতা মূলক ভিডিওগুলো বানিয়েছে,কোন বিনোদন ভিডিও বানাননি। এগুলো না করেও তিনি আপনাদের মত ঔষধ কোম্পানির উৎকোচ ও রোগী দেখে আয়েশি জীবন যাপন করতে পারতেন। তিনি মনে করেছেন, দেশের মানুষকে ন্যূনতম স্বাস্থ্য সচেতন করা দরকার। অনেকে তার চেম্বারে না গিয়ে শুধু তার ভিডিওগুলো অনুসরণ করে উপকৃত হয়েছে। ওনার মত জনপ্রিয় হতে চাইলে আপনি আরও ভালো কিছু তৈরি করে মানুষকে উপকার করুণ, দেখবেন আপনিও মানুষের ভালোবাসায়  সিক্ত হচ্ছেন। বাজে কথা বলে কি তাকে থামাতে পেরেছেন। বরং আপনারা থেমে গেছেন, তিনি জেগে আছেন। 


অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিক্ষিত মানুষ এগিয়ে আসে না।অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন, ২০০৯ সালে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ইচ্ছে পোষণ করে খোলা চিঠির মাধ্যমে অভিমত জানতে চেয়েছিলেন। তাকে আমরা খুব নোংরা ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছি। তিনি কিন্তু চাল গম চুরি করার জন্য রাজনীতিতে আসতে চাননি, তিনি তার অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।বিনিময়ে  আমরা তাকে অসম্মান, অপমান উপহার দিয়েছি। সুদখোর বলেছি, মার্কিনীদের দালাল বলেছি, আরও অনেক কিছু। ভদ্রলোক মনের অনুরাগে আমাদের থেকে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে। যে মানুষটিকে আমাদের দেশের সরকার ও একটা শ্রেণী ফুটো পয়সা দাম দেয় না, সেই মানুষটি ইউরোপ আমেরিকার শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত দেশগুলোতে পরামর্শ দিয়ে বেড়ায়। তার বক্তৃতা কভার করার জন্য পশ্চিমা মিডিয়াগুলো ভিড় জমায়।তার আগমনে উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভবনের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। অনেক পার্কে তার ছবি টাঙানো থাকে।বিদেশে তার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি তারা জানি, অনেক সময় আমাদের ছোট্ট দেশটিকে অনেকই চেনে না, কিন্তু ডক্টর ইউনূসের জন্মভূমি বললে চেনে। বিশ্বের অনেক নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বক্তৃতা দেন, তার বই উন্নত বিশ্বের লাইব্রেরীগুলোতে গবেষণার জন্য রাখা হয়। অথচ ভদ্রলোকের নিজের দেশের সরকার ও এক শ্রেণীর অযোগ্য মানুষ তাকে উপেক্ষা করে।     


কিশোর কুমার দাস নামে এক সুশিক্ষিত তরুণ নিজের জীবনবোধের তাড়না থেকে  নিজের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে সমাজের বঞ্চিত মানুষদের জন্য কিছু করতে এগিয়ে আসলেন। তৈরি করলেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে অনেক তরুণ তরুণী স্বেচ্ছা শ্রমে যুক্ত হলেন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তাদের নতুন নতুন সমাজ বান্ধব কার্যক্রমের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়লো দেশব্যাপী। এই সুনাম এক সময় চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ালো সমাজের এক শ্রেণীর কুচক্রী মহলের কাছে। যে সব ধর্ম ব্যবসায়ী ফতোয়াবাজ পানি ফু দিয়ে পেট চালান তারা উঠেপড়ে লাগলো এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তাদের সমস্যা এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কিশোর কুমার দাসের ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়।তিনি অর্থ ও স্বশরীরে শ্রম দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন অথচ দেশের এক শ্রেণীর পবিত্র লোকজন দাবী তুললেন  হিন্দু লোকের এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের পদে থাকা চলবেনা। ফেচবুকে তার ধর্ম তুলে গালাগালিও করা হল। বিদ্যানন্দ নামটা নাকি হিন্দুয়ানী নাম।অথচ বিদ্যানন্দ নামটি দিয়েছেন এক মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট। “আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন” স্লোগানে তিনি এই নাম দিয়েছিলেন। কাজের থেকে ব্যক্তির ধর্ম ও নাম আমাদের মাথা ব্যথার কারণ হল! 


দেশ থেকে ফ্রান্সে চলে আসার পর দেখলাম, এখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটি বেশ পেছনে পড়ে আছে। নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। একটা শ্রেণী দেশের পচা রাজনীতি চর্চা করে এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত থাকে। কমিউনিটির এই সংকটকে উপলব্ধি করে বেশকিছু উদ্যমী তরুণ কিছু সংস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়।সংস্থাগুলোর সাথে এখানে বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা অর্জন করা কিছু মহৎ তরুণ যুক্ত থাকায় সংস্থাগুলো আজ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বিপদগ্রস্ত মানুষ কোননা কোন ভাবে সংস্থাগুলো থেকে সহায়তা পাচ্ছে। তাদের সমস্যাগুলো নিজের ভাষায় ব্যক্ত করতে পারছে।মহৎ তরুণেরা বিনামূল্যে  নানাবিধ পরামর্শ দিয়ে কমিউনিটির মানুষদের সমস্যা সমাধানের  চেষ্টা করে চলছে। ফলে বিপদকে পূঁজি করে পেট চালানো কিছু টাউটদের আয় কমে যাচ্ছে। সংস্থাগুলোর সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের অনেক ভুল থাকতে পারে, তবে তাদের ভালো কাজের পাল্লাটাই ভারী । ভুলগুলো ধরে তাদেরকে  শুধরানোর পরামর্শ দেয়া যেতে পারে ,অথচ ঐসব টাউট ও এক শ্রেণীর অযোগ্য মানুষ এই সব মহৎ তরুণদের গালাগালি করে থাকে, ফেচবুকে অপপ্রচার করে নানা ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে থাকে ।এই সব নিম্ন চিন্তা ধারার মানুষদের কাছে প্রশ্ন, আপনারা যারা এমন করেন তারা কি ঐ সব তরুণদের সমালোচনা করার যোগ্য? কিংবা এই জনমে ওদের মত দুই একটি ভালো কাজ করে দেখাতে পারবেন?নিজেকে প্রশ্ন করুণ, অন্যের পিছু লাগা ছাড়া আর কি শিখেছেন জীবনে।     


যে জন্য এতোগুলো উদাহরণ টেনে আনলাম তা হল যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফেরদৌস খন্দকারকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কের কারণে। সমগ্র পৃথিবী যখন করোনা ভাইরাসের আক্রমণে দিশেহারা , সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে সকল রাষ্ট্র নায়কেরা, তখন পৃথিবীর কিছু  উদার ডাক্তার ও নার্সেরা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে আলোর দিশা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।ডা. ফেরদৌস খন্দকার এই সময়ে বিভিন্ন ভিডিও বার্তার মাধ্যমে  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মত মানুষকে স্বাস্থ্য জ্ঞান দিয়েছেন। করোনা ভাইরাস থেকে প্রতিরক্ষার পথ দেখিয়েছেন। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তার নিজ বাসস্থান নিউইয়র্ক ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য নানাবিধ পরামর্শ দিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। শুধু চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শই নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে মানুষকে আর্থিক সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন। মানুষ তার কর্মকাণ্ডকে প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশ এখন করোনা মহামারীর মধ্যে দিয়ে কঠিন সময় পার করছে।দেশের কথা চিন্তা করে, দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার টানে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে দেশে গিয়েছেন। ভেবেছেন দেশের মানুষকে সরাসরি চিকিৎসা সেবা দেবেন। ভেবেছিলেন, আর কিছু না হোক মানুষের ভালোবাসা পাবেন, সম্মান পাবেন। কিন্তু, প্রথমেই দেশের মাটিতে নেমে তিনি এয়ারপোর্টে  হয়রানির  স্বীকার হয়েছেন। সম্মানতো দূরে থাক, তার আসার সংবাদ শুনে দেশের ইতর বাদর প্রকৃতির একটি মহল তাকে অপমান করার পূর্ব প্রস্তুতি সাজিয়ে রেখেছেন। কারণ ভালো মানুষের উপস্থিতি থাকলে খারাপ মানুষদের অপকর্ম বাধাগ্রস্ত হয়।সমস্যা  তার নামের পাশের  খন্দকার ও তার জন্মস্থান কুমিল্লা জেলা।বলা হচ্ছে, তিনি  নাকি খুনি খন্দকার মোশতাকের ভাতিজা কিংবা খুনি কর্নেল রশিদের খালাতো ভাই। কোন কিছুর প্রমাণ দাঁড় না করে কাউকে অপবাদ দেয়া কত বড় মাপের অপরাধ ও গর্হিত কাজ, এটা কি আমরা ভেবে দেখেছি। এই ভদ্রলোকতো দেশ থেকে কিছু আনতে যায়নি, বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনাদেরকে দিতে গিয়েছেন , তবে কেন এই অপবাদ? যারা মানুষকে হেয় করেন, মতের বিরুদ্ধে গেলে নামের পাশে জামাত, রাজাকার ট্যাগ লাগিয়ে দেন, তারা কি একবার আয়নার সামনে গিয়ে দেখেছেন, আপনার চেহারা কতটা কুৎসিত? কতটা কদর্যতায় ভরা আপনাদের অন্তর? জীবনে সোজা পথে রুটিরুজির যোগ্যতা অর্জন করতে না পেরে নোংরা পথ বেঁচে নিয়েছেন। এ কথা কি একবারও উপলব্ধি হয়না আপনাদের? একবার খোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেছেন কি? নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যাদেরকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছেন তারা আরও উজ্জ্বল হয়ে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছে । বরং আপনাদের চেহারা কুৎসিত থেকে আরও নিকৃষ্ট মানের কদাকার হয়েছে।    


 রাষ্ট্র ক্ষমতা শেয়াল শকুনদের দখলে, কিন্তু দেশ, দেশের জনগণ ও ভূমি আমাদের সকলের। বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশটি পরিচালিত হয় একে অপরের কাঁধে ভর করে। যারা ভালো কাজ করতে গিয়ে গুটিকয়েক কদাকার মানুষের তিরস্কার ও ভৎসনায় হতাশ হন তাদেরকে বলছি, মানুষের প্রশংসা করার জন্য একটি যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, একটি চর্চার প্রয়োজন হয়, ভালো মানসিকতার প্রয়োজন হয়। যাদের বসবাস অন্ধকারে, রুটিরুজি অন্ধকারে, তারা আলোর ভালো বুঝবে কি করে? বরং আলোকে তারা প্রতিপক্ষ মনে করে। তাই তাদের এই হীন প্রচেষ্টা সর্বক্ষণ।অন্ধকারের বাসিন্দাদের কথায় হতাশ হবার কি আছে। বরং আরও ভালো কাজের মাধ্যমে এদের দমন করতে হবে।    


পরোপকার সর্বোৎকৃষ্ট মহৎ গুণ।সমাজে কিছু মানুষ জন্ম গ্রহণ করে যারা অন্যের কষ্টে ব্যথিত হয়।অন্যের বিপদ দেখে নিজ শ্রম সময় অর্থ ব্যয় করে অন্যের দুঃখ লাঘবের চেষ্টা করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে।এমন মানুষদের মহানুভবতার কারণেই সমাজ ভিত্তিক রাষ্ট্রগুলোর ভারসাম্য টিকে থাকে।বাংলাদেশ একটি সমাজ ভিত্তিক রাষ্ট্র। সমাজের চলমান সমস্যাগুলোর সমাধান এমন উদার মানুষেরাই করে থাকে।অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা এদের তুলনায় গৌণ থাকে।একে অপরের কাঁধে ভর করে আমাদের দেশ ও সমাজ এভাবেই চলছে।প্রবাসের বাংলা কমিউনিটিগুলোতে একই পরিস্থিতি বিদ্যমান।


আমরা জাতিগত মানুসিকতায় আত্মকেন্দ্রিক জাতি।নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রের বৃহত্তর জাতিগত স্বার্থ বিকিয়ে দিতে আমাদের হৃদয় কাঁপেনা।ভোগের জন্য,স্বার্থের জন্য আত্মসত্তাকে অপমান করে অন্যের কাছে নতজানু হওয়ার প্রবৃত্তি আমাদের অস্থি মজ্জায়।ফলে অন্যের উন্নতি যেমন আমাদের সহ্য হয়না, তেমনি অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা আমাদের অসুস্থ করে তোলে।এই হীনমন্যতার কারণে নিজের উন্নতির জন্য যতটুকু সময় ব্যয় করা দরকার অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি অন্যকে হেয় করে আনন্দ লাভের নেশায়।


জাতিগত এই মানুসিকতার পরিবর্তন রাতারাতিই সম্ভব নয়।এ এক সুদীর্ঘ সাধনার যাত্রা।কাজের প্রশংসা আরও ভালো কাজের অনুপ্রেরণা যোগায়, তবে এমন সমাজে যে মানুষগুলো আপামর মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজের অগ্রগতির ব্রত গ্রহণ করতে চান,  তাদের প্রথমে চিন্তা করতে হবে তার ত্যাগের পুরষ্কার কোন বড় মঞ্চে উত্তরীয় পড়িয়ে নাও দেয়া হতে পারে, বরং লাঞ্ছনা,গঞ্জনা, অপবাদ তাদের কাছ থেকেই জুটতে পারে যাদেকে আপনি কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন।তাই বলে আপনার থেমে যাওয়া ঠিক হবেনা।থেমে যাওয়া মানে, আপনার মহৎ হৃদয়কে অকৃতজ্ঞ আত্মকেন্দ্রিক মানুষের কুৎসিত হৃদয়ের কাছে পরাজয় ঘটানো।বরং আপনার আজকের ত্যাগ আগামীর একটি উদার মানুসিকতার জাতি গঠনের সোপান।যে স্বপ্ন আপনি লালন করে সুখ লাভ করেন। 


( বিঃদ্রঃ  কাশেম বিন আবুবাকার এর তথ্য উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া হয়েছে)